“৯ অগাস্ট ধ্বস্ত-বিক্ষত মেয়েটির রক্ত যেন কালো হয়ে উঠে কলঙ্ক লেপে দিয়েছিল রাষ্ট্র আর সমাজের মুখে। তারপরই রাষ্ট্র অগ্রাহ্য করার মত দর্পিত স্পর্ধায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে শুধু চিকিৎসক মণ্ডলী নয়, সমস্ত সমাজ।“–(সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘আর জি কর- কেন এই আলোড়ন ঐতিহাসিক’, শারদীয়া অনুষ্টুপ ২০২৪)
প্রতিবাদের আশ্চর্য সমাপতন ঘটেছে এই আন্দোলনে। এই প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা গণতান্ত্রিক অধিকার ও নিরাপত্তাকে প্রবল ভাবে আঘাত করে। নারী এবং ট্রান্সক্যুইয়ার গোষ্ঠীর মানুষেরা দলে দলে পথে নামেন। নারী, প্রান্তিক যৌনতার মানুষ, যৌন কর্মীরা প্রতিবাদে মুখর হন। আদিবাসী তরুণীর ধর্ষণ ও মৃত্যুর বিচারের দাবি ওঠে রাজপথের মিছিলে। দ্রোহের কার্নিভালে যোগ দেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বর্ধমান বীরভূম মুর্শিদাবাদ থেকে মানুষ। রাতদখল, মানব বন্ধনের সঙ্গে এক হয়ে যান প্রান্তিক মানুষেরা|
শারদীয়া অনুষ্টুপ ২০২৪ এর ক্রোড়পত্রের বিষয় আর জি কর হত্যা, ধর্ষণ ও প্রতিবাদী আন্দোলন। এই ক্রোড়পত্রে ৬ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের সঙ্গে আছে অভয়া কাণ্ডের পরেই তড়িঘড়ি করে আনা অপরাজিতা বিল প্রসঙ্গে রাজ্যসরকারের প্রতি বুদ্ধিজীবী এবং নারীঅধিকার কর্মীদের একটি খোলা চিঠি।
অভয়া আন্দোলনে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দৈন্য আর সরকারি দুর্নীতির পাশাপাশি লিঙ্গসাম্যের অভাব এবং যৌনহিংসার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।
অপরাজিতা বিল যৌন হিংসা প্রতিরোধ করতে চেয়েছে শাস্তির কঠোরতা বাড়িয়ে। ধর্ষণ ও হত্যার ন্যূনতম শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে ফাঁসি। শাস্তি কঠোর হলেই অপরাধের হার কমেনা। আসল প্রয়োজন ছিল অপরাধের প্রতিরোধ আর সহজে অভিযোগ করার ব্যবস্থা। যৌন হিংসা প্রতিরোধ এবং কর্মক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি সম্পর্কে এই বিল কোন মন্তব্য করেনি। এই বিলের সমালোচনা করে বুদ্ধিজীবী এবং নারীঅধিকার কর্মী রা প্রশাসন কে আর জি কর হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায় নেবার আবেদন করেন।
অধ্যাপক সুজাত ভদ্র তাঁর লেখায় নারীবাদী চর্চায় ধর্ষণের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা, ভারতে ধর্ষণ বিরোধী আইন এবং আন্দোলন নিয়ে মূল্যবান আলোচনা করেছেন। নির্ভয়া কাণ্ডের প্রতিবাদ আন্দোলনকে ছাপিয়ে গেছে মেয়েদের রাত দখলের কর্মসূচি এবং পরবর্তী নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ, যেখানে ধর্ষিতা ও নিহত চিকিৎসকের প্রতি সহমর্মিতার পাশাপাশি উঠেছে ন্যায়বিচারের দাবি। বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী অধ্যপক সুজাত ভদ্র এই প্রতিবাদকে ২০০৬-০৭ সালে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অধিকারের সংগঠক Tarana Burke-এর ভাষায় ‘empowerment by empathy’ বলে উল্লেখ করেছেন। অধ্যাপক ভদ্র কেট মিলেট এর ধ্রুপদী গ্রন্থ Sexual Politics – এর পিতৃতন্ত্র সংক্রান্ত আলোচনা দিয়ে শুরু কারেছেন তাঁর প্রবন্ধ। মানবতার স্বার্থে পিতৃতন্ত্রের আপাত অপরাজেয় এই শক্তির পতন প্রয়োজন। মনে করিয়েছেন ব্রাউন মিলার এর সেই বিখ্যাত উক্তি “rape is all about power, not about sex” । অভয়া আন্দোলনের অভূতপূর্ব গণ জাগরণকে কুর্ণিশ জানিয়ে, সরকারি ভুমিকার তীব্র সমালোচনা করেও কিছু জরুরি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছেন তিনি- কেন উত্তরাখণ্ডে নার্সের ধর্ষণ ও হত্যা, এলাম বাজারে নার্সের শ্লীলতাহানি র প্রশ্ন কলকাতার নাগরিক আন্দোলনে কেন জায়গা করে নিতে পারল না, এটা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। উন্নাও হাথরস মনিপুর কেন এই গণজাগরণের জন্ম দিতে পারেনি সেটা নিয়েও ভাবা দরকার।
রিয়া মুখার্জি নারী ও নীরবতা প্রবন্ধে অভয়া হত্যা ও ধর্ষণের প্রসঙ্গে পৃথিবীর সব ধর্মে সব সমাজে প্রাচীন যুগ থেকে চলে আসা নারী বিদ্বেষ এবং নারীর কণ্ঠরোধ নিয়ে আলোচনা করেছেন। ব্রাউন মিলারের অনুসরণে তিনি ধর্ষণ ও ক্ষমতা তন্ত্রের যোগকে চিহ্নিত করে বলেছেন ধর্ষণ আসলে যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এর উৎস সন্ধান করতে হবে ত্রাস সৃষ্টির মনস্তত্ত্বে- “যোনিদেশের প্রতি যুগলালিত ও বহুসঞ্চিত ক্রোধ ও ঘৃণার প্রকাশের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবির আড়ালে নারীদের, প্রান্তিক দের স্বাধীন চেতনার, ভাবনা প্রকাশের প্রতি পুরুষতন্ত্র আর ক্ষমতার এই যুগল বন্দী আক্রোশকে যেন আমরা চিনে নিতে ভুল না করি”।
ডক্টর পুণ্যব্রত গুণ এবং শ্যামল চক্রবর্তী ৮০ র দশকের চিকিৎসক আন্দোলন এবং ২০২৪ এ শুরু হওয়া জুনিয়র চিকিৎসক দের আন্দোলনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। শ্যামল চক্রবর্তী ১৯৮৩ থেকে শুরু করে জুনিয়র চিকিৎসক আন্দোলনের অবিচ্ছিন্ন জনমুখী ধারা নিয়ে লিখেছেন। ডক্টর গুণ ১৯৮৩ র আন্দোলনে All Bengal Junior Doctors Federation (ABJDF) এর স্বাস্থ্য ভিক্ষা নয় অধিকারের দাবির কথা উল্লেখ করেন। ২০২৪ এ জুনিয়র চিকিৎসক এবং মেডিক্যাল ছাত্ররা কী নতুন ধরণের গণতান্ত্রিক অভ্যাসের মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিত করছে, কী ভাবে সিনিয়র চিকিৎসকরা যৌথ সংগঠনের মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তুলছেন এবং কী ভাবে এই আন্দোলন রাজনৈতিক গনজাগরণে পরিণত হয়েছে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে এই রচনায়।
সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক স্বাধীনতাযুগের বৃহৎ গণ আন্দোলনগুলির সঙ্গে এই আন্দোলনকে তুলনা করেছেন। শ্লোগানের স্বকীয়তা ও বৈচিত্র্য নিয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা আছে এই প্রবন্ধে।
শুভাংশু পালের লেখার সময়কাল ৯ অগাস্ট থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৪ – অনশন অবস্থান প্রত্যাহার পর্যন্ত । তথ্য ও বিশ্লেষণে এই সময়ের অন্যতম সেরা দলিল। ২০২৫ এর বই মেলায় প্রণতি প্রকাশনী থেকে বই হিসাবে প্রকাশিত হয়েছে ডঃ শুভাংশু পালের দ্রোহকালের দিনলিপি।
সাহিত্য গবেষণা ও সামাজিক রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে অভয়া আন্দোলন। শারদীয়া অনুষ্টুপে তারই প্রতিফলন। ৯ অগাস্ট ২০২৪ পরবর্তী দ্রোহসাহিত্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন এই সঙ্কলন ।









