আমাদের দেশে ওষুধ নামক বিভিন্ন মাত্রার ভেজালের অধিকারী মহার্ঘ্য দ্রব্যের মাগ্গি গন্ডার বাজারে একেবারে সস্তা দাদার ‘ জন ওষধি কেন্দ্র ‘ এবং দিদির ‘ ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান ‘ গুলির কেরামতি বুঝতে প্রথমে কয়েকটি আপ্ত বাক্যের মধ্যে দিয়ে আমাদের এই সংক্ষিপ্ত দর্শন (Overview) শুরু করতে হবে।
(১) কোন কোন অসুখ নিরাময়ের জন্য ওষুধের (Medicines)প্রবর্তন যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার হাত ধরে হয়ে দাঁড়িয়েছে মুনাফা (Profit) লাভের জন্য ওষুধ আবিষ্কার, তৈরি ও বিক্রি (আরও এগিয়ে – নতুন রোগ বা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি নতুন ওষুধ বিক্রির জন্য)।
(২) কোন ব্যক্তির যেগুলো মনে হচ্ছে অসুখ, তার বেশিরভাগই দেখা যায় অসুখ নয়। আবার অস্বাভাবিক মানসিক চিন্তাভাবনা ও চাপ থেকে অনেক শারীরিক অসুখের (Psychosomatic Disorders) উদ্ভূত হয় বা বৃদ্ধি পায়। এগুলো উপশমের জন্য আমরা যে মুড়ি মুড়কি র মত যথেচ্ছ ওষুধ কিনে খাই (Drug Abuse) সেগুলো আসলে ছলৌষধ (Placebo) । অর্থাৎ অসুখ নেই যেহেতু তাই অসুখ সারার কোন প্রশ্ন নেই, কিন্তু ওষুধ খেলে মনে হয় অসুখটা কমে গেল।
(৩) ওষুধ বলতে ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সিরাপ , ইনজেকশন, ইনফিউশন বিভিন্ন রূপের (Types); ভ্যাকসিন, ইমিউনোগ্লোব্যুলিন … বিভিন্ন চরিত্রের (Characteristics); বিভিন্ন ধরনের (Formulae), বিভিন্ন মাত্রার (Doses), বিভিন্ন যৌগের (Compounds), বিভিন্ন নামের (Generic and Trade Names), বিভিন্ন ব্র্যান্ডের (Manufacturing and / or Marketing Companies), নানা ধরনের মোড়কে রাখা, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম বা মিশ্র উৎপন্ন দ্রব্য (Formulations) । এই ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের (Medical Appliances) এর ভারতে ব্যবসা ২০২৩ – ‘ ২৪ এ ছিল ৭৭০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর সঙ্গে ৯০ গুণ করলে ভারতীয় টাকা। এর বাইরে শিশু খাদ্য, হেল্থ ড্রিঙ্কস, স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদিরও বিশাল বাজার রয়েছে।
(৪) সব অসুখ উপশমের ওষুধ বেরোয়নি। কিছু অসুখের ওষুধ ভেষজ ও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা (Research) করে আবিষ্কার (Discover and/or Invent) করেছেন। সেটা সেই অসুখের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট পর্যায়ে (Clinical Stages) ও বয়স অথবা ওজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় (Proper Dose) দিতে হবে। ইচ্ছেমত ওষুধের দোকান থেকে (Over the Counter) কিনে এগুলো খাওয়ার বস্তু নয়। এগুলো অভিজ্ঞ ডাক্তার দের পরীক্ষানিরীক্ষার পর তাদের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সংগ্রহ সাপেক্ষ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মুনাফালোভী ডাক্তার ও হাসপাতালগুলো অনেকক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লিখে থাকেন। রোগীর বাজেট বহির্ভূত অর্থ (Out of pocket expenditure) বেরিয়ে গেলেও এর বিনিময়ে অসাধু চিকিৎসক, হাসপাতাল / নার্সিং হোম / ক্লিনিকস এর মালিক এবং/অথবা প্রশাসক রা আর্থিক ও অন্যান্য ভাবে লাভবান হন। ওষুধ, বিমা সংস্থা গুলো তাদের নানারকম উপঢৌকন, মদ্যপান, বিনোদন, বিদেশ ভ্রমণ ইত্যাদির ব্যবস্থা করে থাকে।
(৫) প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম হোক প্রতিটি ওষুধ রাসায়নিক পদার্থ (Chemicals)। সুতরাং এর কম বেশি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (Side Effects) থাকবেই। পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ক্ষতিকর হলে তাকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া (Adverse Effects) বলা হয়। বিরূপ প্রতিক্রিয়া মৃদু (Mild) থেকে তীব্র (Severe) আকারের হতে পারে। কারুর কারুর ক্ষেত্রে কোন ওষুধ প্রয়োগ দেহ সহ্য করতে পারেনা, Allergy কিংবা Anaphylactic Shock হতে পারে। একই ওষুধ একেকরকম অঞ্চলে, একেকরকম আবহাওয়ায়, একেক জাতির এবং একেক ব্যক্তির উপর একেক রকম কাজ করে।
(৬) একটি ওষুধের মূল উপাদান Active Pharmaceutical Ingredients (API)। এটি সব চাইতে মূল্যবান। কারণ এগুলি আবিষ্কার করতে বিজ্ঞানীদের অনেক মেধা, পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করতে হয় এবং রাষ্ট্রীয় গবেষণাগার অথবা ওষুধ কোম্পানি গুলোকে অনেক অর্থ খরচ করতে হয়। ওষুধ নিয়ামক সংস্থার নজরদারিতে তিন স্তরের কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ ক্লিনিকাল ট্রায়াল চালাতে হয়। প্রথমে কিছু নির্বাচিত রোগী ও স্বেচ্ছাসেবকের উপর। সেটি সফল হলে নির্বাচিত ছোট জনসংখ্যার উপর। তারপর বড় জনসমষ্টির উপর। আজকাল উৎকোচ দিয়ে সংস্থাগুলি নিজেদের মত দ্বিতীয় স্তর অবধি ট্রায়াল চালিয়ে ওষুধ, ভ্যাকসিন ইত্যাদি বাজারে ছেড়ে দিয়ে কার্যত তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের উপর তৃতীয় স্তরের ট্রায়াল চালায়। জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলি প্রথম শ্রেণীর API উৎপাদন করে এবং ক্যান্সার, এইডস সহ বেশিরভাগ জীবনদায়ী ও দুরারোগ্য অসুখের ওষুধের patent সহ API এই সব ধনী দেশের বহুজাতিক বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলির (Big Pharmas) করায়ত্ব। পরিমাণের দিক থেকে সবচাইতে বেশি পরিমাণ API তৈরি করে চিন (২০% ও ২০০০ ধরনের) এবং সবচাইতে বেশি API ও Bulk Drug রপ্তানিও করে। বর্তমানে ভারতও এখন প্রায় ২০% এর কাছাকাছি ও ৫০০ রকমের API তৈরি করছে । এবার একটি ওষুধ তৈরি করতে API এর সঙ্গে Inactive Incepients (II) প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ Fillers, Binders, Disintegrants, Lubricants, Glidants ইত্যাদি। এরপর সঠিক Weighing, Mixing, Blending, Granulation, Drying, Milling, Compression, Coating, Quality Control Check Up, Packaging, Labelling, Marketting এর পর ওষুধ গুলি কে বাজারে ছাড়া হয়।
(৭) সরকারি ওষুধ কোম্পানি গুলিকে জলাঞ্জলি দেওয়ার পর ব্যক্তি মালিকানার প্রায় ১০,০০০ ভারতীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থা বিদেশ থেকে আনা এবং দেশে প্রস্তুত API দিয়ে বিশ্বের সবচাইতে বেশি ৬০,০০০ জেনেরিক ওষুধের উপর ৫০,০০০ ব্র্যান্ডের লক্ষ লক্ষ ফরমুলেশন প্রস্তুত করে। দেশের বাজার ছাড়াও আফ্রিকা, এশিয়া প্রভৃতি মহাদেশে ভারতীয় ওষুধ কোম্পানি গুলিই সর্বাধিক ওষুধ ও আনুসঙ্গিক দ্রব্য রপ্তানি করে (৪৮%)। ভারতের প্রথম ১২ টি বড় সংস্থা: Sun (বার্ষিক টার্ন ওভার ৩৬৫ কোটি টাকা), Serum Institute, Cipla, Dr. Reddy’s Lab, Divis, Zydus, Torrent, Mankind, Lupin, Aurobindo, Alkem ও Intas। গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে সবচাইতে বেশি ওষুধ প্রস্ত্তত কারক সংস্থা রয়েছে। এছাড়াও অন্ধ্র, কর্নাটক, তামিলনাড়ু প্রভৃতি রাজ্যে বেশি ওষুধ সংস্থা রয়েছে। হিমাচল, উত্তরাখণ্ড, সিকিমের SEZ এলাকায় নতুন নতুন ওষুধ কারখানা গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ তৈরির খরচ বাঁচাতে বড় ও বিদেশি কোম্পানি গুলি ছোট ও দেশীয় কোম্পানি গুলিতে ওষুধ তৈরির বরাত দেয় (Outsourcing)। সেইক্ষেত্রে অনেক সময় ব্র্যান্ডের প্রথম লট প্রস্তুতির পর বাকি API দিয়ে নানারকম II মিশিয়ে তুলনামূলক কম দামের পরবর্তী ব্র্যান্ডের বা ব্র্যান্ড গুলির একই ওষুধ এবং শেষে খুব সস্তার ‘ কমা ‘ একই ওষুধ অন্য নামে তৈরি করা হয়। কর ফাঁকি দিতে এবং মার্কেটিং এর জন্য আরও অনেক অনেক কিছু জটিল বিষয় ঘটে থাকে।
(৮) একটা হিসাবে দেখা গেছে ওষুধ ব্যবসায় প্রস্তুতকারক সংস্থা ১০ – ৪০ %, পরিবহন, রপ্তানিকারী সংস্থা ৪ – ১০%; স্টকিস্ট, ডিস্ট্রিবিউটর ৫ – ২০%; হোলসেলার ৮ – ৪০%, রিটেইলার বা বিক্রেতা ১৬ – ৪০% লাভ রাখে। অর্থাৎ একটা ওষুধে ব্যবসায়ীরা ৪৩ – ১৫০ % লাভ রাখে। বিদেশি বহুজাতিক বৃহৎ ফার্মা গুলির কিছু গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের ক্ষেত্রে একচেটিয়াপনা এবং মুনাফা আরও বেশি। ভারতে প্রভাবশালী বিদেশি বহুজাতিক বিগ ফার্মা গুলি: Pfizer, GSK, Sanafi, Marck, Johnson & Johnson, Nestle, Amgen, Novartis, Roche, Lilly, Abbott প্রমুখ এবং ভারতের ওষুধ বাজারের ১৫ % এদের দখলে।
(৯) অথচ বহু আগে WHO জানিয়েছিলেন ২০০ টি প্রয়োজনীয় ওষুধের (Essential Drugs) মাধ্যমে বেশিরভাগ রোগের চিকিৎসা সম্ভব। ‘ ড্রাগ অ্যাকশন ফোরাম ‘ ভারতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা নির্ণয় করেছিলেন ১১৭। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশে এই সংখ্যাটা ১৫০ নির্ধারণ করে সরকারের মাধ্যমে বাদবাকি বহুজাতিক কোম্পানি প্রস্তুত অপ্রয়োজনীয় ওষুধ নিষিদ্ধ করে, প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো দেশে তৈরি করে ও কম দামে সরবরাহ করে এবং ওষুধের জেনেরিক নাম চালু করে বাংলাদেশে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। ভারত সরকার জীবনদায়ী ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ গুলিকে (Life Saving & Essential Drugs ) Category I, প্রয়োজনীয় ওষুধ গুলিকে ( Necessary Drugs) Category II এবং অন্যান্যদের Category III ও IV এ বিভক্ত করলেও বাজার অর্থনীতির নিয়মে ভেদ রেখা মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে যেখানে উচ্চ মূল্যের অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ কিন্তু স্বল্প মূল্যের জীবনদায়ী ও অত্যাবশ্যক ওষুধ গুলি দুষ্প্রাপ্য। কোথাও বা কালোবাজারে র নিয়ন্ত্রণে। ওষুধ নিয়ামক সংস্থাকে (Drug Control) কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। আজও দেশের কোন সঠিক ওষুধ নীতি নেই।
(১০) এত বিশাল ও লাভজনক অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবসাতেও অসাধু শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, মাফিয়া, নেতা, মন্ত্রী রা সন্তুষ্ট নন। এরা ভারতকে কেন্দ্র করে শুরু করেছেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভেজাল (Spurious or Fake Medicines) ও নিম্ন মানের ওষুধের (Sub standard Medicines) রমরমা ব্যবসা এবং যার শিকার ভারত সহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। ওষুধ প্রস্তুতির সময় নিম্ন মানের ও কম পরিমাণে API দিয়ে এবং বেশি পরিমাণ ও নিম্ন মানের II দিয়ে এই ওষুধগুলি তৈরি করে বাজার ছেয়ে ফেলা হয়েছে। এই ওষুধগুলিতে কাজ হয় না, Anti Microbial Resistance (AMR) হয়, শরীরের ক্ষতি করে। কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হয়। সাধারণের কাছে এগুলি ‘ কমা ওষুধ ‘ অথবা বড়বাজারের ‘ বাগরি মার্কেটের ‘ ওষুধ নামে পরিচিত। এর মূল বাজার গ্রামাঞ্চল, শহর ও শিল্পাঞ্চলের বস্তি কলোনি, হাতুড়েদের চেম্বার, ছোট ছোট বেআইনি ওষুধের দোকান। দরিদ্ররা অর্থাভাবে বাধ্য হয়ে এগুলি কেনেন। বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্যের কোন নিয়ন্ত্রণের অভাবে এগুলি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আসলের সঙ্গে পার্থক্য বোঝাই মুশকিল। সব চেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় সরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল এবং ন্যায্য মূল্যের সরকার অনুমোদিত ওষুধের দোকানে MRP এর চাইতে ৪৮ – ৭৭% কম বা তারও কম মূল্যে বুক ফুলিয়ে এগুলির ব্যবহার ও বিক্রি হচ্ছে। বৃহৎ দুর্নীতি ও প্রবল প্রচারের অন্তরালে নিরুপায় গরীব সাধারণ মানুষ চরম প্রতারিত হচ্ছেন। অসাধু – ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, নেতা, রাজনীতিক রা অতি ধনবান হচ্ছেন। আর জি কর মেডিকেল কলেজে শহীদ তিলোত্তমা কে স্বাস্থ্য মাফিয়া দের হত্যা করার পিছনে সন্দীপ মাফিয়ার পরিচালনায় দুষ্ট ওষুধচক্র একটি বড় কারণ। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক, ভেষজ, আয়ুর্বেদ ইত্যাদির নামে আরেক লাভজনক ব্যবসা চলছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভারত হয়ে উঠেছে অবৈজ্ঞানিক Mixopathy এর সঙ্গে ভেজাল ওষুধের রাজধানী।
L 1 অথবা Lowest 1 এর খেলা: আমাদের দেশে সরকারি টেন্ডার পেতে আড়ালে বিভিন্ন জায়গায় টাকা গুজে বিডার দের স্বনামে বা বেনামে সবচাইতে কমমূল্যের দরপত্র নির্বাচিত হয়। সরবরাহের চুক্তি পেতে তারা বাজারের অনেক কমেও দরপত্র ফেলেন। তার উপর বিভিন্ন মন্দিরে দক্ষিণা গুজতে হয়। নইলে কোন না কোন অজুহাতে সরকারি বাবুরা টেন্ডার বাতিল করে দেবেন। এরপরও সরবরাহকারীকে মুনাফা করতে হবে। সে অত্যন্ত নিম্ন মানের ওষুধ, ইনফিউশন, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করে। ওষুধে API এর পরিবর্তে II ভর্তি থাকে। যাদের নজরদারির কথা তারা দ্রব্যগুণে ধৃতরাষ্ট্র হয়ে যান। সাধারণ রোগীদের হয় এই আবর্জনা গিলতে হয় নইলে অনেক বেশি দামে বাইরে থেকে কিনতে হয়। এইসব কারণে হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসাজনিত নানারকম সংক্রমণ ও দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে এবং ওষুধ থেকে অসুখ (Iatrogenic Diseases) অথবা হাসপাতাল থেকে অসুখ (Nasocomial Diseases) বেশি ঘটছে। জুনিয়র ডাক্তার রা বারবার এই বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কর্তৃপক্ষ ও সরকারের হেলদোল নেই।
” মানুষের জন্য ওষুধ না, ওষুধের জন্য মানুষ “: ১৯৮৪ সালে ‘ ভলান্টারি হেল্থ এসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া ‘, ‘ ড্রাগ অ্যাকশন ফোরাম ‘ এবং ‘ ডকুমেন্টেশন সেন্টার ‘ দু টাকা মূল্যে একটা চমৎকার পুস্তিকা বের করেন। লেখক ছিলেন ডা. অরুণ সেন, ডা. সুজিত কুমার দাস, ডা. পীযুষ সরকার এবং ডা. স্মরজিৎ জানা। সেখানে এই বিষয়গুলি সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়। এছাড়াও ‘ জন স্বাস্থ্য অভিযান ‘, ‘ মেডিকো ফ্রেন্ড সার্কেল ‘ , ‘ শ্রমজীবী স্বাস্থ্য প্রকল্প ‘, অধ্যাপক ডি. ব্যানার্জী প্রমুখ সংগঠন ও ব্যক্তি এই বিষয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। আমাদের ‘ স্বাস্থ্য শিক্ষা উন্নয়ন ‘ পত্রিকাতেও আমরা ডা. জয়ন্ত ভট্টাচার্য, ডা. স্বপন জানা, ডা. পূণ্যব্রত গুণ, ডা. প্রবীর চ্যাটার্জী, উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়, আশীষ কুসুম ঘোষ, অধ্যাপক নির্মলেন্দু নাথ প্রমুখের প্রবন্ধ প্রকাশ করে বিষয়গুলি সাধারণের সম্মুখে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
জন ওষধি কেন্দ্র: ২০০৮ এ ইউ পি এ সরকারের সময় শুরু। ২০১৫ তে মোদি সরকার ‘ প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জন পরিযোজনা ‘ প্রকল্পের অধীনে সস্তায় গুণমানের (Quality) ও কার্যকর (Efficacious) ওষুধ সরবরাহের জন্য রসায়ন ও সার মন্ত্রকের অধীনে এই প্রকল্প শুরু করেন। এখন অবধি সারা দেশে ১৫,০৩২ টি আউটলেট। গুণমান নিয়ে অভিযোগ থাকলেও বহু অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্র সরকারি কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ উপভোক্তা। মিশ্র প্রতিক্রিয়া।
ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান: রাজ্য সরকারের পাবলিক – প্রাইভেট পার্টনারশিপ এ ব্যক্তি মালিকানায় দেওয়া। কেন্দ্রের তবুও ভর্তুকি থাকে। এখানে ব্যক্তি মালিকের মুনাফা। আবার এম আর পি এর থেকে ৭৭ বা তার বেশি শতাংশ ছাড়। কি দাঁড়াচ্ছে বুঝে নিন। এক্ষেত্রেও সাধারণের থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে।
শুধুই মরীচিকা: গ্রাম বাংলায় যদি ঘোরেন দেখবেন কিছুটা পর পর একেকটি নীল সাদা অট্টালিকা। কোনটা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কোনটা লাইব্রেরি, কোনটা পথের সাথী, কোনটা কৃষি বাজার ….। বেশিরভাগের ক্ষেত্রে কোন কাজ না হলেও গ্রামের মানুষ একটা উন্নয়নের শ্লাঘা অনুভব করেন, তাই ভোট বাক্স ভারী হয়। সরকারি উন্নয়নের ফিরিস্তিতে দেখানো যায়। অন্যদিকে নির্মাণ, রং, সাজানো ইত্যাদি থেকে প্রচুর আয়ও হয়। কিছু দলীয় কর্মীকে কাজেও ঢোকানো যায়। তাদের থেকেও হয়তো দক্ষিণা নেওয়া হয়। নিয়মিত অর্থ পাঠানোর ও ভোট উৎরে দেওয়া স্থানীয় নেতা বা দাদারা এগুলিকে এলাকা দখলের পরিকল্পনা, বখরা ভাগ, বিনোদন ও রঙিন সান্ধ্য মজলিশের কাজেও ব্যবহার করে থাকেন। অর্থাৎ মাল্টিপারপাস উন্নয়ন প্রকল্প।
এই ওষুধের outlet গুলোও কার্যত তাই। কিছু গরীব নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ সস্তায় ওষুধ পেয়ে ধন্য ধন্য করলেন, ভোটের বাক্স ভারী হল। আবার বিভিন্ন সূত্রে ক্ষমতাশালী দের কাছে অনেক অর্থ এল। নিজেদের লোক ঢোকানো গেল। কমা ওষুধগুলোও চালিয়ে দেওয়া গেল। আর উন্নয়নের ফিরিস্তির মধ্যে এটির জায়গা তো থাকতেই হবে। কি বলেন আপনারা? আপনাদের মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায়।









