ন্যাশনাল মেডিক্যালের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে জ্বর, খিঁচুনির রোগী ভর্তি হতো খুব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা হতো তড়কা, যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় febrile convulsions. জ্বর কমার ওষুধ, জলপটি, মাথা ধোয়ানো — এতেই কমে যেত মোটামুটি। বছর পাঁচ-ছয় বয়স হয়ে গেলে, শিশুর সাধারণ তড়কা বিশেষ একটা হয় না। জ্বরসহ অথবা জ্বরবিহীন খিঁচুনির অন্য কোনো গুরুতর কারণ থাকে।
অনেক সময় convulsion নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে, ডায়াজিপাম নামে একটি ওষুধ প্রয়োগ করতে হতো। বড়দের ক্ষেত্রে সেটি শিরার মধ্যে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে দিলে কাজ হতো ম্যাজিকের মতো, কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে সেটা কিঞ্চিৎ বিপজ্জনক ছিল বলে, মলদ্বারের ভিতরে টিউবের মাধ্যমে দিলে নিরাপদ, এবং কাজও হয় ভালো – এইরকমই শিখেছিলাম আমরা।
একদিন রাউন্ড দিচ্ছি একা – আমার সামনেই একটি বছর পাঁচেকের রোগাভোগা ছেলের মারাত্মক খিঁচুনি শুরু হয়ে গেল। আমি জীবনে প্রথমবার per rectal অর্থাৎ মলদ্বার দিয়ে ডায়াজিপাম পুশ করতে উদ্যোগী হলাম। ওষুধ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিথিল হয়ে গেল শিশুটির অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, কেমন যেন এলিয়ে পড়ল সে। আর তার ঐ নেতিয়ে পড়া দেখে আমার বদ্ধমূল ধারণা হলো, আমি একটা বাচ্চাকে আমার অজ্ঞ এক্সপেরিমেন্টের শিকার বানিয়ে মেরে ফেললাম। ডোজ হিসেব করতে ভুল করলাম কি? নাকি খুব তাড়াতাড়ি তরলটা ঠেলে দিয়েছিলাম টিউবের মধ্যে? হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো আমার, কান ভোঁ ভোঁ করতে আরম্ভ করল,চোখের সামনে সাঁতরে বেড়াতে লাগল অসংখ্য জোনাকপোকা। আমার অবস্থা দেখে শিশুর মা খারাপ কিছু আন্দাজ করে উচ্চস্বরে দেহাতি বিলাপ আরম্ভ করল, আর সেই টানেই দৌড়ে এলেন সিস্টার দিদিরা। ভয়ে, অনুশোচনায়, দুঃখে আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় হলো যেন। ক্ষণিকের জন্য জাগতিক চেতনা চলে গিয়েছিল বোধ হয় — সম্বিত ফিরল প্রবল ঝাঁকুনিতে। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলাম,আমার কাঁধ ধরে সবলে ঝাঁকাচ্ছে ইউনিট ওয়ানের হাউসস্টাফ উমা, উমা পার্বতী। অনেক দূর থেকে যেন শুনতে পেলাম উমার গলার স্বর — “কি হয়েছে? এমন করছিস কেন?”
উমা দক্ষিণ ভারতীয় হলেও চমৎকার বাংলা বলত।
আমি ওর কথার উত্তরে কিচ্ছু না বলে, আঙুল দিয়ে পাশের বেডটা দেখিয়ে দিলাম। ও দেখল। আমি ফিসফিস করে বললাম –“মেরে ফেললাম ওকে। পার রেক্টাল ডায়াজিপাম দিয়েছিলাম— ”
উমা হো হো করে হেসে উঠে বলল –“হ্যাঁ, তো কি হলো? বাচ্চা তো ঘুমাচ্ছে, দেখ ভালো করে – এত নার্ভাস কেন তুই?”
যেখানে জ্বরের সঙ্গে ঘাড়, মাথা শক্ত হয়ে যাবার উপসর্গ থাকত, সেখানে মস্তিষ্ক বা মস্তিষ্কের আস্তরণের প্রদাহ, মানে, ইনফেকশন সন্দেহ করে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হতো। তার অন্যতম ছিল লাম্বার পাংচার। অর্থাৎ কোমরের কাছে, শিরদাঁড়ার হাড়ের মধ্যের ফাঁক দিয়ে ছুঁচ ফুটিয়ে সুষুম্নাকাণ্ডের ভিতরের রস, মানে cerebrospinal fluid সংগ্রহ করে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতো। সেই পরীক্ষার রিপোর্টের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা চলত বাচ্চাটির।
আমাদের পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডের দুটি বড় হলঘরের দু’পাশে ছিল লম্বা করিডর – পুরো ছ’তলা জুড়ে। পিছনের করিডরের লাগোয়া একটা একলা ঘর ছিল, আমরা রোগীদের রক্তের স্যাম্পল রাখতাম। কোনো শিশুর রক্ত টানা, বা ছটফটে বাচ্চার স্যালাইনের চ্যানেল করা, সব হতো ঐ ঘরে। কারণ, ওয়ার্ডে ঘেঁষাঘেঁষি বেডের মধ্যে কাজ করার জায়গার অভাব ছিল — ছিল না পর্যাপ্ত আলোও।
ঐ ঘরে একদিন একটি শিশুর লাম্বার পাংচার করছিলাম আমি। সহকারী সিস্টার দিদি পরম যত্নে টেবিলে পাশ ফিরিয়ে শোয়ানো শিশুটিকে সামান্য বেঁকিয়ে ধরে আঁকড়ে রেখেছেন শক্ত করে, কারণ সে নড়লেই বেকায়দায় ঢুকে যাওয়া ছুঁচে আঘাত পাবে – আর কাজটিও সফল হবে না।
আমার চোখের সামনে তখন শিশুর ধনুকের মতো বাঁকানো মেরুদণ্ড ছাড়া আর কিছু নেই — বিশেষ ছুঁচ সন্তর্পণে ঢুকিয়ে দিয়েছি যথাস্থানে, নিচের টিউবে বিন্দু বিন্দু সুষুম্না-রস এসে জমতে শুরু করেছে – এমন সময় মাথার পিছনে কোনো ধাতব বস্তু দিয়ে সজোরে কেউ মারল আমাকে!
চমকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম একটি খর্বকায় মানুষ, মোটা কাঁচের চশমার মধ্যে দিয়ে তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন আমার দিকে!
ডক্টর গিরিধারী কুন্ডু, আমাদের ডিপার্টমেন্টের অন্যতম শিক্ষক, হাতে একটা বড়সড় আর্টারি ফরসেপ বাগিয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছেন আমার পিছনে। বুঝলাম ওটা দিয়েই গাঁট্টা মারা হয়েছে মাথায়। কিন্তু করলামটা কি? কিছুই না বুঝে ধড়মড় করে টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যেতেই আবার ধমক! “নিডল বার করো আগে!”
করলাম। তারপর টিউবটা চোখের সামনে তুলে কড়া গলায় বললেন স্যার, “শুরুটা তো ভালই করেছিলে – তারপর হলো কি তোমার? সি এস এফ একদম ক্লিয়ার হওয়া উচিত। তুমি সামান্য হলেও ইঞ্জুরি করে ফেললে? দ্যাখো, দু’এক ফোঁটা রক্ত মিশে কেমন ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে ফ্লুইড! নো,নো, একদম ঠিক হয়নি এটা!”
লজ্জিত মুখে দেখলাম টিউবটা। অপরাধটা মারাত্মক নয়, যাকে বলে ট্রম্যাটিক ট্যাপ, সেটা হয়নি — রিপোর্ট পেতে অসুবিধে হওয়ারও কথা নয়। তবু লজ্জা পেলাম। কোনো কাজ নিখুঁতভাবে শিখতে না পারার, করতে না পারার লজ্জা!
বকাঝকা শেষ করে, ঘর ছেড়ে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন ‘টংসা চু’- এর লেখক, সাহিত্যিক-চিকিৎসক গিরিধারী কুন্ডু। আমি মুগ্ধভাবে তাকিয়ে রইলাম এক পারফেকশনিস্টের চলার পথের দিকে।
রামমোহন ব্লকের ছ’তলা ছাড়া, পেডিয়াট্রিক্সের কার্যক্ষেত্রের বিস্তার ছিল গাইনি ওয়ার্ডেও। ওখানেই ছিল ন্যাশনাল মেডিক্যালের নার্সারি – সদ্যোজাত শিশুদের ওয়ার্ড। সেখানে ডিউটি করতে বড় ভালো লাগত আমার।
যদি প্রশ্ন করা হয় যে পৃথিবীতে সবচাইতে কোমল কি, তাহলে আমি বলব, এক সদ্য ভূমিষ্ঠ মানবশিশুকে স্পর্শের অনুভব। গোলাপি ফুলের পাপড়ির মতো আধ খোলা ঠোঁট, মাতৃজঠরের আঠালো ভার্নিক্সে মাখামাখি তুলতুলে গা, কচি শস্যদানার মতো কুটি কুটি পায়ের আঙুল, নরম মাখনের চেয়েও পেলব, মসৃণ বেবিফ্যাটে ভরপুর ফোলা ফোলা গাল — একটি নবজাতক যেন আমার কাছে একমুঠো আদুরে ঈশ্বরের মতো। নাজুক। ভীষণ লাজুকও।
নার্সারির এক সিস্টার দিদির কথা খুব মনে পড়ে। এতদিন পরে তাঁর নামটি আর মনে নেই। ছোটোখাটো মানুষটি কি অসীম মমতায়, যত্নে, পরিচর্যা করতেন বাচ্চাদের — এতটুকু বিরক্তি নেই, ক্লান্তি নেই, অভিযোগ নেই। তখনই ওঁর বিশ বছর কাটানো হয়ে গিয়েছে নবজাতকদের ওয়ার্ডে। বলতেন, ওখান থেকেই রিটায়ার করবেন, অন্য কোথাও আর মন বসবে না। সেই সদাহাস্যময়ী, মমতাময়ী দিদিটিকে আমার নার্সারিরই আরেকটি ওভার সাইজ বেবি বলে মনে হতো।
আমার এই শিশুপ্রীতি নিয়ে ব্রজ ঠাট্টা করত খুব। হাউসস্টাফশিপ চলাকালীন আমার জন্মদিন এলো, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পালিত আমার শেষ জন্মদিন। বন্ধুবান্ধবদের নানা উপহারের মাঝে ব্রজ-র দেওয়া অভিনব শুভেচ্ছাবার্তার কার্ডটা এখনো রাখা আছে আমার কাছে। ও লিখেছিল – দিদিভাইকে জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা! Wish you become a mother of many many ‘Gublu’s very soon!
ব্রজ-র ইচ্ছে ঈশ্বর পূরণ করেননি, কিন্তু তাতে আমার মনে কোনো খেদ নেই। কারণ, দীর্ঘ কর্মজীবনে গুবলু গাবলুদের সান্নিধ্য থেকে পরম করুণাময় আমায় বঞ্চিত করেননি কখনো।
হাউসস্টাফশিপ শেষ হবার পর কি? এই প্রশ্ন তখন কুরে খাচ্ছে আমায়। সাত বছরের হোস্টেলবাস সমাপ্ত করে ঘরে ফিরে এসেছি, বাবা-মায়ের কাছে। সাত বছরের প্রায় নিরবচ্ছিন্ন স্বাধীনতার পরে মায়ের শাসন অসহ্য লাগতে শুরু করেছিল। মা চাইত, সঙ্গত ভাবেই চাইত, যে আমি এমডি-এমএস এর প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসি। এদিকে আমার মন তখন বিদ্রোহ করে উঠেছে। আমি আর কিছুতেই পড়ব না। আমার আর এই বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। কিন্তু মা অনড়। “একটা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন না হলে চলে? কোথাও কলকে পাবি না! প্র্যাক্টিস জমাতে গেলে তো একটা এম ডি কিংবা এম এস চাই, তাই না?”
আমি জানতাম, আমার মেধায় বিনা উদ্যোগে আর এগোনো অসম্ভব। সর্বভারতীয় ছেড়ে দিলাম, রাজ্যের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এন্ট্রান্সও আমি পেরোতে পারব না, যদি পড়াশোনা না করি। অথচ, সেই তাগিদটা আমি অন্তর থেকে কিছুতেই অনুভব করতে পারছিলাম না। আমি বুঝেছিলাম, বিষয়ের প্রতি ভালবাসা না থাকলে আর এগোনো সম্ভব নয়। মুশকিল হলো, মাকে কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছিল না কথাটা। কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছিল না, যে অনিচ্ছুক ঘোড়া নিয়ে বার বার যুদ্ধ জেতা যায় না।
মা-বাবা যখন বুঝল, যে মোটা মোটা বইগুলোর সামনে আমাকে ঘেঁটি ধরে যতই বসানো হোক, শক্ত শক্ত শব্দ আর কালো কালো অক্ষরগুলো আমার চোখের পর্দায় বুনো মোষের মতো আস্ফালনই করে বেড়াবে কেবল, মগজে সেঁধোবে না এক ফোঁটাও — তখন তারা অন্য রাস্তা ধরল। “লেখাপড়া যদি আর না হয় তোর দ্বারা, তবে বিয়ে দিয়ে দেবো। এখনই। আর দেরি নয়”!
আমি একেবারে আঁতকে উঠলাম। বিয়েতে আমার ঘোর আপত্তি তখন। মোবাইলের যুগ নয় সেটা, আমাদের নৈহাটির গঙ্গাতীরবর্তী কোয়ার্টারে ল্যান্ডলাইনও আসেনি — তবু চিঠিপত্রের মাধ্যমে খবর পেতাম ক্লাসমেটদের। তাদের সিংহভাগই ‘লাগিয়ে’ দিয়েছে কোনো বিষয়ের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি/ডিপ্লোমা, কেউ দেশে, তো কেউ এক পা এগিয়ে বিদেশে। আমার হোস্টেলাইট বান্ধবীদের অনেকেই বসে পড়েছে বিয়ের পিঁড়িতে। কেউ বা বিয়ের পরে পাড়ি দিয়েছে ইংল্যান্ড-আমেরিকায়। সব খবরই পেতাম চিঠি মারফত। বাড়ির পরিবেশ আরও ঘোরালো হয়ে উঠছিল। এই অশান্তির বাতাবরণ কাটিয়ে কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বিয়ের অনুষ্ঠানের সাদর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আর যাওয়া হয়ে উঠত না আমার। কেমন গুটিয়ে যাচ্ছিলাম আমি — কেন্নোর মতো।
ঠিক করলাম, প্র্যাক্টিস করব। প্রাইভেট প্র্যাক্টিস।
মজুর-লেবাররা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন-টেশনের ধার ধারে না, পাশ করা (পাশ না করাও) ডাক্তার হলেই হলো। ঐ মিল কলকারখানার মহল্লায়, এক সদ্য পাশ করা অল্পবয়সী মেয়ে-ডাক্তারকে মুশকো জোয়ান মজদুররা পয়সা খরচা করে দেখাবেই বা কেন, যেখানে প্রত্যেক মিলের নিজস্ব মেডিক্যাল অফিসার রয়েছে, সে কথা একেবারেই মাথায় আসেনি। ‘চিরকালের গাড়ল’ আর কি!
যাই হোক, বাবাকে বলতে, এক পরিচিতকে ধরেকরে একটা ওষুধের দোকানে বসার ব্যবস্থা করে দিল বাবা। পেপার মিলের অফিসারের মেয়ে বলে কথা, কলকাতার প্রেস থেকে দামী কাগজে সুন্দর করে আমার নাম ছাপানো প্রেসক্রিপশনের প্যাডও এসে গেল।
ওষুধের দোকানের মালিকের একটা মিষ্টির দোকান রয়েছে পাশেই। আমার ফি সাব্যস্ত হলো কুড়ি টাকা। সপ্তাহে তিনদিন বসব, দু’ঘন্টা করে। দোকানের ভিতরে একটা ছোট্ট খুপরি ঘরে বসতে হবে। আপাতত সাইনবোর্ডের খরচ ছাড়া দোকানদার ভদ্রলোককে কিছু দিতে হবে না। ওঁর দোকানে পাওয়া যায়, এমন ওষুধই লিখতে হবে কেবল!
তখনো ওষুধ কোম্পানি-দোকানদার অশুভ আঁতাত, অনামা সংস্থার নিম্ন মানের ওষুধ, ইত্যাদি ব্যাপারে পোড় খাওয়া হয়ে উঠিনি – তাই আপত্তি করলাম না। দোকানদার ওঁর দোকানে প্রাপ্ত ওষুধের লিস্ট ধরিয়ে গেলেন। সঙ্গে একটা প্লেটে দুটো সন্দেশ। ওঁরই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মিষ্টি। তখনো বুঝিনি, এটা আমার “চেম্বারের” প্রতিদিনের বরাদ্দ।
প্রথম দিন জনা ছয়েক রোগী এলেন। পরের দিন পাঁচ জন। তৃতীয় দিন সাতজন। আমি উৎসাহিত। দোকানদার গম্ভীর। শেষ রোগী চলে যাওয়ার পরে, সন্দেশের প্লেট হাতে আমার খুপরিতে ঢুকে বললেন — “দিদিমণি, একটু হাতে রেখে ওষুধ ছাড়েন। রোগ একবারে সেরে গেলে চলবে কেন?”
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম – “সে আবার কি? এমন করে চিকিৎসা হয় নাকি?”
উনি বললেন — “রোগীর বাড়ির লোকের সাথে ভাট বকবেন, গপ্প করবেন, তাপ্পর দিন দুই ভালো থাকবে, এমন ওষুধ দিবেন। যাতে দু দিন পরে ফের দৌড়ে আসে।”
আমার হতভম্ব মুখ দেখে উনিই আবার বিশদ করলেন — “একবারে সেরে গেলে লোকে ভাবে,দূর, এ আর এমন কি রোগ! ডাক্তারের কাছে না গেলেও এমনিতেই সারত। এমন করলে, ডাক্তারের কদর থাকে না দিদিমণি।”
পরের সপ্তাহে জনা সাতেক রোগী হলো তিন দিনে। তার পরের সপ্তাহে এলেন সাকুল্যে তিনজন।
মাসখানেক পর থেকে রোগী আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। কোনো সপ্তাহে একজন-দুজন হয়ত এসে পড়েন আচমকা, কোনো সপ্তাহে একজনও নয়।
বাড়ি থেকে দোকানে আসার রিক্সা ভাড়া মায়ের কাছে চাইতে হয়। হাউসস্টাফশিপে সাড়ে আঠারো শ’ টাকা মাইনে পেতাম মাসে, একটা টাকাও জমাইনি। ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্টও ছিল না আমার!
মাস তিনেকের মাথায় ধৈর্য ফুরিয়ে গেল।
সেদিনও কোনো পেশেন্ট আসেনি। পরপর তিন দিন কেউ আসেনি। রংচটা পর্দা ঠেলে, ফাটা প্লেটে দুটি সন্দেশ নিয়ে দোকানদার দাদাটিকে খুপরিতে ঢুকতে দেখেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। একটু রুক্ষ ভাবেই বললাম — “একটাও রোগী আসেনা, তাও রোজ রোজ মিষ্টি আনেন কেন আপনি? আর আনবেন না!”
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন — “তাতে কি হয়েছে? বিনা পয়সায় দুটো মিষ্টি খাওয়ালে আমি গরিব হয়ে যাবো না দিদিমণি, আপনাদের আশীর্বাদে দোকান আমার ভালই চলে”!
অপমানের নোনতা অশ্রুর সঙ্গে মিশে সস্তার ছানার সন্দেশের সেই কিম্ভূত স্বাদ এখনো যেন আমার জিভে লেগে আছে – নির্ভুল টের পাই আমি।
(ক্রমশ)












অনবদ্য লেখনীর স্মৃতি রোমন্থন 🙏🙏🙏 আপনাকে প্রণাম জানাই।