দৃশ্য -১
ভদ্রলোককে দেখে চিনতেই পারিনি। মাথাভর্তি পাকা চুল, পাকা ভ্রূ, চোখের চারদিকের কোঁচকানো চামড়া, অথচ এমন দৃপ্ত ভঙ্গিমায় আমার চেম্বারে প্রবেশ আমাকে ক্ষণিকের জন্য বিহ্বল করে দিয়েছিল।
সম্বিত ফিরল রোগীর ফাইলের দিকে চোখ পড়তে। আমারই পুরনো রোগী। না, ঠিক তত পুরনো নয়। মাত্র চার মাস আগে মেরুদন্ডে মাইক্রোসার্জারী অপারেশন করেছি ভদ্রলোকের। বিরাশী বছর বয়স। অ্যাজমা। ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে না যদিও।
চারমাস আগে আমার চেম্বারে ছেলে আর বৌমা নিয়ে এসেছিল ধরাধরি করে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলন। পা ভারী। কোমরে প্রবল ব্যথা। এক্সরে, এমারাই- দুটোতেই বেশ খারাপ অবস্থা। তারপর সব বড় পত্রিকায় যেমন করে লেখা হয়- বাইপাসের ধারের বেসরকারি হাসপাতালে- আমার যত্নে ভর্তি। অ্যাজমার জন্য বক্ষ বিশেষজ্ঞের পরামর্শে অপারেশন তিনদিন পেছতে হয়েছিল। তারপর স্বাভাবিক অপারেশন এবং দুদিন বাদে বাড়ি।
‘আবার কি হল?’ আমি বললাম।
‘ডাক্তারবাবু আমাকে বাঁচান!’
ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘আবার কোমরে ব্যথা?’
‘না না, কোমর, পা একদম ঠিক আছে।’
‘তাহলে?’
‘ঘাড়ে আর ডান হাতে প্রচন্ড ব্যথা। হাত মোটে তুলতে পারছি না।’ ভদ্রলোক প্রায় কাঁদো কাঁদো।
‘এমন কিছু একটা করুন যেন আমি এক্ষুণি আবার আগের মত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারি।’
‘তার মানে আপনি চটজলদি রেজাল্ট চাইছেন তাই তো?’
‘হ্যাঁ’
‘সেটাই আমাদের টার্গেট। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ সম্ভব হবে না। কারণ, আপনি অ্যাজমাটিক এবং বয়সটাও একটু হয়েছে। ব্যথার ওষুধ অনেক ভেবেচিন্তে দিতে হবে।’
‘তাহলে আমাকে রিলিফ দিতে পারবেন না?’
‘মনে আছে, আপনার অপারেশন পেছতে হয়েছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘তারপরেও পুরো অজ্ঞান করা যায় নি। বহু কষ্টে লোকাল অ্যানাস্থেসিয়ায় মেরুদন্ডে অপারেশন করতে হয়েছিল!’
‘আচ্ছা, ওই কোমরে অপারেশনের জন্য আমার ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছে না তো?’
‘কোমরে অপারেশনের জন্যে? তাও এতদিন বাদে? কেন আপনার কোমরে বা পায়ে কি ব্যথা রয়ে গেছে?’
‘একটুও না।’
‘ঘা শুকোয় নি? পায়ের অবশ ভাব, কমজোরী ভাব কি রয়ে গেছে?’
‘কিচ্ছু নেই। অপারেশনের পরেই আমার কোমর, পা একেবারে ঠিক হয়ে গেছে। সেই জন্যই তো আহিরীটোলা থেকে একা একা আবার আপনার চেম্বারে ছুটে এসেছি।’
‘তাহলে আপনার কেন মনে হল যে, কোমরে সার্জারির জন্য আপনার ঘাড়ে ব্যথা হচ্ছে?’
‘না, মানে সবাই বলে তো স্পাইন সার্জারি করালে কমপ্লিকেশন হয়।অপারেশনের রোগীরা বিছানায় পড়ে যায়। ’
‘আপনি বিছানায় পড়ে আপনার সার্জারি হয়েছে কোমরের এত নীচে। আর এখন ব্যথা হচ্ছে ঘাড়ে। তাও এতদিন পরে! এটা আপনার অপারেশনের কমপ্লিকেশন মনে হল?’
‘তাহলে ঘাড়ে ব্যথা কেন হচ্ছে?’
‘সম্ভবতঃ সার্ভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। কোমরের এমারাইতেই একটা ছবিতে সেটা দেখা গিয়েছিল। আপনার ছেলেকে বলেও দিয়েছিলাম সে কথা, যে এখন কোনো সমস্যা হচ্ছে না ঠিকই কিন্তু পরে ঘাড়ের সমস্যা হতে পারে।’
ভদ্রলোক বললেন, ‘তাই না কি? আমি তো জানি না।’
আমি বললাম, ‘শরীরের কোথাও কোনো একটা অপারেশন হলেই ব্যস্। তারপরে আর যখন যেখানে যা কিছু সমস্যা হোক না তার জন্য দায়ী ওই ব্যাটা অপারেশন আর সার্জেন- এই তো আপনাদের মনোভাব!’
‘তাহলে অপারেশনের জন্যে ঘাড়ে ব্যথা হয় নি বলছেন! অপারেশনের পরেই তো ঘাড়ে ব্যথা হয়েছে।’
‘এক্সরে করে আসুন।’
রোগী একাই গিয়ে এক্স রে করে এলেন। সার্ভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। তারপরে তার সন্দেহ দূর হল।
দৃশ্য -২
জুলাই ২০১৪। ঠিক দশ বছর আগে। কলকাতা থেকে লন্ডন যাব দোহা হয়ে। দোহা এয়ারপোর্টে লন্ডনের ফ্লাইট ধরব বলে বসে আছি। মাইক।র
হঠাৎ ঘোষণা- ‘ডাক্তার চিন্ময় নাথ নাথ, প্যাসেঞ্জার টু লন্ডন হিথরো, প্লীজ কাম টু দি ট্রানজিট কাউন্টার।’
দুশ্চিন্তায় পড়লাম, আবার কি গন্ডগোল হল কে জানে!
কাউন্টারে দেখা করতেই ইউনিফর্ম পরিহিতা কাতার এয়ারওয়েজের একজন তরুণী স্টাফ ট্রানজিট কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে বাংলায় জিজ্ঞেস করল-
‘ভাল আছেন স্যার?’
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! কোথায় কলকাতা, কোথায় দোহা। কাতার এয়ারওয়েজ। তায় বাঙালি।
‘আপনি বোধহয় আমাকে চিনতে পারেন নি! আমি রূপালী রায় (নাম পরিবর্তিত)।
জামার উপরে ব্যাজে ওই নাম-ই লেখা।
‘আপনি আমাকে এই চাকরিটা পেতে হেল্প করেছিলেন।’
‘আমি? কিভাবে?’
‘আপনি ভুলে গেছেন। বছর দুই আগে আমি আপনার কাছে কাতার এয়ারওয়েজের চাকরির জন্য ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে গেছিলাম।’
এতক্ষণে মনে পড়ল! সেই জন্যে মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছে! আসলে এয়ারলাইন্সের ইউনিফর্মে চিনতেই পারিনি।
এয়ারপোর্টের কাছে একটা বেসরকারী হাসপাতালে যুক্ত থাকার সুবাদে কাতার এয়ারওয়েজ মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য মেয়েটিকে আমার কাছে পাঠিয়েছিল। খুব সামান্য স্কোলিওসিস (পিঠের মেরুদন্ড বাঁকা) ছিল এই মেয়ের। ত্রিকোনমিতির মাপে মেরুদন্ড ১০ ডিগ্রীর কম বাঁকা থাকলে তাকে স্কোলিওসিস বলা যায় না। পরীক্ষা করে, এক্সরের ছবি তুলে তারপর সফ্টওয়্যারে মেপে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, ওটা ১০ ডিগ্রির থেকে কম।
জনসন কোম্পানির ‘সার্জিম্যাপ’ নামে একটা সফ্টওয়্যার আমার কাছে তখন ছিল। সিঙ্গাপুরে আমার মেন্টর প্রফেসর ওয়াং হি কিট দিয়েছিলেন। যা দিয়ে সব ধরণের হাড়ের ব্যাঁকা সঠিকভাবে মাপা যায়। তাই দিয়ে মেরুদন্ড কতটা ব্যাঁকা মেপে তারপর ছবি তুলে কাতার এয়ার ওয়েজে পাঠিয়েছিলাম। তারপরে, বহু ইমেল চালাচালি করতে হয়েছিল। শেষমেষ ওরা মেনে নেয় যে এটা ‘স্কোলিওসিস’ নয়!
রূপালী হঠাৎ ঢিপ করে আমার পা ছুঁয়ে প্রনাম ঠুকলো- যা আজকালকার যুগে অকল্পনীয়, বিশেষ দোহা এয়ারপোর্টের মত জায়গায়। আমি সসংকোচে দু-পা পিছিয়ে এলাম।
‘আরে, আমি তো কিছুই করি নি!’
‘আপনি আমার জন্য কি করেছেন- আপনি জানেন না। চলুন আপনার সাথে একটা সেলফি তুলি।’
তখন তার এক সহকর্মী এসে তাকে কানে কানে কি একটা বলল। অন-ডিউটি এয়ারলাইন্সের স্টাফ এয়ারপোর্টের মধ্যে প্যাসেঞ্জারের সাথে ছবি তুলতে পারে না। নিয়ম নেই।
আমি যে আজকের কাতার এয়ার ওয়েজেল ফ্লাইটে ট্রাভেল করছি- তা কেবলমাত্র আমার পরিবারের গুটিকয় লোক জানে। এ জানল কি করে?
রূপালী আমার ভাবনা বুঝতে পেরে বলল, ‘হঠাৎ কলকাতার প্যাসেঞ্জার লিষ্টে দেখলাম নাম- চিন্ময় নাথ। মনে হল, ইনি নিশ্চয়ই আমার ডাক্তার।’
শেষে রুপালী দোহা এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে আমার একার একটা ছবি তুলে দিল। শুধু তাই নয়, এক কাপ কফি খাইয়ে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেল।
এত কৃতজ্ঞতা রাখব কোথায়?
n.b. সঙ্গের ছবিটা দশ বছর আগে- দোহা এয়ারপোর্টে










