জ্ঞানদারঞ্জন বাবু তার মায়ের দেওয়া নামটি সার্থক করতে সদাই উৎসুক ছিলেন। নানাবিধ বিষয়ে লোকজনকে ফ্রিতে জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টায় কোনো বিরতি ছিল না। মুশকিল হল যে লোকজন মূলত অকৃতজ্ঞ ও ফাজিল (বাংলা ফাজিল, আরবী ফাজিল নয়), তারা জ্ঞানদা বাবুর এই মহতী প্রচেষ্টায় মোটেই তেমন সাড়া দেয় নি। তো জ্ঞানদাবাবু একটু মুষড়ে পরলেও ফেসবুক আসার পরে দ্বিগুণ উৎসাহে জ্বলে উঠেছেন। একটি একাউন্ট খুলেছেন এবং বিনে পয়সায় জ্ঞানদান করেই চলেছেন।
পুজো আসলে জ্ঞানদা বাবু তিন গুণ উৎসাহে জ্বলে ওঠেন। মহালয়ার সকাল থেকেই চলতে শুরু করে তার কলম থুড়ি কী বোর্ডে আঙুল। কেন শুভ মহালয়া বলা যাবে না, সেটা যে “শুভ শ্রাদ্ধ” বলার মতোই অমার্জনীয় ভুল – এ নিয়ে নাতি দীর্ঘ নিবন্ধ রচনা প্রকাশ থুড়ি পোস্ট এর পরেই তার নজর চলে যায় আরেক দেওয়ালে। কোন হতভাগা আবার মহালয়াকে মহিষাসুর মর্দিনীর সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। সেই পোস্টে লম্বা একখানা কমেন্ট করে আসতে না আসতেই চোখে পরে আরেক খানা পোস্ট।
তাতে আবার পুজো উপলক্ষেই কড়া হিন্দুত্ববাদী একখান উপাখ্যান। আজন্ম সেক্যুলার জ্ঞানদা বাবু আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বেতার অনুষ্ঠানের মূল কারিগরদের মধ্যে প্রায় সবাই হিন্দু বাঙালি হলেও আবহ সঙ্গীত বাজিয়েদের দলে ঠিক কতজন মুসলিম ছিলেন তার লম্বা লিস্ট পোস্ট করে আসলেন। সঙ্গে ফাউ হিসেবে দিয়ে দিলেন কবে আকাশবাণীতে স্তত্র পাঠ করেছিলেন এক মুসলিম।
মহালয়া থেকে মহা(?) ষষ্ঠী’র দিন পর্যন্ত জ্ঞান বাবুর একটি ফুরসৎ মেলার কথা কিন্তু হতভাগা উত্তর উপনিবেশিকতা বাদী দের জ্বালায় তার জো আছে? পুজো আসলেই পাজীগুলো ইংরেজ তুষ্ট করার নামে দুর্গাপুজো প্রচলন করা মুৎসুদ্দি জমিদার বাড়ির ফিরিস্তি দিতে থাকে অগত্যা তাদের কাউন্টার করার জন্য তাহের পুরের রাজা দর্পনায়ারণ এর পুজো নিয়ে লম্বা একখানা ন্যারেটিভ নামানো ছাড়া জ্ঞান বাবুর আর কোনো উপায় থাকে না।
ষষ্ঠীর সকাল থেকে তো মেইন লাইন বামপন্থী জ্ঞানবাবুর মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। কর্ড লাইন সব সাবওল্টার্ন বামগুলো সেই হুদুর দুর্গা আর আর্য নারী এর হাতে ছলে বলে কৌশলে অনার্য অসুর রাজের নিধন এর হ্যাজ নামাবেই। তাদের কাউন্টার করার জন্য নেবুচাডেনজার আসুরবান্নিপাল থেকে শুরু করে ইন্ডো এরিয়ান পার্সিয়ান থিওরি অবধি লিখে লিখে জ্ঞান বাবুর আঙুল ব্যথা হয়ে যায়।
যতই ব্যথা হোক, বরফ জলে আঙুল চুবিয়ে, ভোলিনি স্প্রে করে জ্ঞান বাবু অপেক্ষা করেন অষ্টমীর সকালের জন্য। কুমারী পূজার ফর্দাফাই করে ভয়ানক নারীবাদী একপিস লেখা না নামানো অবধি জ্ঞানবাবুর শান্তি হয় না।
মাঝখানে সপ্তমীর দিন ভেবেছেন জ্ঞান বাবুর রেস্ট ডে আগে যেমন টেস্ট ম্যাচ এর মধ্যে থাকতো ? মোটেই না। বামপন্থীদের পুজোয় বই এর স্টল দেওয়া নিয়ে দু একটা বিতর্ক থাকবেই। উৎসবের দিনে নাস্তিক মেন স্ট্রিম বামদের এ নিয়ে কটাক্ষ করলে জ্ঞান বাবু একেবারে প্রস্তুত এঙ্গেলস কতবার তার লন্ডনের বাড়িতে ক্রিসমাস উদযাপন করেছেন তার তালিকা নিয়ে লড়ে যাবেন ই। সে সব উদযাপনে মেনু কি কি থাকতো, মায় কত ধরনের সুরা তার তালিকা অবধি তৈরি আছে জ্ঞানবাবু এর কাছে। আর মায়ের দয়ায় নরম দক্ষিণ বা চরম দক্ষিণপন্থীরা যদি বামদের পুজোর দু একটা স্টল ভেঙ্গে ফেঙ্গে দেয় তাহলে তো জ্ঞান বাবুর পোয়া বারো। ওই সব ফ্যাসিস্ট সেমি ফ্যাসিস্ট এটাককে বই পোড়ানোর নাৎসি জার্মান ইতিহাসের সাথে তুলনা করে জ্বালাময়ী লেখা জ্ঞান বাবুর তৈরি।
আবার চলে আসে নবমী। লেটেস্ট বাম রাজনীতি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করা জ্ঞান বাবু জানেন এটাই সুযোগ। ইকো-লেফটদের একমাত্র বাঙালি প্রতিনিধি হিসেবে এটা তার পবিত্র কর্তব্যের মধ্যে পরে যে কলা বউ আসলে যে গণেশের বউ নয়, ওটা নব পত্রিকা, প্রকৃতির আরাধনা, গাছের পুজো সেটা বুঝিয়ে দেওয়ার।
দশমীর বিকেলে সিঁদুর খেলা নিয়ে তৈরি জ্বালাময়ী লেখাটা তৈরি করেও পোস্ট করতে গিয়ে থমকে যান জ্ঞানবাবু। মণ্ডপ থেকে গিন্নি ফিরে এসে সিঁদুর খেলার অবশেষ ধুয়ে মুছে খাবার দাবার বেড়ে দিলে তবেই খেতে পাবেন, মায় প্রেসারের ওষুধটাও গিন্নি খুঁজে সযত্নে বেড়ে দেন। নাস্তিক বাম জ্ঞানবাবুর শরীর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে আসে। থাক তাহলে লেখাটা।
গভীর রাতে বিসর্জন থেকে ফিরে আসা পাড়ার পাঁচুদের অবশিষ্ট চকোলেট বোমা ফাটার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া জ্ঞানবাবু রেগে মেগে বিছানার পাশের টেবিল থেকে চশমাটা তুলে নিয়ে চোখে দিয়ে ফেসবুক খুলে শব্দ দূষণ নিয়ে একখানা যুতসই পোস্ট করতে যাবেন, অমনি চোখ চলে যায় ফিডে বাল্যবন্ধু, যার সাথে পুজোর দিন গুলোতে হাফপ্যান্ট পড়ে ক্যাপ বন্দুক ফাটাতেন, তার ক্যালিফোর্নিয়াবাসী প্রবাসী পুত্র ফেসবুক জানাচ্ছে যে তার বাবা আর নেই। আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতার নামি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ। সেই পোস্টে রিপ লিখতে গিয়ে নাস্তিক জ্ঞান বাবুর আঙুল সরে না, যেন পক্ষাঘাত হয়ে গেছে।
ফেসবুক এর ফ্রেন্ড লিস্টে দুহাজার বন্ধু এর উপস্থিতি নিয়ে বড়াই করা জ্ঞানবাবুর চোখের কোন দিয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরে। পুজোর সময় খুব ইচ্ছে ছিল পুরোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়ার কিন্তু নানান পোস্ট দেওয়াতে মেতে থাকায় আর সেটার জন্য সময় বের করা হয় নি। যাক কে। আসছে বছর এই ভুল আর করবেন না। আবার তো পুজো হবে। ভুলটা শুধরে নেয়ার সুযোগ থাকবে। বিসর্জনের মন্ত্র তো আসলে “পুনরাগমনায় চ”। আবার ফিরে এসো। বাঙালি এখনও ব্যথা পেলে বলে “উফ, মা গো।”










😄😁🙄👌💐 কি লিখব!!
এ যে ঝেড়ে ধুয়ে কাপড় পরানো। good written
লেখাটা ভালো লাগলো। একটু বানানের দিকে নজর দিলে আরও ভালো লাগত।