আলুর সিজনে যেখানে খুচরো বাজারে চন্দ্রমুখী আলুর দাম কেজি প্রতি ২০ টাকার কম নয় সেখানে শ্রমসাধ্য, সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল আলু চাষ করে ন্যূনতম ফসলের দাম না পেয়ে ঋণজর্জর আলু চাষীরা কোচবিহার থেকে পশ্চিম মেদিনীপুর পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে তাদের গরীব পরিবারগুলিকে পথে বসিয়ে আত্মহত্যা করে চলেছেন। লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে ভুঁইফোড় দালাল – বড় ব্যবসায়ী – মহাজন – হিমঘর মালিক – শাসক দলের নেতারা। পশ্চিমবঙ্গের মত কৃষিপ্রধান ও গ্রাম-কেন্দ্রিক রাজ্যে অন্যান্য চাষেও একই অবস্থা। সরকার থেকে বিরোধী দলগুলি, সরকার সমর্থিত তথাকথিত অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত বিদ্বজ্জন ও বিপ্লবীকূলের এইসব বিষয় নিয়ে কোন দায়িত্ব এবং প্রচেষ্টা, এমনকি সহানুভূতিটুকুও নেই।
রাজ্যের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্ম সংস্থান, গণ পরিবহন ইত্যাদি ব্যবস্থা বেহাল থেকে বেহালতর। শিল্প শেষ, কৃষি চরম সংকটে। সামান্য উপার্জনের জন্য গ্রাম – শহর উজাড় করে বাচ্চা থেকে প্রৌঢ় নিজেদের ঘরবাড়ি, গ্রাম – শহর, রাজ্য ছেড়ে দলেদলে চলে যাচ্ছেন ভিন রাজ্যে। বেশিরভাগই স্বল্প মজুরির (যা পশ্চিমবঙ্গের থেকে অনেক বেশি) পরিযায়ী শ্রমিক। সেখানে তাদের অনেকে চরম বৈষম্য, হেনস্থা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কোভিডের সময় চূড়ান্ত বিপর্যয় নেমে এসেছিল তাদের জীবনে। এখন তাদের অনেকের মৃতদেহ ফিরে আসছে গ্রাম বাংলায় তাদের অভাবী পরিবারগুলির কাছে। চিকিৎসা ও উচ্চ শিক্ষার জন্যও মানুষকে ছুটতে হচ্ছে ভিন রাজ্যে। এইসব নিয়ে ক্ষমতাসীন, পূর্বোক্ত ক্ষমতাসীন এবং বর্তমান পরিবর্তনকামীদের উচ্চকিত পারস্পরিক দোষারোপ ছাড়া নিরাময়ের ছিটেফোঁটা উদ্যোগ নেই। বিপরীতে এদের অপকর্ম, অপদার্থতা ও অবহেলার জন্য একদা স্বর্ণপ্রসবিনী এই রাজ্য শ্মশানে পরিণত হয়েছে।
এর সঙ্গে অতীতের মাশুল সমীকরণ নীতি, পশ্চিমবঙ্গের দুর্বল কর্ম সংস্কৃতি ও নোংরা রাজনীতি, সবকিছুতে রাজনীতি, হিংসা ও নৈরাজ্যের পরিবেশ, কেন্দ্রের ধারাবাহিক বৈষম্য, বাম ও তৃণমূল সরকার কর্তৃক কেবলমাত্র ভোটের ফায়দা তোলার জন্য যথাক্রমে কেন্দ্রের কংগ্রেস ও বিজেপির সঙ্গে সামগ্রিক বোঝাপড়া রেখেও কেন্দ্র বিরোধিতার অবস্থান ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নীতি অনেকাংশে দায়ী। ফলে প্রতিবেশী বিহার, অসম, ওড়িশায় একের পর এক কেন্দ্রে র উন্নয়নমূলক প্রকল্প হয়ে চললেও পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত। আবার রাজনৈতিক স্বার্থে রেল, স্বাস্থ্য সহ কেন্দ্রের প্রকল্পগুলিকেও বাধা বা বানচাল করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে কেন্দ্র সরকার তাদের দেয় অর্থ ঠিকমত দেয়না। সবমিলিয়ে ভুক্তভোগী পশ্চিমবঙ্গবাসী।
বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ নাবালিকা ও নারী পাচারে শীর্ষে। গ্রাম বাংলার ভাঙ্গা কুটির, শহর – শিল্পাঞ্চলের বস্তি (উত্তরণের একশেষ) – ঝুপড়ি এবং রুগ্ন – বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক কলোনি গুলি থেকে কাজ দেওয়ার বা বিয়ের নাম করে গরীব পরিবারগুলির মেয়েদের নিয়ে গিয়ে ভয়াবহ যৌন অত্যাচার করে দেশের বিভিন্ন পতিতালয় ও ধনীদের খামারগুলিতে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। গার্হস্থ্য হিংসা, নারী নির্যাতন ও নারীদের উপর অ্যাসিড ছোঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ শীর্ষে। বিগত কয়েক বছরে স্কুল ড্রপ আউট, নাবালিকা বিবাহ, নাবালিকা মাতৃত্ব, গর্ভবতী মায়েদের মৃত্যুর হার ভয়ানক রকম বৃদ্ধি পেয়েছে। কামদুনি থেকে কুশমন্ডি, হাঁসখালী থেকে আর জি কর ভয়াবহ সব যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যার ঘটনা অবিরাম ঘটে চলেছে এবং সেখানে শাসক দলের ছত্রছায়ায় থাকা বেপরোয়া দুষ্কৃতী আর প্রভাবশালীরা যুক্ত থাকছে। কোনটার কোন বিহিত হচ্ছে না। আরও মারাত্মক বিষয় পুলিশ, প্রশাসন, মায় প্রশাসনের শীর্ষতম ব্যক্তি অপরাধীদের বাঁচাতে বা আড়াল করতে, তদন্ত বিপথে চালিত করতে অতি সক্রিয় হয়ে উঠছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে সিআইডি, সিবিআই প্রমুখ সরকারি তদন্তকারী সংস্থার এবং অনেকক্ষেত্রেই শেষ আশ্রয় আদালতের ভূমিকাও খুবই উদ্বেগজনক। একটি উদাহরণ, অভয়া হত্যা মামলায় তদানীন্তন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় এর ভূমিকা।
গণতন্ত্র বলে এই রাজ্যে কিছু নেই। বিশেষজ্ঞ দের যৌথ সিদ্ধান্তে নয় এক স্বৈরাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোলুপ নেত্রীর ইচ্ছা ও খামখেয়ালিপনায় সবকিছু চলছে। বরুণ বিশ্বাস থেকে তপন দত্ত থেকে আনিস খান – প্রতিবাদীদের একের পর এক হত্যা করে মামলা ধামা চাপা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে কেষ্ট মণ্ডল, আলু চট্টোপাধ্যায়, বালু মল্লিক, শেখ শাজাহান, শওকত মোল্লা, হামিদুর রহমান, উদয়ন গুহ প্রমুখ ডাকাত, মাফিয়া, গুণ্ডা সর্দার রা বড় বড় সরকারি পদ, মন্ত্রীত্ব অলঙ্কৃত করে রাখে।
রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা, জনসাধারণের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। সন্ত্রাস, ডাকাতি, লুঠপাট, খুন, ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ, অবরোধ, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এই রাজ্যের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। থানা কোন এফআইআর নেয় না। পুলিশ শাসক নেতা ও শাসক দলের সমাজবিরোধীদের কথায় ওঠে বসে। পুলিশকেও এক তোলাবাজির মাধ্যম হিসাবে তৈরি করা হয়েছে। মানুষের প্রয়োজনে পুলিশ কে পাওয়া যায় না, বিশাল সংখ্যক পুলিশ মুখ্যমন্ত্রী এবং তার সাংসদ ভাইপোর পাহারায় নিযুক্ত। কালীঘাট, হরিশ মুখার্জি রোড এবং নবান্ন তাদের থাকার জায়গাগুলি, তাদের বিমান ও হেলিকপ্টারে ওঠার পথগুলি দুর্গতে পরিণত করা হয়েছে। কয়েকবছরের মধ্যে বগতুই গণহত্যা, সন্দেশখালী তে গণ জমিদখল ও গণ নারী নির্যাতন এবং আসানসোল, বেলডাঙ্গা, সামসেরগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে একের পর এক পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে গেছে। কালিয়াচক প্রভৃতি ব্লক এবং তুফানগঞ্জ থেকে হিঙ্গলগঞ্জ দীর্ঘ সীমান্ত এবং সংলগ্ন গ্রামাঞ্চলে দেশের আইন কানুন চলে না। বিএসএফ – পুলিশ – পঞ্চায়েত – প্রশাসনকে হাত করে অথবা নিষ্ক্রিয় রেখে দুষ্কৃতী, চোরাকারবারী, ডাকাত, সন্ত্রাসী আর জিহাদীরা রাজ্যের মধ্যেকার এই বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বেআইনি অনুপ্রবেশ; অস্ত্র, জাল নোট ও ড্রাগস পাচার; চোরা চালান, সীমান্ত পথে নারী ও মানব পাচার, দুষ্কৃতী, সন্ত্রাসী ও জিহাদী দের আনাগোনা আকছার ও অবারিত। খাগরাগড় থেকে ঢোলা একের পর এক সাংঘাতিক বোমা বিস্ফোরণ আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার আসল চেহারা দেখিয়ে দেয়। দেশের প্রায় প্রতিটি সন্ত্রাস ও অন্তর্ঘাতের ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ কে করিডোর হিসাবে ব্যবহার চোখে পড়ে। এখানে সহজেই আশ্রয় এবং সমস্ত নথিপত্র থেকে মোবাইলের সিম পাওয়া যায়।
দুর্নীতিতে পশ্চিমবঙ্গ নিজেই নিজের রেকর্ড ভেঙে সুপ্রসিদ্ধ বাঙালী জাতির সুনামকে কলঙ্কিত করেছে। এখানে টাকা বা ঘুষ ছাড়া কিছু হয়না। তোলাবাজি শাসক দলের নেতা ও কর্মীদের বিপুল আয়ের প্রধান উৎস। সারদা – নারদা – রোজ ভ্যালি সহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি, চাল – রেশন কেলেঙ্কারি, নিয়োগ – শিক্ষা কেলেঙ্কারি কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো। টাকা নিয়ে অযোগ্য শিক্ষকদের চাকরিতে ঢোকাতে যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি কেড়ে নেওয়া হয়। নিজেদের সমস্ত অপকীর্তি ঢাকার চেষ্টায় জনগণের কর প্রদত্ত মূল্যবান অর্থ খরচ করে এখানকার সরকার সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ে। সরকারি কর্মচারী দের ন্যায্য ডিএ থেকে বঞ্চিত করে আদালতের রায় উপেক্ষা করে এখানকার সরকার কালক্ষেপ ও প্রতারণা করে যায়।
কয়েক বছরের মধ্যে একটি গর্ব করা জাতিকে ভিখারিতে পরিণত করে দেওয়া হয়েছে। নিজেদেরই অর্থে প্রদেয় সামান্য অনুদান নির্ভর রাজ্যের কর্মঠ অথচ কর্মহীন পুরুষ – নারী, যুবক – যুবতী নতজানু হয়ে সামান্য ডোলের আশায় রাস্তায় লাইন দেয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, গণতন্ত্র যে তাদের অধিকার ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আয়হীন ঋণজর্জর রাজ্যে আরও ঋণ করে মাইনে দেওয়া, অনুদান ও উপহার – উৎসবে অপচয় আরও আর্থিক সংকটের জন্ম দিয়ে চলেছে। যে রাজ্যের মূল আয় মদ বিক্রি সেখানকার স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি কি অবস্থায় বলে দিতে হবে না। অপরাধ, নারী নির্যাতন তো রয়েছেই রবীন্দ্র – নজরুল – জীবনানন্দের রাজ্যে চারিদিকে অশ্লীল শব্দবানের মধ্যে কুণ্ঠিত হয়ে আমাদের বসবাস করতে হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা, অন্যান্য নেতা – মন্ত্রীরা সারাবছর কুকথার ফুলঝুড়ির প্রতিযোগিতা করে চলেন। মানুষকে অপরাধে প্ররোচিত করেন। আর পরিবেশ দূষণ, গাছ কাটা, জলাশয় বোজানো, অপরিকল্পিত নির্মাণ, শব্দ দূষণ, নদী দূষণ যে কি পর্যায়ে চলে গেছে কহতব্য নয়। ফারাক্কা থেকে ডিভিসি সংস্কারের অভাবে ভয়াবহ ভাঙ্গন ও বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ ধ্বংস দক্ষিণ বঙ্গকে সাইক্লোনের মুখে ফেলে দিচ্ছে।
দ্রব্য মূল্যের অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের কোন দায়দায়িত্ব নেই। ব্রেন্ট ক্রুড এর দাম যখন কম তখনও তেলের দাম বাড়িয়ে, সেস নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মানুষের পকেট কেটে মুনাফা করে যান। হাসপাতালে ও আদালতে গেলে ঘটি বাটি বিক্রি করতে হয়। উপসাগরের যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই এখানে কালোবাজারি, রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার উধাও হওয়া, সব কিছুর দাম বাড়ার মত ঘটনা ঘটে।
বাজারের দোকানে জোরে গান বেজে চলে। কারণ দোকানের পিছনে লোহার পাইপ কাটা চলছে। দিশি ও মুঙ্গেরের কারিগররা খুব ব্যস্ত ওয়ান শটার, পাইপ গান ইত্যাদি বানাতে। আর গ্রামের পাট ক্ষেতের মধ্যে কিছুটা জায়গা ফাঁকা করে রাতদিন তৈরি হচ্ছে সকেট বোম, পেটো ইত্যাদি যেগুলোর এখন প্রচুর অর্ডার, কারণ সামনে নির্বাচন। নির্বাচন এই রাজ্যে এক বিভীষিকা। নির্বাচন নিয়ে এত প্রচার, সময় নষ্ট, কর্মদিবস নষ্ট, স্কুল কলেজ বন্ধ, অশান্তি, মারামারি, সন্ত্রাস, খুনোখুনি, রক্তপাত, বিরোধীদের আক্রমণ, উৎখাত কোন রাজ্যে হয়না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারি অর্থে অর্থাৎ জনগণের করের টাকায় দীঘায় জগন্নাথ মন্দির বানিয়ে (অবশ্য সবকিছু তিনি নিজে করেছেন বলে থাকেন) বাড়ি বাড়ি প্রসাদ পাঠিয়েছেন। এরপর নিউ টাউনে দুর্গা মন্দির, শিলিগুড়িতে মহাকাল মন্দির এবং কচুয়া তে লোকনাথ মন্দির তৈরি তে হাত দিয়েছেন। পুরোহিত – মোয়াজ্জেম দের ভাতা চালু করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ ক্রীড়ায় যত পেছোচ্ছে, ক্লাবগুলোকে পুজো করার জন্য বিপুল সরকারি অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। বছরের এক তৃতীয়াংশ সরকারি ছুটি। বিসর্জনের পরেও রাস্তা জুড়ে কার্নিভাল। অন্যদিকে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও মন্ত্রী রেজিনগরের হুমায়ুন কবির বিতর্কিত বাবরি ইস্যুকে তুলে ধরে তৈরি করছেন বাবরি মসজিদ। বিজেপি বাংলায় নিয়ে এসেছে রাম নবমী, হনুমান জয়ন্তী সহ উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদী মধ্যযুগীয় পশ্চাদপদ ধর্মীয় সংস্কৃতি। তাদের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে জোকার ‘ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট, কলকাতা ‘ তৈরি করেছে শিব এবং হনুমান মন্দির। চারিদিকে ধর্মীয় বুজরুকি ও ধর্ম ব্যবসার রমরমা। তৃণমূল, বিজেপি ও হুমায়ুন কর্তৃক মেরুকরণের রাজনীতি অব্যহত।
বঙ্গীয় রেনেসাঁ থেকে আধুনিক কাল অবধি বাঙালি জাতি যে জ্ঞান, বিজ্ঞান, সম্যক দৃষ্টি, উদারতা অর্জন করেছিল সবকিছুকে ধর্ম – সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত – লিঙ্গ বৈষম্য, কুসংস্কার – অন্ধ বিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠান সর্বস্বতার যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়েছে। চারিদিকে যত অভাব – অভিযোগ – অসুস্থতা – অসহায়তা, তত পুজো – হজ – মেলা – উৎসবের হিড়িক। একে একে রাজ্যে অবস্হিত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির রাজ্য ছাড়ার কাজ চলছে। এসবে আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক দিগগজ দের কোন হুস নেই। তারা মেতে আছেন তৃণমূল – বিজেপি, মমতা – মোদি বাইনারি এবং তাদের চাপিয়ে দেওয়া নোট বন্দী, এনআরসি, শ্রম কোড, দণ্ড সংহিতা, নিত্য নতুন নিয়ম আর শংসাপত্রের আপডেট ও সংযুক্তিকরণ, এসআইআর, নির্বাচন ইত্যাদি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই এ।
হাড় হিম করা অভয়া হত্যাকাণ্ডের পরও এই রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকান্ড এবং তাকে প্রাতিষ্ঠানিক ধামাচাপা দেওয়া চলছে। কৃতী শিল্পী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং সেটি নিয়ে শাসক ঘনিষ্ঠ প্রযোজক সংস্থার ধোঁয়াশা সৃষ্টি তার সাম্প্রতিক উদাহরণ।
নতুন ভাঁওতা: এই যখন আমাদের রাজ্যের ও রাজ্যবাসীর করুণ অবস্থা তখন ইলেক্টোরাল বন্ড নামক বৃহৎ শিল্পপতি, ঠিকাদার, কালোবাজারি, লটারি মাফিয়া দের কালো টাকা পকেটস্থ করা দুটি বৃহৎ পারিবারিক পুঁজিবাদী ও কর্পোরেট দের পদলেহী দক্ষিণপন্থী দল ‘ এসআই আর (Special Intensive Revision)’ নামে এক খুড়োর কল এবং নির্বাচন নামক এক বার্ষিক উৎপাত কে পশ্চিমবঙ্গবাসীর মাথায় উপর চাপিয়ে দিয়ে গত ছয় মাস ধরে রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এক পক্ষ এর কার্যকারিতা নিয়ে এবং অন্য পক্ষ এর ভয়াবহতা নিয়ে মানুষকে উত্তেজিত ও ভীত করে চলেছে। সমগ্র পরিসর দখল করা তৃণমূল ও বিজেপি এই দুটি দলের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে সিপিআইএম, জাতীয় কংগ্রেস, আইএসএফ, ফরোয়ার্ড ব্লক প্রভৃতি রাজনৈতিক দল যাদের মাঝারি থেকে অল্প জনভিত্তি রয়েছে তারা কোন প্রতিরোধই করে উঠতে পারেনি। আর এসইউসি, বিভিন্ন নকশাল গোষ্ঠী – এই ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র দলগুলি এবং তাবৎ বিদ্বজ্জনরা পুরোপুরি ভেসে গেছে।
নরেন্দ্র মোদি – অমিত শাহ – মোহন ভাগবত দের কুক্ষিগত নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ‘ এসআইআর ‘ একদিকে ছিল তৃণমূলকে দেওয়া একটি অসাধারণ উপহার, অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটি বিশেষ চাল। সেই কারণে লোকদেখানো গর্জন করলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ জিএসটি ‘, ‘এনআরসি ‘, ‘ নতুন ওয়াকফ আইন ‘ এর মত ‘ এসআইআর ‘ লাগু করার বিরোধিতা করেন নি। বরং অভয়ার ন্যায় বিচারের জন্য প্রবল গণ আন্দোলনে ত্রস্ত; শিক্ষা ও নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে ধ্বস্ত; একের পর এক দুর্নীতি, অপরাধ, দাঙ্গা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ডিএ মামলা প্রভৃতিতে নাজেহাল তিনি ‘ এসআইআর ‘ তরজার মাধ্যমে সবকিছুকে চাপা দিতে পেরেছেন। অনেকটা সমর্থন হারানো মুসলমান, নমঃশূদ্র ও রাজবংশী সম্প্রদায় এবং মতুয়া ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সমর্থনকে নতুন করে সংহত করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে জাতীয় স্তরে দুর্বল করে দেওয়া এবং বিরোধী INDIA জোট কে কখনই কার্যকর হতে না দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া তৃণমূলকে এতদিন পশ্চিমবঙ্গে ছেড়ে রাখলেও (সামান্য অজুহাতে মহারাষ্ট্র, দিল্লি প্রভৃতি সরকার ফেলে দেওয়া, তুলনামূলক দুর্বল অভিযোগে দিল্লি ও ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী দের গ্রেফতার, অন্যদিকে সারদা থেকে ইডির হাত থেকে ফাইল কেড়ে নেওয়া, বিজেপি কর্মীদের খুন সহ হাজারো দুর্নীতি ও অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের সরকার ও শাসক পরিবারের ক্ষেত্রে কেন্দ্র ও বিজেপি উদার থেকে গেছে) এবার এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে কিছুটা চাপে রাখা হয়েছে।
এটি বুঝতে হবে যে ক্ষমতা দখল, ভোগ ও টিকে থাকার জন্য দক্ষিণপন্থী বিজেপি – তৃণমূল দলগুলির মধ্যে যেমন বোঝাপড়া ও সমন্বয় আছে, সেরকম দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাও আছে। বাস্তব রাজনীতিতে অদক্ষ রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে এযাবৎকালের মধ্যে সবচাইতে দুর্বল করে দিয়ে অনেক পিছনে ফেলে বিজেপি – আরএসএস যখন সমগ্র ভারত প্রায় দখল করে ফেলেছে তখন পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের দখল না হওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু দখল করার চেষ্টা করবে।
তবে বিজেপি নেতৃত্ব জানেন যে জাত্যাভিমানী এবং আদর্শগতভাবে বিজেপির হিন্দু – হিন্দি – হিন্দুস্তানি সংস্কৃতির বিরোধী পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু জয় করা অত সহজ নয়। তাই এবারের পাঁচ রাজ্যের ভোটে বিজেপির প্রধান লক্ষ্য কেরল। ইতিমধ্যেই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত কেরলের মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিআইএম নেতা বিজয়ন কে বাগে নিয়ে মোদি আদানির জন্য সেখানকার বন্দর, একটি সংসদ আসন, রাজধানী তিরুবন্তপুরম পুরসভা ইত্যাদি দখল করে নিয়েছেন। বিজয়নকে দিয়ে এতদিনকার প্রগতিশীল গণ আন্দোলন এবং আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করিয়ে জনপ্রিয় সবরিমালা মন্দিরে ঋতুবতী বয়সসীমার নারীদের প্রবেশাধিকার আবার ছিনিয়ে নিয়েছেন। কেরলে যে বিজয়ন গোষ্ঠীর কুক্ষিগত সিপিআইএম এর সঙ্গে বিজেপির সমঝোতা হয়েছে রাহুল গান্ধী থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে বলেছেন।
এসআইআর এর কলকাঠি: ভোটারদের তালিকা মাঝেমাঝেই আপডেট করতে হয় এবং সময় নিয়ে সেটি করা হয়েও থাকে। এবারও সেটি করলেই হত। কিন্তু তা না করে নির্বাচন কমিশন আপাদমস্তক ভুলে ভরা এবং নাগরিকদের চূড়ান্ত হয়রানি করা এসআইআর করছে কেন?
মোদি সরকার দেখেছে এত টাকা ও প্রচারের ঢক্কা নিনাদের মধ্যেও দেশের মানুষের এক বড় অংশ তাদের সমর্থন করছেন না এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিজেপিকে পরাজয়ের কাছাকাছি পৌঁছতে হচ্ছে। তাই তারা অনেক চিন্তাভাবনা করে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়ে দুটি উপায় বের করেছেন – কুক্ষিগত নির্বাচন কমিশন কে দিয়ে (১) ডিজিটাল রিগিং করিয়ে ভোট বৃদ্ধি ও আসন জয়লাভ। (২) এসআইআর এর মাধ্যমে বিরোধী ভোট ব্যাপক পরিমাণে ছেঁটে ফেলা। এভাবেই তারা বিগত লোকসভা ভোট থেকে আরম্ভ করে হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, বিহার প্রতিটি ভোটে জিতে চলেছে। এছাড়াও এসআইআর এর মাধ্যমে আরও কয়েকটি বিষয় সহজেই হয়ে যাচ্ছে – (১) এনআরসি, (২) বিরোধী ভোটারদের সন্ত্রস্ত ও ব্যতিব্যস্ত করে রাখা এবং (৩) বিরোধী দলগুলিকে ও নাগরিকদের ব্যস্ত রাখা যাতে তারা সরকারের অন্যান্য নেতিবাচক দিক গুলি নিয়ে ভাবা ও কিছু করার অবকাশ না পায়।
তৃণমূল এটি ভালোভাবে জানে এবং বোঝে পুলিস, প্রশাসন ও গুন্ডাদের দিয়ে করা তাদের নির্বাচনী সন্ত্রাস ও কারচুপির প্রকল্পর চাইতে এটি আরও বৃহৎ ও ব্যাপক সন্ত্রাস ও কারচুপির প্রকল্প। তাই তারা বিএলএ স্তর থেকে সুপ্রিম কোর্ট অবধি ধারাবাহিক প্রতিরোধ করে গেছে। তাদের প্রতিরোধের ফলে এখনবধি এক কোটি ভোটারের নাম বাদ গেছে এবং ট্রাইব্যুনালের গল্প জারি আছে। নইলে দু কোটি এবং তাদের মুসলমান ভোট ব্যাঙ্কের অর্ধেক নাম বাদ যেত।
বেনাগরিকত্ব ইস্যু: সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র নেতৃত্বে বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের একচ্ছত্র প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর বৃহৎ পুঁজি ও কর্পোরেটদের আরও মুনাফার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আরও সস্তা এবং বাধাহীন শ্রম। সেইসঙ্গে এআই সহ প্রযুক্তির উন্নতির কারণে ও তেল সহ সব কিছুর খরচ বৃদ্ধির জন্য শ্রম সংকোচন। সেই দিকে লক্ষ্য রেখে মার্কিন থেকে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ভারত সর্বত্র কঠোর অভিবাসন নীতি এবং বেনাগরিকত্বের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। সেই একই কারণে পশ্চিমবঙ্গে র চাইতেও বেশি নাগরিককে বেনাগরিক করে দেওয়া হচ্ছে উত্তর প্রদেশ ও তামিলনাড়ু র মত রাজ্যে যেখানে অনুপ্রবেশ এই মুহূর্তে কোন ইস্যু নয়।
অসমে যখন এনআরসি র মাধ্যমে ১৭ লক্ষ প্রতিষ্ঠিত দীর্ঘদিন বসবাসকারী বাঙালি হিন্দু ভারতীয় নাগরিকদের বেনাগরিক করে চরম অন্ধকারে নিক্ষেপ করা হল সব দেখে শুনেও পশ্চিমবঙ্গের বন্দ্যোপাধ্যায় – ভট্টাচার্য্য দের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলি চুপ করে ছিল। কারণ সেই বাঙালিদের বেশিরভাগ ছিলেন নমঃশূদ্র, কৈবর্ত, রাজবংশী, মাহিষ্য, পৌন্ড্র ক্ষত্রিয়, যোগী নাথ, কাপালি, ঋষি প্রমুখ। কিছু জনজাতি, কিছু নেপালি। এবার তাদের ক্ষমতায় পৌঁছনোর মুসলমান ভোট ব্যাঙ্কে এর প্রভাব পড়তে তারা ত্রাহি রব শুরু করে দিয়েছেন।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ থেকে ১৯৯১ এ সোভিয়েত এর পতন অবধি পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের প্রধান প্রতিস্পর্ধী ছিলেন কমিউনিষ্ট ও সমাজতান্ত্রিকরা। তাদের দমন করতে সাম্রাজ্যবাদী রা যুদ্ধ, চক্রান্ত, অপপ্রচার, গুপ্ত হত্যা, অন্তর্ঘাত, অর্থনৈতিক অবরোধ ছাড়াও যেটি করতেন ইসলামি ঘাতকদের লেলিয়ে দেওয়া। এই পর্যায় জুড়ে মৌলবাদী ইসলাম এবং পেট্রোডলার পুষ্ট ইসলামি সন্ত্রাসী ঘাতক বাহিনী ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের একটি প্রধান অস্ত্র। আর এভাবেই সমগ্র এশিয়া – আফ্রিকা জুড়ে ইসলামি মৌলবাদী রা তাণ্ডব চালিয়ে গেছে। সৌদি আরব, আমির শাহী, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর, জর্ডান, ইয়েমেন, লিবিয়া, মরক্কো, আলজিরিয়া, সোমালিয়া, সুদান প্রভৃতির মত মৌলবাদী ইসলামি দেশ তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে মওদুদি, সাদ্দাম হোসেন, গদ্দাফি, লাদেন, বাগদাদি, গোলাম আজম দের মত ভয়ংকর সব চরিত্র। কিন্তু মূলত নিজেদের অক্ষমতা ও অদক্ষতার জন্য বিশ্ব জুড়ে কমিউনিষ্ট ও সমাজতান্ত্রিকরা যখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে, অন্যদিকে ইরানের শিয়া মোল্লাতন্ত্রের নেতৃত্বে ইসলাম সাম্রাজ্যবাদের প্রতিস্পর্ধী শক্তি হয়ে উঠেছে। সেই কারণে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বর্তমান আক্রমণের বর্শামুখ ইসলাম এবং নির্দিষ্টভাবে ইরান। অন্যদিকে পশ্চিমী পুঁজিবাদের সঙ্গে পেরে না উঠে সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী রাশিয়া, চিন এবং উত্তর কোরিয়া ইরান কে মিসাইল প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমর্থন যোগাচ্ছে। ভারতের ক্ষেত্রেও শাসক শ্রেণীর কাছে কমিউনিষ্ট ও বাম রা এখন আর কোন সমস্যা নয়, সমস্যা প্রতিবেশী চিন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এবং দেশের অভ্যন্তরে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ। তাই ব্রাহ্মণ্যবাদী জাত ব্যবস্থায় ঘৃণিত দলিত দের সঙ্গে মুসলমান রাও বেনগরিকত্বের লক্ষ্যবস্তু, আবার এরাই দেশের প্রধান সস্তা শ্রমের বাহিনী।
তিনটি শ্রেণী, তিনটি চিন্তা: হাটে – বাজারে, ট্রেনে – বাসে, অনুষ্ঠান বাড়িতে কান পাতলে শোনা যাবে (i) সাধারণ মানুষ এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মধ্যে কিভাবে সংসার চালাবে তাতেই ব্যতিব্যস্ত, চিন্তাক্লিষ্ট। আগেই কৃষিজীবীদের সমস্যার বিষয় বলা হয়েছে। তবে এদের মধ্যে একটা উপ শ্রেণী তৈরি হয়েছে যারা বিনামূল্যের রেশন, মা – স্ত্রী – মেয়ের বিভিন্ন ভাণ্ডার ও শ্রী র অনুদান, পাঁচ টাকায় ডিম ভাত, ২০ টাকার মদের পাউচ ইত্যাদি দিয়ে শুয়ে বসে তাস খেলে নেশা করে দিব্যি চলে যাচ্ছে।
(ii) সীমান্ত সংলগ্ন জেলা গুলিতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার কারণে যে বিশাল মুসলমান সমাজ বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছে, সমস্ত কাগজপত্র করে নিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে আছে তাদের একাংশ র নাম বাদ পড়ায় তারা যেমন চিন্তিত, আবার মৌলবাদী মুসলমান ও দুষ্কৃতী দের অত্যাচারে সব ফেলে এদেশে চলে আসা হিন্দু শরণার্থীদের, যাদের বেশিরভাগ নিম্নবর্ণের দরিদ্র কৃষক, বিজেপি প্রতিশ্রুত CAA তে নাগরিকত্ব হলোই না, এবার এস আই আর এ ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ যাওয়ায় গভীর দুশ্চিন্তার মধ্যে রেখেছে।
(iii) তৃতীয় অংশটি শহুরে মধ্যবিত্ত ও ধনী। তাদের কাছে বর্তমান জমানায় মুসলমান দের বাড়বাড়ন্ত, পাশের বাংলাদেশে ইসলামি মৌলবাদীদের ভয়ংকর কার্যকলাপ খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছে। তাদের কাছে পরিস্থিতিটি অনেকটা ১৯৪৬ এর মত তুলে ধরা হচ্ছে। আদৌ কি আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুরা থাকতে পারবে? এই ফ্যাক্টর গুলি আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আগামী নির্বাচন: আগামী নির্বাচন ২৩ ও ২৯ এপ্রিল ঠিকমত ও শান্তিপূর্ণ হবে কিনা, আদৌ নির্দিষ্ট সময়ে হবে কিনা, হলে কে জিতবে আমাদের জানা নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞ্যানেশ কুমার রা তাদের পরিকল্পিত খেলা শুরু করে দিয়েছেন। আর এন রবি কি করছেন এখনও বোঝা যাচ্ছে না।
তবে পাটিগণিতের হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের এবারও জেতার কথা কারণ অন্য কারো এরকম জনপ্রিয়তা, জনভিত্তি, সাংগঠনিক শক্তি নেই এবং অনুদানগুলোয় এক বড় উপভোক্তা মন্ডলী তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসআইআর এ এত নাম বাদ এবং ডিজিটাল রিগিং লাগু হলে অনেককিছু পাল্টে যেতে পারে। বিশেষ করে ৯১ টি মার্জিনাল আসনে।
এবারের যা পরিস্থিতি তাতে কংগ্রেস ও সিপিআই এম – র ভালো ফল করা উচিত ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ভাবে অজ্ঞ রাহুল গান্ধীর অদক্ষ নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্রমশ পেছোচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সব আসনে দাঁড়িয়ে তারা তৃণমূলের সুবিধা করে দিয়েছে। তথাপি অধীর চৌধুরী, গণি পরিবারের নেতৃত্বে মুর্শিদাবাদ ও মালদায় কংগ্রেস কিছুটা ভাল ফল করতে পারে। তবে সিপিআইএমের ক্ষেত্রে এরকম কিছু আভাস এখনও পাওয়া যায়নি। কোন গণ আন্দোলনে ও বিক্ষোভে নেতৃত্ব না দেওয়া এবং সম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে হাত মেলানোর প্রবণতা সম্পন্ন রাজ্য সম্পাদকের নেতৃত্বে কোন লড়াই এ না থাকায় সিপিআইএম ক্রমশঃ মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাছাড়া তাদের অতীতের কুকর্ম মানুষ এখনও ভোলে নি।
কি করা উচিত ছিল আর কি হল: ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড, ইরান, কিউবা, মণিপুরে আমরা সরাসরি কিছু করতে পারিনা। কিন্তু আমাদের রাজ্যে তো আমাদের করাই উচিত। উচিত ছিল ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দেওয়া এবং ২০২৬ এর এই বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কে বাদ দিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সবাইকে নিয়ে জোট বেঁধে প্রতি কেন্দ্রে একজন মাত্র প্রার্থী দেওয়া। কিন্তু তা হয়নি। হুমায়ুনের জনতা উন্নয়ন দল, ওয়াইসি র এমআইএম কিংবা এসইউসি, নকশাল গোষ্ঠী গুলি বিজেপি অথবা তৃণমূলের পক্ষে ছায়া দল হিসাবে দাঁড়িয়ে পড়েছে এবং কার্যত তাদের হয়েই কাজ করছে। ফলে যা হবার তাই হবে। যে দুই পাহাড় পশ্চিমবঙ্গবাসী কে পিষে মেরে ফেলছে তারাই বা তাদের জোট হয়তো আবার ফিরে আসবে। নিজেদের ভুলের জন্য পশ্চিমবঙ্গবাসীর সহজে রেহাই নেই।
০৭.০৪.২০২৬










