ধ্রুপদী, উচ্চাঙ্গ, রবীন্দ্র ও অন্যান্য সঙ্গীত প্রসঙ্গ ব্যতিরেকে শুধুমাত্র জনপ্রিয় বাংলা সঙ্গীত নিয়েই যদি বলি তাহলে আমরা দেখতে পাবো কুন্দনলাল সায়গল, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্ত, কিশোর কুমার, ভূপেন হাজারিকা, আরতি মুখোপাধ্যায় প্রমুখ দিকপাল কন্ঠ শিল্পীদের বিভিন্ন ধারা ও নিজস্ব গায়কি রয়েছে। আবার এর মধ্যে থেকে যদি গণ ও লোকসঙ্গীতের কথাই ধরা হয় তাহলেও দেখা যাবে নিবারণ পণ্ডিত, বটুক মৈত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সলিল চৌধুরী, আব্বাসউদ্দীন, সুরেশ বিশ্বাস, প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডে, নির্মলেন্দু চৌধুরী, অংশুমান রায় থেকে গৌতম চট্টোপাধ্যায়, সুমন চট্টোপাধ্যায় হয়ে জলি বাগচী, প্রবীর বল, কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যদের বিভিন্ন ধারা ও গায়কি রয়েছে। কিন্তু প্রতুল মুখোপাধ্যায় ছিলেন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন ও অনন্য ঘরানার।
অদ্ভুত এক গায়ক। খালি গলায় মাঠে ঘাটে মিছিলে পথসভা মঞ্চে আড্ডায় নিজে বিভোর হয়ে এবং শ্রোতাদের সুর লহরীতে বিভোর করে গান গেয়ে যেতেন। কোন যন্ত্র অনুষঙ্গ, প্রস্তুতি, সহযোগী দরকার হত না। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এক স্নিগ্ধ বিরল সুর ও ক্ষুরধার অথচ মায়াবী কথা উঠে এসে তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গীতের শ্রোতাদের ঘিরে ফেলত। সঙ্গে সাপুড়ের বাঁশির মত তাঁর সমস্ত শরীর তরঙ্গায়িত হত, আর আন্দোলিত হত শ্রোতাদের মনন। মনে পড়ে এক সন্ধ্যার কথা। প্রবল বর্ষণে কলেজ স্কোয়ারের লিটল ম্যাগাজিন মেলা পণ্ড। কাকভেজা কিছু স্বপ্ন নেভা তরুণ স্টুডেন্টস হলের গাড়ি বারান্দার নিচে জড়ো হয়েছেন। চারদিকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। তরুণদের মধ্যে ভিজে একসার হয়েও পরপর গান গেয়ে তরুণদের উদ্দীপিত করে চলেছেন প্রতুলদা। বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে প্রতুল দার কণ্ঠের “লড়াই করো লড়াই, করো লড়াই, যতদিন না বিজয়ী হও …” তরুণ মননে এক অন্য মাত্রা সংযোজিত করছে।
তাঁর ভুবনবিজয়ী গান ‘আমি বাংলায় গান গাই’ সকলের প্রিয়। তাঁর ‘ডিঙ্গা ভাসাও সাগরে সাথীরে’ কিংবা ‘যেতে হবে দূরে বহুদূরে’ যে কোন অবসাদ অপনোদনের মহৌষধ। এছাড়াও ‘ওঠো হে’, ‘পাথরে পাথরে নাচে আগুন’, ‘ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ’, ‘লাল কমলা হলদে সবুজ’, ‘গিয়েছিলাম পাখির হাটে’, ‘সেই ছোট্ট দুটি পা’, ‘ভয় পাস না ছেলে’, ‘আমরা ধান কাটার গান গাই’, ‘আমার মা গো’, ‘শ্লোগান’ … কত না উদ্দীপনাময়, আবেগঘন, মজার গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গেয়ে তাঁদের আনন্দ দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন। লাল ফৌজের বিজয়রথ নিয়ে মাও সেতুং এর কবিতার সম্ভবত কমলেশ দার (প্রয়াত কবি কমলেশ সেন) বাংলা অনুবাদকে সুরের চাবুকে করে তুলেছিলেন এক আইকনিক গান: “কিসের ভয়? সাহসী মন লাল ফৌজের, লাফিয়ে হই পার … “। অরুণ মিত্র, শঙ্খ ঘোষ থেকে লাংসটন হিউজেস, শহীদ কবি বেঞ্জামিন মোলাইস দের কবিতায় সুর দিয়েছেন, প্রাণ উজাড় করে গেয়েছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় রচিত ‘গোসাই বাগানের ভূত’ চলচ্চিত্রে গেয়েছিলেন।
অবিভক্ত ভারতের অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলায় জন্ম। পিতা শিক্ষক ছিলেন। দেশভাগের পর হুগলির চুঁচুড়ায় চলে আসেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে অধ্যয়ন করেন। পরে তদানিন্তন ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার উচ্চপদে চাকরি করতেন। ‘ ৬০ এর দশক থেকে বিভিন্ন গণ আন্দোলন তাঁকে প্রবল নাড়া দিয়েছে, তিনিও তাঁর মত করে অংশ নিয়েছেন। নকশালবাড়ি কৃষক অভ্যুত্থান তাঁকে খুবই প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের কৃষকদের জমিরক্ষার আন্দোলনে খুব সক্রিয় ছিলেন। ভালবেসে, সৃষ্টির আনন্দে এবং গণ আন্দোলনের প্রয়োজনে ও শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য অবিরাম গান গেয়ে গেছেন কয়েক দশক ধরে। গানের সঙ্গে উপহার দিয়েছেন আদর্শ ও মূল্যবোধের শিক্ষা। দুই বাংলায় কে তাঁর গান গেয়ে নাম করছে, কে তাঁর গান নিজের নামে চালাচ্ছে, কোথায় কত ক্যাসেট বা ডিস্ক বেরিয়েছে, এসবের কপি রাইট কি হবে – এসব নিয়ে তাঁর কোন মাথা ব্যথাই ছিল না।
আপনাদের অনেকের মত সামনে থেকে, দূর থেকে, ঘরোয়া আড্ডায় প্রতুলদার মনমোহিনী সব গান শুনেছি, স্নিগ্ধ হয়েছি। তাঁর সঙ্গে মিছিলে পথ হেঁটেছি। ২০১১ এর পালা বদলের পর অনেকেই নানা অজুহাত দেখিয়ে, ফ্যাসিবাদ প্রতিহত করার মত ভারী কথা বলে, আসলে নানারকম আর্থিক, পদ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিতে কিংবা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে তৃণজীবী হয়ে যান। কিন্তু প্রতুলদার মত সংবেদনশীল, উচ্চ শিক্ষিত, বড় চাকরি করা, আপাদমস্তক ভালো মানুষ এবং সজ্জন ব্যক্তি কিভাবে তৃণজীবী হলেন আমার কাছে কোন ব্যাখ্যা নেই? কিভাবে তাঁর মত মানুষ চোর, ডাকাত, লুঠেরা, প্রতারক, ধর্ষকদের অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দুর্নীতি, গুণ্ডাগদ্দি, মিথ্যা ভাষণ, একনায়কতন্ত্র, অপরাধ – সন্ত্রাসের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিলেন বুঝতে পারিনি। তাই তাঁর কাছ থেকে অনেকেই আমরা সরে এসেছিলাম।
তিনিও উপলব্ধি করতে পারছিলেন। বেশি একটা তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। শোনা যাচ্ছিল না তাঁর নব নব সৃষ্টি। বয়সও হয়েছিল। অগ্ন্যাশয় এর ব্যাধিতে ভুগছিলেন। আজ চলে গেলেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর অন্ত্যেষ্টি করল। সেখানে প্রধান উপস্থিতি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তদানিন্তন বাম সরকারের নিয়োজিত মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার যিনি গণ আন্দোলনের উপর নিষ্ঠুর অত্যাচারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
মাপ করবেন প্রতুলদা। আপনার মত অসাধারণ সৃষ্টিশীল গণশিল্পীর এরকম বিদায় নয়, জনতার আন্তরিক বিদায় পাওয়ার কথা ছিল।
১৫.০২.২০২৫












