বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকে থেকে মুনাফা করতে হলে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলিকে প্রধানত দুটি কাজ করতে হয়: (১) বৃহৎ পুঁজি এবং তাদের স্বার্থরক্ষা করে চলা তাদেরই আর্থিক অনুদানে চলা রাজনৈতিক দল এবং সেই দলগুলির সরকার ও তাদের স্বৈরাচারী দুর্নীতিগ্রস্ত ও বেশিরভাগই অদক্ষ-অযোগ্য নেতানেত্রীদের খুশি রাখতে হয়। (২) জনগণকে শোষণ করে বাহ্যিকভাবে জনবাদী (Populist) মর্মবস্তুতে জনবিরোধী এই সমস্ত সরকার এবং তাদের মেগালম্যানিয়াক নেতারা আত্মপ্রচারের জন্য যেসব বিশাল ও ব্যয়বহুল বিজ্ঞাপন দেন, তাছাড়াও যাবতীয় সরকারি টেন্ডার, বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদি পত্রিকার জন্য সংগ্রহ করতে হয়। কার্যত পত্রিকাগুলি বর্তমান ভারতীয় ও পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিতে শাসক স্তুতিময় গদি মিডিয়া তে পর্যবসিত হয়েছে।
এরপরও পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি মালিকাধীন একটি বাণিজ্যিক পত্রিকা এখন অবধি কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখেও নিজস্বতা ও উৎকর্ষ বজায় রেখে চলেছেন। এই পত্রিকাটি ঘোষিতভাবে তার নির্ণায়িত জাতীয়তাবাদ, উদারতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি সংস্কৃতি, পুঁজিবাদের সমর্থক। এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নির্বাচনী রাজনীতিতে বাহ্যিকভাবে যুযুধমান কেন্দ্রের ও রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা দুটি দক্ষিণপন্থী দলের পক্ষে লেখা এবং সমালোচনাগুলি খুব সংযতভাবে কোন তৃতীয় সূত্রের তরফে প্রতিবেদনের ভেতরে রাখা অথবা না রাখা।
এই বহুপঠিত জনপ্রিয় পত্রিকাটিতে ২০২৬ এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দুই পর্ব ভোটের মধ্যে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হল যে দেশের মধ্যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে একবার ভর্তি থাকাকালীন রোগীর বা রোগীর বাড়ির লোকের যে বাজেট বহির্ভূত অতিরিক্ত খরচ (Out of pocket expenditure) হয় সেটির জাতীয় গড় ৩৪,০৬৪ টাকার চাইতে পশ্চিমবঙ্গের গড় ২৬,৪৫২ টাকা অনেকটাই কম। এর কারণ হিসাবে প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৮০% জনসংখ্যার রাজ্য চালিত ‘স্বাস্থ্যসাথী’ বিমা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্তিকরণের উল্লেখ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গবাসীর ক্ষেত্রে এটি কম খারাপ। স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের শাসক দল ভোটের বাজারে এই কৃতিত্ব প্রচারে কার্পণ্য করছে না। কিন্তু যখন কেন্দ্রীয় শাসকদলকে নিয়ে ভীত রাজ্য শাসকদলের আশ্রয়ে থাকা একদা বিপ্লবী ও জনস্বাস্থ্য আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করা ব্যক্তিবর্গ কোন কিছু খতিয়ে না দেখে এই বাণিজ্যিক – রাজনৈতিক প্রচারে ভেসে যায় তখন উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
অতিরিক্ত খরচের কি বা প্রয়োজন?: সরকারগুলির নগ্ন বেসরকারিকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও কর্পোরেটকরণ ড্রাইভের মধ্যেও আমাদের দেশের ও রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা সর্বজনীন, সুবিন্যস্ত এবং নিঃশুল্ক। কেন্দ্রের ও রাজ্যের সংক্রামক-অসংক্রামক প্রায় সমস্ত রোগের প্রতিরোধ, নিরাময় ও নিয়ন্ত্রণের জন্য অজস্র নিঃশুল্ক স্বাস্থ্য কর্মসূচি বহাল। তথাপি প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে কেন বিভিন্ন বেসরকারি চিকিৎসক ও ক্লিনিকের কাছে ছুটতে হয়, অর্থ খরচ করতে হয় এবং বিভিন্ন ওষুধের দোকান (Private Pharmacies) থেকে Over the counter ওষুধ কিনতে হয়?
এবার আসা যাক সরকারি হাসপাতালে দেখানোর ক্ষেত্রে। আউটডোর-এ যদি দেখান, চিকিৎসকের লেখা বেশিরভাগ ওষুধ হাসপাতাল থেকে পাবেন না অথবা চিকিৎসক এমন সব ওষুধ লিখবেন যা হাসপাতালে নেই – দুই ক্ষেত্রেই আপনাকে বাইরে থেকে পকেটের অর্থ খরচ করে ওষুধ কিনতে বা পরীক্ষা করাতে হবে। অপারেশন এবং এমার্জেন্সি র ক্ষেত্রেও রোগীর কোন খরচ হওয়ার কথা নয়। দুই ক্ষেত্রেই বাস্তব রোগীর বাড়ির লোককে তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হবে বাইরে থেকে ব্যয়বহুল ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনার জন্য। অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট দোকান বা ব্যক্তির কথা বলা হবে।
এবার আপনি রোগী ভর্তি করলেন। সমস্তটাই নিঃশুল্ক। অথচ যতক্ষণ রোগী ভর্তি থাকবে প্রতিনিয়ত ওষুধ, পরীক্ষা, সরঞ্জাম আপনাকে কিনেই দিয়ে যেতে হবে বাইরে থেকে। হাসপাতালের নার্স, গ্রূপ ডি, সাফাই কর্মীরা থাকা সত্ত্বেও আপনাকে টাকা দিয়ে স্পেশাল আয়া রাখতে হবে যদিও আপনি ভালো করে জানেন সে একসঙ্গে পাঁচ জনের দায়িত্ব নিয়েছে এবং একজনকেও ভাল করে দেখছে না। আর গেট থেকে ওয়ার্ড প্রতি পদে টাকা দিতে দিতে কত যে খরচ হবে বলবার নয়। আবার এই ভর্তি করার ক্ষেত্রে শাসক দলের প্রভাবশালী নেতার সরাসরি অনুমোদন ছাড়া দালালদের ভাল রকম অর্থ দেওয়া ছাড়া কোনভাবেই ভর্তি সম্ভব নয়। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে রোগীকে মরতে হবে। হাসপাতাল ও রোগীর চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তির ফি ওঠানামা করবে। আমরা যখন এসএসকেএম হাসপাতালে হাউস ষ্টাফ ছিলাম তখন আন্দামান, ত্রিপুরা প্রভৃতি দূরবর্তী রোগীর বাড়ির লোকদের কাছ থেকে ভর্তির অর্থ শুনে চমকে উঠতাম। সেই ট্র্যাডিশন চলছে। এরপর ভাল বেড পেতে, ভাল খাবার পেতে, পরীক্ষা ও অস্ত্রপচারের তাড়াতাড়ি তারিখ পেতে আপনাকে টাকা ঢেলেই যেতে হবে।
এবার আপনাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করছি – সরকারি হাসপাতালের সবটাই যখন জনগণের করের মধ্যে থেকে সংগৃহীত ও সরকারি বাজেটের অন্তর্গত নিঃশুল্ক সেক্ষেত্রে বিমার আবার কি প্রয়োজন?সরকারের নেত্রীর বিমাকরণের প্রতি এত উৎসাহ কেন? ভাবুন।
এবার বলুন কেন্দ্র সরকার যেখানে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প পরিবার পিছু বছরে পাঁচ লাখ টাকা করে স্বাস্থ্য বিমা করে দিচ্ছে সেখানে অর্থ সংকটের মধ্যে সেই টাকা না নিয়ে রাজ্য সরকার নিজে থেকে টাকা বরাদ্দ করে স্বাস্থ্য সাথীর মাধ্যমে একই প্রকল্প পরিবার পিছু বছরে পাঁচ লাখ টাকা করে স্বাস্থ্য বিমা করে দিচ্ছে কেন?
রোগীর হয়তো কোন অস্ত্রপচারের প্রয়োজন আছে, তাতে এমনিতেই সরকারি হাসপাতালে হত। এবার দেখা যাচ্ছে প্রয়োজন না হলেও অস্ত্রপচার করিয়ে ছাড়া হচ্ছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে অবিবাহিত যুবতীদের জরায়ু বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য সাথীর টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এসেছে। সরকারি দালাল সব ব্যবস্থা করবে, ডাক্তার থেকে বিমা কোম্পানি টাকা ভাগ হয়ে যাবে এবং দ্রুত বরাদ্দ পাঁচ লাখ টাকার সদ্ব্যবহার হয়ে যাবে। আর যারা বিমা কোম্পানি গুলিকে এই সোনার খনিতে ডেকে এনেছেন তারা কিভাবে উপকৃত হচ্ছেন কেন্দ্রিয় এজেন্সি গুলি সৎ ভাবে খোঁজ করলে এবং দুবাই থেকে ইউরোপ তাদের বিদেশি একাউন্ট গুলি পরীক্ষা করলে বুঝতে পারতেন।
এবার প্রাইভেট নার্সিং হোম বা হাসপাতালে চিকিৎসা করতে গিয়ে আপনার বহু বিজ্ঞাপিত স্বাস্থ্য সাথী কার্ড দেখান। তক্ষুনি বলে দেবে বেড নেই। শাসক দলের প্রভাবশালী দের মত কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। প্রাইভেট রা এটি করে কেন কারণ তারা আরও ভাল করে করে জানে এটি জুমলা। ঘোষণার সঙ্গে অর্থ বরাদ্দের মিল নেই। তাদের দিক থেকে অলাভজনক। টাকা পাওয়া যাবে না ইত্যাদি।
ফলে কি দাঁড়াচ্ছে: সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে সরকারি অর্থে (জনগণের অর্থে) এই সব লোকদেখানো লাভজনক বিমা প্রকল্প কার্যত জনগণের প্রতি জুমলা।
২৭.০৪.২০২৬











লেখাটি ভালোই । নেতাদের সমালোচনা করে লিখলে সবারই ভালো লাগে। কিন্তু ডাক্তারদের পত্রিকায়, ডাক্তারদের সমালোচনার বিপদ থেকেই যায়। আমি আমার নিজের দুটি অভিজঙতার কথা জানাই ( সভয়ে)। ১) কুড়ি বছর বাইরে কাজ করে একটি মেডিক্যাল কলেজে কাজ করতে এসে, প্রথম ” ডাক্তার আসোসিয়েশন “- এর মিটিং এ গিয়ে একটি আলোচনা আমার মাথায়় ঢুকছিল না। ” আবার Evening Round শুরু করা হোক” , এই কথাটা আমার মোটা মাথায় ঢুকছিল না। পাশের ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে বুঝলাম; ঐ হাসাপাতালে কোন ইভনিং রাউন্ড হয় না। পরের ১৫-১৬ বছরেও সেটা আমি দেখিনি।
২) রাত নটা নাগাদ ইমারজেন্সি ডিউটি করতে গিয়ে দেখি আমার এক ডাক্তার দাদা, হাতে Trop T স্লাইড নিয়ে চুপ করে বসে আছেন। আমি পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন। নিজের Acute Myocardial infarction হলেও, আমি না পৌঁছলে হাসপাতাল ছেড়ে যেতে পারছিলেন না। আমি জোর করে ওনাকে ঐ হাসপাতালেই ভর্তি করে নিই। উনি জানালেন যে, ঐ Cardiology department এ উনি নিজে বছর তিনেক কাজ করেছেন, ওদের ব্যাপার স্যাপার সব জানেন। তবুও উনি ঐ department এর RMO ছেলেটিকে ফোন করে ডেকেছেন। ভর্তির টিকিট হয়ে যাওয়ার পর পরই সেই RMO ছেলেটি এসে হাজির হয়। দাদা ওকে জিজ্ঞেস করলেন, তোদের কোন ভিজিটিং এর আজ Admission date? আমি দেখলাম, RMO ছেলেটি ফোনে ঐ Bed in-charge কে ধরার চেষ্টা করছে। বার তিনেক চেষ্টা করেও তাঁকে ধরা গেল না। ওকে বললাম, Whats app এ একটা মেসেজ পাঠাও। এবার উত্তর এল, ” তুমি তোমার মত চিকিৎসা শুরু করে দাও, আমি বুধবার সকালে গিয়ে দেখব!” ওটা ছিল একটা শনিবার। তবুও দাদাকে বললাম, এই রাত দশটার পর কোথায় ছুটে বেড়াবেন; আজ রাতটা এখানেই থাকুন। পরদিন সকালে দাদা একটি Corporate hospital এ গিয়ে ভর্ত্তি হলেন, সেই দিনই Stent লাগানো হয়েছে। দাদা আর আমি তার বছর খানেকের মধ্যেই চাকরী থেকে অবসর নিয়েছি। নিজের হাসপাতালের একজন সহকর্মী ডাক্তারকে দেখতে যদি চারদিন পর আসবেন জানান, সেই সব বড় ডাক্তারবাবুর উপর সাধারণ মানুষ কি করে ভরসা রাখবে?