
২৫ শে জুলাই, ছিল এডওয়ার্ড জেমস করবেটের জন্মদিন।
আন্তরিকভাবে বনজঙ্গল অপছন্দ করেও কি করে যেন আমি করবেটের প্রকৃতিবিষয়ক লেখাগুলির আগ্রহী পাঠিকা হয়ে গিয়েছিলাম। ওঁর অনায়াস, স্বচ্ছসুন্দর লেখার গুণেই হবে হয়ত।
ইশকুল জীবনে পাঠ্য র্যাপিড রিডারের মধ্যে দুটি লেখা পেয়েছিলাম — রবিন আর কুঁয়র সিং।
অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকে বাংলার নবজাগরণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত জন ড্রিঙ্কওয়াটার বীটন সায়েব(বেথুন), ‘ঝড়ের পাখি’ ডিরোজিও, পণ্ডিত উইলিয়াম জোনস কিংবা জেমস লং সায়েবের কথা তো সকলেই জানি। কিন্তু উত্তরভারতের নৈনিতাল অঞ্চলের বাসিন্দা এই শিকারী সাহেবটি যে কতখানি ভারতপ্রেমিক ছিলেন, তাঁর অনবদ্য জাঙ্গলিক কাহিনীগুলি তার সাক্ষ্য বহন করে। নৈনিতাল, রামনগর, কালাধুঙ্গি, চম্পাবত, রুদ্রপ্রয়াগের বিস্তীর্ণ জঙ্গুলে পাহাড়ে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন হামলাকারী নরখাদক বাঘ বা চিতাবাঘের সন্ধানে — বেশির ভাগ সময় পায়ে হেঁটে। একবার এইরকমই একটি বিপজ্জনক রাস্তায় চলতে চলতে তাঁর দেখা হয়েছিল বছর আষ্টেকের একটি ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে, যে তার বাবার মোষটি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিল কয়েক মাইল দূরের গ্রামে, তার কাকার বাড়িতে — একা। করবেট লিখছেন, যে পথে দিনের বেলা সমর্থ পুরুষেরা দল বেঁধে ছাড়া চলার সাহস পায় না, সেই পথে একটি নিরুপায় ছোট মেয়ে বিপদ মাথায় করে তার অসুস্থ বাবার মোষটিকে কাকার বাড়িতে একলা নিয়ে চলেছিল — যাত্রাপথে বাঘের উপদ্রব আছে জেনেও। করুণায় দ্রব হয়ে এসেছিল লেখকের কলম। সেই
ভিজে মায়া কখন যেন ছুঁয়ে যায় পাঠকের মনকেও।
চিতার আক্রমণে স্ত্রী আহত হয়েছে। দুঃস্থ গ্রামবাসী স্বামী তাকে কোনওক্রমে নিজের এককামরার বাড়িটির ভিতরে ঢুকিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে দরজা। ভয়ে সে খুলতে পারেনি একমাত্র জানলাটিও। সারারাত চিতা দোর আঁচড়ে গিয়েছে সশব্দে। রক্তাক্ত অসুস্থ স্ত্রীর কোনও পরিচর্যাই সে করতে পারেনি রাতভ’র। ভোরের দিকে যখন চিতা সরে গিয়েছে, মেয়েটির প্রাণবায়ুও কেড়ে নিয়ে গিয়েছে সেপসিস — ঐ বদ্ধ, বায়ু চলাচলহীন ঘরে রক্তাক্ত ঘা বিষিয়েছে দ্রুত, পুরুষটি অসহায় কষ্টে তিল তিল করে স্ত্রীর মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছে প্রতি মুহূর্তে — করবেটের লেখনীও যেন হয়ে উঠেছে তার বেদনার শরিক।
প্রথম জীবনে ভারতবর্ষের দুর্গম পার্বত্য প্রদেশের দরিদ্র বনবাসী মানুষের ‘মসিহা’, নরখাদক বন্যপশুদের হাত থেকে তাদের রক্ষাকারী এক দেবদূত — আর পরবর্তী জীবনে বন্যপ্রাণ এবং পরিবেশ রক্ষার এক পথিকৃৎ সৈনিক জিম করবেট, যাঁর হাত ধরে ভারতে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের মহাযজ্ঞের আরম্ভ।
১৯৪৭এ স্বাধীনতার পরে তিনি ভারত ছাড়েন। চলে যান আফ্রিকার কেনিয়ায়। ১৯৫৫ সালে নিয়েরি-তে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আফ্রিকার বিশাল এবং বিবিধ বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের কাণ্ডারী হয়ে থেকে গিয়েছিলেন তিনি। করবেটের মৃত্যুর পরে অধুনা উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুনের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল অভিহিত হয় তাঁর নামে। করবেট ন্যাশনাল পার্ক ভারতের প্রথম জাতীয় উদ্যান রূপে আত্মপ্রকাশ করে।
আমার কাছে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অন্য। একটা মানুষ কি করে এতটা সাহসী হতে পারে, আমি অনেক ভেবেও এর সদুত্তর পাইনি। সদ্য কৈশোরে যখন প্রথম তাঁকে পড়েছি, তখনও না — আজ প্রৌঢ়ত্বের সীমায় পৌঁছেও না। মনে আছে রাতে জিম করবেট অমনিবাস পড়তে পারতাম না, নির্জন দুপুরেও পারিনি। এখনও পারি না। জনবহুল শহরের মাঝখানে বসেও টেম্পল টাইগারের গল্প পড়তে গেলে ভয়ে গায়ে জ্বর আসে — খাট থেকে উঠে দু’পা দূরের টয়লেটে যেতেও পাশের বাড়ি থেকে লোক ডাকবার অদম্য ইচ্ছে জাগে। অথচ একশো বছর আগে ঐ মানুষটি একটি গুলিভরা রাইফেল আর এক বুক সাহস সম্বল করে রাত্তিরবেলা পায়ে হেঁটে নরখাদক বাঘের পিছু নিয়েছিলেন — এ কথা ভাবলে অপার শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। কোথা থেকে পেয়েছিলেন এমন দুর্জয় মনোবল?
সাহস অবিশ্যি এখনকার বনপ্রেমী পর্যটকরাও দেখান। হুডখোলা গাড়িতে তাঁরা সোৎসাহে জঙ্গল সাফারি করেন, বিরলকেশ মানুষের মাথার মতো লুপ্তপ্রায় পাতলা জঙ্গুলে পথে দৈবাৎ বাঘবাবাজি দর্শন দিলে পিলে চমকানো ‘ওয়াও’ চিৎকারে আর মুঠোফোনের ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক আওয়াজে তাকে অভ্যর্থনা করেন — সে এক এলাহি ব্যাপার! এদিকে সংরক্ষণের আওতায় থেকেও সারা দেশে বাঘের সংখ্যা যে ক্রমশ পড়তির দিকে (মাঝে ভয়ঙ্কর কমে গিয়েছিল, সাম্প্রতিক সুমারিতে কিছুটা বেড়েছে), সে খেয়াল বেশি লোকজনের নেই সম্ভবত। তাই উত্তরবঙ্গের চা বাগানে, মহারাষ্ট্রের সঞ্জয় গান্ধী জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন লোকালয়ে, গুজরাটের গির অরণ্যের ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’র গ্রামে আর সুন্দরবনের পড়শি লোকবসতিগুলোতে যখন তখন বন্য জানোয়ারের অনুপ্রবেশে আমরা আর অবাক হই না। ওড়িশার সিমলিপালের বাঘ অক্লেশে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে পর্যটন করে যায়, ঝাড়খণ্ডের দলমার হাতি হামেশাই হামলা করে বাঁকুড়ার গ্রামে আর আলিপুরদুয়ার কিংবা পশ্চিম মেদিনীপুরের সরডিহার বুক চিরে যাওয়া রেললাইনে মাঝেমধ্যেই পড়ে থাকে ট্রেনে কাটা পড়া হতভাগ্য হাতি পরিবারের মৃতদেহ। আমাদের সয়ে গিয়েছে এইসব খবর।
আমি জঙ্গল ভালবাসি না। জন্তুদেরও পছন্দ করি না। সমাজমাধ্যমে কারোর কাছে এইজন্য আমার ‘পলিটিক্যালি কারেক্ট’ থাকার কোনও দায় নেই। স্বপক্ষে একটিই কথা বলার রয়েছে। আমি যেমন তাদের ভালবাসি না, তেমনই তাদের এলাকায় কখনও, কোনওভাবেই দর্শনাভিলাষে পা রাখার কথা চিন্তাও করি না। জীবজন্তুদের নিজস্ব পরিসরকে সঙ্কুচিত করে মানুষের সর্বগ্রাসী আবাদকেও সমর্থন করি না। এই ব্যাপারে প্রান্তবাসী মানুষগুলিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই — রাষ্ট্র পেরেছে তার প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করতে? যত সহজে পরিচয়পত্র নিয়ে খবরদারি করা যায়, অনু *প্র *বেশকারী সন্দেহে শাসন করা যায়, ভাষা নিয়ে তিরস্কার করা যায়, তত সহজে গরিব মানুষের ভিটে ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না বোধহয়।
তাই আজও ‘বাঘে নিয়ে’ গেলে ক্ষতিপূরণের জন্য দৌড়ে মরে সুন্দরবনের প্রান্তিক বাসিন্দা। শোক ভুলে দু’দিন পরেই কাঁকড়া ধরতে বা মধু সংগ্রহ করতে নোনাজলে নৌকো ভাসিয়ে দেয় অপঘাতে মৃত ব্যক্তির প্রিয়জন।
আগামী ২৯শে জুলাই আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস। বাঘের সঙ্গে আমার কোনওকালেও শুভদৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবুও সবসময়ই চাইব, তারা তাদের নির্ধারিত বাসভূমিতে নিজেদের মতো ভাল থাকুক, আমি আমার আধাশহুরে প্রতিবেশে আমার মতো ভাল থাকি।
করবেট শিখিয়ে গিয়েছেন — পৃথিবীটা একা মানুষের জন্য নয়। এই সারসত্যটি আধুনিক মানুষ যত শীঘ্র আত্মস্থ করে, তত এই গ্রহের মঙ্গল।










