(এক)
শ্রেণীবিভক্ত সমাজে ‘সরকার’ সবসময়েই রাষ্ট্রযন্ত্রের সেবাদাস ও পাহারাদার। ‘ইউনিয়ন’ সরকার হোক বা ‘রাজ্য’ সরকার।
সরকারি ‘দল’-এ তফাৎ হয়। তার রঙ বদলায়। নেতৃত্ব পাল্টায়। সরকার কিছু আর্থিক ‘ভাতা’ বা ‘ডোল’ দিতেই পারে, কিন্তু কখনোই জনগণের / সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি হতে পারে না। ‘সরকার’ শুধুই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিনিধি ও পাহারাদার; তারা সবসময়েই শোষকশ্রেণীর প্রতিনিধি হিসাবে ভূমিকা পালন করে।
সেইজন্য ‘সরকার’ কখনোই রাষ্ট্রবিরোধী হতে পারে না। কোনও শোষকের টিকিও তারা কখনোই ছুঁতে পারে না। রাষ্ট্রযন্ত্র আর শোষকের ভজনা ও স্তাবকতাই তাদের মূল কাজ। তাই জনগণের শোষক-বিরোধী, শোষণ-বিরোধী যেকোনও প্রতিবাদ-আন্দোলন-সংগ্রামকে শায়েস্তা করার জন্য তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। ধমকানো, চমকানো, গ্রেপ্তার, লাঠি, গুলি… সবই চালায় তারা। সেটাই তাদের ‘সংবিধানসম্মত কাজ’। দল, সরকার, রং, নেতা-নেত্রী ইত্যাদির পরিচয় যা-ই হোক না কেনো।
(দুই)
কিছু মানুষ কী আশ্চর্যজনকভাবে ‘সরকার’ বা সরকারি ‘দল’-এর অন্ধ স্তাবক হয়ে ওঠে! ‘অন্য’ সরকারের আমলে যেকোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন, ‘প্রিয়’ সরকারের শাসনে তারচেয়ে বহুগুণ বেশি অন্যায় হলেও তাঁরা তখন বোবা ও কালা হয়ে থাকেন! সরকারের প্রতিটি অন্যায় যে তাঁর জীবনকেও নানাভাবে প্রভাবিত করে, সেই স্বাভাবিক বোধটুকুও কোথায় যেন হারিয়ে যায় তাঁদের! কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য আর্থিক লাভের আশাও তাঁদের থাকতে পারে। নিরুপদ্রব ও তথাকথিত ‘শান্তিপূর্ণ’ জীবনের আকর্ষণ তাঁদের আত্মস্বার্থকেও যেন ভুলিয়ে-গুলিয়ে দেয়।
নিজের ও পারিবারিক ‘ভালো’ দেখতে গিয়ে, তাঁরা আত্মপ্রবঞ্চনার শিকারে পরিণত হন! সরকারি দল আর নেতা-নেত্রীদের প্রভাবে তাঁরা জনবিরোধী রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়ক শক্তি শুধু না, এমনকি স্তাবক-ও হয়ে ওঠেন। নিজেদের পায়েই তখন কুড়ুল মারতে থাকেন তাঁরা!
(তিন)
‘তৃণমূল কংগ্রেস’ আমলে, সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য ও আইনসঙ্গত পাওনা থেকে বঞ্চিত করার লক্ষ্যে হাইকোর্ট, ডিভিশন বেঞ্চ ইত্যাদির রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে সরকার। সরকারি তহবিল থেকে বিপুল টাকা খরচ করে, সুপ্রীম কোর্টে দৌড়াদৌড়িও করেছে। এই জনবিরোধী কাজের ন্যায্য বিরোধিতা উঠেছে কর্মচারীদের তরফ থেকে। শেষপর্যন্ত সুপ্রীমকোর্টেও হেরেছে সরকার। হেরেছেন পশ্চিমবাংলার দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী মুখ্যমন্ত্রী – তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কিন্তু ‘বামফ্রন্ট’ সরকারের আমলে, সিএমডিএ কর্মচারীদের বঞ্চিত করার জন্য যখন একই পাপ করা হয়েছিলো, তখন আজকের প্রতিবাদী কর্মচারীদের অনেকেই বোবা হয়ে ছিলেন। তাঁরা সেদিন কার্যত সমর্থন করেছিলেন সরকারের জনবিরোধী পদক্ষেপকে। হাইকোর্ট এবং ডিভিশন বেঞ্চের রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, একইভাবে সরকার গিয়ে হাজির হয়েছিলো সুপ্রীমকোর্টে। সরকারি তহবিল থেকে বিপুল টাকার আদ্যশ্রাদ্ধ করে, ‘সিনিয়ার অ্যাডভোকেট’-ও নিয়োগ করেছিলেন কর্মচারীদের বঞ্চিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে। কিন্তু সরকার সেদিনও হেরেছিলো। হেরেছিলেন পশ্চিমবাংলার ‘বামপন্থী’ মুখ্যমন্ত্রী (তথা সিএমডিএ-র চেয়ারম্যান) – সিপিআই (এম) নেতা জ্যোতি বসু।
(চার)
চল্লিশের দশক থেকেই কংগ্রেসী সরকার যখন জনগণের উপর একের পর এক গণহত্যা, হত্যা ও অত্যাচার চালিয়েছে, কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা কখনোই তার প্রতিবাদ করেন নি। ষাটের দশক থেকে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘বামপন্থী’ সরকারের আমলে যখন বারবার গণহত্যা-হত্যা-ধর্ষণ-নিপীড়ন ইত্যাদি ঘটেছে, সরকারের স্তাবক সমর্থকরা কেউই তার প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন নি। বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে যখন ব্যাপক চুরি-জালিয়াতি-ধর্ষণ-খুনের তাণ্ডব চলছে সারা রাজ্য জুড়ে, স্তাবকের দল তখন শুধুই বোবা নয়, বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা অপরাধীদের পক্ষে আর প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় তৎপর। পশ্চিমবাংলার বুকে “সুনার বাংলা” গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ (!) বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে যখন গণহত্যা-দাঙ্গা-খুনখারাপি-ধর্ষণ-ঘৃণার প্লাবন চলছে, হিংসার চাষ চলছে সারা ভারত জুড়ে, বিজেপির ধান্দাবাজ নেতা-নেত্রীরা তখন বোবা-কালা।
তৃণমূলের আমলে যেমন আমরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ‘অভয়া’-র ধর্ষণ ও খুন দেখেছি, ‘বাম’ আমলেও ঘটে যাওয়া সরকারি অফিসার অনীতা দেওয়ানের ধর্ষণ ও খুনের কথাও আমরা ভুলে যাই নি। সাধারণ মানুষ সবক্ষেত্রে ঘেন্নায়-ক্রোধে-ক্ষোভে সরকারকে ধিক্কার দিলেও, শাসকের দলীয় বাহিনী সবসময়েই সরকারের স্তাবকতা করে। তাঁরা যেন প্রতিবাদ করতে ‘ভুলে’ যান!
(পাঁচ)
সোজা কথা, জনবিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকের প্রতি ‘দায়বদ্ধ’ হলে আর শাসিত-শোষিত জনগণের পক্ষে থাকা যায় না। শোষকদের তাঁবেদারি করবো অথচ শোষিতদের ‘পক্ষে’ থাকবো, এটা নির্ভেজাল ভণ্ডামির ‘রাজনীতি’! ধর্ষকদের পক্ষে থাকবো, ধর্ষকদের আড়াল করার এবং বাঁচানোর চেষ্টা চালাবো, আবার ধর্ষিতার পক্ষ নিয়েও ন্যাকামো করবো, এই দ্বিচারিতা শুধুই ঘৃণা পাবার যোগ্য!
বাংলার বুকে শাসকের রূপ ধারাবাহিকভাবে বদলায়, কিন্তু চিকিৎসক সমাজের অভিজ্ঞতা বদলায় না।
ব্রিটিশ শাসনে (সেপ্টেম্বর ১৯১৫), কলকাতায় এবং আশপাশের জেলাগুলোতে সরকারি হাসপাতালের কয়েকশো চিকিৎসকের ধর্মঘট হয়েছিলো সাত দিন; ব্রিটিশ শাসকরা ছিলো উদ্ধত। আজ থেকে বিয়াল্লিশ বছর আগে (১৯৮৩) কলকাতায় জুনিয়ার ডাক্তারদের আন্দোলন করতে হয়েছিলো দ্বিতীয় ‘বামফ্রন্ট’ সরকারের আমলে। প্রধানত “জীবনদায়ী ওষুধ, ব্লাড ব্যাঙ্ক, ইসিজি মেশিন, ২৪ ঘন্টা এক্স-রে” ইত্যাদির মতো জনস্বার্থবাহী দাবিসমূহ নিয়েই এই আন্দোলন শুরু হয়েছিলো। চলেছিলো ছয় মাসেরও বেশি। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু শেষপর্যন্ত ‘মেনে নিয়েছিলেন’ দাবি! কিন্তু ৫০ টাকা ভাতা বৃদ্ধি করলেও, স্বাস্থ্য পরিষেবার দাবিগুলো না মানার কারণে, ১৯৮৭ সালে আবার ৪৩ দিন কর্মবিরতি করতে হয় জুনিয়ার ডাক্তারদের। এসএসকেএম এবং এনআরএস হাসপাতালে তখন আন্দোলনকারী ডাক্তারদের লাঠিপেটা করে পুলিশ; আহত হন ২৮ জন ডাক্তার; সিপিআই(এম) কর্মীরাও পুলিশের সহযোগী ভূমিকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। এবারে ডাক্তারদের কর্মবিরতি হয়েছিলো ১৮-টি সরকারি হাসপাতালে। ডাক্তারদের আন্দোলনকে সরকারপক্ষ ন্যক্কারজনকভাবে “বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন” হিসাবে দেগে দেবার বজ্জাতিপূর্ণ চেষ্টা করলেও, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দাবি ছিলো, “স্বাস্থ্য কোনও ভিক্ষা নয়, স্বাস্থ্য আমার অধিকার।” ২০২৪ সালে সরকারি আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসক ‘অভয়া’-র ধর্ষণ ও খুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রেরই খেসারত। সব অন্যায় ও দুর্নীতি মেনে নিলে তাঁকে আর অত্যাচারিত হতে ও মরতে হতো না। হাজারো মিথ্যা, নোংরামো, ইতরামো, থ্রেট কালচার সত্ত্বেও এই ঐতিহাসিক সত্য কোনোদিনই মিথ্যা হয়ে যাবে না।
১৯১৫ থেকে ২০২৬, ডাক্তারদের তরফ থেকে, অন্যায়কারী সরকারের বিরোধী গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ধারাবাহিকভাবে অমলিন।
(ছয়)
সরকারপক্ষ সবসময়েই ডাক্তারদের জনস্বার্থবাহী ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। কিন্তু সমাজসচেতন ডাক্তাররা চিরকালই জনস্বার্থের মশালবাহী। ব্রিটিশ আমল থেকে কংগ্রেসের সময় হয়ে ‘বামপন্থী’ শাসন কিংবা তৃণমূলী রাজত্ব, একই অভিজ্ঞতা। একটা জ্বলন্ত উদাহরণ দিয়েই লেখাটা শেষ করা যাক।
‘শিলিগুড়ির মহানন্দা-বালাসন সেতু শেষপর্যন্ত তৈরি হয়েছিল জুনিয়ার ডাক্তার এবং ডাক্তারি ছাত্রদের দাবি মেনে। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়ার ডাক্তার এবং ছাত্রেরা সেতুর দাবি তুলেছিলেন সত্তরের দশকে।’ ডেপুটেশন, পথ অবরোধ, ৩৭ জন গ্রেপ্তার, সবকিছুই হয়েছিলো সেসময়ে। আসলে সাধারণ মানুষকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসতে হতো বহু মাইল পথ ঘুরে। তাঁদের স্বার্থেই ছিলো এই আন্দোলন। কলকাতার জুনিয়ার ডাক্তাররাও এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বহু বছর লেগে গেলেও, শেষপর্যন্ত সেতু তৈরি হয়েছে।
সরকারের ধামাধরা কিছু ডাক্তার এবং সরকারের মন্ত্রী-সান্ত্রি-ঠ্যাঙারে বাহিনী চিরকালই আন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। কিন্তু জনস্বার্থরক্ষার জন্য ডাক্তারদের যৌথ সামাজিক চেতনা তাতে শেষ হয়ে যায় না। এটাই সামাজিক শিক্ষা। সরকারি জনবিরোধী বাহিনীর দাপট বনাম জনস্বার্থরক্ষায় চিকিৎসকদের অঙ্গীকার, কার্যত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে শতাধিক বছর যাবৎ। চিকিৎসক ‘অভয়া’র ধর্ষণ ও খুনের ন্যায়বিচারের দাবিতে প্রায় দেড়-বছর যাবৎ চলমান আন্দোলন তারই সমসাময়িক বহিঃপ্রকাশ।
শুধু শারীরিক চিকিৎসা না। এইসব ডাক্তারগণ সামাজিক চিকিৎসার কাজেও অগ্রণী বটে। বঞ্চিত, অবহেলিত, নিপীড়িত বৃহত্তর সমাজের প্রাণঢালা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার জন এঁরা ।।










