শুরুর কথা
ডেভিড হেয়ারকে (১৭৭৫-১৮৪২০) নিয়ে গবেষণা বা জীবনীমূলক গ্রন্থের সংখ্যা অপ্রতুল নয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে সরজেশ মুখোপাধ্যায়ের লেখা The Life and Times of David Hare: The First Secular Educationist of India (2024)। বইটি আমার এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি। তবে ডেভিড হেয়ারকে নিয়ে সাধারণভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে উপনিবেশিক বাংলায় শিক্ষাপ্রসারে তাঁর ভূমিকা, নারী শিক্ষার সূচনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান, বিভিন্ন সামাজিক হিতৈষণার কাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইত্যাদি। এগুলো সবকটিই তাঁর জীবনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ববাহী এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার আলোচনা কেন্দ্রীভূত থাকবে সম্ভবত অদ্যাবধি অনালোচিত একটি বিষয়ে – বাংলায় তথা ভারতে “হসপিটাল মেডিসিন”-এর সূচনার ক্ষেত্রে মেডিক্যাল কলেজ এবং ডেভিড হেয়ারের নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে।
এর আগে কয়েকটি বিষয় স্মরণ করা যেতে পারে। রাজানারায়ণ বসু পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে সাংস্কৃতিক রূপান্তর বোঝাতে গিয়ে একটি লাগসই শ্লোক ব্যবহার করেছিলেন। সংস্কৃতে আসল শ্লোক ছিল –
অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।
পঞ্চ কন্যাঃ স্মরেন্নিত্যং মহাপাতকনাশনং।।
রাজনারায়ণের কালে এর আদলে তৈরি যে শ্লোকটি জনপ্রিয় হয়ে উঠল, তা হল –
হেয়ার্ কল্বিন্ পামরশ্চ কেরি মার্শমেনস্তথা।
পঞ্চ গোরাঃ স্মরেন্নিত্যং মহাপাতকনাশনং।।[1]
এখানে নতুন শ্লোকের প্রথম নামটিই দেখতে পাচ্ছি “হেয়ার”। আবার সুনীতি চট্টোপাধ্যায় কুমার চ্যাটার্জি ডেভিড হেয়ারের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর পিতামহের কাছ থেকে একটি “doggerel verse” ছেলেবেলায় শিখেছিলেন।[2] সে পদ্যাংশটি হল –
জোন্সঃ কেরী তথা হ্যারঃ
প্রিনসেপশ্চ কনিংঘমঃ।
পঞ্চ গৌরান স্মরেন্ নিত্যং
জ্ঞানাঞ্জন-প্রদায়কান।।
ভিন্ন সময়ে রচিত হলেও দুটি শ্লোকের মধ্যে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। আবার সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর “ডেভিড হেয়ার” শীর্ষক পদ্যে লিখেছিলেন –
কুড়ায়ে পথের রোগী সংক্রামকে তুমি দিলে প্রাণ, –
তবুও নাস্তিক তুমি! – ও অস্থি নেবে না গোরস্থান!
তাই ছাত্র-পল্লী-তলে বিরাজিছ ছাত্রের দেবতা!
সমাধা – সমাধি সেথা পবিত্র ব্রতের যেথা সুরু!
মনুষ্যত্ব-ধর্মে পূত – হে নাস্তিক! আস্তিকের গুরু![3]
এরকম চারণা থেকে বোঝা যায় বিংশ শতাব্দিরও এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ডেভিড হেয়ার সামাজিক স্মৃতিতে বিশেষভাবে জীবন্ত ছিলেন। একবিংশ শতাব্দিতে এসে এই সামাজিক স্মৃতি দ্রুত ক্ষীয়মাণ।
(হেয়ার স্কুলে ডেভিড হেয়ারের স্ট্যাচু)
(শিল্পীর আঁকা তাঁর স্কেচ)
বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ থেকে যতদূর জানা যায় ১ জুন, ১৮৪১-এ তিনি কলেরায় আক্রান্ত হন এবং ২ জুন, ১৮৪১ সালে প্রয়াত হন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ গবেষক ১ জুন, ১৮৪১ তারিখটিকেই তাঁর প্রয়াণদিবস হিসেবে ধরেছেন। সুবলচন্দ্র মিত্র জানিয়েছেন – “১৮৩৮ খ্রী ইনি Calcutta Court of Requests নামক আদালতে জজ পদে অধিষ্ঠিত হন। এই আদালত এখন ছোট আদালত নামে অভিহিত। মৃত্যুর পর কলিকাতা গোলদীঘির এক কোণে ইঁহাকে সমাহিত করা হয়। ইংরাজী শিক্ষার প্রবর্তক ছিলেন বলিয়া শিক্ষিত বাঙ্গালীগণের অনেকেই সম্মান ও কৃতজ্ঞতা জানাইবার জন্য আজ পর্যন্ত প্রতি বৎসরের ১লা জুন ইঁহার কবরের নিকট সমবেত হন। ইঁহার একটি প্রস্তরময়ী মূর্তি প্রেসিডেন্সি কলেজ ও হেয়ার স্কুলের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপিত হইয়াছে এবং যে বাড়িতে ইনি বাস করিতেন, সেই বাড়িতে স্মরণ-চিহ্ন-স্বরূপ গভর্নমেন্ট একটি মর্মরফলক স্থাপিত করিয়াছেন। ছোট আদালতের দক্ষিণে যে রাস্তায় ইঁহার বাড়ি ছিল (Nicco House নামে সম্পূর্ণ তৈরি না-হওয়া বাড়ি), সেই রাস্তাটি হেয়ার স্ট্রীট নামে বহুদিন যাবৎ অভিহিত আছে।”[4]
উল্লেখ করা দরকার, হেয়ারের মৃত্যুর পরে তিনি “নেটিভ” তথা ম্লেচ্ছদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশতেন বলে তাঁকে সমাহিত করার জন্য একখণ্ড ভূমিও তৎকালীন কলকাতার মিশনারিরা দিতে অস্বীকার করে (সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর পদ্যে উল্লেখ করেছেন)।
বিপরীতে বাংলায় তাঁর গুণগ্রাহীরা ১৭ জুন ১৮৪১-এ রাজা কৃষ্ণনাথ রায়ের আহুত মেডিক্যাল কলেজের থিয়েটারে অনুষ্ঠিত মিটিংয়ে তাঁর সমাধিফলকে লেখা বার্তা নিয়ে সহমত হন।[5] নিচে সমাধিফলকে লেখা বার্তা দেওয়া হল।
ডেভিড হেয়ারের সময়কাল
ডেভিড হেয়ার ছিলেন স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহন করা একজন ঘড়ি নির্মাতা তথা ব্যবসায়ী। ১৮০০ সালে ভারতে আসেন ভাগ্যান্বেষণের সন্ধানে। কিন্তু, ইতিহাসের নিয়মে, তাঁর নিজের এবং বাংলার সাংস্কৃতিক-সামাজিক (অন্তত ওপরতলার মানুষদের ক্ষেত্রে) ভাগ্যই বদলে যায়। ঘড়ির ব্যবসায়ী থেকে তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তাকে বাংলার মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে একজন অগ্রদূত। তাঁর নিজের তেরি আরপুলি স্কুল এবং ইংরেজি পাঠশালা। তিনি নিজে লেডিজ সোসাইটি ফর নেটিভ ফিমেল এডুকেশনের একজন পৃষ্ঠপোষক, হিন্দু কলেজ (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং বর্তমানে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি) এবং আরও একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সভা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি প্রাগ্রসর ভূমিকা পালন করেছেন। রামমোহনের “আত্মীয় সভা”-র সাথে যুক্ত ছিলেন। এবং সেসময়ে ইউরোপের আদলে যে বিভিন্ন “জ্ঞানোপার্জনী সভা” (Society for the Acquisition of Knowledge) তৈরি হচ্ছিল, সেগুলোর সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।
আমরা জানতে চাইতে পারি, কেমন ছিল উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকের সময়কাল? ঐতিহাসিক এরিক স্টোকস তাঁর seminal গ্রন্থ The English Utilitarians and India-তে জানাচ্ছেন সে সময়কালকে বুঝতে হলে আমাদের ভারতের পরিবর্তে ইংল্যান্ডের দিকে তাকাতে হবে – “Free trade was its solid foundation. Evangelicalism had provided its programme of social reform, its force of character, and its missionary zeal.”[6]
পরে স্টোকস বলছেন – “Utilitarian hopes of inaugurating a competitive society based on individual rights in the soil, depended as much upon the revenue assessment, and the registration of landholdings which accompanied it, as upon the superstructure of judicial codes and establishments.”[7]
স্টোকস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন – “It was in that year (1818) that the orator of the new liberalism, the young Macaulay, shook off his father’s toryism and avowed himself a Radical. It was in the same year that James Mill published his great History of India, and became a candidate for high office in the Company’s Home Government.”[8]
একটু আগে যেমন বলেছি, স্টোকস যেন সেকথাই অন্যভাবে ভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের নজরে আনেন – “It should not mask the more formative role which India played in English history throughout the greater part of the nineteenth century.”[9]
তিনি আমাদের অবহিত করেন যে ১৮ শতকের মুষ্টিমেয় কিছু ইংরেজ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ইংরেজ স্ত্রী ছিলনা কিংবা ছিলনা “prospects of furlough”। কোন অনমনীয় নৈতিকতা কিংবা ধর্মীয় নিয়মাচরণ এদের জীবনের ক্ষেত্রে আবশ্যিক ছিলনা। এবং এই মানুষেরা “soon adapted themselves to Indian ways of living. Set on making their fortune before the climate or disease carried them off, they were zealots for no cause or political principle, and were content to conduct the public business according to its traditional Indian forms and in the traditional hybrid Persian.”[10] ডেভিড হেয়ারের ক্ষেত্রে এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ অনেকাংশে সত্যি। সেসময়ের কলকাতার কথা বলতে গিয়ে স্টোকস জানাচ্ছেন – “The Calcutta mercantile community had its own narrower, more selfish standpoint, but substantially swelled the great tide of liberalism engulfing the English mind in the eighteen-thirties … if the new British Empire were to be a dominion not over territory but over wants of the universe, it followed that it was more important to civilize than subdue.”[11] এ কথাও ডেভিড হেয়ারের মতো যেসব ভারতপ্রেমী এদেশে এবং বাংলায় এসেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বহুলাংশে সত্যি।
এখানে আরেকটি প্রসঙ্গ আমাদের বিবচনায় আমাদের বর্তমান প্রবন্ধ ও বিষয়ের জন্য প্রাসঙ্গিক। ১৮২৭ সালে উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক বাংলার গভর্নর জেনারেল হয়ে ভারতে দ্বিতীয়বার আসেন। এর আগে তিনি মাদ্রাজে সরকারের কর্তাব্যক্তি হিসেবে কাজ করেছিলেন। দ্বিতীয়বার গভর্নর-জেনারেল হয়ে এদেশে এসে বেন্টিঙ্ক প্রথম যে কাজটিতে হাত দিয়েছিলেন তাহল ব্রিটিশের একের পর এক যুদ্ধে বিদ্ধ্বস্ত এবং প্রায় শূণ্য কোষাগারকে লাভের মুখ দেখানো।
সি এ বেইলি জানাচ্ছেন – ““Between 1829 and 1835 he transformed a budget deficit of one and a half million pounds sterling into a surplus of a half a million pounds … Worst of all British India found stability neither on its internal and or external frontiers … It is against this background that Bentinck’s social and educational reforms must be set … The Governor General was certainly influenced by the utilitarian philosophy of government urged by James Mill.”[12]
লুঠ এবং যুদ্ধের কারণে বেন্টিঙ্কের সময়ে ব্রিটিশ কোষগারে অর্থের ঘাটতি চলছিল। এই ঘাটতি বেন্টিঙ্ক পূরণ করেন। এর ফলে ১৮৩৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় রদ হয়ে যাওয়া চার্টারের নবীকরণ ঘটে। এবং এর প্রশাসনিক পুরস্কার হিসেবে বেন্টিঙ্ক ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে মনোনীত হলেন। অন্য আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অভাব নিয়ে যে অভিমত ঐতিহাসিক বেইলি ব্যক্ত করেছেন বেন্টিঙ্ক এর বিপরীত কথা বলেছেন বন্ধু পিটার অবারকে লেখা একটি চিঠিতে – “My firm opinion on the contrary is that no dominion in the world is more secure against internal insurrection”[13]।
বেন্টিঙ্ক সম্বন্ধে অন্যত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে তিনি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের দায়িত্বভার নেবার আগে বেন্টিঙ্ক “indeed subscribed in 1826 for two shares in the newly founded University College, London – an institution under combined Whig, Benthamite and Dissenting control, and a forward battalion in the ‘march of mind’…”[14]। অক্সফোর্ড এবং কেম্ব্রিজের বিপরীতে ইউনিভার্সিটি কলেজের ছাত্রদের প্রয়োজন ছিলনা “subscription to the thirty nine Articles of the Church of England. This new university tried in the 1830s to join the theoretical study of science to the practical work of the clinic, as was already underway in Germany.”[15]
“হসপিটাল মেডিসিন”-এর আবির্ভাবকাল
পূর্বোক্ত পটভূমিতে মেডিক্যাল কলেজের প্রতিষ্ঠা – ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডনের আদলে ও শিক্ষাদানের চরিত্রে। এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষে ঐতিহাসিকভাবে “হসপিটাল মেডিসিন”-এর সূচনা। হাসপাতালে কোন রোগীর চিকিৎসা হওয়া মানেই “হসপিটাল মেডিসিন” নয় – এ কথা আমাদের পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। “হসপিটাল মেডিসিন” – ঐতিহাসিকভাবে এই ধারণার উদ্গাতা অ্যাকারনেখট।[16]
এই নতুন ধরনের মেডিসিনের চারিত্র্যলক্ষণ কী? অ্যাকারনেখটের কথায় – “it was only at the hospital that the three pillars of the new medicine – physical examination, autopsy, and statistics – could be developed.” অস্যার্থ, ৩টি প্রধান ভিত্তির ওপরে “হসপিটাল মেডিসিন” দাঁড়িয়ে আছে – (১) হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীর শয্যাপার্শ্বে রোগীকে পরীক্ষা করা, তার রোগের ইতিহাস নেওয়া এবং রোগ সম্পর্কে অবহিত হওয়া, (২) মৃত্যুর পরে রোগীর শবব্যবচ্ছেদ করে রোগের লক্ষণের সঙ্গে দেহাভ্যন্তরের (pathological anatomy) কী কী পরিবর্তন ঘটেছে তা মিলিয়ে নেওয়া, এবং (৩) রোগের এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান তৈরি করা। অ্যাকারনেখট দেখিয়েছেন যে “প্যাথোলজিকাল অ্যানাটমি”-র বাস্তব জগতে চর্চা শুরু হয় ফরাসী বিপ্লবোত্তর অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দির শেষে প্যারিসের হাসপাতালে।[17] এই দেহগুলোর জোগানদার কারা ছিল? “These were essentially a consequence of the tremendous influx of uprooted and penniless boys and girls from the country and of the beginnings of the Industrial Revolution.”[18]
স্বল্পকথায় বললে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে “হসপিটাল মেডিসিন” উদ্ভবের পর্যায়কাল দুটি ঘটনা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করল – (১) medical cosmology-র রূপান্তর ঘটল, এবং (২) মেডিক্যাল জ্ঞান তৈরির প্রক্রিয়া ব্যক্তিগতভাবে দেখা কয়েকজন রোগীর পরিবর্তে জন্ম নিতে শুরু করল হাসপাতালে ভর্তি শ’য়ে শ’য়ে রোগীর প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, মৃতুর পরে মৃত্যু-পূর্ব সময়ের লক্ষণের সাথে দেহের অঙ্গসংস্থানের পরিবর্তন মিলিয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসার ধারার (course of treatment) মধ্য দিয়ে উপার্জিত জ্ঞান।
যে কোন পাঠকই খেয়াল করলে বুঝবেন যে, মেডিক্যাল কলেজের আবির্ভাবের আগে যেভাবে মেডিসিনের প্র্যাক্টিস হত এবং মেডিসিন-সংক্রান্ত যেসব ধারণা ছিল (এদেশে আয়ুর্বেদ কিংবা ইয়ুনানি হোক কিংবা পাশ্চাত্যে গ্যালেনীয় কিংবা হিপোক্রেটিয় মেডিসিন হোক) সেসমস্তকিছুর সাথে একটি ”paradigm shift” ঘটে গেল। তবে উল্লেখ করার যে, ইউরোপে “হসপিটাল মেডিসিন”-এর আবির্ভাব ঘটতে কয়েক শতাব্দীর সামাজিক রূপান্তর, বিপ্লব এবং অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে ঘটেছে। কিন্তু ভারতে ঘটেছে মাত্র এক দশক সময়ের মধ্যে। এবং এর ভিত্তি ছিল ছাত্রদের দ্বারা শবব্যবচ্ছেদ। ২৬ জানুয়ারি ১৮৩৫-এ বেন্টিঙ্ক পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন – “That all the foundation pupils (of Medical College) be expected to practise human dissection and perform operations upon the dead body, or be discharged.”[19] হয় ডিসেকশন তথা শবব্যবচ্ছেদ কর, কিংবা কলেজ থেকে বিদেয় হও।
ডেভিড হেয়ার, তাঁর মেডিসিন ও মেডিক্যাল কলেজ
প্যারিচাঁদ মিত্র হেয়ারের আত্মজীবনী লিখতে গিয়ে জানাচ্ছেন – “হেয়ারের পাল্কীটি একটি নিয়মিত ডিসপেনসারি ছিল as it contained medicines for healing suffering of all kinds.”[20] মিত্র আরও জানাচ্ছেন – “তাঁর (হেয়ার) কাছে আগত যাদের বই কেনার সামর্থ্য ছিলনা তাদেরকে সেজন্য সাহায্য করা হত। আর অসুস্থরা received medicines and medical aid from him.”[21]
Records of Public Instruction-এ দেওয়া Mr. Kerr-এর সাক্ষ্য উদ্ধৃত করে মিত্র জানাচ্ছেন – “He used also when they were sick to visit them at their houses, bringing medicine to them, and taking a fatherly and affectionate interest in their welfare. On these occasions it is said even the Hindu women would lay aside their reserve and consult him as they would a father or brother.”[22]
যদিও প্যারিচাঁদ মিত্র কোন সময়ক্রম উল্লেখ করেন নি, আমরা ধরে নিতে পারি এই সময়কাল মেডিক্যাল কলেজ তৈরির (১৮৩৫) আগেকার সময়কালের অর্থাৎ ১৮২০-৩০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে।
এখানে কয়েকটি বিষয় কৌতূহলী পাঠককে ভাবায় – (১) হেয়ার সবসময় সঙ্গে মেডিসিন নিয়ে ঘুরতেন। এর অর্থ কী সাধারণভাবে মেডিসিনের ব্যাপারে তাঁর কিছু বুনিয়াদি ধারণা ছিল? (২) তাঁর অধীতব্য অর্থাৎ পাঠ-তালিকা সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য কোন উপাদান না পাওয়া গেলেও অন্তত এই প্রবন্ধকারের মন বিশ্বাস করতে চায় যে, ইউরোপে মেডিসিনের যে অগ্রগতি ঘটেছে সে বিষয়ে তিনি কিছুটা ওয়াকিবহাল অবশ্যই ছিলেন, এবং (৩) হিন্দু মহিলারাও তাদের শারীরিক সমস্যার কথা হেয়ারকে জানাতেন নিঃসংকোচে – পিতা কিংবা ভাই হিসেবে বিবেচনা করে। সেসময়ের গোঁড়া পর্দানসীন হিন্দু সমাজে এরকম ঘটনা বিস্ময়কর বৈকি।
প্যারিচাঁদ মিত্রের লেখা থেকে আমরা আরও জানতে পারি, প্রথম দিকে হেয়ার প্রতিটি স্কুল এবং কলেজ ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শনে যেতেন। কিন্তু পরের দিকে কেবলমাত্র হিন্দু কলেজ, পটলডাঙ্গা স্কুল এবং মেডিক্যাল কলেজে যেতেন পরিদর্শন করতে।[23]
শিবনাথ শাস্ত্রী জানাচ্ছেন – “তখন স্বীয় স্বীয় বালকদিগকে ইংরাজী শিখাইবার জন্য লোকের এমন ব্যগ্রতা জন্মিয়াছিল যে, হেয়ারের পক্ষে বাটীর বাহির হওয়া কঠিন হইয়াছিল। বাহির হইলেই দলে দলে বালক – “Me poor boy, have pity on me, me take in your school” বলিয়া তাঁহার পাল্কীর দুই ধারে ছুটিত।”[24]
১৮২২ সালে কলকাতায় ব্রিটিশ ভারতের প্রথম আধুনিক মেডিসিনের ট্রেইনিং ইন্সটিটিউট Native Medical Institution (NMI) তৈরি হল। এখানে ইংরেজি ছাড়াও হিন্দি, আরবি এবং ফার্সীতে শিক্ষা দেওয়া হত। এরপরে কলকাতা সংস্কৃত কলেজ এবং কলকাতা মাদ্রাসায় আধুনিক মেডিসিনের কিছু গোড়ার পাঠ দেবার ব্যবস্থা করা হল। NMI-এর যুগকে (১৮২২-১৮৩৫) আমরা বলতে পারি “হসপিটাল মেডিসিন”-এর আগমনের আগে “গর্ভাবস্থার সময়” (gestation period/period of nativity)।[25]
১৮৩৫ সালের ২৮ জানুয়ারি যখন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হল তখন শুরুতে ৩ জন মাত্র শিক্ষক ছিলেন – ডঃ ব্রামলি (অধ্যক্ষ), এবং সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ছিলেন ডঃ গুডিভ এবং ডঃ উইলিয়াম ব্রুক ও’শনেসি। পাঠ্যসূচীর মধ্যে ছিল অ্যানাটমি, অ্যানাটমির ডেমনস্ট্রেশন, কেমিস্ট্রি, মেটেরিয়া মেডিকা এবং ফার্মেসি, সার্জারি (মৃতদেহের ওপরে), বোটানি, হাতেকলমে শেখার জন্য ল্যাবরেটিরতে শিক্ষা এবং কিছু পরিমাণে ফিজিওলজি শিক্ষা।
২৮ অক্টোবর ১৮৩৬-এ ভারত তথা এশিয়ার প্রথম ডিসেকশন হল মেডিক্যাল কলেজে। অধ্যক্ষ ব্রামলি জানাচ্ছেন – “For the most part also the students looked with contempt upon the ignorant prejudices of their countrymen, and it was most delightful to witness the spirit current amongst them, to raise themselves above the evils of their condition.”[26]
পরে যোগ করছেন – “On that day, which may be regarded as an eventful era in the annals of the Medical College, four of the most intelligent and respectable pupils, at their own solicitation undertook the dissection of the human subject, and in the presence of all the Professors of the College and of fourteen of their brother pupils, demonstrated they were hereafter to receive when the hospitals should be thrown open to their observation.”[27] কিন্তু লোকসমাজে ব্রাত্য হবার ভয়ে এই ৪ জন ছাত্রের নাম ব্রামলি তাঁর অকাল মৃত্যুর জন্য মেডিক্যাল কলেজের অসমাপ্ত প্রথম বার্ষিক রিপোর্টে প্রকাশ করতে পারেন নি। তিনি সখেদে তাঁর কিছু মন্তব্য রেখেছিলেন রিপোর্টে – “were their names brought to the notice of Government in the present report; but the same reason which induces them to conceal their anatomical labours, and the probable publicity of this document, forbids my making the disclosure.”[28]
শিবনাথ শাস্ত্রী জানাচ্ছেন – “সেকালের লোকের মুখে শুনিয়াছি এই মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ লইয়া সে সময়ে তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল … নব্যবঙ্গের নেত্রৃবৃন্দ শব-ব্যবচ্ছেদকারী ছাত্রগণকে রীতিমত উৎসাহ দিয়া এই নবপ্রতিষ্ঠিত কালেজকে সবল করিতে লাগিলেন।”[29]
প্রমথনাথ বসু জানিয়েছেন – “The first demonstration by dissection caused great anxiety. The College gates were closed to prevent forcible interruption of that awful act”[30]
আমাদের স্মরণে রাখতে হবে ডেভিড হেয়ার এই সমগ্র কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন। শবব্যবচ্ছেদের মধ্য দিয়ে “হসপিটাল মেডিসিন”-এর ভিত্তি প্রস্তর তৈরি হল। ভারতের ইতিহাসে এ এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু ছাত্ররা তাদের ক্লিনিকাল শিক্ষা অর্থাৎ হাসপাতালের ওয়ার্ডে গিয়ে রোগীকে দেখা, রোগের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং চিকিৎসাবিধি শিখবে কোথায়? এর জন্য প্রয়োজন কলেজের একটি নিজস্ব হাসপাতাল যা নতুন মেডিসিনের আরেকটি প্রধান ভিত্তি। শাস্ত্রী জানাচ্ছেন (এবং সরকারি রিপোর্টও জানাচ্ছে) – “তাঁহার (ডঃ ব্রামলি) মৃত্যু হইলে মহামতি হেয়ার ইহার সম্পাদক হন।”[31]
হেয়ারের নতুন ভূমিকা
মেডিক্যাল কলেজে প্রথম ডিসেকশনের আগে ডেভিড হেয়ার সহ কলেজের সমস্ত শিক্ষক, ব্রিটিশ কর্তাব্যক্তি এবং বাংলার উচ্চকোটির আধুনিকমনস্ক ব্যক্তিদের মধ্যে প্রধান উদ্বেগের কারণ ছিল ছাত্রদের হাতে সমাজে নিন্দিত, পরিত্যক্ত এবং ঘৃণিত শবব্যবচ্ছেদ গোঁড়া হিন্দু সমাজে কী বিপুল প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এ কারণে সংস্কৃত শাস্ত্রে বা আয়ুর্বেদে শবব্যবচ্ছেদের কোন নজির আছে কিনা, এটা অনুসন্ধান করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন।
প্রথম ডিসেকশনের আগে তৎকালীন সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক ও পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্তকে (যিনি পরে মেডিক্যাল কলেজে যোগদান করেন এবং স্নাতক হন এবং যিনি সুশ্রুত-সংহিতা-র ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন) হেয়ার এই অনুসন্ধানের কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। কিন্তু বেশ দীর্ঘ সময় পরে তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই হেয়ার মধুসূদনকে বলেন – “আমি এতদিন ধরে কী উদ্বেগ বেদনা বহন করেছি, মধু (হেয়ারের উচ্চারণে Muddo), তুমি কী জান না? তুমি শাস্ত্র থেকে শব্যবচ্ছেদের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ জোগার করতে পেরেছ?”[32]
মধুসূদন এর জবাবে বলেন – “Sir! fear no opposition from the orthodox section of the community, I and my Pundit friends are prepared to meet them it (hey come forward which I am sure they will not do”[33]। এই জবাবে হেয়ার আশ্বস্ত হন এবং মধুসূদনকে বলেন যে “আগামীকাল সকালেই তিনি লর্ড অকল্যান্ডের সাথে এই ব্যাপারে দেখা করবেন।“[34]
সহজ কথা হল, মেডিক্যাল কলেজের প্রথম ডিসেকশনের সঙ্গে হেয়ার ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ভারতে “হসপিটাল মেডিসিন”-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বিকশিত করার ক্ষেত্রে তিনি একজন অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯ জানুয়ারি ১৮৩৭ সালে মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ব্রামলি প্রয়াত হন অতি অল্প বয়সে। এর অব্যবহিত পরেই ডেভিড হেয়ার মেডিক্যাল কলেজের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনিই প্রথম এবং শেষ চিকিৎসাশিক্ষার বাইরের জগতের মানুষ হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করেছেন।
মেডিক্যাল কলেজের কলেজ কাউন্সিলের সেক্রেটারি হিসেবে ৯ মার্চ, ১৮৩৭-এ তিনি General Committee of Public Instruction-এর তৎকালীন সেক্রেটারি জে সি সি সাদারল্যান্ডকে একটি দীর্ঘ চিঠি তথা প্রতিবেদন লেখেন মেডিক্যাল কলেজের জন্য কী কী করণীয় সে বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য জানিয়ে।[35]
তাঁর চিঠির শুরুতেই তিনি বলেন – “The time has arrived when it becomes necessary that the students of the Medical College should enter upon a more practical course of education connected with their profession, than has hitherto engaged their attention.”[36]
কেন বললেন এ কথা? ১৮৩৬ শিক্ষাবর্ষে কলেজের ছাত্ররা ডিসেকশন, কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরিতে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডেমনস্ট্রেশন-ভিত্তিক মৌখিক শিক্ষা ছাড়া নতুন ধারার মেডিসিনের অন্যতম ভিত্তি রোগ ও রোগীদের দেখা ও চিকিৎসা নিয়ে কিছুই শেখেনি।
এই বিষয়ে তাঁর চিঠির প্রথমাংশে হেয়ার সবিস্তার জানিয়েছেন। এরপরের ধাপটি হল ক্লিনিকাল মেডিসিনের পথে অগ্রসর হওয়া – “a well regulated supply of patients should be submitted to their (professors) charge for the express purpose of illustrating their lectures.”[37] এর ফলে লাভ হবে – “witnessing disease in every variety should at the same time be furnished to the pupils.”[38]
এরপরে বলছেন কলকাতায় দুটি প্রদাহান হাসপাতাল রয়েছে – ইউরোপীয় রোগীদের জন্য General Hospital এবং দেশীয় রোগীদের জন্য Native Hospital। Native Hospital-এ সার্জারির রোগীদের ভর্তি করা হত এবং General Hospital-এ মেডিক্যাল রোগীদের। এখানেও হেয়ার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে নিজস্ব মন্তব্য করেছেন যে ইউরোপীয় রোগীদের দেখে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের বিশেষ উপকার হবেনা এই কারণে যে ইউরোপের এবং ভারতের রোগের ধ্রনের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং কলেজের ছাত্রদের চিকিৎসা করতে হবে এদেশীয় রোগীদের – “Europeans, whose maladies differ materially from those of the native constitution, which in after life these young men will for the most part be called upon to treat.”[39]
হেয়ারের আরেকটি আপত্তি ছিল যে এই হাসপাতালগুলো কলেজ থেকে অনেকটা দূরত্বে অবস্থিত ছিল। এজন্য প্রতিদিন পায়ে হেঁটে রোজ হাসপাতালে যাওয়া এবং ফিরে এসে কলেজ করা বিশেষ শ্রমসাধ্য ব্যাপার ছিল। এজন্য তিনি চেয়েছিলেন কলেজ চত্বরের মধ্যে একটি হাসপাতাল তৈরি করা হোক – “The College bell would summon them to lecture, and the library and dissecting room would be constantly within reach – advantages of which they would be altogether deprived if they were compelled to attend hospitals at any distance from the College.”[40]
তাঁর প্রস্তাব ছিল সেসময়কালে প্রস্তাবিত “ফিভার হসপিটাল”-কে কলেজের সাথে সংযুক্ত করার।[41] কলেজে হাসপাতাল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ছিল –
(১) একটু আগে যে আলোচনা করেছি, নেটিভ হাসপাতাল এবং জেনারেল হাসপাতাল-এর মধ্যেকার রোগীদের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেজন্য মেডিক্যাল কলেজের জন্য প্রস্তাবিত নতুন হাসপাতালে উভয় ধরনের রোগীই থাকবে। এমনকি শিক্ষার্থী ছাত্ররা “minor operations” (যেমন ফোঁড়া কাটা ইত্যাদি) করতে শিখবে।
(২) পূর্বালোচিত জেনারেল হাসপাতাল-এর রোগীদের বৈশিষ্ট্য – “it would be certainly be a very mischievous medical education which should direct their attention chiefly to the maladies of a class of patients who may very rarely under their notice hereafter, and at the same time leave untaught the characters of disease amongst their own people.”[42]
(৩) নেটিভ হাসপাতাল-এর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল “too remote from the chief native portion of the town to provide sufficiently for the wants of the population.”[43] তাঁর আরেকটি গুরত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল হাসপাতালটি হয় “within the precincts of the College, or in its immediate neighbourhood, (as in all the medical schools of Europe,)” হবে। এর ফলে ছাত্রদের প্রভূত সুবিধে হবে। এবং হাসপাতালটি শহরের মাঝখানে হওয়ায় বিভিন্ন স্থানের রোগীর পক্ষে সহজে অধিগম্য হবে।[44]
(৪) এই হাসপাতাল ছাত্রদের কাছে “practical instruction”-এর মাধ্যম হবে। তাছাড়াও এরকম হাসপাতালে ছাত্ররা “could become dressers and assistants, and devote the whole of their spare time to its, wards”[45]।
(৫) নেটিভ হাসপাতাল-এর আরেকটি অসুবিধের কথা তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, যে সমস্ত রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হয় তারা “for the most part of wretched objects, pilgrims, beggars, and criminals the very dregs of society” এবং এরা দারিদ্র্যের কারণে রোগের শেষ অবস্থায় হাসপাতালের ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। এরা এতটাই অসুস্থ থাকে যে এদের রোগের বিকাশ বোঝার অবকাশ থাকে না। অতি দ্রুত মারা যায়।[46]
(৬) হেয়ারের প্রস্তাবিত হাসপাতালে “separate wards should be kept for the patients necessary to form the subjects of of the clinical lectures on medicine.”[47]
(৭) ক্লিনিকাল সার্জারির প্রোফেসরদের তরফে ছাত্রদের শিক্ষাদানের জন্য আলাদা সার্জিকাল ওয়ার্ড থাকবে।[48]
(৮) হাসপাতালের সাথে একটি ডিসপেনসারিও যুক্ত থাকবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যেমনটা ইউরোপের ক্ষেত্রে প্র্যাক্টিস করা হয়, “pupils might also be ordered (as in Europe) to attend at the houses of such patients as were unwilling to enter the hospital and were too sick to appear at the dispensary.”[49]
(৯) ছাত্রদের মধ্য থেকে নির্বাচিত ছাত্ররা যা করবে তা হল “to assist as dressers, and to aid in compounding the medicines.”[50]
(১০) ক্লিনিকাল ওয়ার্ড সম্পূর্ণত কলেজের প্রোফেসরদের তত্ত্বাবধানে থাকবে।[51]
তিনি তাঁর চিঠি শেষ করছেন এই বলে যে “This outline of the scheme will suffice for the present.”[52] তাঁর এই সুদীর্ঘ প্রতিবেদন তথা চিঠি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মেডিসিনের নতুন অধ্যায় “হসপিটাল মেডিসিন”-এর স্তম্ভটিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানোর এবং একে বাস্তব ক্ষেত্রে আরও প্রসারিত করার উদ্যোগ নিলেন। মেডিসিনের ইতিহাসে একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হল হেয়ারের হাত ধরে।
এখানেই ডেভিড হেয়ারের অনন্যতা।
(Memorial Plaque of David Hare in Nicco House, Hare street in Kolkata)
___________________________
[1] প্রাগুক্ত, পৃঃ ৫।
[2] সুনীতি কুমার চ্যাটার্জি, “David Hare: Humanist, Educationist, Thinker, Lover of Man – And His School”, David Hare Birth Bicentenary Volume (1975-76), 1976, p. 1.
[3] “মাঙ্গলিক”,David Hare Birth Bicentenary Volume (1975-76), 1976।
[4] সুবলচন্দ্র মিত্র, সরল বাঙ্গালা অভিধান, ২০০৯, পৃঃ ১৩২৭।
[5] Paery Chand Mittra, A Biographical Sketch of David Hare, 1877, pp. 88-90.
[6] Eric Stokes, The English Utilitarians and India (London: Oxford University Press, 1959), p. xiv.
[7] Ibid., p. 81.
[8] Ibid., p. xvi.
[9] Ibid, pp. xi-xii.
[10] Ibid, pp. 1-2.
[11] Ibid, p. 43.
[12] C. A. Bayly, Indian Society and the Making of the British Empire (Cambridge University Press, 2008), p. 121.
[13] C H Philips, ed., Correspondence of Lord William Cavendish Bentinck, vol. 2, পৃঃ ১২৭৯-১২৮০।
[14] John Rosselli, Lord William Bentinck: The Making of a Liberal Imperialist, 1774-1839 (Thompson Press (India) Limited, 1974), পৃঃ ৮৫।
[15] Thomas Neville Bonner, Becoming a Physician: Medical education in Britain, France, Germany, and the United States, 1750–1945 (New York: Oxford University Press, 1995), p. 144।
[16] Erwin H. Ackerknecht, Medicine at the Paris Hospital, 1794-1848 (Baltimore: Johns Hopkins Press, 1967)। এছাড়া আরেকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পুস্তক হল, Caroline Hannaway and Ann La Berge, ed. Constructing Paris Medicine (Amsterdam: Rodopi, 1998)।
[17] Ackerknecht, Medicine at the Paris Hospital, পৃঃ ৭৪-৯৩।
[18] Ibid, p. 15.
[19] Philips, Correspondence of Lord William Bentinck, vol. II, p. 1403.
[20] Peary Chand Mittra, A Biographical Sketch of David Hare (Calcutta, 1877), p. 34.
[21] Ibid, p. 134.
[22] Ibid. p. 43.
[23] মিত্র, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৩১।
[24] শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ (নিউ এজ পাবলিশার্স, ২০০৭), পৃঃ ৩০।
[25] বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য, Jayanta Bhattacharya, The Calcutta Medical College, 1822-1897: Medicine, Social Psyche and the Making Modern Citizenry (Primus, 2025)।
[26] Report of the General Committee on Public Instruction of the Presidency of Fort William in Bengal, for the Year 1836 (hereafter GCPI, 1836), p. 57.
[27] GCPI, 1836, pp. 55-56.
[28] Ibid, p. 55.
[29] শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী, পৃঃ ১০৫।
[30] P. N. Bose, A History of Hindu Civilization (W. Newman & Co., Calcutta, 1894) vol. II, p. 32. এছাড়াও দ্রষ্টব্য, জয়ন্ত ভট্টাচার্য, “The first dissection controversy: introduction to anatomical education in Bengal and British India”, Current Science 2011, 101 (9): 1227-1232.
[31] শাস্ত্রী, প্রাগুক্ত, পৃঃ ১০৫।
[32] Mittra, A Biographical Sketch, p. 127.
[33] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১২৭।
[34] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১২৮।
[35] GCPI, 1837, Appendix No. 8, pp. 163-166.
[36] Ibid, p. 163.
[37] Ibid, p. 164.
[38] Ibid, p. 164.
[39] Ibid, p. 164.
[40] Ibid, p.165.
[41] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৫।
[42] Ibid, p. 164.
[43] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৪।
[44] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৪।
[45] Ibid, p. 164.
[46] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৫।
[47] Ibid, p. 166.
[48] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৬।
[49] Ibid, p. 166.
[50] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৬।
[51] প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৬৬।
[52] Ibid, p. 166.
















সমৃদ্ধ হলাম স্যার ❤️
অসাধারণ লেখা আপনার 🙏🙏
আপনার লেখা গুলো পড়তে ভাল লাগে, অনেক নতুন জিনিস জানা যায়
সুন্দর লেখা। ডেভিড হেয়ার নিয়ে আলোচনা সভা চোখে পড়ে না। হেয়ারের হাত ধরেই আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন এই লেখা পড়ে তা জানা গেল।