‘কথা কও, কথা কও
অনাদি অতীত অনন্ত রাতে
কেন বসে চেয়ে রও?’
খুব ছোটবেলার কথা বেশির ভাগ লোকেরই মনে থাকে না। তবে চার বছর বয়সের ঘটনাবলীও যে কারোর স্মৃতি থেকে বেমালুম অবলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, হালে নিজেকে দিয়েই প্রত্যক্ষ করলাম।
ঘরকুনো, বারমুখো সব রকম মানুষকেই অতীত খুঁড়ে খুঁড়ে আপন শিকড়ে পৌঁছনোর দুরূহ অথচ মায়াময় প্রয়াসে নিযুক্ত হতে শিখিয়েছে যে পদ্ধতি তার নাম ভোটের স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন।
তা, এ হেন এসআইআর আবহে প্রায়ই বাড়ির সাবেকি আলমারি, দেরাজ, বাবার সাতপুরোনো সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ড্রয়ার হাতড়াচ্ছিলাম কিছুদিন যাবত। কিছুটা খেয়ালে, বাকিটা প্রয়োজনে।
গতকাল বুড়োদাদু আর ঠাকুমার মরণোত্তর আলতা রাঙানো পায়ের ছাপ, মায়ের ১৯৭৭ সালের চেস্ট এক্সরে-র প্লেট (আমার জন্মের আগে মায়ের যক্ষ্মা হয়েছিল — জানতাম, হাতে গরম প্রমাণও পেলাম), আমার ইশকুল বয়সের বাংলা বানান আর রচনার জন্য প্রাপ্ত মেডেলগুলোর সঙ্গেই পেয়ে গেলাম ১৯৭৩ সালের কিছু ছবি — দেওঘরের।
দেওঘরে আমার দাদুভাইয়ের (মায়ের বাবা) একখানি পৈতৃক বাড়ি ছিল। সব আত্মীয়স্বজনেরা ছুটির অবকাশে কিছুদিন করে কাটিয়ে এসেছে সেখানে। তিয়াত্তর সালে গিয়েছিল আমার মা বাবা। আমাকে নিয়েই। মায়ের মুখে ত্রিকূট পাহাড় আর বম্পাস টাউনের গপ্প ঢের শুনেছি — কিন্তু নিজেকে কিছুতেই ‘প্লেস’ করতে পারিনি সেই সময়টাতে। ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে লেপাপোঁছা স্লেটের মতো ঐ সময়টুকু মনের আঙিনা থেকে মুছে গিয়েছিল চিরতরে। ছবিগুলোতে নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না — একটু একটু হিংসেও হচ্ছিল, আমার মা বাবার সঙ্গে এই অচেনা ঘ্যানা বাচ্চাটা কে রে বাবা?

চার বছুরে ‘আমি’টাকে সনাক্ত করার মতো মানুষও যে বেশি নেই আর আমার ছোট্ট পৃথিবীতে। অবশেষে শাশ্বতীদিই মুশকিল আসান করলো। হোয়াটস্যাপে ছবিগুলো পাঠাতেই গড়গড় করে বলে দিল —
“ওমা, এই তো আমাদের দেওঘরের বাড়ি। এই তো সিংদরজা, এটা জাফরিঘেরা পিছনের বারান্দা, আর ডলিপিসি-পিসেমশায়ের সঙ্গে এই পুচকেটাই তো তুই!”
দেওঘরের সেই বাড়ি বিক্রি হয়ে গিয়েছে কবে। মা নেই, মামা মাইমা নেই, বাবা নেই, ডহরু মালি নেই, ডহরুর মেয়ে মঞ্জুয়া নেই। কে জানে সেই দেওঘরও হয়ত নেই আর।
কবেকার ঝাপসা ছবিগুলো বুকে আঁকড়ে রেখে নিজেকে চিনতে না পারা বোকা ‘আমি’টার দু’চোখ ভেসে যাচ্ছে এক বুক নোনাজলে। অথচ আমার ছোট্ট শরীর বেড় দিয়ে আগলে রাখা হাসিমুখ বাবাটার শক্তপোক্ত হাতখানি আমি দিব্যি অনুভব করতে পারছি। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিbসব ছবিতেই মা সূর্যমুখীর মতো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে — সেই চার বছর বয়স থেকে চুয়ান্ন বছর বয়স পর্যন্ত — যেমন করে হাসপাতালের রেলিং ঘেরা বিছানা থেকে দু’টো চোখের ব্যাকুল দৃষ্টি ঘিরে থাকত আমার অস্তিত্বকে।
আমি বসে বসে দেখতাম, ঠোঁট নড়ছে নিরুচ্চারে –কবে থেকে যাব যাব করেও ঐ জন্যই যেতে পারছি না খুকু। কার কাছে রেখে যাব তোকে?
‘কেন চেয়ে আছ গো মা, মুখপানে —‘











