আমি ব্যক্তিগতভাবে অভয়া মঞ্চ এবং পশ্চিমবাংলার চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোর যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক হলেও কোন মঞ্চের প্রতিনিধিত্ব আমি এই কনভেনশনে করছি না। যা বলব তার অনেকটাই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি। অভয়া আন্দোলনে আমার বা আমার সংগঠনের ভূমিকার পিছনে একটা দীর্ঘ ঘটনাক্রম আছে। সত্তর এর দশকের শেষে বাংলার কলেজগুলিতে দলীয় নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীন ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠা, মেডিকেল কলেজে মেডিকেল কলেজ ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। আশির দশকের শুরুতে এবং শেষে অল বেঙ্গল জুনিয়র ডাক্তার ফেডারেশনের আন্দোলন। শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনের সঙ্গে ডাক্তারদের যুক্ত হওয়ার লাগাতার প্রচেষ্টা। ৯০ এর দশকের শেষে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ গড়ে ওঠা। সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ স্বাস্থ্য আন্দোলন ছেড়ে সামাজিক আন্দোলনের আঙিনায় পা ফেলে। পরের দশকে সবার জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে প্রচার আন্দোলনে যুক্ত হয়। ২০১৭- এ মমতা ব্যানার্জি যখন নতুন ক্লিনিকাল এস্ট্যাবলিশমেন্ট একট নিয়ে আসেন, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর আক্রমণ ভয়ানক বৃদ্ধি পায় তখন যে জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টরস তৈরি হয় তার অন্যতম ঘটক সংগঠন শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ।
যে কথা বোঝানোর জন্য এই ভূমিকা করা তা হল আমরা ৯ ই আগস্ট ২০২৪ আরজি করে পা ফেলেছিলাম একটা সংগঠিত শক্তি হিসেবে। মেডিকেল ছাত্র ও জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে সংগঠিত বলতে যা বোঝায় তেমন শক্তি ছিল মূলত মেডিকেল কলেজে। তাদের যোগাযোগে অন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
প্রথমে সাধারণ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা মনে হলেও যেভাবে সর্বস্তরের প্রশাসন অপরাধীদের আড়াল করতে নামে তাতে বোঝা যায় আসলে অভয়ার ধর্ষণ হত্যা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ষণ হত্যা। জুনিয়র ডাক্তারদের লাগাতার কর্ম বিরতি এবং সমর্থনে সিনিয়র ডাক্তারদের মিটিং মিছিলের পাশাপাশি দু-একদিনের মধ্যেই মানুষ পথে নামতে শুরু করেন।
এই আন্দোলন চিকিৎসকদের শুরু করার আন্দোলন থেকে গণ আন্দোলনের চেহারা নেয় ১৪ ই আগস্ট রাত দখলের রাতে। ১৯৪৭ এর পর ভারত এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের সাক্ষী থাকে।
জুনিয়র ডাক্তারদের লালবাজারে অভিযান ও অবস্থান, স্বাস্থ্য ভবন অভিযান ও অবস্থান, প্রশাসনের সঙ্গে কথাবার্তা এবং শেষে অনির্দিষ্টকালীন অনশন। প্রতিটা পদক্ষেপে জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতি আবেগে জনজোয়ার বাড়তে থাকে।
এর পাশাপাশি ঘটে চলা প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোর কথা মনে করুন, ক্রীড়া প্রেমীদের বিক্ষোভ প্রদর্শন, ১ লা ও ২ রা অক্টোবর দুটি মিছিল, ১৫ ই অক্টোবর দ্রোহের কার্নিভাল।
প্রতিবাদীরা দীর্ঘ তিন মাস প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার পর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ২৮শে অক্টোবর গঠিত হয় অভয়া মঞ্চ। অভয়া মঞ্চ অভয়ার বিচার চায়, আরজি করের অভয়া ছাড়া আর যে অভয়ারা নির্যাতিত তাদের বিচার চায়, এমন এক সামাজিক পরিস্থিতি চায় যেখানে কোন অভয়া হবে না। নারী ও প্রান্তিক লিঙ্গ যৌনতার মানুষদের স্বাধীনতা অধিকার ও সুরক্ষা অভয়া মঞ্চের লক্ষ্য। লক্ষ্য রাজ্যকে ভয়ের রাজনীতি মুক্ত করা।
অভয়া মঞ্চ তৈরীর উদ্যোগ নিয়েছিল যে জেপিডি তাদের সাত বছরের অভিজ্ঞতা ছিল দলীয় নিয়ন্ত্রণহীন যৌথ মঞ্চ চালানোর। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য সমর্থক বা সাধারণ চিকিৎসক সবাই এক জোটে লড়াই করেছেন জেপিডির পতাকা তলে।।
অভয়া মঞ্চ অরাজনৈতিক নয়, ভয়ের রাজনীতির বিরোধিতা অরাজনীতি দিয়ে করা যায় না। বলা যায় অভয়া মঞ্চ অদলীয় একটি মঞ্চ। যেকোনো দলের সদস্য বা সমর্থক বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যে কোন মানুষ মঞ্চের উদ্দেশ্যগুলির সঙ্গে একমত হয়ে মঞ্চে থাকতে পারেন। বাস্তবত অভয়া মঞ্চে সংখ্যাগরিষ্ঠ বামফ্রন্টের সমর্থকেরা। বামফ্রন্টের বাইরের বামেরাও আছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়।
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় যখন প্রতিবাদীরা ঐক্যবদ্ধ হতে চান তখন আমরা বলেছিলাম অভয়া মঞ্চের নামে হোক বা অন্য কোন নামে একটা জায়গায় সব প্রতিবাদীদের একটাই মঞ্চ হোক। এমন হয়েছে বৃহত্তর বারাসত অভয়া মঞ্চে, বৃহত্তর বিধাননগর অভয়া মঞ্চে, অভয়া মঞ্চ বৃহত্তর দক্ষিণে..
কিন্তু বামেদের এই ঐক্য গড়ে তোলার পথে বাধা আছে এখনো। বামফ্রন্ট বহির্ভূত একটি বাম দল তারা অভয়া আন্দোলনে আছেন, জুনিয়ার ডক্টর ফ্রন্টের সঙ্গে আছেন, কিন্তু অভয়া মঞ্চে থাকা সবচেয়ে বড় বাম দলের চিকিৎসক নেতার বিরোধিতা করছেন। এর ফল পড়ছে জেপিডি বা অভয়া মঞ্চের সঙ্গে ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়ার ডক্টরস ফ্রন্টের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। বার মাস হতে চলল জে পি ডি ও জে ডি এফ এর মধ্যে অর্থাৎ সিনিয়র ডাক্তার ও জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনের মধ্যে কোন অনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে উঠলো না। এখনো অব্দি আন্দোলনের কর্মসূচি আলাদা আলাদা ঘোষিত হয়। সুলক্ষণ হলো উভয়েই চেষ্টা করে অপরের কর্মসূচিকে ব্যাহত না করতে।
একই সমালোচনা আমার অভয়া মঞ্চে থাকা বড় বাম দলের কিছু বন্ধুদের জন্য, কোন ক্রমেই তারা আগের বাম দলটিকে কাছে টানতে দেবেন না।
দেশের রাজধানীতে সব বাম দলের কেন্দ্রীয় নেতারা একসঙ্গে বিবৃতি দেন, রাজ্যে যুদ্ধ বিরোধী মিছিল হয় একসঙ্গে। কিন্তু অভয়া আন্দোলনে আলাদা আলাদা!?
আমাদের অভিজ্ঞতা কেবল অভয়ার সুবিচারের জন্য প্রচার নয় অন্য অভয়াদের বিচারের জন্য রাস্তায় নামা, থানায় যাওয়া, আদালতে যাওয়ার মধ্য দিয়েই আমরা মানুষের কাছে পৌঁছতে পারি।
আজ যারা এই কনভেনশনে আছেন তারা সবাই অভয়া আন্দোলনের সমর্থক বলে ধরে নিতে পারি। অভয়া আন্দোলন তো আসলে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, সেই ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের বৃত্ত বড় হোক, বন্ধুরা সংখ্যায় বাড়ুক, শত্রুদের শিবির থেকে মানুষ বেরিয়ে আসুক আন্দোলনের টানে। অভয়া মঞ্চের আগামী কর্মসূচি নয় আগস্ট সকালে সুবিচারের দাবিতে রক্ষা বন্ধন এবং বিকেল চারটে হাজরা মোড়ে জমায়েত কালীঘাট চলো স্লোগান দিয়ে। ১৪ ই আগস্ট রাত ন’টা থেকে বারোটা মহিলারা রাত দখল করবেন এমনটা আমরা আশা করি আর রাত বারোটায় স্বাধীনতার পতাকা তুলবেন। এই কর্মসূচিগুলি নিয়ে মতামত শোনার জন্য আর ঠিক ৬ দিন বাদে একই সভা গৃহে একটি নাগরিক কনভেনশনের আহবান করেছে অভয়া মঞ্চ। আপনাদের প্রতিনিধিদের সেই কনভেশনে আমন্ত্রণ জানাই।











