শান্তিপুর হাসপাতালে ডাক্তারের ‘অমানবিক’ আচরণ নিয়ে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল ভালোই সোচ্চার। টেলিভিশন চ্যানেলে তো অভিভাবকের ‘বমি পরিষ্কার’ করার ভিডিও সম্প্রচারিত হচ্ছে। বামপন্থী এক দৈনিকে তিন ‘কলাম’ ধরে উল্লেখিত হয়েছে মধ্য রাত্রে এমার্জেন্সি ওয়ার্ডের ঘটনা, সেখানে আবার অভিভাবক জানিয়েছেন ‘চিকিৎসা নিয়ে কিছু বলার নেই, কিন্তু…..’
টেলিভিশন চ্যানেলে এক অতি পরিচিত জুনিয়র ডাক্তারও বললেন এটা উচিত হয়নি, যদিও তিনি হাসপাতালে স্টাফের অপ্রতুলতার কথাও বলেছেন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কথাও বলেছেন কেউ কেউ !একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, প্রগতিশীল – প্রতিক্রিয়াশীল সকলেই ডাক্তারের এ হেন দুর্বিনীত কাজের নিন্দা করছেন প্রায় এক বাক্যে !!
শান্তিপুর হাসপাতালের সুপার নাকি কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়েছেন এবং ‘এনকোয়ারি কমিটি’ও তৈরি করে ফেলেছেন। প্রসঙ্গতঃ, এই সুপারের বিরুদ্ধেই কিছু দিন আগে এক মহিলা ডাক্তার ‘আর জি কর করে দেওয়া’র হুমকির অভিযোগ এনেছিলেন, আর তার জন্যও নাকি তখন একটা ‘এনকোয়ারি কমিটি’ গঠিত হয়েছিল, যদিও তার কী রিপোর্ট হলো কেউ জানে বলে জানা নেই।
সমগ্র বিষয়টা নিয়ে দু একটা কথা বোধহয় বলা উচিত………..
১) এটা ঠিক, এখন সমস্ত ডিপার্টমেন্টের মতো স্বাস্থ্য দপ্তরেও স্থায়ী কর্মী বিশেষতঃ গ্রুপ ডি ও সাফাই কর্মীর নিয়োগ উল্লেখযোগ্য ভাবে কম বা প্রায় নেই। কিন্তু, যখন স্বাভাবিকভাবে নিয়োগ হতো, তখনো কি সবসময় বা মধ্যরাত্রে ডাকলেই সাফাই কর্মী বা সুইপার পাওয়া যেতো? হাসপাতালগুলিতে আমার বেশ কয়েক দশক কাজের অভিজ্ঞতা কিন্তু সেরকম কোনো তথ্য দেয় না। হাসপাতালে সব ওয়ার্ডে আলাদা করে সুইপার রাখা কোনো দিনই সম্ভব ছিল না।জানি না অন্যদের এই বিষয়ে অভিজ্ঞতা কিরকম!
তাছাড়া, যারা হাসপাতালে কাজ করেছে তারা ভালো করেই জানে, সাফাই কর্মীদের আর যাই হোক হুকুম দিয়ে কাজ করানো প্রায় অসম্ভবই ছিল। তাই, থাকলেও মাঝ রাতে ঘুম থেকে তুলে বমি পরিষ্কার করে দিতে বললেই সে করে দিতো, এই ধরণের গ্যারান্টি দেওয়া আদৌ সম্ভবপর বলে মনে হয় না।
২) এক মহিলাকে বলতে শুনলাম আমরা কেন পরিষ্কার করবো, তার জন্য তো সুইপার আছে। বুঝতে পারলাম না, সুইপার কি কোনো মনুষ্যতর জীব?! সে যা পারবে তা বাচ্চার বাবা করলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো?!
‘ট্রেনে বাসে নিজের বাচ্চার বমি পরিষ্কার করেন না?’, এই কথাটা বলে ডাক্তার কী গুরুতর অপরাধ করেছে সত্যিই আমার মাথায় ঢোকে নি।
সত্যি করে বলতে গেলে ঐ ডাক্তারের জায়গায় আমি থাকলেও একই কথা বলতাম যে, ‘আপনি না করতে চাইলে আমাকেই বমি পরিষ্কার করতে হবে’। অবশ্য এটা ঠিক যে, কর্মক্ষেত্রে আমি খুব ভদ্র সভ্য হিসাবে সম্ভবতঃ পরিচিত ছিলাম না।
৩) আমি বুঝতে পারছি না, খবরের কি এতই অভাব ঘটেছে যে একজন নিজের বাচ্চার বমি নিজে পরিস্কার করেছে এটা প্রায় ‘ব্রেকিং নিউজ’ !!
৪) ‘স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়া’র সত্যিই অনেক জাজ্জ্বল্যমান উদাহরণ রয়েছে, দয়া করে তার মধ্যে ‘বমি কেলেঙ্কারি’কে ঢুকিয়ে গোটা বিষয়টাকে লঘু করে দেবেন না।
বাস্তবিকপক্ষে, শান্তিপুর হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে কর্মরত ডাক্তারের আচরণকে আমার কখনই অমানবিক,নির্দয় বা রুচিবিহীন বলে মনে হয় নি, বরং নিতান্তই স্বাভাবিক মনে হয়েছে।
এই সঙ্গে, একটা জিনিস স্বীকার করতেই হবে, আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে, আমাকে এই সময়ে কাজ করতে হয়নি, চাকরিতে থাকতে হয়নি এই রকম বিষাক্ত পরিবেশের মধ্যে!!
আমার সমস্ত সহানুভূতি রইলো আমার থেকে বয়সে অনেক কম ডাক্তারটির প্রতি যাকে ‘ভিলেন’ বানানোর জন্য তৎপর প্রায় সকলেই, দলমত নির্বিশেষে………..










