বিভিন্ন প্রচার ও সমাজ মাধ্যম ছাড়াও বিভিন্ন ঘরানার বিভিন্ন পত্রিকায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিহার নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষণ সহ বেশ কিছু প্রতিবেদন বেরিয়েছে। এটি ঘটনা যে কেন্দ্রের এবং ১৬ টি রাজ্য দখল করা শাসক দল বিজেপি নানাভাবে মিডিয়ার এক বড় অংশের দখল নিয়ে নিয়েছে। তারা বিজেপি – জেডিইউ জোটের এই বিপুল জয়ের কারণ হিসাবে মোদিজীর নেতৃত্ব, ডবল ইঞ্জিন সরকার, নীতিশের সুশাসন ও উন্নয়ন, মহিলা ভোট ইত্যাদির একমাত্রিক ব্যাখ্যা দিয়েছে।
সেই সব লেখার ভিতর থেকেও কিছু বিষয় বেরিয়ে এসেছে । এর বাইরেও কিছু পত্রপত্রিকা, ব্লগার তাদের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। এগুলি সারসংকলন করলে যেটি দাঁড়ায়:
(১) নির্বাচন কমিশন দ্বারা প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ২০০০ বিধানসভা ভোটে এন ডি এ জোট পেয়েছিল ৩৭.৩% ভোট আর মহাগাঠবন্ধন পেয়েছিল ৩৭.২% ভোট। মাত্র ০.১% ব্যবধান। সেদিক থেকে এগিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার (Anti incumbency) কথা মাথায় রেখে বিজেপি কিছু নতুন কৌশল নেয়। উচ্চাকাঙ্খী দলীয় নেতাদের নিবৃত্ত করে অসুস্থ নীতিশ কুমারকেই জোটের মুখ রেখে, জোটকে সম্প্রসারিত করে চিরাগ পাসোয়ানের ‘লোক জনশক্তি পার্টি (রাম বিলাস) (এল জে পি (আর ভি))’, উপেন্দ্র কুশোয়ারের ‘রাষ্ট্রীয় লোক মোরচা (আর এল এম)’, জিতন রাম মাঝি র ‘হিন্দুস্তানি আওয়াম মোরচা – সেকুলর (এইচ এ এম)’ প্রমুখ জাত ভিত্তিক দলগুলিকে কাছে টেনে; প্রশান্ত কিশোরের ‘জন সুরাজ পার্টি’ কে মাঠে নামিয়ে, আসাউদ্দীন ওয়েসির ‘অল ইন্ডিয়া মজলিশ – ই – ইত্তেহাদুল মুসলিমেন (এ আই এম আই এম)’ এর সঙ্গে মুসলমান প্রধান আসন গুলিতে বোঝাপড়া করে ছোট পার্টি ও নির্দলদের নিয়ন্ত্রণে প্রায় ২০% ভোটে থাবা বাড়ায়। তারপর বিপুল পরিমাণ টাকা ছড়ানো, প্রবল প্রচার, প্রতিশ্রুতির বন্যা, নীতিশ কুমার এর দীর্ঘ শাসনের ও বিজেপির কেন্দ্র শাসনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি তুলে ধরা, হিন্দুত্ব ও উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রচার ইত্যাদি তো আছেই। এই অবধি তবুও ঠিক ছিল, কিন্তু জয়কে নিশ্চিত করতে পশ্চিমবঙ্গে যেমন সিপিআইএম ও তৃণমূল সন্ত্রাস ও রিগিং চালায়, এখানে বিজেপি আশ্রয় নিল নিবার্চন কমিশনের মাধ্যমে ডিজিটাল কারচুপির। ২৪৩ টি আসনের মধ্যে ২০২ টি আসন (বিজেপি সর্বাধিক ৮৯ আসন) ও ৪৬.৬% ভোট পেয়ে বিশাল জয় (Landslide Victory) ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এন ডি এ জোটের এই জয় কালিমালিপ্ত।
(২) বিজেপির হয়ে নির্বাচন কমিশন নিয়োজিত এজেন্সি বা ব্যক্তিবর্গ কোথাও ইভিএম হ্যাক করে, কোথাও ডুপ্লিকেট ভোটার তৈরি করে তাদের ভোট গুলি দিয়ে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করে বিজেপি – জে ডি ইউ জোটকে বিপুলভাবে জিতিয়েছে, যার তথ্য ছত্রে ছত্রে (আগে আমরা কিছুটা আলোচনা করেছি) এবং এটি করতে গিয়ে যাদের দায়িত্ব ছিল তারা বিজেপি – জে ডি ইউ জোটকে এত দৃষ্টিকটু ও একচেটিয়া ভাবে জিতিয়েছে যে সবার চোখে পড়েছে।
(৩) SIR এর নামে পরিযায়ী শ্রমিক, গরীব ভূমিহীন কৃষক, ক্ষেত ও জনমজুর, মহিলা, দলিত, মুসলমানদের একটি বড় অংশের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে যারা মূলত বিরোধী দলগুলির ভোটার।
বিরোধী রা প্রথমটি ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেননি এবং দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে সেভাবে প্রতিবাদ করে উঠতে পারেননি। গত লোকসভা ভোটে কারচুপির পর থেকেই বিরোধীদের বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে জোড়ালো ও ধারাবাহিকভাবে কারচুপি প্রকাশ, প্রচার, প্রতিবাদ ইত্যাদি করে বিষয়টিকে একটা জনআন্দোলনে পরিণত করা উচিত ছিল। সেটি তারা যোগ্য নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দুর্বলতা, ঐক্যের অভাব এবং সর্বোপরি লড়াকু মানসিকতার অভাবের কারণে করে উঠতে পারেননি। ফলে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহার প্রতিটি গুরত্বপূর্ণ নির্বাচনে বিজেপি পেটোয়া নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এই কারচুপি উত্তরোত্তর বাড়িয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকে প্রহসনে পরিণত করে ফেলেছে এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে।
প্রশ্ন উঠবে যেহেতু সরকার, সংসদ, আদালত, আমলাতন্ত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, সামরিক বাহিনী, পুলিশ, সংবাদ মাধ্যম সমস্ত প্রতিষ্ঠান তারা দখল করে ফেলেছে, ফলে তাদের বিরোধিতা করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই জায়গা থেকে নিজেদের লোকে ভরা নির্বাচন কমিশন শুধু এসবই করছে না বিরোধীদের কোন অভিযোগ, তথ্য প্রকাশের আবেদনকেও পাত্তা দিচ্ছে না। আদালত সময় নষ্ট করে চলেছে। ফলে প্রমাণ করা যাবে কি করে? যেহেতু সরকার, নির্বাচন কমিশন, আদালত কার্যত সব রাস্তাই বন্ধ তখন প্রতিবাদকে রাস্তার আন্দোলনে নিয়ে যাওয়া এবং গণ প্রতিরোধে রূপ দেওয়া উচিত ছিল। উন্নত দেশগুলির মত অন লাইন এ বর্তমান অবস্থায় সম্ভব না হলেও ব্যলট পেপারে নির্বাচনের দাবিকে ফলপ্রসু করা উচিত ছিল। সেখানেও যথেষ্ট কারচুপি করা গেলেও এত দ্রুত, এত সহজে ও এত ব্যাপক কারচুপি রীতিমত বড় সন্ত্রাস না করে করা সম্ভব হত না (যেরকম কংগ্রেস আমলে সর্বত্র হত, পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল আমলে হয়ে চলেছে)।
(৪) ভোটের মুখে সমস্ত নীতি ও নিয়ম লঙ্ঘন করে সরকারি কোষাগার থেকে প্রচুর অর্থ একটি বড় সংখ্যক মহিলাদের (জীবিকা দিদি হিসাবে) দান (এককালীন ১০ হাজার টাকা) এবং বিজেপি – জেডিইউ ক্ষমতায় আসার পর পরের কিস্তি ও বাকি মহিলাদের অর্থ প্রদানের প্রতিশ্রুতি।
(৫) আর এস এস – বিজেপির সামাজিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুযায়ী উত্তর প্রদেশে যেমন অখিলেশ ও মায়াবতীর যাদব ও জাটভ জাত দুটি বাদে অন্য জাতগুলির দল গড়ে সফল্য পাওয়া গেছিল, সেরকম বিহারে লালু – তেজস্বী র ভিত্তি যাদব ও মুসলমানদের বাদে কেওরি, পাসোয়ান, কুশওয়া, মুশাহার প্রমুখ পশ্চাৎপদ, দলিত, মহাদলিত দের কিছু দাবি পূরণ করে ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে হিন্দুয়ানির বৃহৎ কাঠামোর মধ্যে তুলে ধরে সেই জাতগুলির ভোট লাভ। চিরাগ পাসোয়ান, উপেন্দ্র কুশওয়া, জিতনরাম মাঝি দের দলগুলি এরফলে ভাল ফল করে। মুকেশ সাহানি র নিষাদ ও মাল্লা জাত ভিত্তিক দল ‘বিকাশশীল ইনসান পার্টি (ভি আই পি)’ বিরোধী জোটে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে।
(৬) নির্বাচনী রাজনীতির সফলতম পরামর্শদাতা প্রশান্ত কিশোরের ‘জন সুরাজ পার্টি’ গঠন করে নেমে পড়া এবং বিগত আড়াই বছর ধরে বিহার চষে ফেলা এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করে।
সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বিক্ষোভ নিয়ে বিরোধীদের বিশেষত বিভিন্ন বামপন্থী দের জায়গাটি এভাবে দখল করে নেওয়া হয়। জন সুরাজ এর প্রাপ্ত ৩.৩৪ % ভোট বহু কেন্দ্রে জয় পরাজয়ের পার্থক্য করে দেয়। ভোটের পরপরই প্রশান্ত কিশোরের একদিনের অনশন এবং পুনরায় ‘ঐক্য যাত্রা’র সূচনা শাসক শ্রেণীর বিহারে রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তোলার প্রচেষ্টা।
(৭) বিজেপি সহযোগী ‘এ আই এম আই এম’ এর মুসলমান অধ্যুষিত সীমান্ত অঞ্চলে আসন ধরে রাখা এবং সামগ্রিক ২ % ভোট পেয়ে মুসলমান ভোটের বিভাজন ঘটিয়ে অনেক কেন্দ্রে বিরোধী প্রার্থীদের পরাজয়ে ভূমিকা রাখা।
(৮) সমস্ত মিডিয়া কে নামিয়ে, বিপুল অর্থ খরচ করে বিজেপির নরেন্দ্র মোদির মাহাত্ম্য এবং বিজেপি – জে ডি ইউ জোটের অবশ্যম্ভাবী বিজয়ের প্রবল প্রচার।
(৯) বুথ স্তরে আর এস এস – বিজেপি র শক্তিশালী সংগঠন।
(১০) কেন্দ্রে চারবার মন্ত্রী হয়ে এবং রাজ্যের ২০ বছরের বেশি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের বিহারের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থ ও প্রকল্প সংগ্রহে সফলতা এবং রাজ্যের পরিকাঠামো, আইন শৃঙ্খলা প্রভৃতির চোখে পড়ার মত উন্নতি এবং মহিলা ও পশ্চাদপদ দের উন্নয়ন। বিপরীতে লালু প্রসাদের জঙ্গল রাজের দুঃসহ স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলা।
(১১) নীতিশের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বনাম লালু পরিবারের চারা ঘোটালা সহ চরম দুর্নীতি।
(১২) মুখ্যমন্ত্রীর মুখ হিসাবে তেজস্বীর থেকে নীতিশের অনেক এগিয়ে থাকা।
(১৩) প্রধান বিরোধী দল এবং বিরোধী জোটের প্রধান নেতা হিসাবে ভারতীয় সমাজ – রাজনীতি বিষয়ে এখনও অজ্ঞ ও অদক্ষ থেকে যাওয়া ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ রাহুল গান্ধীর মোদির চাইতে অনেক পেছিয়ে থাকা। তারপর সব কিছু শিকেয় তুলে রেখে রাহুল গান্ধীর ঘন ঘন বিদেশে অজ্ঞাতবাসে চলে যাওয়া।
(১৪) ‘অধিকার যাত্রা’য় কিছুটা সাড়া পেলেও পরবর্তী সময়ে বিরোধী জোটের নিষ্ক্রিয়তা, রাহুল গান্ধীর নিখোঁজ, তেজস্বী যাদবের হাম্বড়াই এবং নির্বাচনের আগে আসন ভাগ নিয়ে বিরোধী জোটের বচসা।
(১৫) আর এস এস – বিজেপির ধারাবাহিক হিন্দুত্ববাদী প্রচার এবং অপারেশন সিঁদুর এর প্রভাব।
(১৬) বিরোধী নেতা কর্মীদের হত্যাকারী মাফিয়া ডন সাহাবুদ্দিনের পুত্র ওসামা সাহেব, মাফিয়া পাপ্পু যাদবদের বিরোধীদের প্রার্থী করা।
(১৭) এরপরও পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা প্রভৃতি রাজ্য থেকে ভোটার ভাড়া করে নিয়ে গিয়ে ভোট দেওয়া।
বিহার নির্বাচনে জে ডি ইউ দের সঙ্গে নিয়ে বিজেপি দেশের দ্বিতীয় জনবহুল এবং পূর্ব ভারতের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য শুধু পুনর্দখল নয় বিরোধীদের ছত্রখান করে দিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে পাঠিয়ে নীতিশ কে হটিয়ে, ভারতীয় নামের পরিবর্তে ইংরেজি নাম দিয়ে প্রথম থেকেই বিজেপি বিরোধী INDIA জোটকে দুর্বল করে রেখেছিল। বিহার নির্বাচনে জোটকে একদম মাটিতে নামিয়ে আনল। এই জোটের স্বাভাবিক মিত্র হওয়া উচিত ছিল সমাজবাদী নীতিশ, মোটেই দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরাচারী লালু – তেজস্বী নয়।
এই নির্বাচন দুর্বল এবং বিভাজিত বামদের আরও দুর্বল করে দিল। সি পি আই এম এল লিবারেশন আরা – ভোজপুর – সিওয়ান মূল কাজের জায়গা থেকে একটি আসনেও বিজয়ী হতে পারলনা। সবমিলিয়ে বামেরা পেল মাত্র তিনটে আসন (লিবারেশন দুইটি এবং সি পি আই এম একটি)।
পাশাপাশি নির্বাচনী কারচুপি রোধে ঐক্যবদ্ধ গণ আন্দোলনের সম্ভবনাও রেখে গেল।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৩ টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছিল ২১৫ টি আসন (৪৮.০২% ভোট), বিজেপি ৭৭ টি আসন (৩৮.১৫% ভোট) এবং আই এস এফ একটি আসন (সিপিআইএম, কংগ্রেস, অন্যান্য দল, নির্দল মিলে ১০.০৪% ভোট)। তৃণমূল শুধু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই নয় ধারেভারে জনসমর্থনে অনেক এগিয়ে ছিল এবং এখনও এগিয়ে আছে। বিজেপির প্রাপ্ত ভোট অনেকটা হলেও সেটা তার নিজস্ব সমর্থনের ভিত্তি নয়, বাম ও কংগ্রেসের থেকে আসা তৃণমূল বিরোধী ভোট। পরবর্তী পাঁচ বছরে দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব ও তৃণমুলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বোঝাপড়ায়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নিষ্ক্রিয়তা ও একের পর এক সচেতন ভুল পদক্ষেপ এবং তৃণমূলের আবদারে দিলীপ ঘোষ, সুব্রত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ তৃণমূল বিরোধী লড়াকু অংশকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় সংগঠন আরও দুর্বল হয় এবং বেশ কিছু নেতা, কর্মী, বিধায়ক, সাংসদ তৃণমূলে যোগ দেন। এই জায়গা থেকে পাটিগণিতের নিয়মে বিজেপির আসন সংখ্যা আরও কমার এবং এরমধ্যে বাম, কংগ্রেস, আই এস এফ বা অন্য দল বা সংগঠন তেমন দাগ কাটতে পারেনি তাই তৃণমূল তার দৈনন্দিন জনসংযোগমূলক কার্যকলাপ, জনবাদী (Populist) কর্মসূচিগুলি চালিয়ে যেতে পারায়, ব্যাপক সংখ্যক গরীব ও নিম্নবিত্ত মানুষের মধ্যে তৃণমূল দল ও প্রশাসন নির্ভর এক অর্থনৈতিক জীবন – জীবিকা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারায় এবং ৪০% মুসলমান ও প্রায় ৫০% পশ্চাৎপদ ও তফসিলিদের এক বৃহৎ অংশের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে পারায় এবং শত দুর্নীতি মিথ্যাভাষণ ছলনা প্রতারণা সত্ত্বেও ধারেভারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারেকাছে কোন জনপ্রিয় বিরোধী নেতা বা মুখ না থাকায় তৃণমুলের আরও বেশি আসনে এবার জেতা উচিত। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে বিহারের মত এত ছোট দল, জাত ভিত্তিক দল, নির্দল, দোদুল্যমান ভোটার নেই যাতে কোন চমক দিয়ে ভোটে জেতার এবং অন্যান্য বিরোধী অর্থাৎ বাম, কংগ্রেস, আই এস এফ এর সঙ্গে জোট করে বিজেপির ভোট বাড়ানোর সুযোগও নেই। এই দলগুলির মূল চরিত্র বিজেপি বিরোধিতা। অন্যদিকে এরা সকলেই মুসলিম ভোটের প্রত্যাশী।
কিন্তু পরিস্থিতি একরকম থাকেনা। বিজেপি ও বিজেপির কেন্দ্র সরকার আইন শৃঙ্খলার কারণ দেখিয়ে কাশ্মীর ও মনিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ধারাবাহিক আইন শৃঙ্খলার সমস্যা থাকলেও এবং একের পর এক বিজেপি নেতা কর্মী আক্রান্ত ও খুন হলেও তারা পশ্চিমবঙ্গে কোন ব্যবস্থা নেননি। মদ বিক্রি ও গৃহ সজ্জায় দুর্নীতির কারণ দর্শিয়ে দিল্লির আপ সরকারকে ফেলে দিলেও হাজারো এবং পাহাড় প্রমাণ দুর্নীতি সত্ত্বেও মমতা সরকার ও তাঁর পরিবারকে কিছু বলেনি। পার্থ, অনুব্রত, জ্যোতিপ্রিয়, শাহাজাহান, সন্দীপ ঘোষ প্রমুখ দুর্নীতির কয়েকজন অপারেটরের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে সামান্য সবক শিখিয়ে ছেড়ে দিয়েছে মাত্রা (অথবা ছাড়ার পথে)। গোয়া, নাগাল্যান্ড, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি রাজ্যের মত ঘুরপথেও এখন অবধি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য দখল করেনি। বরং তিলোত্তমা হত্যাকাণ্ড, নিয়োগ দুর্নীতি, ডি এ মামলা প্রভৃতি চাপা দিতে রাজ্য সরকার কে সাহায্য করেছে। এর কারণ কেন্দ্রে টিকে থাকতে, সারা ভারত দখল করতে, বিরোধী জোটকে এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস কে দুর্বল করতে তৃণমূলের সাহায্যের দরকার ছিল। এখন কিন্তু পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। কেন্দ্রে বিজেপির স্থায়ী সরকার, বেশিরভাগ রাজ্য দখলে এবং বিরোধী জোট ও কংগ্রেস ছত্রখান। আর ‘আর এস এস’ এর এক দিকে অন্যতম তাত্বিক কেন্দ্রভূমি (বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ, শ্যামাপ্রসাদ; আর এস এস প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সরসঙ্ঘচালক হেডগেয়ার কলকাতায় চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার সময় ‘অনুশীলন সমিতি’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকার আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য মুর্শিদাবাদের সারগাছি আশ্রমে ছিলেন) অন্যদিকে মতাদর্শগত প্রধান বিরোধীদের (বাম, জাতীয়তাবাদী, ধর্ম নিরপেক্ষ, নাস্তিক) ঘাঁটি পশ্চিমবঙ্গ দখল করা অনেকদিনের অভীপ্সা। সেই দিক থেকে এবারের ভোট অন্যরকম হতেও পারে, আবার এখনি নাও হতে পারে।
কিন্তু যাইই হোক সহজে পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারকে ফেলা যাবেনা কারণ ২৭ বছর আগে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর নিজের হাতে তৈরি দলের দৃঢ় গণভিত্তি, শক্তিশালী সংগঠন, এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ নেতা ও কর্মীর উপস্থিতি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও লড়াই এর ক্ষমতা, বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে সম্পর্ক এবং উত্তরসূরী হিসাবে ভ্রাতুষ্পুত্র দক্ষ রাজনীতিক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কে তুলে আনা এবং অবশ্যই ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ সহ জনবাদী সরকারি প্রকল্পগুলিতে লাভমান বেশিরভাগ গরীব, নিম্ন বিত্ত মানুষ। অন্যদিকে কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য বিজেপি এমন কিছু করেন নি যাতে মানুষ তাদের ভোট দেবেন। বরং কেন্দ্রের প্রকল্পগুলি আনার পথ সুগম না করে বাগড়া দেওয়া; বি এস এফ কে দিয়ে অনুপ্রবেশ না আটকে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মুসলিম সমাজকে ঘুষপেটিয়া, অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গা বলা; তফসিলি উদ্বাস্তু ও মতুয়া দের প্রতারণা করা, বাঙালি আর বাংলাদেশী এক করে ফেলা; হিন্দু, হিন্দি, নিরামিষ চাপিয়ে দেওয়া; বাংলা ও বাঙালি বিদ্বেষ ইত্যাদি তাদের প্রতি মানুষকে আরও বিরূপ করেছে। সুতরাং সংঘ পরিবার প্রণীত হিন্দুত্ব এবং সম্প্রদায়িক বিভাজন ও মেরুকরণ তাদের হাতে একমাত্র অস্ত্র। কিন্তু তাতেও পশ্চিমবঙ্গের মত উদারতাবাদ ও সহিষ্ণুতার মাটিতে; শ্রীচৈতন্য, লালন, রবীন্দ্রনাথ দের সৃষ্ট প্রেম ও মানবতাবাদী আবহে কতটা চিড়ে ভিজবে সংশয় রয়েছে।
সেই জায়গা থেকে এখন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের এত ‘এস আই আর’ প্রত্যাশা। খেয়াল করে দেখবেন শুভেন্দু অধিকারী অনেকদিন আগেই এক কোটি নাম বাদ দেওয়ার কথা বলেছেন। এস আই আর থেকে নিবার্চন কমিশন যদি এক দেড় কোটি বিরোধী ভোটারের নাম বাদ দিতে পারে এবং সম পরিমাণ duplicate ভোটিং করতে পারে তাহলে একটি সম্ভবনা থাকছে। কিন্তু সেটিও পশ্চিমবঙ্গে সহজে হবার নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তেজস্বী যাদব কিংবা রাহুল গান্ধী নন, তিনি উত্তাল গণ আন্দোলন শুরু করে দেবেন। তাছাড়া এস আই আর এর প্রথম রাউন্ডে তৃণমূল বিজয়ী হয়েছে। তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কিছু মৃত ও ভুতুড়ে ভোটারের নাম বাদ গেলেও এবং বেশ কিছু পরিযায়ী শ্রমিক ফর্ম না তুললেও তৃণমূল সংগঠনকে বুথ স্তরে নামিয়ে তাদের বাদবাকি সমস্ত ভোটারের নাম তোলাতে সক্ষম হয়েছে। মৃত ২৪ লক্ষ, পরিযায়ী, ঠিকানা পরিবর্তন ধরে ৫৮ লক্ষের মত নাম বাদ পড়েছে। বিজেপি অনুপ্রবেশকারীদের নাম কাটানোতো দূরস্থান এমনকি বি এল ও দের সঙ্গে বি এল এ পর্যন্ত দিতে পারে নি, শুধু রাজ্য নেতারা সংবাদ মাধ্যমের সামনে গর্জন করে গেছেন। বাম ও কংগ্রেস রাও বুথ স্তরে নিস্ক্রিয় থেকেছেন। অপরদিকে বি এল ও রা যেমন ছিলেন তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে , তার উপর তাদের কড়া ম্যান মারকিং করে রেখেছিলেন তৃণমূলের স্থানীয় নেতা এবং বি এল এ রা।
এরপরও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে ও পরে অনেককিছু ঘটবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন আরও জনবাদী প্রকল্প ঘোষণা করবেন এবং প্রচারের বন্যা বইয়ে দেবেন, বিজেপিও গীতা পাঠের মত আরও ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করবে এবং প্রধানমন্ত্রী কে দিয়ে প্রচারের ঝড় তোলার চেষ্টা করবে। সম্প্রতি প্রতিবেশী বিহার নির্বাচনে বিপুল জয়, তার আগে প্রতিবেশী অসম ও ওড়িশা জয় এবং অতি সম্প্রতি কেরলের স্থানীয় নির্বাচনে রাজধানী তিরুবন্থপুরম পুরনিগম দখল সহ চমকপ্রদ ফল বিজেপি নেতাদের কিছুটা চাঙ্গা রাখবে। নানারকম নির্বাচনী রণকৌশলের মধ্যে অনবরত লড়াই চলতে থাকবে। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছে আই প্যাকের মত পেশাদার সংস্থা। তবে ঠিক এই মুহূর্তে দুটি বিষয় মমতা দেবীকে কিছুটা বিব্রত রেখেছে।
(১) মুর্শিদাবাদের ভরতপুরের ঠোঁটকাটা তৃণমূল বিধায়ক (অধুনা নিলম্বিত) হুমায়ুন কবীরের বেলডাঙ্গায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ, মুসলিমদের জন্য নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূল দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিসদ্গার। সত্যিসত্যিই যদি হুমায়ুন পশ্চিমবঙ্গের না হলেও মুসলমান প্রধান মুর্শিদাবাদ জেলার ২২ টি বিধানসভা আসনের মুসলিম ভোট একত্রিত করতে অথবা তৃণমূলের মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসাতে পারেন তাহলে আগামী পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
(২) ছোট দুর্গাপুর উদ্বাস্তু ক্যাম্প এলাকা থেকে ক্রমে পশ্চিমের বন্দর এলাকা থেকে মাঝেরহাট, সাহাপুর, নিউআলিপুর, বৃহত্তর টালিগঞ্জ, বৃহত্তর যাদবপুর, ব্রিহত্তর গড়িয়া হয়ে বাইপাশের পূর্ব দিকের অ্যাডেড এরিয়া পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার বিস্তৃত অঞ্চলের বেতাজ বাদশা হয়ে ওঠা বিশ্বাস এন্ড বিশ্বাস কোম্পানির কর্ণধার; পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলেন দাসগুপ্ত, মনীশ গুপ্ত, পার্থ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ দলের হেভিওয়েট নেতাদের সরিয়ে সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করা; নামী থিমের পুজো, টলিউড বিনোদন শিল্প সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিজের বাহুবলে নিয়ে আসা; গোটা পাঁচেক মন্ত্রিত্ব কব্জা করা; শোভন চট্টোপাধ্যায়ের লীলাকলায় যোগদানের পর দলের প্রধান তহবিল সংগ্রহকারী হয়ে ওঠা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত ছায়াসঙ্গী ধুরন্ধর রাজনীতিক অরূপ বিশ্বাসের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি এবং লিওনেল মেসির অনুষ্ঠান পণ্ড করার মূল চরিত্র হিসাবে চিহ্নিত হয়ে পড়া যা শহুরে ও যুব ভোটারদের মধ্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।










