৭৮ বছর বয়স হলেও কমলদা ছিলেন অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, কর্মক্ষম, কর্মদ্দীপনায় ভরপুর এক তরুণ তাজা প্রাণ। খালি পায়ে মেঠো পথে জঙ্গলে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কর্ম ব্যস্ততায় ছোটাছুটি করতেন। তিনি কোন শহুরে আদুরে পরিবেশ প্রেমী ছিলেন না, টাটা কোম্পানির বড় চাকরি ছেড়ে এসে ওরকম পশ্চাদপদ অঞ্চলে থেকে সঙ্গীদের সঙ্গে নিয়ে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার বৃক্ষনাথকে লালন পালন করেছিলেন। আদিবাসী শিশুদের জন্য স্কুল নির্মাণ করে তাকে ক্রমশঃ উন্নত করে তুলছিলেন। শিশুদের মধ্যে পৌঁছে দিচ্ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। এর সাথে জৈব চাষে পরীক্ষা নিরীক্ষা, গোপালন, মৎস্য চাষ। স্থানীয় মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য কেন্দ্র। ঈশ্বর মেলা, পলাশ উৎসব … কত কিছু। মায় ভালো পাহাড় কে তো একটা পর্যটন কেন্দ্র বানিয়ে তুলেছিলেন। এর সাথে ছিল তাঁর সাহিত্য চর্চা। একটা সুন্দর লাইব্রেরি তৈরি করেছিলেন।
তাই কমলদার আকস্মিক চলে যাওয়া শুধু গভীর যন্ত্রণাই নয় এক বিরাট শূন্যতা। পরিবেশ আন্দোলনের বিরাট ক্ষতি।কিন্তু এক সময় আমাদের সবাইকে আগে পরে চলে যেতেই হবে। থাকবে কমলদার ওই কাজের নজির। ওই কাজ করতে কমলদাকেও কি কম বাধা ও বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছিল? সবাইকেই কম বেশি হতে হয়। কমলদার মত সেগুলো অতিক্রম করে চলতে হয়।
কমলদা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর সবুজের সমারোহ মহীরূহদের, তাতে বিচরিত অজস্র পাখি পাখালি প্রজাপতি। এছাড়াও কত রকমের দেশি ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোশালা, নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ানো মরাল বাহিনী এবং অবশ্যই তার নিষ্ঠাবান সহযোগী ও ছাত্র ছাত্রীদের।
আর আছে বন্দোয়ানের অপার্থিব নিসর্গ প্রকৃতি, একদম কাছাকাছি বন্দোয়ান ও দলমা পাহাড় – জঙ্গল, ভালো পাহাড়ের কাছ দিয়ে ছলছলাত বয়ে চলা সাত গুরুম নদী, দুয়ারসিনির আদিবাসীদের বর্ণাঢ্য হাট, স্থানীয় সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, বিরহর, শবর, ভূমিজ, মাহাতো প্রকৃতির সন্তানদের।
তাঁদের সবাইকে নিয়ে ভালো পাহাড় ভালো থেকো।
সংক্ষিপ্ত জীবনী:
নীল পাহাড়, সবুজ বন, আদিবাসী বালক – বালিকা আর নিশুতি রাতের জোনাকিদের সাহচর্য ছেড়ে তারাদের দেশে পাড়ি দিলেন কমলদা –
তাঁর বৃক্ষনাথদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টাকে অসমাপ্ত রেখে সুবর্ণরেখার গুণী সন্তান, ‘ টাটা বাবা ‘ প্রমুখ জনপ্রিয় কবিতা ও প্রচুর চমকপ্রদ গদ্যের রচয়িতা, ‘ কৌরব ‘ পত্রিকার প্রাণপুরুষ, একদা ‘ টেলকো ‘ র ইঞ্জিনিয়ার এবং পরবর্তীতে পুরুলিয়ার বন্দোয়ানের লতা অঞ্চলে ঊষরভূমিতে এক লক্ষ ২০ হাজার দেশজ গাছ লালন পালন করে ‘ ভালো পাহাড় ‘ পরিবেশ সামাজিক ও শিক্ষা আন্দোলনের প্রবক্তা শ্রী কমল চক্রবর্তী (১৯৪৬ – ২০২৪) চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
আমরা হারালাম অফুরান শক্তির তরতাজা এক চিরযুবক বন্ধু ও সুহৃদকে।
হাসপাতালে ভর্তির আগে তিলোত্তমার উপর নারকীয় অপরাধের ঘটনায় কমলদার গভীর শোকভারনত প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ:
” ভাবতে ভাবতে বুকে রক্ত জমে যাচ্ছে। ” ১৬ আগষ্ট
” আর কত দিন, আমরা, মেরুদন্ড হীন হয়ে থাকব। জয় বৃক্ষ 🌲 নাথ। ”
১৭ আগষ্ট
কমলদাকে আমাদের প্রণাম ও বিদায়। 🙏🙏











