নমঃশূদ্র ও মতুয়াঃ
মাননীয়া থেকে মাহুয়া, মিডিয়া থেকে মালে নমঃশূদ্র ও মতুয়া একাকার করে ফেলছেন। নমঃশূদ্র হচ্ছে হিন্দু জাত বা বর্ণ ব্যবস্থায় নিম্ন বর্ণের মূলতঃ কৃষিজীবী একটি সম্প্রদায় যাঁরা ভারত সরকারের তফসিলি জাতি (Scheduled Caste or SC) বর্গ ভুক্ত। অবিভক্ত বাংলায় সমগ্র হিন্দু জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি সব চাইতে বেশি সংখ্যক জনসমষ্টি ছিল মাহিষ্য (OBC), নমঃশূদ্র (SC) এবং রাজবংশী (SC)। তাঁরা মূলতঃ ছিলেন গ্রাম কেন্দ্রিক কৃষিজীবী। নমঃশূদ্র ও রাজবংশী রা ছিলেন গরীব ভূমিহীন কৃষক ও অল্প কিছু বর্গা চাষী, কিছু মৎস্যজীবী, নৌকা চালক মাঝি ও গ্রামীণ কারিগর যেমন ছুতোর, ঘরামি ইত্যাদি। মাহিষ্যদের মধ্যে কিছু মধ্য কৃষক ছিলেন।
ব্রিটিশ – ইস্পাহানী সৃষ্ট ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর এবং ব্রিটিশ – কংগ্রেস – মুসলিম লীগ – হিন্দু মহাসভা কৃত রক্তক্ষয়ী সম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং দেশ ও বাংলা ভাগের ফলে এই তিনটি কৃষি ও শ্রমজীবী সম্প্রদায় সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশেষ করে নমঃশূদ্র ও রাজবংশী রা একেবারে পথে বসেন। কারণ নমঃশূদ্রদের মূল বাস ছিল পূর্ববঙ্গের যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, কুমিল্লা, শ্রীহট্ট প্রভৃতি জেলা এবং রাজবংশী রা মূলতঃ বাস করতেন উত্তরবঙ্গের রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, মালদা, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার প্রভৃতি জেলায়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৭১ হয়ে আজকের ২০২৪ – ‘ ২৫, বৈরী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং ইসলামি মৌলবাদী শক্তির কাছে মার খেতে খেতে এদের একটি বড় অংশের মৃত্যু হয়েছে ও হয়ে চলেছে, এদের নারীরা নির্যাতিত ও ধর্ষিত হয়েছেন ও হয়ে চলেছেন, এদের জমি ও সম্পত্তি দখল ও লুঠ হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। এদের একটি অংশ ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন ও হয়ে চলেছেন। অন্য একটি বড় অংশ সব হারিয়ে উদ্বাস্তু (Refugee) হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, আন্দামান, দণ্ডকারণ্য, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড প্রভৃতি রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছেন ও পড়ছেন এবং এখনও এক কোটির বেশি সংখ্যক এরা চরম নির্যাতিত ও অবদমিত হয়ে বাংলাদেশে রয়ে গেছেন। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ, বিহার প্রভৃতি রাজ্যেও আগে থেকেই নমঃশূদ্র সম্প্রদায় রয়েছেন।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের সব জেলাতেই বিশেষ করে নদীয়া, দুই চব্বিশ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান, মালদা প্রভৃতি জেলাতে প্রচুর পরিমাণ নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের বাস যার মোট সংখ্যা হবে তিন কোটির বেশি যা ভোট ব্যাঙ্ক হিসাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের সমতুল্য। তাই সমস্ত ভোটবাজ রাজনৈতিক দলকে দেখা যায় মুসলমান ও নমঃশূদ্র দুটি পশ্চাদপদ বিশাল জনসমষ্টির প্রকৃত উন্নয়ন, উদ্বাস্তুদের মনবেতর অনিশ্চিত জীবন থেকে উদ্ধার না করে, মরিচঝাঁপির মত গণহত্যা ঘটিয়ে, পরিবর্তে এদের সুবিধাবাদী ধর্মীয় নেতাদের নানা সুযোগ সুবিধা ক্ষমতা দিয়ে কাছে টানতে। আর প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির উচ্চবর্ণীয় সুবিধাভোগী নেতাদের এদের নিয়ে রয়ে গেছে অবজ্ঞা অবহেলা ও শ্রেণী ঘৃণা, সুতরাং এদের ভালোমন্দ নিয়ে কোন মাথা ব্যথা নেই কেবল নির্বাচনের সময় ভোট টুকু আদায় করা ছাড়া।
নমঃশূদ্র দের একটি বড় অংশ মতুয়া ধর্মাবলম্বী, কিন্তু সকলে নন। আবার কিছু অন্য নিম্ন বর্গীয় সম্প্রদায়ের একাংশ মতুয়া ধর্মাবলম্বী। তাই মাননীয়া থেকে মালে – এদের সবাইকে প্রথমে জানতে বুঝতে হবে যে সব নমঃশূদ্র মতুয়া নন, আবার সব মতুয়া নমঃশূদ্র নন। অর্থাৎ নমঃশূদ্র সম্প্রদায় এবং মতুয়া ধর্ম এক নয়।
মতুয়া ধর্ম ও সংস্কার আন্দোলনঃ
তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা ডিভিশনের গোপালগঞ্জ জেলা) সফলডাঙ্গা গ্রামে এক গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মী চন্ডাল (অপভ্রংশ চাঁড়াল) কৃষক পরিবারে হরিচাঁদ ঠাকুরের (১৮১২ – ১৮৭৮) জন্ম হয়। জন্মগত নাম হরিদাস বিশ্বাস। পিতামহের ধর্মীয় উপাধি ছিল ঠাকুর। পরবর্তীকালে তাঁর ভক্তরা তাঁকে শ্রীকৃষ্ণের অবতার রূপে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর নামে অভিহিত করেন।
সেইসময় ব্রাহ্মণ্যবাদী জাত ও সামন্ত ব্যবস্থায় নিম্নবর্ণের দরিদ্র চন্ডাল কৃষি ও শ্রমজীবীদের উপর প্রবল শোষণ ও পীড়ন বলবৎ ছিল। তাঁরা অস্পৃশ্য ও জল অচল হিসাবে হিন্দু ধর্ম ও বর্ণ সমাজে অপাংতেও ও সমাজ বহির্ভূত শ্রমদানকারী হিসাবে গণ্য হতেন। অথচ উচ্চবর্ণের খাদ্যের সংস্থান, বর্জ্য পরিষ্কার থেকে যাবতীয় পরিষেবা প্রদান তাঁদের দায়িত্ব কর্তব্য ছিল। ধর্মপ্রাণ প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব হরিচাঁদ এর বিরুদ্ধতা করায় স্থানীয় জমিদার কর্তৃক তাঁর নিজের গ্রাম ওড়াকান্দি থেকে বিতাড়িত হন। এরপর তিনি স্বজাতি চন্ডাল কৃষকদের নিয়ে বৈষ্ণব ভক্তিধর্মের আদলে এক প্রতিবাদী ধর্ম সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। হরি (কৃষ্ণ র অপর নাম) প্রেমে মাতোয়ারা বা মেতে থাকার জন্য এদের মতুয়া বলা হয়। এই কৃষক, মৎস্যজীবী, নৌকা চালক শ্রমজীবী মানুষেরা উদয়াস্ত কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং সন্ধ্যার পর হরিপ্রেমে মাতোয়ারা হয়ে ডঙ্কা, সিংগা ইত্যাদি বাজিয়ে হরিনাম এবং নৃত্য গীত করতেন। প্রধান ধ্বনি ছিল ‘ হরি বলো ‘ ।
তিনি বলেছিলেন অরণ্যে গিয়ে তপস্যার প্রয়োজন নেই। গৃহে থেকে সংসার ধর্ম পালন করে সৎ কর্ম করলে এবং ঈশ্বরে নিবেদিত হলে নির্বাণ সম্ভব। তিনি হাতে কাজ ও মুখে ঈশ্বরের নাম করতে বলেন। বলেন সব মানুষ সমান। মতুয়া ধর্মে নারী সমাদৃত। তিনি হিন্দু ধর্মের মায়ার ধারণাকে নস্যাৎ করেন। পাশাপাশি তিনি ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১২ টি পালনীয় অনুশাসনের কথা বলেন। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে দরিদ্র চন্ডাল রা বর্ণহিন্দু জমিদারদের প্রতিরোধ করতে শুরু করেন। তাঁর প্রবর্তিত এই ধর্ম ও সংস্কার আন্দোলন ক্রমে পার্শ্ববর্তী যশোর, খুলনা, বরিশাল, ঢাকা প্রভৃতি জেলায় চন্ডাল দের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। সেই সময় দুদু মিঞার নেতৃত্বে ফরাজি আন্দোলন মুসলমান কৃষকদেরও সংগঠিত করেছিল। মুচি, মালি, তেলি প্রভৃতি অন্যান্য নিম্নবর্গের বহু মানুষ হরিচাঁদ ঠাকুরের ‘ মতুয়া মহা সংঘে ‘ যোগ দেন।
হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরের (১৮৪৬ – ১৯৩৭) সময় চন্ডাল রা সংগঠিত হয়ে ১৮৭২ থেকে নিজেদের নমঃশূদ্র নাম অর্জন সহ অন্যান্য সামাজিক আন্দোলন জোরদার করেন যার ফলশ্রুতিতে ১৮৯১ এর জনশুনানি র সরকারি নথিতে চন্ডাল সম্প্রদায়ের নমঃশূদ্র নামকরণ নথিভুক্ত হয়। ১৮৭৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে উচ্চবর্ণের অত্যাচারের প্রতিবাদে নমঃশূদ্র রা ধর্মঘট করেন এবং উচ্চবর্ণদের বয়কট করেন। আধুনিক যুগে উপমহাদেশে এটি ই সম্ভবত প্রথম সংগঠিত দলিত প্রতিবাদ। একইসময়ে দেশের অপর প্রান্তে মহারাষ্ট্রে অগ্রজ মহাত্মা জ্যোতিরাও ও সাবিত্রী ফুলে ‘সত্যশোধক সমাজ‘ গড়ে জাতের নামে বজ্জাতির বিরুদ্ধে, শিক্ষা প্রসারে, নারী মুক্তির বিষয়ে, সমাজ সংস্কারে বৈপ্লবিক সংগ্রাম চালাচ্ছিলেন। গুরুচাঁদ স্থানীয় গুরুগৃহে, পাঠশালায় ও মোক্তবে দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন করলেও চন্ডাল পরিবারে জন্মগ্রহণের অপরাধে কোন উচ্চবর্ণ পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্র তে ভর্তি হতে পারলেন না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শিক্ষার্জন ছাড়া অবহেলিত জাতির এগোনো সম্ভব নয় এবং সেটি নিজেদের উদ্যোগেই করতে হবে। তাই তিনি ১৮৮০ থেকে নমঃশূদ্র অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে একের পর এক পাঠশালা ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করলেন। তিনি নমঃশূদ্র সমাজের কাছে আহ্বান জানালেন যে ভিক্ষা করেও ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শেখাতে হবে। নারী শিক্ষা বিস্তারেও তিনি উদ্যোগী হলেন। তাঁর শিক্ষা বিস্তারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষাব্রতী ব্যাপটিস্ট মেডিকেল মিশনারী ডা. সিসিল সিলাস মিড (১৮৬৬ – ১৯৪০) যিনি পূর্ব বাংলার ঐ নমঃশূদ্র অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে ২৯ বছর পরিষেবা দেন। ১৯০৭ এ তাঁরা মিলে একটি ইংরেজি মিডিয়াম উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরে মহাত্মা ভেগাই হালদারের মত নমঃশূদ্র সমাজের অনেকেই শিক্ষা বিস্তারে বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেন।
১৮৮১ তে গুরুচাঁদ ঠাকুর প্রথম নমঃশূদ্র সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন। তিনি নারী উন্নয়নেও ব্রতী হন এবং ১৯০৯ থেকে নমঃশূদ্র সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন করেন। ১৯০৭ এ তাঁর নেতৃত্বে নমঃশূদ্র রা সরকার কে দাবিপত্র দেন যে নমঃশূদ্র দের উচ্চবর্ণের স্বীকৃতি দিতে হবে। এছাড়াও নমঃশূদ্র দের সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। তাঁদের আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার ৩১ টি পেছিয়ে পড়া জাতিকে তফসিলভুক্ত করেন। প্রথমে বাংলা প্রদেশে এই সংরক্ষণ চালু হয়, পরে মন্টেগু – চেমসফোর্ড আইন হয়ে ১৯১৯ থেকে সারা দেশে লাগু হয়।
উদীয়মান দলিত তফসিলি আন্দোলনঃ
বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে পূর্ববঙ্গে ব্রিটিশ সহযোগী রক্তচোষা অনুপস্থিত রাজা, নবাব, জমিদার এবং তাদের অত্যাচারী নায়েব গোমস্তাদের শোষণ পীড়নের বিরুদ্ধে একের পর এক মুসলমান, নমঃশূদ্র, কৈবর্ত, রাজবংশী প্রমুখ দরিদ্র শ্রমজীবী কৃষক দের আন্দোলন ও বিদ্রোহ সংগঠিত হতে থাকে। এই রাজা – নবাব – জমিদার রা ছিলেন বৃটিশ ঔপনিবেশিক এবং জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আশ্রয়ে। লড়াই এর ময়দান থেকে এদের প্রতিস্পর্ধি নেতা ও সংগঠন গড়ে ওঠে ফজলুল হক ও তাঁর ‘কৃষক প্রজা পার্টি‘ এবং যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ও তাঁর ‘বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল সিডিউলড কাস্ট ফেডারেশন‘ এর মধ্য দিয়ে যাঁরা ব্রিটিশ – কংগ্রেস – মুসলিম লিগ – হিন্দু মহাসভার প্রবল বাধা ও গভীর ষড়যন্ত্রের মধ্যেও ৩০ ও ৪০ এর দশকে বঙ্গীয় রাজনীতির প্রধান নিয়ন্তা হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে নমঃশূদ্র সমাজে শিক্ষার আবহে মল্লিক ভ্রাতৃত্রয়, বিরাট মন্ডল দের মত, কৃষক আন্দোলন থেকে রসিক লাল বিশ্বাসের মত নেতাদের আগমন। আবার গুরুচাঁদ ঠাকুরের পুত্র শশীভূষণ ঠাকুরের পুত্র প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর বা পি আর ঠাকুর উচ্চশিক্ষা করে, লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে, ইউরোপ ঘুরে দেশে ফিরে ১৯৩০ থেকে মতুয়া মহাসংঘের ধর্মীয় প্রধান হয়ে গেলেন।
সারা ভারত জুড়েই তখন এক দলিত উত্থান। দক্ষিণের দ্রাবিড় ভুমির কেন্দ্রে পেরিয়ার, ডি রাজা এবং তাঁদের ‘জাস্টিস পার্টি’। কেরলে নারায়ণ গুরু প্রমুখের নেতৃত্বে ভাইকম মন্দির প্রবেশ আন্দোলন সহ বহু চমকপ্রদ কর্মসূচি। পাঞ্জাবে মঙ্গুরাম, মহারাষ্ট্রে শাহু মহারাজ প্রমুখ। উত্তর ও মধ্য ভারতে আদি ধর্ম, রবিদাসিয়া আর সৎনামীরা। আর তাঁদের সবাইকে ছাপিয়ে বাবাসাহেব আম্বেদকর (১৮৯১ – ১৯৫৬), রামচন্দ্র মোরে প্রমুখের নেতৃত্বে বেগার শ্রম, খোটটি প্রথা রদ সহ জোরালো কৃষক আন্দোলন, মাহাদ সত্যাগ্রহের মত সামাজিক জাগরণ, রাজপথে মনুস্মৃতি পোড়ানো, দলিত ও অন্যান্য শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে বিশাল বিশাল সমাবেশ ও ধর্মঘট। লন্ডনের গোল টেবিল বৈঠকে গান্ধীর মত নেতার সঙ্গে পাঞ্জা কষে জয়। বিফল গান্ধী আমরণ অনশন শুরু করলে রণকৌশলগত পশ্চাদপসরণ করে পুনে চুক্তি (১৯৩২)। দলিত মাহার সেনার কাছে অত্যাচারী উচ্চবর্ণের পেশোয়ার পতনের ভীমা কোড়েগাঁও যুদ্ধের (১৮১৮) স্বগৌরব উদযাপন।
অবিভক্ত বাংলায় তখন যোগেন মন্ডল (১৯০৪ – ১৯৬৮) অবিসংবাদী নমঃশূদ্র ও তফসিলি নেতা। বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার মইস্তারকাঠি গ্রামে এক দরিদ্র নৌকার মিস্ত্রি ও বর্গা চাষী পরিবারে তাঁর জন্ম এবং ভয়ংকর বর্ণ হিন্দু শোষণ বৈষম্যের মধ্যে স্বীয় প্রতিভা বলে খুব কষ্ট করে শিক্ষা এবং বরিশাল ও কলকাতা শহরে উচ্চ শিক্ষা, স্নাতক ও আইনের স্নাতক হয়ে বরিশালে ফিরে আইনজীবী হিসাবে নাম। তারপর স্থানীয় রাজনীতি থেকে বৃহৎ রাজনীতিতে পদার্পণ, জনপ্রিয়তা ও সাফল্য। দুবার বিধায়ক, দুবার বাংলা সরকারের মন্ত্রী এবং ৩২ জন তফসিলি বিধায়ক কে নিয়ে বিধানসভায় ব্লক গঠন। ১৯৩৭ এ অনুষ্ঠিত হওয়া প্রথম সর্বভারতীয় নির্বাচনে একমাত্র তফসিলি প্রার্থী হিসাবে সাধারণ কেন্দ্রে কংগ্রেসের দুদে প্রার্থীকে পরাজিত করে জয়লাভ এবং আম্বেদকর কে কংগ্রেসী রা যখন বোম্বাই থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিচ্ছিল না তখন তাঁকে বাংলায় এনে জিতিয়ে ১৯৪৬ এ কনস্টিটিউয়েট এসেম্বলি তে পাঠান। তিনি নেতাজি সুভাষ বসুর আপ্ত সহায়কের কাজ করেন এবং তাঁর নির্দেশে কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন ও সাফাই কর্মীদের নেত্রী সাকিনার নেতৃত্বে দলিত সাফাই কর্মীদের ঐতিহাসিক ধর্মঘটে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রাখেন। গ্রামাঞ্চলে ভূমি সংস্কার, সেচ বিস্তার, বন্যায় দুর্গতদের সাহায্য, শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে হিন্দু মহাসভা ও ইসলামি মৌলবাদী দের সৃষ্ট একাধিক দাঙ্গাকে সহযোগীদের নিয়ে রুখে দেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে নমঃশূদ্র অঞ্চলে প্রতিরোধ করেন।
ব্রিটিশ সাহায্যে গান্ধী – নেহরু – বল্লভভাই প্যাটেল দের কংগ্রেস কিছুতেই শরৎ বসুদের নেতৃত্বাধীন বাংলার কংগ্রেসের সঙ্গে হক সাহেবের কৃষক প্রজা পার্টির সরকার গড়তে এবং জমিদার বিরোধী ফ্লাউড কমিশন সুপারিশ (১৯৩৮) কার্যকর হতে দিলনা। অন্যদিকে যোগেন মন্ডল এর তফসিলি ঐক্যে ফাটল ধরাল মতুয়া প্রধান পি আর ঠাকুর এর নেতৃত্বে ‘ ডিপ্রেশড ক্লাসেস লীগ, বেঙ্গল চ্যাপ্টার ‘ তৈরি করিয়ে যোগেন মন্ডল এর বিরোধিতা করে। যোগেন মন্ডল হরিচাঁদ – গুরুচাঁদ ঠাকুরের অগ্রগণ্য ভূমিকার প্রতি সম্মান জানিয়েও ঠাকুরবাড়ির ধর্ম ও মহাজনী ব্যবসার সমালোচনা করেন। আবার অগ্নি মন্ডলের মত তফসিলি নেতা ও সমাজ সংস্কারক হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত হলেন।
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ, ব্রিটিশ – ইস্পাহানী সৃষ্ট ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ যাতে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ যাদের এক বড় অংশ পূর্ব বাংলার দরিদ্র নমঃশূদ্র কৃষক এবং ব্রিটিশ – কংগ্রেস – মুসলিম লীগ – হিন্দু মহাসভা কর্তৃক রক্তঝরা দাঙ্গা ও দেশ ভাগ সবকিছু ওলটপালট করে দিল। যোগেন মন্ডল দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করে ব্যর্থ হয়ে বৈরী বর্ণ হিন্দু দের পরিবর্তে গ্রামে একই সঙ্গে বসবাসকারী মুসলমানদের স্বভাব মিত্র স্থির করে নিজে পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান ও স্বজাতি নমঃশূদ্র দের থেকে যেতে বলেন। আগেই ব্রিটিশ ভারত সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, এবার পাকিস্থানের মন্ত্রী হন। অচিরেই পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামি মৌলবাদী রাষ্ট্র ও তার সশস্ত্র বাহিনী এবং জামাত – রাজাকার দের হিন্দু এবং নমঃশূদ্র দের উপর আক্রমণ ও অত্যাচার তাঁর মোহ মুক্তি ঘটায়। সব হারিয়ে তিনিও যখন উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে চলে এলেন তখন তিনি চূড়ান্ত অসম্মানিত। উদ্বাস্তুদের কল্যাণে আমৃত্যু কাজ করলেও উদ্বাস্তু আন্দোলন ততদিনে সি পি আই এর নেতৃত্বে বামপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
অন্যদিকে পি আর ঠাকুর সম্প্রদায়িক দাঙ্গার আবহে দেশভাগের সময় বেশ কিছু ভক্তের সঙ্গে ওড়াকান্দি থেকে চব্বিশ পরগনা র গাইঘাটায় এসে নতুন ঠাকুরবাড়ি পত্তন করলেন। কালক্রমে জায়গাটির নাম হল ঠাকুরনগর। তিনি কংগ্রেসে যোগ দিয়ে বিধায়ক এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তফসিলি ও আদিবাসী উন্নয়ন মন্ত্রী হলেন। পরে ১৯৬৪ তে রাজনীতি ছেড়ে আমৃত্যু মতুয়া ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মগুরুর ভূমিকা পালন করে গেলেন।
মতুয়া উত্তরাধিকারঃ
১৯৯০ এ পি.আর. ঠাকুর এর মৃত্যু হলে তাঁর স্ত্রী বীণাপাণি দেবী বা বড়মা ২০১৯ এ তাঁর মৃত্যু অবধি মতুয়া সঙ্ঘের সর্বাধিনায়িকার ভূমিকা পালন করেন। সামগ্রিকভাবে উদ্বাস্তু নমঃশূদ্র সম্প্রদায় এবং মতুয়া ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে একসময় বামপন্থীদের ভালো ভিত্তি ছিল। প্রাক্তন দুবারের বিধায়ক ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের দুবারের মন্ত্রী চারু মিহির সরকার ঠাকুরনগরের অধিবাসী ছিলেন। দীর্ঘসময় বামফ্রন্ট সরকারের স্কুল শিক্ষা মন্ত্রী, সিপিএম এর তফসিলি নেতা এবং পাঁচ বারের বিধায়ক কান্তি বিশ্বাস প্রথম তিনবার ঠাকুরনগরের বিধানসভা আসন গাইঘাটা র বিধায়ক ছিলেন। ফরোয়ার্ড ব্লকের হরিপদ বিশ্বাস একজন অগ্রণী মতুয়া নেতা ছিলেন। সিপিএম এর দাবাং নেতা ও মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী নিজস্ব স্টাইলে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য র শাসনের শেষার্ধে যখন সারা রাজ্যে বামপন্থীদের সাংগঠনিক ও সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে তখন থেকে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া জঙ্গী বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমশ জনসমর্থন অর্জন ও বৃদ্ধি করতে থাকেন। ঐ সময় তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী প্রথমে গাইঘাটা পরে হাবড়ার বিধায়ক এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (বালু) এর মাধ্যমে, যে বালু পরবর্তীতে দুষ্কৃতীরাজ, চোরাচালান, বন ও রেশন দুর্নীতি, সুটিয়া যৌন মাফিয়াদের মদত, প্রতিবাদী বরুণ বিশ্বাস কে হত্যা সহ বহু অভিযোগে অভিযুক্ত এবং কিছুটা সময় শ্রীঘরে কাটিয়ে এসেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বীণাপাণি দেবীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন এবং নানারকম উপহার, সুযোগ সুবিধা ও ক্ষমতা দান, ঠাকুরবাড়ির উন্নতি, চাঁদপাড়ায় কলেজ স্থাপন ইত্যাদি এবং নিজস্ব দক্ষতায় বড়মার আস্থা এবং সেইসঙ্গে মতুয়া ভোট ব্যাংকের একটি বড় অংশ লাভ করেন।
তিনি বড়মা কে বঙ্গ বিভূষণ সম্মাননা দেন এবং তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র কপিল কৃষ্ণ ঠাকুরকে ২০১৪ তে বনগাঁর তৃণমূল সাংসদ ও কনিষ্ঠ পুত্র মঞ্জুল কৃষ্ণ ঠাকুরকে ২০১১ তে গাইঘাটার তৃণমূল বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী করেন। ২০১৪ তেই কপিল কৃষ্ণের মৃত্যু হলে উপনির্বাচনে তাঁর স্ত্রী মমতাবালা ঠাকুর কে ২০১৫ তে তৃণমূল সাংসদ করেন। বড়মার বার্ধক্যের কারণে পরম্পরা, ক্ষমতা ও ঠাকুরবাড়ির কর্তৃত্ব নিয়ে তাঁর দুই পুত্রের পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ২০১৪ তে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর মঞ্জুল কৃষ্ণ কিছুদিন বিজেপিতে গিয়ে আবার তৃণমূলে ফিরে এসে আবার ২০১৫ তে তৃণমুল থেকে বিজেপিতে যোগ দেন। বিনিময়ে তাঁর বড় পুত্র সুব্রত ঠাকুর কে বিজেপি ২০২১ এ গাইঘাটা বিধায়ক কেন্দ্রে এবং ছোট পুত্র শান্তনু ঠাকুরকে ২০১৯ ও ২০২৪ এ বনগাঁর সাংসদ কেন্দ্রে প্রার্থী করে এবং উভয়েই জয়লাভ করেন। শান্তনু কে বিজেপি কেন্দ্রের জাহাজ প্রতিমন্ত্রী করে। ২০১৯ এ বনগাঁ সাংসদ কেন্দ্রে মমতাবালা ঠাকুর পরাজিত হলে তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৪ এ রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ এবং তাঁর কন্যা মধুপর্না ঠাকুর কে ২০২৪ এই বাগদা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তৃণমুল বিধায়ক নির্বাচিত করেন। বড়মার মৃত্যুর পর ঠাকুরবাড়ির ক্ষমতা দখল নিয়ে মমতাবালা (তৃণমুল) – শান্তনু (বিজেপি) পরিবারের দুই তরফের বিবাদ বেড়েই চলে। সম্প্রতি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কারণে ছোট তরফের দুই ভাই সুব্রত ও শান্তনুর, দুজনেই বিজেপির জন প্রতিনিধি, মধ্যে তীব্র বিবাদ শুরু হয়। শান্তনুর ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে সুব্রত ও মমতাবালা এবং মঞ্জুলের স্ত্রী একত্রিত হন। একদা নমঃশূদ্র ও নিম্নবর্গীয় কৃষক সমাজে গুরুত্বপুর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের প্রবক্তা হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের বংশধররা লোভ ও ক্ষমতা দর্পে অধঃপতিত হয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ চালিয়ে সমগ্র সম্প্রদায়ের ক্ষতি এবং অসম্মান করে চলেছেন। ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন থেকে ধর্ম ও রাজনৈতিক ব্যবসায় বিচ্যুতি র ক্ষেত্রে এটিই হয়তো স্বাভাবিক পরিণতি ছিল।
মাহুয়া:
অসমের কাছাড় এর লাবাকে জন্ম, কনভেন্ট স্কুলে শিক্ষা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা, বিদেশে কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত, পরে ২০০৯ এ ভারতে ফিরে কংগ্রেসে যোগদান, আবার তার পরের বছরেই তৃণমূলে যোগদান, ২০১৬ তে নদীয়ার করিমপুর থেকে নির্বাচিত বিধায়ক এবং ২০১৯ ও ২০২৪ এ নদীয়ার ই কৃষ্ণনগর কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত সাংসদ, ধনী ব্রাহ্মণ কন্যা মহুয়া মৈত্র কে রাজধানীর মিডিয়া মাহুয়া সম্বোধন করে থাকে। সিলেটি দ্রুত কথা বলার পদ্ধতিতে চোস্ত ইংরেজি বলে, সংসদে মোদি – আদানি ‘দুষ্ট চক্রের’ বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে এবং আধুনিক নারীবাদী আচরণে তিনি যেমন একদিকে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তেমনি হিন্দু দেবদেবীদের ও খাদ্যাভাস সম্পর্কে বিতর্কিত বক্তব্য; বাবুল সুপ্রিয়, নিশিকান্ত দুবে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ সহ – সাংসদ দের সঙ্গে প্রবল বিবাদ; প্রাক্তন পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে বিবাদ ও মামলা; হিরাচন্দানি শিল্প গোষ্ঠীর অবৈধ সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ; ধনী আইনজীবী ও উড়িষ্যার প্রাক্তন বিজেডি সাংসদ কে দ্বিতীয়বার বিবাহ করে ‘মা মাটির মানুষের’ এই সাংসদের বিলাসবহুল ভ্রমণ, বল নৃত্য ও জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠানের ছবি সমাজমাধ্যমে প্রকাশ ইত্যাদি ঘটনায় বারবার সমালোচিত হয়েছেন, এমনকি একবার সংসদ থেকে নির্বাসিতও হয়েছেন।
সেই তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ কর্তৃত্ব ও উদ্ধত ভঙ্গিতে নমঃশূদ্র সম্প্রদায় এবং মতুয়া ধর্মাবলম্বীদের একাকার করে আক্রমণাত্বক, অসাংবিধানিক ও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাত্যাভিমানী বক্তব্য রাখেন বনগাঁর একটি সভায়। তিনি প্রকাশ্যে নির্দেশ দেন সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে হলে শাসক তৃণমূল কেই ভোট দিতে হবে। মতুয়া দের গলায় ধারণ করা ধর্মীয় তুলসীমালা নিয়েও আপত্তিকর মন্তব্য করেন। স্বাভাবিকভাবে শান্তনু ঠাকুর, শুভেন্দু অধিকারী দের নেতৃত্বে বিজেপি প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করেন ঠাকুরবাড়ির প্রতিনিধি তৃণমুল সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর এবং তাঁর অধীনস্থ মতুয়া মহাসংঘের অংশ।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়েছে একদা বাঁকুড়া, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, হুগলী, জলপাইগুড়িতে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রাজ্যজুড়ে ভালো সংগঠন থাকা, ইদানিং মধ্য কলকাতায় সিপিএমের সঙ্গে কিছু নির্বিষ মিছিল ও প্রেস বিজ্ঞপ্তি ছাড়া প্রায় নিষ্ক্রিয়; বোগটুই গণহত্যা, চিটফান্ড নিয়োগ রেশন শিক্ষা স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি, প্রতিবেশী বাংলাদেশে প্রতিবাদী বিরোধী ও হিন্দুদের নিধন, সন্দেশখালির জমি লুঠ, সামসেরগঞ্জ দাঙ্গা, উপর্যুপরি বোমা বিস্ফোরণ ও আইন শৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অভাব, তিলোত্তমা সহ নারী নির্যাতন ও হত্যা, তৃণমুল নেতাদের দুর্নীতিতে যোগ্য শিক্ষকদের চাকরি চলে যাওয়া, শিক্ষা গণপরিবহন ইত্যাদি ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া প্রভৃতি রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ইসুগুলিতে প্রায় নীরব এবং প্রতিটি নির্বাচনে কার্যত তৃণমূল কে ঘুরপথে সমর্থন করা রাজ্যে বর্তমানে দুর্বল শক্তি সিপিআইএমএল লিবারেশন বা ভাকপা মালের এই প্রসঙ্গে তৎপর প্রতিক্রিয়া।
মালে:
১৯২০ তে সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্গত উজবেকিস্তানের তাসখন্দ এ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯২৫ এ ভারতের মাটিতে সংযুক্ত প্রদেশের কানপুরে আত্মপ্রকাশ করা ভারতের কমিউনিস্ট দলের রয়েছে দীর্ঘ জটিল সংগ্রাম ও পশ্চাদপসরণ, সাফল্য ও ব্যর্থতা, ত্যাগ ও সমঝোতা, জয় ও বিপর্যয়ের বিসর্পিল ইতিহাস। তেভাগা, তেলেঙ্গানা, কায়ুর, পুন্নাপ্রা ভায়লার, শোলাপুর প্রভৃতি কৃষক ও শ্রমিক সংগ্রামের গৌরবজনক ইতিহাসের পর বড় জলবিভাজিকা ১৯৬২ এর সংশোধনবাদী সিপিআই ও বিপ্লবী সিপিএম এর মধ্যে পার্টি ভাগ এবং ১৯৬৭ এর নকশালবাড়ি ও ১৯৬৯ এর শ্রীকাকুলামের কৃষক সংগ্রাম। নকশালবাড়ি ঘটনার পর সিপিএম দলের একটি বড় অংশ বেরিয়ে এসে ১৯৬৭ – ৬৮ তে এ ‘আই সি সি সি আর’ গঠন ও ঐক্য প্রক্রিয়া চালিয়ে ১৯৬৯ এ চারু মজুমদার এর নেতৃত্বে কানু সান্যাল, সুশীতল রায় চৌধুরী, সরোজ দত্ত, সৌরীন বসু, সুনীতি ঘোষ প্রমুখ রা বিপ্লবী সিপিআইএমএল দল গঠন করে পশ্চিমবঙ্গ ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন। এআইসিসিসিআর এ কানাই চট্টোপাধ্যায় ও অমূল্য সেনের নেতৃত্বাধীন ‘এম সি সি’ থাকে না, আবার সেখানে থাকলেও প্রমোদ সেনগুপ্ত, পরিমল দাশগুপ্ত, নাগি রেড্ডি, ডি ভি রাও, কোল্লা ভেঙ্কাইয়া প্রমুখ রা সিপিআইএমএল এ যোগ দেন না। ১৯৭২ এর মধ্যে নকশাল আন্দোলন তাঁর নিজস্ব দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রের প্রবল দমন পীড়নের অভিঘাতে কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। প্রায় সমস্ত নেতা সহ শত শত কর্মী শহীদ হন, বাকিরা কারাবন্দী। চারু মজুমদার এর সঙ্গে দেখা করে জগদীশ মাহাতো, রামেশ্বর অহির, রাম নরেশ রাম দের নিয়ে বিহারের ভোজপুরের একোয়ারি গ্রামে যে নকশাল আন্দোলন শুরু করেন সেটিও প্রবল রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের মধ্যে পড়ে। মাহাতো, অহির অন্যান্য দলিত ভূমিহীন কৃষক যোদ্ধাদের সঙ্গে শহীদ হন।
এই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সত্যনারায়ণ সিং, শর্মা, মহাদেব মুখার্জি কতিপয় নেতা যে উদ্যোগ গুলি নিচ্ছিলেন সেগুলি খুবই সংকীর্ণ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, বিতর্কিত ছিল। বরং চন্দ্র পুল্লা রেড্ডি রা অন্ধ্রে তুলনামূলক সফল উদ্যোগ নেন। সেই সময় মধ্য বিহার সমতলের লেলিহান ক্ষেতখামার থেকে সংবাদের শিরোনামে আসে সুব্রত দত্তের (জওহর) নেতৃত্বে দলিত ভূমিহীন ক্ষেতমজুরদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র স্কোয়াড গুলির উচ্চবর্ণের জমিদার – মহন্ত দের প্রাইভেট আর্মি ও বিহার মিলিটারি পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সাফল্য। এই কৃষক সংগ্রামের উপর দাঁড়িয়ে জওহর, বিনোদ মিশ্র (দিলীপ) ও স্বদেশ ভট্টাচার্য (রঘু) ১৯৭৪ এ কেন্দ্র কমিটি পুনর্গঠিত করে পার্টিকে সংগঠিত করেন। পূর্ব উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে নতুন করে সশস্ত্র কৃষক সংগ্রামের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭৫ এ জওহর শহীদ হলে মিশ্র সাধারণ সম্পাদক হন এবং ১৯৭০ এর অবিভক্ত পার্টির প্রথম পার্টি কংগ্রেস কে সম্মান জানিয়ে ১৯৭৬ এ গয়া য় দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত করে পার্টিকে সংহত ও ১৯৭৮ এ দিল্লিতে সর্বভারতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে পার্টি জুড়ে শুদ্ধিকরণ আন্দোলন শুরু করেন। ততদিনে জয়প্রকাশ নারায়ণ এর নেতৃত্বে দেশ জোড়া প্রবল গণ আন্দোলনের অভিঘাতে ইন্দিরা স্বৈরতন্ত্র ও জরুরি অবস্থার অবসান হয়েছে। এতদসত্বেও তাঁদের পার্টি কাঠামো ছিল সম্পূর্ণ গোপন এবং বিভিন্ন রাজ্যে সশস্ত্র কৃষক প্রতিরোধ সংগ্রাম ই ছিল মূল কর্মকাণ্ড।
১৯৮১ তে কোডারমায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় পার্টি কংগ্রেসের পর পার্টি গণ সংগ্রাম ও গণ সংগঠনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৮২ তে দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়ান পিপলস ফ্রন্ট‘ গড়ে উঠে সর্বভারতীয় পরিচিতি পায়। ওড়িশার নাগভূষণ পটনায়েক, অন্ধ্রের বঙ্গার রাও, অসমের অনিল বড়ুয়া প্রমুখ অভিজ্ঞ নেতৃত্ব যুক্ত হন। দত্তসামন্ত, শঙ্কর গুহ নিয়োগী, এ কে রায়, মেধা পাটেকর প্রমুখ বিশিষ্ট নেতানেত্রী, উত্তরাখণ্ড সংঘর্ষ মোর্চা প্রভৃতি সংগঠন আই পি এফের কাছাকাছি আসে। অন্যদিকে ধূর্যটি বক্সি, জয়ন্ত গাঙ্গুলি, স্বপন মুখার্জি, ব্রজ বিহারী পাণ্ডে, গণেশন, শ্রীলতা স্বামীনাথন, অশোক কুমার প্রমুখ অসাধারণ সব সংগঠকরা পাঞ্জাব থেকে তামিলনাড়ু, দিল্লি – উত্তর প্রদেশ থেকে কেরল, মহারাষ্ট্র থেকে ত্রিপুরা; রেল, ডিফেন্স, ব্যাংক প্রভৃতি সেক্টরে পার্টির বিস্তার ঘটান। রুহুল শর্মা, অখিলেন্দ্র প্রতাপ সিং, কুমুদিনী পতি, শিবরামন, শঙ্কর প্রমুখ এক ঝাঁক প্রতিশ্রুতিবান তরুণ নেতৃত্ব উঠে আসেন। শ্রমিক, মহিলা, যুব, ছাত্র, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক বিভিন্ন শাখা সংগঠন গড়ে ওঠে। গোরখ পাণ্ডে, মহেশ্বর প্রমুখ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সমাবেশিত হন। পশ্চিমবঙ্গেও ভোলানাথ শিট, অরিজিৎ মিত্র, সনৎ রায়চৌধুরী, বিমান বিশ্বাস, সুবোধ অধিকারী প্রমুখ জনপ্রিয় বিপ্লবী কৃষক ও গণ নেতার নেতৃত্বে সংগঠন এগিয়ে যায় এবং পঞ্চায়েত স্তরে বেশ কিছু আসন জয়লাভ করে। হিন্দি ও ইংরাজি কেন্দ্রীয় মুখপত্র, বিভিন্ন রাজ্য মুখপত্র এবং গণ সংগঠন গুলির মুখপত্র নিয়মিত প্রকাশ হতে থাকে। নেপাল পার্টির সঙ্গে সংহতি বাড়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিনোদ মিশ্র ও স্বদেশ ভট্টাচার্য চিন সফর করেন।
বিভিন্ন প্রাইভেট আর্মি, পুলিশ এর ঘেরাও দমনের বিরুদ্ধে শোষিত নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে একাত্ম থেকে প্রবল সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিহারের গণভিত্তি বজায় থাকে। ১৯৮৯ এ আরা কেন্দ্র থেকে আই পি এফ এর রামেশ্বর প্রসাদ সাংসদ এবং বিহার বিধানসভায় সাতটি আসনে আই পি এফ প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। অসমের কারবি আংলং এ স্বায়ত্বশাসিত বোর্ড, পাঁচ জন বিধায়ক এবং ডাঃ জয়ন্ত রংপি সাংসদ নির্বাচিত হন ‘এ এস ডি সি‘ সংগঠনের তরফে। ছাত্র সংগঠন ‘এ আই এস এ’ দিল্লির জে এন ইউ এর সংসদে বিজয়ী হয়। ১৯৯০ এর কলকাতায় অনুষ্ঠিত পঞ্চম কংগ্রেসে পার্টি গোপন থেকে প্রকাশ্যে আসে। ২০২৩ অবধি পার্টি ১১ টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত করে। পার্টির ইংরেজি মুখপত্র ‘লিবারেশন’ এর নামে পার্টির পরিচিতি হয় সিপিআইএমএল লিবারেশন নামে। হিন্দি বলয়ে ভাকপা মালে বা মালে। ১৯৯৮ তে বিনোদ মিশ্র র মৃত্যুর পর দীপঙ্কর ভট্টাচার্য দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। লালু প্রসাদ যাদব এর সরকার ও আর জে ডি দল পার্টির যাদব সহ গণভিত্তিতে যে আঘাত করেছিল দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে তার পুনরুদ্ধার ঘটিয়ে ২০২০ এর বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ১৯ টি আসনে দাঁড়িয়ে ১২ টি আসন, ২০২৪ লোকসভায় বিহার থেকে চারটি আসনে দাঁড়িয়ে দুটিতে জয় এবং ঐ বছরেই ঝাড়খন্ড বিধানসভা আসনে চারটিতে দাঁড়িয়ে দুটিতে জয়। মহারাষ্ট্রের ‘লাল নিশান পার্টি‘ এবং ঝাড়খন্ডের ‘মারক্সিস্ট কো অরডিনেশন কমিটি‘ লিবারেশনে সংযুক্ত হয়। বর্তমানে লিবারেশন বা মালে বিজেপি বিরোধী জাতীয় স্তরের ‘ইন্ডিয়া‘ জোটের শরিক।
সারা বিশ্বে যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ মার্কিনের নেতৃত্বে ভয়াবহ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন; সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গুলি যখন সংকটে অথবা বিচ্যুত; ভারতে সাবেকি বামরা যখন কেরল ব্যতিরেকে প্রায় অস্তিত্বহীন; সীতারামাইয়া, সত্যমূর্তি, আপ্পাল্লাসুরি দের প্রতিষ্ঠিত একদা গণভিত্তি সম্পন্ন সিপিআইএমএল পিপলস্ ওয়ার, পরে সিপিআই মাওবাদী, হয়ে শক্তিশালী সামরিক ও নৈরাজ্যবাদী অনুশীলন চালিয়ে যখন প্রবল ধাক্কার মুখে; কেন্দ্র ও রাজ্যে একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজি লালিত ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী এবং লুম্পেন দুর্বৃত্ত সরকার আসীন হয়ে দেশের যাবতীয় সম্পদ, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, সামাজিক কাঠামো, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে লুঠ ও ধ্বংস করে চলেছে; তখন পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, উত্তর প্রদেশ, পুরোনো কাজের জায়গাগুলিতে অবনমন ঘটলেও মালের নেতৃত্বে বিহারের বীর কৃষক যোদ্ধাদের ৫৫ বছর ধরে ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং সাফল্য ভারতীয় জনগণের কাছে আশা র আলো।
নিশ্চয় মালে তাঁর বিচার বিবেচনায় প্রতিটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে হস্তক্ষেপ করবে। অবশ্যই অসহায় উদ্বাস্তু, বঞ্চিত তফসিলি ও জনজাতি সম্প্রদায়, বৈষম্য পীড়িত নারী, নিপীড়িত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু সেটি যেন biased ও selective এবং কেবলমাত্র ভোট কেন্দ্রিক না হয়। আপনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর দুর্গা ও ছট পুজো সহ বিভিন্ন পুজো, কার্নিভাল, ঈদ ইত্যাদি নিয়ে মাতামাতি নিয়ে কিছু বলবেন না, বন্যাদুর্গত হাজারো সমস্যায় দীর্ণ পশ্চিমবঙ্গের কোষাগার থেকে দুর্মূল্য শত শত কোটি টাকা দিয়ে পুজোয় ক্লাবগুলিকে অনুদান নিয়ে টু শব্দ করবেন না, সরকারি কর্মচারীদের ডি এ বঞ্চিত করে দীঘায় কোষাগার উজাড় করে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ এবং সরকারি ব্যয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাড়ি বাড়ি প্রসাদ বিতরণ নিয়ে প্রতিবাদ করবেন না, প্রতিবেশী বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মস্থান ধ্বংসে নিশ্চুপ থাকবেন; কেবল পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ও মতুয়া ভোট ব্যাঙ্ক এর ক্ষেত্রে ধর্মীয় আঘাত নিয়ে বলবেন; সেটি যেমন নীতিনিষ্ঠ নয় অন্যদিকে যুক্তিপূর্ণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যও নয়। এই ধরণের অনুশীলন সিপিএম এতদিন করে গেছে যা নিজেদের কার্যত দুর্বল করে হিন্দু ও মুসলমান দু তরফের মৌলবাদীদের সমাজে বিষ ছড়াতে এবং বিজেপি ও তৃণমূলের বাড়বাড়ন্ত র সুবিধা করে দিয়েছে।










