মাস তিনেক আগের এক ঘটনা । সন্ধ্যের চেম্বার প্রায় শেষ। হন্তদন্ত হয়ে বিশাল বপু বছর পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক চেম্বারে এসে ঢুকলেন। সাথে আসা সহধর্মিণী বেশ চিন্তাগ্রস্ত । ভদ্রলোক নির্বিকার। কি ব্যাপার?
দুপুরে খাবার পর থেকেই বুকে ব্যথা।প্রথমে ভাবলাম গ্যাস হয়েছে বোধহয়। তাই একটা অ্যান্টাসিড লিকুইড খাওয়ালাম। কমলো না। তখন কাছের এক গ্রামীণ চিকিৎসককে ডেকে আনলাম বাড়িতে। ব্লাড প্রেসার বাড়া। উনি পেট টিপে, স্টেথোস্কোপ দিয়ে দেখে বললেন গ্যাসই হয়েছে। কয়েকটা ওষুধ সাথে থাকা ব্যাগ থেকে বের করে খাইয়েছিলেন। একটা চুষে খাওয়া ওষুধ খাবার পর ব্যথা খানিক কমলো বটে। কিন্তু মাথা ঘোরাতে শুরু করলো সাথেসাথেই। উনাকে বিছানায় শুইয়ে একখান স্যালাইন চালানো হয়েছিলো। কিছুক্ষণ বাদেই ব্যথা উধাও হলো। গ্রামীণ চিকিৎসকও পারিশ্রমিক নিয়ে বিদায় নিলেন।
ঘন্টা চারেক পর আবারও শুরু হলো ব্যথা। এবার ব্যথাটা বেশ বেশি। ব্যথার জন্য একবার খানিক শ্বাসকষ্টও হলো মনে হলো। গ্রামীণ চিকিৎসককে আবারও ডেকেছিলাম। কিন্তু উনি এইসময় বাইরে থাকায় আর একজন কোয়াক চিকিৎসককে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আবার সেই চুষে খাবার ওষুধটা দিতেই এক্কেবারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন বিছানায়। প্রেসার মেপে দেখলেন, প্রেসার নাকি এক্কেবারে নেই। তাই হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে উনি চলে গেলেন। আমরা হাসপাতালে যাবার পথে আপনার চেম্বার খোলা দেখে ঢুকে পড়লাম।
আমি ততক্ষণে প্রেসার মেপেছি। একশো দশ বাই বাহাত্তর। প্রায় নরমাল।কিন্তু ভদ্রলোক গুম হয়ে থাকলেও বুকের বোতামের ফাঁকে কষ্টকর শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার চিহ্ণ আমার চোখ এড়ালো না। কাছে থাকা ইসিজি মেসিন টা বসিয়ে দেখলাম হার্টের সামনের ও নিচের দেওয়ালে হার্ট অ্যাটাক(এ.এম.আই) হয়ে রয়েছে। সাথেসাথেই ট্রপোনিন টি টেস্ট করা হলো। পজিটিভ।
অর্থাৎ কিনা এই হার্ট অ্যাটাকের বয়স বেশি নয়। সাথে সাথেই অ্যাস্পিরিন, ক্লপিডোগ্রেল আর স্ট্যাটিনের লোডিং ডোজ প্রয়োগ করে এনোক্সাপারিন ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে যাবার নিদান দিলাম।
কিন্তু এরপরেই এতক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকা রোগী বেঁকে বসলেন।কোয়াক চিকিৎসক জিভের তলায় যে ওষুধ টা দিয়ে ব্যথাটা কিছুক্ষনের জন্য কমিয়ে দিচ্ছিলেন সেই ওষুধ খেয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যেতে চান। হাসপাতালে যেতে চান না।
হার্টের নিচের দেওয়ালে অ্যাটাক ( এ.এম.আই) হলে এবং ব্লাডপ্রেসার প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকলে সরবিট্রেট জাতীয় নাইট্রেট ওষুধ খাওয়ালে যে বিপজ্জনক অবস্থা তৈরি হতে পারে, তা তিনি দু-দুবার অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবার পরেও বুঝতে চান না। সরবিট্রেট হার্ট অ্যাটাকের জীবনদায়ী ওষুধ বটে। কিন্তু প্রয়োগের সম্বন্ধে বিশদ ধারনা না থাকলে এক সরবিট্রেটই জীবন নিয়ে নিতে পারে। এ বিষয়ে গ্রামীণ চিকিৎসকেদের অতটা ধারনা না থাকাই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় আর সরবিট্রেট বা স্যালাইন না দিয়ে ইমিডিয়েট একটি ইকোকার্ডিওগ্রাফি করে প্রয়োজনে আই সি ইউ তে ভর্তি হতে হবে। দরকার হলে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টিও করতে হতে পারে। কাছেপিঠের একমাত্র মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ ছাড়া কোনো নার্সিংহোমে এ চিকিৎসা একমুহূর্তে পাওয়া মুস্কিল।
বেশ কিছুক্ষণ বোঝানোর পরে সহধর্মিণী বুঝলেন বটে । কিন্তু ভদ্রলোক বুঝলেন বলে মনে হলো না। তাও একরকম জোর করেই মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হলো। সেই রাত্রেই উনার অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি অপারেশন হলো। দুদিন পর খোঁজ নিয়ে জানলাম বেশ সুস্থ আছেন উনি।
যে ছেলেটি সেই রাতে ট্রপোনিন টি টেস্ট করেছিলো সে শুধু জানালো – ভদ্রলোক এতকিছুর পরেও বলছেন এই জন্যই তিনি পাশ করা ডাক্তারের কাছে আসতে চান না। শুধুশুধু অহেতুক ভয় দেখায়।
আমি মিচকি হাসি দিয়ে বাঙালির ভবিতব্যের মঙ্গল কামনা করে দীর্ঘশ্বাস টি সকলের অলক্ষ্যে ঢোঁক গিলে কর্তব্যে মন দিলাম।










