২২ ডিসেম্বর, ২০২৫
সেক্যুলারিজম মানে ধর্মহীনতা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতা। একে অন্যের ধর্মকে শুধু সহন নয়, সম্মান করার মানসিকতা৷ এ হল ভারতীয় নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার যে প্রতিবেশী অন্য ধর্মের মানুষ হলেও তাঁরা পরস্পরের ধর্মকে সম্মান করবেন৷ এর বাইরে কিছু ভারতে সম্ভব বলে মনে করি না৷
কাল যাদবপুর কফি হাউসের সামনে একটি মৈত্রী সভার আয়োজন করা হয়েছে রাতদখল ঐক্যমঞ্চ থেকে। তার পোস্টার হোয়াটস্যাপে শেয়ার করছি যখন, তখন বাজারে বাংলাদেশে হিন্দু হত্যার সঙ্গে সঙ্গে লগ্নজিতার গানের অধিকারে মেহবুব মল্লিকের কুৎসিত হস্তক্ষেপের খবর ভাসছে৷ আমাদের পোস্টারে লেখা আছে, ‘বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই সংখ্যালঘুর উপর দানবীয় অত্যাচারের প্রতিবাদে…’ ইত্যাদি। তাই কিছু রিবাটাল পেলাম।
যেমন,
১) “ভারতে আবার সংখ্যালঘু নির্যাতন কী? চা চা প্যাটিস প্যাটিস?”
২) “কে সংখ্যালঘু ভারতে? জৈন? বৌদ্ধ?” (অর্থাৎ মুসলমানরা নন)
এঁরা কেউ বিজেপি করেন না, যদ্দূর জানি। কিন্তু যথারীতি ঘৃণার রাজনীতির জবাবে এঁদের ঘৃণাই আসছে মাথায়, মুখে, কলমে, কীপ্যাডে।
তাঁদের সংক্ষিপ্ত উত্তরে মনে করালাম আখলাক, আফরাজুল, কাঠুয়া থেকে সাম্প্রতিক বিহারে মুসলিম ব্যবসায়ীকে হত্যার কথা।
আবার এটাও ঠিক যে আমার বন্ধুদের যে দীপু দাসের মৃত্যু নিয়ে সরব হতে দেখছি, এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশে নৃশংস হিন্দুহত্যা এই প্রথম ঘটল। এই প্রবণতা শুধু গত জুলাই-পরবর্তী সময়েরও নয়। হাসিনার আমলেও নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যা হয়েছে। ইউএন-এ রিপোর্ট জমা পড়েছে হাসিনার আমলেই। খানিক নীরবতা ছিলই প্রগতিশীল মহলে।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি, এবং এটা আগেও বলেছি যে, এই ইস্যুটিকে না দেখার ভান করলেই বরং বিজেপি নিজের মতো ন্যারেটিভ তৈরি করার সুযোগ পায়৷ এই ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা করলেই বরং ‘সংখ্যালঘুত্বের ভিক্টিমহুডের’ তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করা যায়, ‘হিন্দু ভিক্টিমহুডের’ বদলে। কার্পেটের তলায় চালান করাটা রাস্তা নয়। রাস্তা হল স্বীকার, আলোচনা ও উত্তরণ।
আমাদের রাজ্যে তৃণমূল সরকার তোষণের রাজনীতি করে। তাদের হিন্দু ধর্ম বা ইসলাম কোনো কিছু সম্পর্কেই বোঝাপড়া নেই। তাই মেহবুব মল্লিকের মতো চরিত্ররা এদের দলে শোভা পায়৷ মেহবুব মল্লিক ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি ততটাই অশ্রদ্ধাশীল, যতটা অমিত শাহ।
একজন ভারতীয় হিসেবে আমরা অবশ্যই হিন্দু হতে পারি, মুসলমান হতে পারি। কিন্তু একজন ভারতীয়র শুধুই হিন্দু, কেবল মুসলমান মনে হয় হওয়া সমীচিন নয়। মনুস্মৃতি মানা ব্রাহ্মণকে সাংবিধানিক কারণে গায়ে পড়ে অসম্মান করব না। কিন্তু ওটুকুই, তাঁকে ভারতীয়ত্বের ধারক মানব না। তেমনই ভিনদেশের সংগীত বিরোধী ফতোয়া মানা, মূর্তিপূজাবিরোধী ফতোয়া প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া মুসলমান মানুষকে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব হিসেবে সহন করব৷ কিন্তু কোনো ফতোয়া এদেশে লাগু করার বিপক্ষে থাকব।
সম্মান করব নজরুলকে, বড়ে গুলাম আলি খাঁকে। বিসমিল্লা খাঁকে, যাঁর বেনারসের বাড়ি ভাঙা পড়েছে বিজেপি সরকারের বেনারস নবীকরণের অভিযানে। এতে যদি বলা হয় ‘প্রো-হিন্দু মুসলমানই ভাল মুসলমান’-এই তত্ত্বে আমি বিশ্বাসী, তাহলে আমি অপারগ৷ আমি ভারতীয়ত্ব বলতে এই সংকরায়ণ, এই জগাখিচুড়িটাই বুঝি। এই সংকরায়িত সংস্কৃতির আনাচে-কানাচে ধর্মজাত ভাষা, নৃত্য, গান, কলা এমনভাবে মিশে আছে যে তাকে আলাদা করার কথা ভাবা অসম্ভব। তা ভারতীয়ত্ব হরণের সামিল হবে।
আশার কথা যে আমাদের কর্মসূচী শুধু নয়, কলকাতায় বেশ কিছু বাম ও প্রগতিশীল মহল কাল বাংলাদেশ ও ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা একসঙ্গে বলবেন।











বা! তবে আমি সেক্যুলারিজম-এর বাংলা হিসেবে #ধর্মনির্লিপ্ততা পরিভাষা ব্যবহার করি