নীচের ছবিটি দেখুন। শিল্পী অসিত সাঁই নির্মিত ভাস্কর্যর একটি স্টিল ফটোগ্রাফ এটি।
কী দেখতে পাচ্ছেন? কী মনে হচ্ছে? আপনাদের?
মনে হচ্ছে না যে, এটা ঠিক-ঠিক মানব/মানবীর মুখাবয়ব নয় মোটেই? বরং এটিই কি মনে হচ্ছে না যে, এটা আদতে স্রেফ একটি প্রাণীর মুখ? যার একমাত্র পরিচয় হলো যে তার– প্রাণ আছে। এবং সেই প্রাণের ভয়ে, সে-ই আদরের প্রাণটিকে অকালে হারিয়ে ফেলার ভয়ে সে ভীত? আর্ত? ত্রস্ত? এবং যারপরনাই বিস্মিত?
হ্যাঁ। এমতই তো হওয়ার কথা ছিল। এমনই তো হয়। ঘটে। প্রতিনিয়ত।
হত্যা করা হয় যাকে, হত্যার অব্যবহীত পূর্বে সে মানুষ, কুকুর, বেড়াল, সিংহ অথবা শিলাকান্থ থাকে না আর কোনোমতে মতেই। থাকাটা, বোধকরি সম্ভবও নয়। বরং, তার তাবৎ পরিচয়-সাকিন-ঠিকানা সে ত্যক্ত করে রাখে সেই সময় সন্ধিক্ষণ-এ। এবং তখন তার এক আর একমাত্র পরিচয় রচিত হয় এমত যে, সে একটি প্রাণী। যার প্রাণ আছে। প্রাণ আছে। প্রাণ আছে। আছে প্রাণোচ্ছলতা। আছে প্রতিবাদ, আছে পেগ মেপে মদও; আর আছে প্রেমিক-প্রেম, পিতামাতা-পড়শী, পছন্দের রঙ, পর্দাঘেরা বিছানা, পরিচিত আস্তানা।
এবং সেই প্রাণটিকে অকালে মুচড়ে দিচ্ছে এখন, এই ক্ষণে, দুর্বৃত্তরা। দিচ্ছে–দুমড়িয়ে।
তাই সে… সে বেচারি… ভীত, আর্ত, ত্রস্ত। এবং যুগপৎ বিস্মিত–
আমাকে মারছো কেন? হ্যাঁ? কেন মারছো আমাকে? কী দোষ করেছি আমি? কিছু কি দোষ করেছি আমি? বলো? বলো না! …আচ্ছা আচ্ছা…শোনো…প্লিজ…শুনুন না…এক সেকেন্ড…প্লিজ…মারছেন কেন? কষ্ট হচ্ছে, বড় ব্যথা লাগছে…শু…শুনুন না…আমি আর করব না এরকম, আমি ভালো হয়ে যাবো…আমি আর করব না কিছু…প্লিজ…ব্যথা লাগছে…ওই…শুনুন না…আহঃ… মা গো…আপনিও তো একজন মানুষ বলুন…কেন মারছেন…মা গো…ও মা…বাড়ি যাব…বাধ্য হবো… সব মেনে নেব…কষ্ট হচ্ছে মা…বাবাকে বলো না…একবার যেন টর্চ নিয়ে এদিকে আসে…মা, শুনতে পাচ্ছো…মা! পারছো? শুনতে?
*****
অতঃপর,একটি রক্তিম শূন্যতা রচিত হইল। রচিত হইল, একটি নীলাভ চিরশান্তির বাতাবরণ। নিশ্চুপে এবং একরাশ ঘৃণামোচন করিয়া অসহায়, জীবনমুখী, যন্ত্রণাকাতর মানুষরুপী প্রাণীটি হারাইয়া গেল অসীমতায়। যেমত কীট, যেমত কুক্কুট, যেমত হালাল-হালিম, যেমত মশকী… অথবা আপন মাংসে বৈরী হরিণী।
ব্যাস! হয়ে গেল।
বাবাঃ! বহুত তড়পাচ্ছিল শালী!
কাজ-খতম করে ঘাম মুছে নিলো এবার হন্তা। স্যাঙাৎ আর সাথী সঙ্গীরা গুছিয়ে রাখলো, মুছে রাখলো অপরাধ চিহ্নগুলি। যেন, সীতার ফেলে যাওয়া গহনা অতি সন্তর্পণে সরিয়ে রাখছে কেউ। পথ যেন খুঁজে না পায় রাঘব। প্রিয়ার।
রাম কে? কে বা রাঘব? ভুলে যেতে সময় লাগে? কারো?
হ্যাঁ। বেয়াড়া কিছু জন আছে। যারা মনে রাখে টুকটাক। তা থাকুক। ধুস! ওরা যদি মনেও রাখে কেউ কেউ তবে, আমলা-হামলা-মামলা দিয়ে গুলিয়ে দেবো সবটা। সমস্তকিছু। অথবা উৎসব দেব। দেব অনুদান। দেব–কার্নিভাল। আর ছড়িয়ে দেব ছবি– সমস্ত মাধম্যে। বলবো– এই যে দেখুন ভিড় করেছেন আপনারাই।
অতএব ‘ভিড়’ করেননি যারা তারা ফক্কা।
সিংহাসনে, আপনাদের সমর্থনে, আমিই বসবো আবারো–পাক্কা।
*****
হ্যাঁ মধ্যে যদিও , মিছিল হলো। মধ্যে, মিটিং হলো মিটমিটিয়ে। মধ্যে, লাইভ অর নট টু লাইভ, ‘টিস দ্য কোয়েশ্চেন হলো। কবিতা হলো। গাথা হলো। নিহতজনের পিতা মাতার ক্রন্দন হলো। বিচার, সুপ্রিম… ইত্যাদিও হলো, টুকটাক।
আর সবাই বুঝে গেল– এভাবে কিছু হয় না। “সকলই ফুরায়, ফুচকার প্রায়, পড়ে থাকে–শালপাতা”।
কিন্তু হলো। হ্যাঁ হলো। ওই যে দেখুন রচিত হচ্ছে এক আশ্চর্য লহমা। ওই যে, দেখুন–
বৎসর ত্রিশেক পরে একদা এক ক্লিষ্ট রোগিনী আর একটুকুও হাঁটতে না পেরে হাসপাতাল দুয়ারের সন্নিকটে থপ করে বসে গেলেন–যেখানে, জিরোলেন জমিনে– যেখানে, আর পুনর্বার বাম বাহুতে ভর দিয়ে উত্থিতা হলেন পেট চেপে ধরে –যেইখানে …সে দেশে তখন অন্য সরকার…সেই রাজ্যে তখন অন্য ‘গরমেন্ট’, সেই ফেসবুকে তখন অন্য সব্যসাচী … তখন…সেই তখনই, আচমকা চোখ পড়ল মাথার এক্কেবারে উপরের ছায়াপ্রদানকারী মূর্তিতে।
কাকপক্ষীতে হেগেমুতে একশা করে রেখেছে যেখানে। জং পড়েছে, কলঙ্ক রচিত হয়েছে, ভেঙেও গেছে টুকরো টাকরা অযত্নে । তবুও যেটুকু যা আছে তা, ব্যথা ক্ষণিকের জন্য ভুলিয়ে দিতে পারে সমস্তকে। আর তাই স্বামীর কাঁধ খামচে বলে উঠলো সে, সেই রোগিণী – উফঃ, কী বীভৎস! এ কিসের মূর্তি?জানো?
স্বামীটি উত্তর দিতে পারেননি। তৎক্ষণাৎ।
স্বামী বলবেন সম্ভবত সেই দিনেই কয়েক ঘন্টা পরে– একে মেরে ফেলেছিল জানো? গুগুল করে দেখলাম। এর নাম অভয়া। …এ কী! মেয়ে হয়নি? নাম ভেবে রেখেছিলাম যে আমি কতদিন ধরে! আচ্ছা আচ্ছা বাবা, রাগ করে না, আমাদের ছেলের নাম রাখব আমরা
–অভয়।
“Art should comfort the disturbed and disturb the comfortable”
–
Cesar A. Cruz
সৃষ্টি, ব্যথিতকে আরাম-পশম দেয়, আর আরামপ্রদকে দেয়– অস্বস্তি।










