কালিয়াগঞ্জ গ্রামীণ হাসপাতালের তেমন একটা ছিরি ছাঁদ ছিল না। টিনের চালের একতলা ব্যারাকের মতো হাসপাতাল বাড়ি, দুদিকে দুটি ডানা ছড়ানো। একদিকে তিরিশ শয্যার মেল ওয়ার্ড, অন্যদিকে সমসংখ্যক শয্যার ফিমেল ওয়ার্ড। মাঝে চৌখুপি জায়গাটায় সিস্টারদের ঘর, একটা ত্যাড়াবাঁকা আউটডোর অপারেশন থিয়েটার আর একখানি মলিন লেবার রুম।
মেল ওয়ার্ডের রোগী সংখ্যা খুবই কম, তাই সে ঘর অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন। ফিমেল ওয়ার্ডে তিল ধারণের জায়গা নেই। দু’সার জং ধরা লোহার খাটের মাঝের একফালি জায়গায় গুঁতোগুঁতি করছে ঘাড় মোচড়ানো স্যালাইন স্ট্যান্ড আর তোবড়ানো অক্সিজেন সিলিন্ডার। মেঝেতে পা ফেলবার জায়গা মেলা দুষ্কর। কুটকুটে লাল কম্বলের উপর সবজে চাদর বিছিয়ে তৈরি করা ‘বেড’এ উপছে পড়ছে রোগী। প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই বাড়ির লোক রয়েছে। ব্যথায় ছটফট করা প্রসূতির মাথার কাছে বসে দাঁতে কালো ফিতে চেপে চিরুনি দিয়ে চুল বাঁধছে শাশুড়ি, তার পাশের বেডেই ডায়েরিয়ায় নেতিয়ে পড়া শিশুর মুখে স্তন গুঁজে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে তরুণী মা, আর এই দুই বিছানার পায়ের কাছে ‘এক্সট্রা বেড’এ নাকে অক্সিজেনের নল, হাতে স্যালাইনের চ্যানেল আর মূত্রনালিতে ক্যাথিটার গোঁজা চেতনাহীন স্ট্রোকের রোগিণীর কোলের কাছে গুটিয়ে শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে দুই বিনুনির কিশোরী! হাতের কিডনি ডিশে ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল আর কাচের সিরিঞ্জ নিয়ে বেডে বেডে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সর্বংসহা সিস্টার দিদিরা।
তারই মাঝে ন্যাকড়া জড়ানো কাপড়ের পুঁটুলি হাতে লেবার রুম থেকে বেরোচ্ছে আয়া মাসি – “ও দিদি, লিখে নাও, বারো নম্বরের মেল বেবি, ওজন দু’কিলো আটশো”—
গড়গড় শব্দে গড়িয়ে আসছে ডায়েটের গাড়ি। গরম ভাত আর পাঁচমেশালি ঘ্যাঁটের গন্ধে গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে ওয়ার্ডের বাইরের ঝিমোতে থাকা হুলো বেড়ালটা।
এই হাসপাতাল বাড়ির উল্টোদিকে দুই কামরার আউটডোর বিল্ডিং – রাস্তা থেকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। একেকটি ঘরে একটি টেবিল আর চারটি করে চেয়ার, সর্বাধিক চারজন করে ডাক্তার বসতে পারেন সেখানে। এই চেয়ার টেবিল আর দেয়ালের মধ্যে যে সামান্য পরিসর, তার একদিকে কোনো মতে একটা কাঠের শোয়ার জায়গা, সেটা রোগীদের একজামিনেশন টেবিল। খুব কম রোগীদেরই শুইয়ে পরীক্ষা করার সময় পাওয়া যেত। কারণ, ঐ ঘন্টা পাঁচেক আউটডোরের অবকাশে জনা চারেক ডাক্তারকে দৈনিক প্রায় ছ’শো রোগী দেখতে হতো। জেনারেল আউটডোরের পিছনের ঘরে বসতো ডেন্টাল ওপিডি, তার দৈর্ঘ্যপ্রস্থ মাপলে পাড়ার চিলতে সেলুনও অবাক হয়ে যাবে।
আউটডোর বিল্ডিং এর এক পাশে ছিল এক্সরে ঘর, আর অন্যপাশে ঝাঁকড়া বটগাছতলার নিচে জীর্ণ হাসপাতাল অফিস। সেখানেই আমার প্রথম আলাপ হলো ডক্টর কোলের সঙ্গে। কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালের বিএমওএইচ ডক্টর শিশির কোলে — এক অজানা শহরে যে মানুষটার অভিভাবকত্বে আমাকে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তে কলকাতা ফিরে গিয়েছিল আমার বাবা মা।
লেবার কেস সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা অকপটে ব্যক্ত করার পর যিনি সংক্ষেপে বলেছিলেন – “কোনো চিন্তা নেই, পুতুলমাসি, প্রণতিমাসির কাছে শিখে নিও। ওরা খুব এফিসিয়েন্ট।”
হাসপাতালের অন্য ডাক্তাররা যেখানে চুটিয়ে প্রাইভেট প্র্যাক্টিস করছেন অথচ আমি প্র্যাকটিসে একেবারেই ইচ্ছুক নই জানার পর যিনি বলেছিলেন – “সেকি! এতদূরে এসে শুধু মাইনের ভরসায় থাকবে, ব্যবসায় নামবে না?”
আমার কালিয়াগঞ্জ বাসের প্রতিটি অভিজ্ঞতার প্রতিটি পরতে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে রয়েছেন এই মানুষটি এবং তাঁর পরিবার – দু’চার কথায় তাকে বেঁধে ফেলা অসম্ভব।
একদিন আমার ডিউটি চলাকালীন হাসপাতালে একজন পেশেন্ট ভর্তি হলো — প্রাইমিগ্র্যাভিডা, অর্থাৎ প্রথম প্রসূতি। তখনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি এই পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক জেলাটিতে, গ্রামের দাইয়ের হাতেই বেশির ভাগ শিশুর জন্ম হতো। বলাই বাহুল্য রাজ্যের গড়ের নিরিখে নবজাতকের মৃত্যু এবং প্রসূতিমৃত্যুর হারেও বেশ পিছনের সারিতে ছিল উত্তর দিনাজপুর।
অনেক পরে সরকার থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল দাই ট্রেনিংএর। তখন এই গাইনি না জানা আনাড়ি ডাক্তারনী হাতে কলমে অনেক গ্রামীণ দাইদের ট্রেনিং দিয়েছে। আবার প্রবীণ, অভিজ্ঞ দেয়াসিনীদের থেকে শিখেছেও অনেক কিছু। চণ্ডীগড়ের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের এমসিএইচ করা প্লাস্টিক সার্জেন থেকে গ্রামীণ রাজবংশী দাই — আমার শিক্ষকের তালিকা লম্বা, ও ব্যাপারে আমি বাছবিচার করিনি কখনো।
মূল ঘটনা থেকে সরে এসেছি অনেকটা, এবারে আমার সেই ডিউটির সময়ে ফিরি। দাই অনেক টানা হেঁচড়ার পরে অপারগ হলে, সেই প্রসূতির বাড়ির লোক অনন্যোপায় হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। আমি প্রাথমিক পরীক্ষা করে বুঝলাম সংকোচনের ওষুধ দিয়েও মেয়েটির নিস্তেজ জরায়ুকে উত্তেজিত করা যাবে না আর। এদিকে, আমার অভ্যস্ত কানে গর্ভস্থ শিশুর ‘ডিসট্রেস’ ধরা পড়েছে তার হৃদস্পন্দনে। হবু মায়ের যোনিপথ থেকে নির্গত সবুজ তরলেও সেই ‘ডিসট্রেস’ এর লক্ষণ স্পষ্ট। বুঝলাম হয় সিজারিয়ান করে পৃথিবীর আলো দেখাতে হবে শিশুকে, নয়ত করতে হবে ফরসেপস ডেলিভারি। কালিয়াগঞ্জে সিজারের ব্যবস্থা ছিল না – অতএব ফরসেপস ছাড়া গতি নেই। আমার পক্ষে ফরসেপস ডেলিভারি করা অসম্ভব। আমি কেবল যন্ত্রটি চোখে দেখেছি, ব্যবহার করিনি জীবনেও।
নার্সিং স্টাফ দিব্যশ্রীদি বা কৃষ্ণা আচার্যিদিও সাহায্য করতে পারবেন না, কারণ ফরসেপস দেওয়া সিস্টারদের এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। আমার কান্না পেয়ে গেল। হাসপাতালের একমাত্র গাইনি এমডি করা ডাক্তার তাপসদা, ডক্টর তাপস ঘোষ সেদিন রায়গঞ্জে গিয়েছেন কোনো কারণে। ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী আমার আর এক ডাক্তার কলিগ রীতাদি, ডাক্তার রীতা বিশ্বাস তখন কলকাতায়, ছুটিতে।
আমি সিস্টার রুমের ল্যান্ড ফোন থেকে ডায়াল করলাম ডক্টর কোলের বাড়িতে। উনি কোয়ার্টারে থাকতেন না। হাসপাতাল চত্বরের ঠিক বাইরে, পঞ্চায়েত অফিস আর তিস্তা প্রকল্পের বিল্ডিংগুলো ছাড়ালেই ওঁর দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ির বারান্দা দেখা যেত।
আমার ফোনের পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছে গেলেন ডক্টর কোলে।
তারপরের মিনিটগুলোয় যেন কোনো ভোজবাজি দেখলাম আমি। অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় নার্স দিদিদের সহযোগিতায় ফরসেপসের সাহায্যে প্রসব করাতে করাতে উনি শুধু একবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন –
“বেবিটাকে তুমি দেখে নিও, এদিকটা আমি সামলে নিচ্ছি।”
ভূমিষ্ঠ হয়ে শিশু কাঁদল না। সিস্টাররা আতঙ্কিত, উনি চিন্তিত, এত কষ্টের পরে বাচ্চা না বাঁচলে তো খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। আমি লেগে পড়লাম কাজে – এটাই তো শিখে এসেছি এত বছর ধরে, কাজে লাগাবার এই তো সময়!
মাউথ টু মাউথ দেওয়া, সাকার মেশিনে নিয়ন্ত্রিত সাকশন করে গলায় জমে থাকা শ্লেষ্মা যতটা সম্ভব বার করে আনা, আম্বু ব্যাগের সাহায্যে নিঃশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা, সবই করে চললাম যান্ত্রিক দ্রুততায়। কয়েক মিনিটের মাথায় কেঁদে উঠল শিশু, রঙ ফিরল বেগুনি হয়ে আসা তিরতিরে ঠোঁটে, অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো ছোট্ট বুকের খাঁচাটার ওঠাপড়া।
ওদিকে নতুন মায়ের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন যোনিপথের সেলাই দক্ষ হাতে প্রায় শেষ করে এনেছেন ডক্টর কোলে।
যুদ্ধ শেষে দুজনেই বেরোলাম লেবার রুম থেকে।
স্বল্পবাক বিএমওএইচের প্রশংসাবাক্য শুনলাম — “শুধু এমবিবিএস তো তুমি। কিন্তু পেডিয়াট্রিক্সটা বেশ ভালই জানো দেখছি!”
আমি পেডিয়াট্রিক্স বেশ ভালই জানি, ডক্টর কোলের এই স্তুতিবাক্যে ভেসে আত্মশ্লাঘায় জারিত হয়ে, চিকিৎসক হিসেবে বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছি ততদিনে। সিস্টাররা জেনে গিয়েছেন, সদ্যোজাতের আপগার স্কোর যত নীচেই হোক, এই নতুন ডাক্তার দিদি চেষ্টাচরিত্র করে তাকে ফিরিয়ে আনবে ঠিক। আপগার স্কোর হলো নবজাতকের সুস্থতা নির্ধারণের মাপকাঠি – যেমন নিশ্বাস প্রশ্বাসের স্বাভাবিকতা, ত্বকের রঙ, হার্ট রেট, শিশুর নড়াচড়া ইত্যাদি। যে সদ্যোজাতের এই স্কোর যত উঁচুর দিকে, তার জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার সম্ভাবনা তত বেশি। অপুষ্ট রোগাভোগা অবহেলিত উত্তরবাংলার গ্রামে তখন সম্ভাব্য হেরোরাই সংখ্যাগুরু, আর আমি তো চিরকালই হেরোদের পৃষ্ঠপোষক।
ডায়েরিয়ায় ভোগা খুব ছোট্ট শিশুদের মুখে ওআরএস খাওয়ানোই রেওয়াজ ছিল, অবস্থা ঘোরালো হলে রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালে রেফার করে দেওয়া হতো। আমি খুব ছোটো শিশুদেরও শিরা খুঁজে খুঁজে স্যালাইন চালিয়ে দিতে পারতাম। সুস্মিতা ম্যাডামের শিক্ষা – তাই গ্যাস্ট্রোএনটেরাইটিসে বাচ্চাদের জেলাসদরে রেফারালও কমে গেল বেশ খানিকটা।
কালিয়াগঞ্জ হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ একজন ছিল – ডাক্তার দেবাশিস চক্রবর্তী। দেবাশিস খুব দক্ষ শিশু চিকিৎসক হলেও ব্যস্ত থাকত নিজস্ব প্র্যাক্টিস নিয়ে। আমার ওসব বালাই নেই — ‘পাতি এমবিবিএস’ বলে ইগোর সমস্যাও ছিল না। ডক্টর দেবাশিসের সঙ্গে আমার বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমার ডিউটির সময়ে ওর চেম্বারের পেশেন্ট, যাদের ও ভর্তির উপযুক্ত মনে করত, তাদের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলে স্যালাইন চালানো, প্রেসকৃপশন লেখার কাজ আমিই করে দিতাম। ডক্টর কোলে রাগ করতেন, নির্বোধ বলে শ্লেষোক্তিও করেছেন কখনো কখনো। আমি ভাবতাম, আমার প্রাপ্তি কাজের সন্তুষ্টি — সেটা তো আর কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
গ্রামীণ সরকারি পরিকাঠামোর হাজার সীমাবদ্ধতার মধ্যে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম আমি। তার মধ্যেই ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর ঘটনা।
একদিন আউটডোরের শেষে প্রচন্ড জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে একটি মাস ছয়েকের শিশু ভর্তি হলো। পরীক্ষা করে দেখলাম অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক, নানা ধরণের হাতুড়ে-হেকিমি অপচিকিৎসার শেষে অন্তিম মুহূর্তে নিয়ে এসেছে সরকারি হাসপাতালে। শিশুর প্রাণের প্রদীপটি তখন প্রায় নিভে এসেছে। সিস্টার দিদিকে জীবনদায়ী ইঞ্জেকশন রেডি করতে বলে আমি সেই প্লাস্টিকের তোষকে শোয়ানো শিশুটির মুখের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম, মাউথ টু মাউথ দেবার জন্য। সোজাসুজি মুখ হাঁ করিয়ে নিজের প্রশ্বাস তো দেওয়া যায় না, তাই শিশুর মুখগহ্বর পাতলা গজের আস্তরণে ঢেকে দিলাম। গ্রুপ ডি দাদা তখন অভ্যস্ত হাতে সিলিন্ডারের অক্সিজেন চেক করছে বাচ্চাটির নাকে বাতাসি নল ঢোকাবে বলে।
বাচ্চাটিকে বাঁচাবার মরিয়া প্রচেষ্টায় আমি খেয়াল করিনি, যা আমার চার দেওয়ালের বন্ধ ‘প্রসিডিওর রুমে’ করার কথা, সেটা আমি প্রকাশ্য ওয়ার্ডে করে চলেছি। আর আমার এই ‘আসুরিক’ পদ্ধতি প্রত্যক্ষ করতে ভিড় করে এসেছে গ্রামীণ জনতা। হাসপাতালের ওয়ার্ড আর খোলা হাটের মধ্যে তখন আর কোনো তফাত নেই।
আমি তার বাচ্চার উপরে কোনো মারণ উচাটন করছি সন্দেহ করে বাচ্চার মা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাকে টেনে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু আমি তখন পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন — এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলাম নিজেকে, খেয়ালও করলাম না যে আমার ঝটকার অভিঘাতে সে বেচারি কাত হয়ে পড়ে গেল বিছানার একপাশে।
এত করেও কিন্তু বাঁচানো গেল না শিশুটিকে। ভর্তি হওয়ার আধ ঘন্টার মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে গেল আমাদের সম্মিলিত চেষ্টা, মারা গেল সে।
ডেথ সার্টিফিকেটের প্রোটোকল সম্পন্ন করে সবে নিজের কোয়ার্টারে ফিরেছি, এমন সময় দরজার কড়া নড়ে উঠল। যে কোনো মৃত্যু বড্ড অবসন্ন করে দেয় মনকে – সে একটা ছ’মাসের বাচ্চার মৃত্যুই হোক বা নব্বই বছরের বৃদ্ধের। তার উপর প্রাণান্তকর চেষ্টা বিফলে গেছে, তার একটা আলাদা বেদনা ছিল। যেন এটা আমার এতদিনের শিক্ষার অপমান, এমন একটা আত্মগ্লানিতে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল মন। এই মানসিক অবস্থায় কারো সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছে ছিল না, তবু, খুলতেই হলো দরজা। দেখলাম হাসপাতাল পাড়ার জনা দুয়েক নেতা গোছের লোক — অফিসে দেখেছি এঁদের কয়েকবার — খুবই অমিত্রসুলভ মনোভাব মুখে ফুটিয়ে আমার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন।
অতঃপর যা শুনলাম, তাতে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেল। বাড়ির লোকের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও আমি নাকি চিকিৎসার নামে ঐ অসুস্থ শিশুর মুখে গজ ঢুকিয়ে, শ্বাসরোধ করে ওকে মেরে ফেলেছি। বাচ্চার মা আমাকে বাধা দিতে এসেছিল, তাকে মেরে ধরে খাটের উপর ঠেলে ফেলে দিয়েছি। এই সাংঘাতিক অপরাধের প্রতিবাদে ওরা শিশুর দেহ নেবে না। যতক্ষণ না পুলিশ এসে ‘খুনী ডাক্তার’কে গ্রেপ্তার করছে, বাচ্চার গ্রামের সমস্ত লোক হাসপাতালের সামনে অবস্থানে বসবে।
এই সুভাষিত বাণী আউড়ে তাঁরা আমার ঘরের দরজা থেকে বিদায় নিলেন।
আমার কোয়ার্টার ছিল হাসপাতালের মূল ফটকের একেবারে মুখোমুখি। আমি আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই দেখতে পেলাম একটি দু’টি করে লোক জড়ো হচ্ছে, তাদের দৃষ্টি আমার ঘরের দিকে। হঠাৎ দেখলাম আমার রাঁধুনি কাম গৃহকর্মী বেলা ভিড়ের মাঝখান থেকে বেরিয়ে দৌড়ে আসছে আমার ঘরের দিকে। বাঁশের বেড়ার ওপাশ থেকে ভয়ার্ত গলায় সে আমাকে সাবধান করে দিয়ে গেল —“দিদি, তুমি দরজা জানলা সব বন্ধ করে বসে থাকো গো, সবাই তোমায় মারতে আসতিছে!”
পরের দেড় দু’ ঘন্টার অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। আমি রান্নাঘরের ভিতরের দরজায় পিঠ দিয়ে মাটিতে বসে আছি। কাঠের সদর দরজায়, ছাদে, জানলার লোহার জাফরিতে এলোপাথাড়ি ঢিল পড়ছে, পড়ছে ইঁটের টুকরো। ভেসে আসছে গালিগালাজ। খানিক আগে পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখে এসেছি, কোয়ার্টার ঘিরে ফেলেছে অন্তত শ’তিনেক লোক।
আমার কোয়ার্টারে তখনও কোনো টেলিফোনের লাইন নেই। কারুর কাছে সাহায্য চাইবারও কোনো উপায় নেই।
রান্নাঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে বসে আমি শুধু ভাবছিলাম, হাসপাতালের ল্যান্ডলাইনের তারটা কি ওরা কেটে দিয়েছে? বিএমওএইচ-কে ফোন করে কেউ খবর দিতে পারেনি এতক্ষণেও? আরও তো তিনজন ডাক্তার রয়েছে হাসপাতাল প্রেমিসেসের কোয়ার্টারে। তারা কেউ আসতে পারছে না সাহায্য করতে? আর কতক্ষণ সহ্য করব এই মানসিক চাপ? একবার ভাবলাম, যা থাকে কপালে, উঠে যাই, গিয়ে খুলে দিই সদর দরজা! তারপর ইঁটের ঘায়ে না হয় মেরেই ফেলুক ওরা আমাকে!
হয়ত শেষ অবধি দরজাটা খুলেই দিতাম, এমন সময় কানে এলো গাড়ির আওয়াজ। আওয়াজটা থামল আমার আস্তানার সামনে। তারপর অনেক গুলো জুতোর শব্দ পেলাম সিঁড়িতে, বারান্দায়।
এবার কড়া নাড়ার আওয়াজ। সঙ্গে পরিচিত স্বর — “সুকন্যা, দরজা খোলো, আমি ডক্টর কোলে।”
কাঁপা হাতে ছিটকিনি খুলে দেখলাম, ডক্টর কোলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন কালিয়াগঞ্জ থানার ওসি, পিছনে জনা দুই সশস্ত্র কন্সটেবল। কোয়ার্টারের সামনের মাঠের ভিড়টা বেশ পিছিয়ে গেছে। হাসপাতালের রাস্তায় একটা পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে আছে।
ডক্টর কোলে সংক্ষেপে বললেন — “পোশাক বদলে ঘরে তালা লাগিয়ে বেরিয়ে এসো। আমরা অপেক্ষা করছি।”
বেরোলাম। পড়ে রইল দুপুরের ডাল,ভাত তরকারি। এইসব ডামাডোলে আমার আর খাওয়াই হয়নি সেদিন।
বেরিয়ে ওসির সঙ্গে জিপে গিয়ে উঠলাম। শুনতে পেলাম সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ডক্টর কোলে বলছেন, “তোমরা চেয়েছিলে, তাই ডাক্তার দিদিকে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে। তবে ঐ বাচ্চার বডি কিন্তু হাসপাতাল ছাড়বে না, রায়গঞ্জে নিয়ে গিয়ে পোস্টমর্টেম করতে হবে। তারপর পুলিশ কেস হবে, তোমাদেরও উকিল জোগাড় করতে লাগবে। এখন থানায় গিয়ে রিপোর্ট লেখাতে হবে। কে কে আসবে বলো?”
আমি জিপের সামনের সিটে বসে সাইড মিররে দেখতে পাচ্ছিলাম যে, ডক্টর কোলের কথার মধ্যেই ভিড়টা পাতলা হয়ে আসছিল দ্রুত। মিনিট পাঁচ দশের মধ্যে শিশুটির পরিবার ছাড়া আর কেউ রইল না। তাদের সঙ্গে দু’চারটি কথা বলে ডক্টর কোলে জিপের কাছে এসে দাঁড়ালেন। ওসিকে বললেন, “আপনি ওকে আমার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। এরা রিপোর্ট ফিপর্ট করবে না বলছে। বডি চাইছে এখন। মনা পাটোয়ারিরাও বলছে, হাসপাতালে এত গন্ডগোল হবে, ওরা বোঝেনি। ওরা কাউকে ইনস্টিগেট করেনি বলছে। আসলে ঝামেলা এদ্দুর গড়িয়েছে দেখে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে আর কি। যাই হোক, এদিকের ফর্মালিটিজ মিটিয়ে আমি বাড়ি ফিরে যাবো। সন্ধ্যেবেলা আপনাকে ফোন করব, ঠিক আছে?”
থানার গাড়ি আমাকে ডক্টর কোলের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। মিসেস কোলে, মানে আমার মঞ্জুদির হাজার সাধ্য সাধনাতেও ভাত আর গলা দিয়ে নামল না আমার। এক কাপ চা আর কয়েকটা বিস্কুট জোর করেই আমাকে খাইয়েছিলেন মঞ্জুদি।
সুস্থ ভাবে চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতাটাও যেন লোপ পেয়েছিল তখন। এই ঘটনা নিয়ে ওঁদের আলোচনা, স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা, পুলিশের সক্রিয়তা, এই সব কথাবার্তা যেন অর্থহীন শব্দতরঙ্গ হয়ে আছড়ে পড়ছিল কানের পর্দায়, মাথায় ঢুকছিল না কিছুই।
সন্ধে পেরিয়ে রাত নামল, গভীরও হলো। আমি কোলে দম্পতিকে সবিনয়ে জানালাম, কোয়ার্টারে ফিরব এবার।
মঞ্জুদি বললেন – “পারবে? ভয় করবে না তো একা থাকতে? আজ রাত্তিরটা আমাদের সঙ্গে থেকে গেলে পারতে -”
আমি হাসলাম – “ভয় করলে কি চলে দিদি? কদ্দিন পাহারা দিয়ে রাখবেন আমায়?”
নিশুত রাত্তিরে, চোরের মতো চুপি চুপি নিজের কোয়ার্টারে ঢুকে দরজা বন্ধ করলাম। অন্ধকার ঘরে, ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে, সারা দিনের অবরুদ্ধ অভিমান, অপমান, দুশ্চিন্তা যেন বাঁধ ভেঙে নেমে এলো দুই গাল বেয়ে। এই-ই তাহলে সিনসিয়ারিটির পুরস্কার? পাবলিক সার্ভিস তাহলে একেই বলে? কেবল নির্লোভ মন নিয়ে ডাক্তারি শিখলেই রোগীর চিকিৎসা করা যায় না?
অনেক অনেক কিছু শেখা বাকি রয়ে গিয়েছে তাহলে আমার! এই জীবনে আর শিখে ওঠা হবে কি? জানি না। অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে আমার জয়পুরি চাদর পাতা লোহার খাটটায় গিয়ে বসলাম আমি। জানলায় ফুলছাপ পর্দা উড়ছে গ্রীষ্মের হাওয়ায়।
সারা কোয়ার্টারে তখন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য আর টকে যাওয়া ভাত তরকারির অম্ল গন্ধ ভুরভুর করছে।
(ক্রমশ)








