কলকাতা থেকে দূরে চাকরি করার একটা বড় অসুবিধে, সপ্তাহের শেষটুকু বাদে বাড়ি থাকা যায় না। পারিবারিক দায়দায়িত্ব, ছেলের পড়াশোনা দেখা থেকে শুরু করে বিবিধ সামাজিক কর্তব্য, সবই ওইটুকু সময়ে সারতে হয়। এদিকে নতুন মেডিকেল কলেজ – কাজের পরিমাণ যদিও খানিক কম, কিন্তু লোকসংখ্যা এতই কম যে পাওনা ছুটি নষ্ট হতে থাকলেও গুরুতর প্রয়োজনীয়তা ছাড়া ছুটি নেওয়া অসম্ভব। এই যেমন ধরুন, এবারের উইকএন্ড-এ মাড়ির সংক্রমণ এবং বেমক্কা ঠান্ডা লেগে বেশ কাবু হয়ে পড়লেও হাসপাতালের কাজে ছুটি নেওয়া যাচ্ছে না – সোমবার ঝাড়গ্রাম না গেলেই নয়। তবে কথাটা কর্মক্ষেত্রের সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে এসব নাকে কাঁদা বিষয়ক নয়।
কথাটা হলো, অভয়ার বিচার চেয়ে ধর্মতলায় লাগাতার অবস্থান চলছে। এদিকে আমি শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেখানে গিয়েই উঠতে পারলাম না। জুনিয়র থেকে সিনিয়র, পালা করে অনেকেই থাকছেন। জুনিয়রদের উপস্থিতি দেখে উজ্জীবিত বোধ করি বটে, কিন্তু সিনিয়রদের উপস্থিতি দেখলে নিজের অনুপস্থিতির কারণে সত্যিসত্যি অপরাধবোধ জাগে, জাগছেও। সেই অনুভূতির কথাটাই মা-কে বলছিলাম।
আমার মা সারাজীবনই বাবার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর প্রবণতার কারণে ভুক্তভোগী। ইন ফ্যাক্ট, বিবিধ কার্যকলাপের কারণে চাকুরিক্ষেত্রে আমার বিবিধপ্রকার হয়রানি দেখে মা প্রাথমিকভাবে বাবাকেই দোষারোপ করত – শুধু তোমার জন্য ছেলেটা প্রতিবাদী টাইপের হয়ে গেল! (যদিও নিজেকে সেরকম কিছু প্রতিবাদী বলে আমি মনে করি না।) তো সে যা-ই হোক, আমার মা একদিকে যেমন বাঙালি মধ্যবিত্তসুলভ গা-বাঁচানো, সন্তানকে আগলে রাখা ইত্যাদিতে বিশ্বাসী, আবার আরেকদিকে নিজের সেই প্রবণতা নিয়ে হাসিঠাট্টা করতেও সক্ষম।
যেমন, ধর্ণামঞ্চে যেতে না পারার ব্যাপারে আমার সেই আক্ষেপ শুনে সাথেসাথেই মা বলল – না না, যেতে হবে না। যা করার শরীর বুঝে করবি। এই ঠান্ডার মধ্যে রাত জেগে বসে থাকলে…
এটাওটা কথার পর বললাম – ওখানে যারা বসে আছে, তাদের অনেকের বয়স আমার চাইতে দশ-বারো-পনের বছর বেশি। তাদের শরীর খারাপের ভয় নেই? জুনিয়র যারা আছে, তারাও কারও না কারও ছেলে বা মেয়ে – তাদেরও ঠান্ডা লাগে, তাদেরও শরীর খারাপ হয়। আসলে তোমাদের ব্যাপার হলো, অন্যায় হয়েছে, খুব অন্যায়, প্রতিবাদ করা দরকার, খুব খুউব দরকার। শুধু সেই প্রতিবাদের ঝামেলায় নিজের ছেলেটি না জড়ালেই হলো!
এবারে মা হেসে ফেলল।
বলল – তোর কথা শুনে বাবার (মায়ের বাবা, অর্থাৎ আমার দাদু) মুখে শোনা বনমালী গোঁসাইয়ের গল্পটা মনে পড়ে গেল। গল্প নয়, ছোট ঘটনা – কিন্তু সত্যি ঘটনা। স্বাধীনতার আগেকার পূর্ববঙ্গের গল্প। দাদুদের ফেলে আসা ‘দ্যাশ’ বেতিলা-র গল্প।
প্রতিবেশীর জমির বেড়া নিয়ে বনমালী গোঁসাইয়ের মনে প্রবল ক্ষোভ জন্মেছে। চেঁচামেচি শুনে পাড়াশুদ্ধ লোক হাজির। গোঁসাই বলছেন – “দ্যাখসেন? দ্যাখসেন একবার? বলেন, এডা অন্যায় নয়?” কিছু দেখুক বা না দেখুক, এমতাবস্থায় ভিন্নমত হওয়া অসম্ভব – সুতরাং সকলেই হ্যাঁ-হ্যাঁ করে। সম্মিলিত সমর্থনে উৎসাহ পেয়ে গোঁসাই এবারে বলেন – “তাইলে কন, আমাগো কি উচিত না, সক্কলে মিল্যা বেড়াডা ভাইঙ্গা ফ্যালান?” সকলেই হ্যাঁ-হ্যাঁ করে, কিন্তু কেউই যেন প্রথম পা এগোতে চায় না – পরস্পরের মুখ-চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে।
তবে বেড়া ভাঙার ব্যাপারে বাপের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে সবার আগে এগিয়ে যায় গোঁসাইয়ের ছোট ছেলে। অমনি বনমালী গোঁসাই ছেলের হাত টেনে ধরে – “আহ্, সগ্গলের আগে তর আগাইয়া যাওনে কাম কী!”

তো গল্প ছেড়ে আরও একবার কাজের কথাটা মনে করিয়ে দিই। বিচারের দাবিতে ধর্মতলায় লাগাতার অবস্থান-বিক্ষোভ চলছে। অহোরাত্র। দিন-রাতের যেকোনও সময়ই যেতে পারেন। পারলে আসুন।










