রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্ভাগ্যজনক অপমৃত্যুর বিষয়ে কিছু বলার জন্য এই পোস্ট নয়।
তাঁর মর্মান্তিক অকালমৃত্যুপরবর্তী যে নাট্যরঙ্গ সোশ্যাল মিডিয়া, প্রিন্ট এবং ভার্চুয়াল সংবাদমাধ্যমে দেখার সৌভাগ্য হচ্ছে গত চব্বিশ ঘন্টা ধরে, সেই বিষয়ে কিছু লিখব ভেবেছিলাম। এখন কলম ধরতে বিবমিষা হচ্ছে।
একজন মানুষের মৃত্যুর পরে কোথায়, কখন, কতটা মুখ খুলতে হয়, মন্তব্য রাখতে হয়, প্রশ্ন রাখতে হয় — সে বিষয়ে খুব কম জানি আমরা।
কিছুটা ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে কবি লিখে গিয়েছিলেন –‘এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা’ —
বিভিন্ন আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা ‘নেটিজেন’রা তাঁদের বক্তব্য প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছেন সমাজমাধ্যমে, এটি নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। তবে পুরানি কহাবৎ বলে ‘ভেড়ার শিংয়ে পড়লে হিরের ধারও ভোঁতা হয়ে যায়।’
তাই কোনও ব্যক্তির মৃত্যুদিনে শোকজ্ঞাপনের পোস্টের নিচে অশ্লীল, স্থূল, অমানবিক মন্তব্যের বন্যা বয়ে যায় — চুপ্, রাজনৈতিক প্রতিবাদ চলছে!
কেবল নেটিজেনদের দোষারোপ করে নিজের নিদাগ আঁচল ঘুরিয়ে ethical snobbery দেখানো যেতেই পারে, তবে তলিয়ে ভাবতে গেলে অস্বস্তি হয় বড্ড।
যে ভ্রষ্ট সময়ে দায়িত্বশীল সাংবিধানিক প্রধানেরা রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে কুকথার মাধ্যমে পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে নিত্য মত্ত থাকেন, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কুশীলব সাংবাদিকেরা শোচনীয় ঘটনাবলীর আশেপাশে ঘা*য়ের মা*ছির মতো বুম হাতে ছোঁকছোঁক করেন, কাউকে আক্রমণ করার বা প্রতিশোধস্পৃহা নিবৃত্ত করার সবচাইতে ভাল মাধ্যম হয়ে ওঠে মেঘনাদের মতো আড়ালে থেকে প্রযুক্তির অসদব্যবহার — তখন আমজনতা কুৎসিত থেকে কুৎসিততর রিল, মিম, ভিডিও তৈরি করাকে রোজগারের পন্থা বানালে আমার মতো সংবেদী নীতিপুলিশদের নাক সিঁটকে ‘গেল গেল’ রব তোলার কিছু থাকে কি?
Yellow journalism যখন সাধারণ মানুষের বোধগম্য বিনোদনের জোগান দেয়, negative publicity যখন জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি হয়ে ওঠে, সমাজমাধ্যমে body shaming বা verbal abuse কে যখন স্মার্ট এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক হিসেবে ধরা হয়, তখন সেকেলে দিদিমার মতো মুখের উপর থানের খুঁট তুলে উপচে ওঠা নর্দমার জলের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে পথ চলার শুচিবায়ুগ্রস্ততা দেখালে ঈশ্বরও ‘আজব সার্কাস’ বলে মুচকি হেসে ফেলবেন, আমি নিশ্চিত।
গত চব্বিশ ঘন্টায় সোশ্যাল মিডিয়ার নানা রকম দেওয়াল লিখন, প্রতিলিখন দেখে মনে একটাই প্রশ্ন জাগছে — আমরা, মানুষেরা কি আদতে শিকার, নাকি শিকারী? আন্তর্জাল ঘেঁটে দেখলাম, বিশ্বের প্রথম দশটি মহা-আক্রমণাত্মক জীবের মধ্যে ন’নম্বরে রয়েছে মানুষ। আর কে না জানে যে খাদ্যের প্রয়োজন ব্যতিরেকে মানুষই একমাত্র জীব যারা শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে — কখনও একা, কখনও যূথবদ্ধভাবে।
এমনি এমনিই কি আর ঈশ্বরের ‘শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি’? আসুন, সকলে মারাত্মক রকমের শ্লাঘাবোধ নিয়ে শান্তির ঘুম ঘুমোতে যাই আজ।
শুভ রাত্রি।









