ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাসে, প্রত্যাশিতভাবে – এবং যথোচিত কারণেই – সমাজমাধ্যম ভেসে যাচ্ছে।
একাধিকবার কাছাকাছি এসে ফস্কে যাবার পর এবারে কাপ হাতে এলো – এখনকার মেয়েরা পূর্বসূরিদের ডেকে নিলেন সেলিব্রেশনের সময়, সিনিয়ররা নিজেদের প্রাপ্তির অপূর্ণতাটুকু মুছে ফেললেন জুনিয়রদের জয়ের আনন্দে সামিল হয়ে – খেলা শেষের পরের এই দৃশ্যগুলো অনেক অনেএএক বছর আমাদের মতো কারও কারও স্মৃতিতে রয়ে যাবে।
মেয়েদের সাফল্যে এই এত এত পুরুষ এমন করে উচ্ছ্বসিত – এটুকু দেখতে পাওয়াও কম বড় পাওনা নয়।
তবু কুচুটে মনে খুঁতখুঁতানি জাগে – দেখুন, সাফল্যের মতো চমৎকার রকমের সফল তো আর কিছুই নয় – কিন্তু সেমিফাইনালের আগে, শুরুর দিকে ম্যাচগুলোর পর, এই সমাজমাধ্যমেই, মহিলা ক্রিকেট দল নিয়ে যা যা মন্তব্য দেখেছি, তাতে মেয়েরা বিশ্বকাপ খেলে পুরুষতন্ত্রের মুখে থাপ্পড় মারতে পারছেন এমন পর্যবেক্ষণ তো শুনিনি! তবে কি গ্রাম-মফস্বল-শহর থেকে যে মেয়েরা সমাজের ট্যারাদৃষ্টি অতিক্রম করে জাতীয় দলে খেলতে এলো – এবং যারা লড়াই করেও এতদূর আসতে পারল না – বিশ্বকাপ না জিতলে তারা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক (নাকি পিতৃতান্ত্রিক) মনোভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তা প্রমাণ হতো না?
মানে, রাত বারোটা নাগাদ খেলা শেষ হলে জনৈকা মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য উদ্ধৃত করে শ্লেষের সুরে নির্মিত প্রশ্ন – মেয়েরা এত রাতে বাড়ির বাইরে কী করছিল? – এবং উত্তরে – কেন? বিশ্বকাপ জিতছিল! – বিশ্বকাপ না জিতলে, পরের উত্তরটুকু না দেওয়া গেলে, আগের প্রশ্নটা হজম করে নিতে হতো? দেখুন, পিতৃতান্ত্রিকতার হাত এতই প্রবল যে জনৈকা নারী এমনকি প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে পৌঁছানোর পরেও পুরুষের সুর ভিন্ন অন্যসুরে কথা বলতে পারেন না, সেই সর্বব্যাপী প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াইটা কি অস্বীকৃত রয়ে যেত, গতকাল যদি মাঠের মধ্যে ওই এগারোটা মেয়ে একটি খেলায় বিচ্ছিরিভাবে হেরে যেত?
হ্যাঁ, যেকোনও লড়াইয়ের ক্ষেত্রেই, প্রতিটি সাফল্য পরের মানুষের লড়াইয়ের পথটা আরেকটু সহজ করে। সেটা খুব কম পাওনা নয়। আবার মারাত্মক বড় কিছু পাওনা, এমনও তো নয়। নারী যখন বিপণনের বস্তু, তখন নারীর সাফল্য বিপণনের নতুন উপাদান হয়ে যেতে পারে – যায়ও – তা পিতৃতন্ত্রের সামনে নতুন সুযোগ তৈরী করতে পারে – এক্ষেত্রে তা করবে কি? মেয়েদের এই অবিস্মরণীয় সাফল্য মেয়েদের খেলাধূলা তথা মেয়েদের প্রয়াসের জন্য নতুন দরজা খুলে দিতে পারে, অবশ্যই – আবার… নাহ্ থাক, আনন্দের মুহূর্তে এত সাবধানবাণী উচ্চারণ করার মানে হয় না।
শুধু বলি, যদি পারেন, চেষ্টা করুন চেষ্টার পাশে থাকার, লড়াইয়ের পাশে থাকার – এবং যারা সেই লড়াইয়ের বিরুদ্ধতা করছে, তাদের বিরুদ্ধে থাকার। পুরুষ কিংবা নারী – যারা লড়াই করছে, যারা নিজেদের প্যাশন নিয়ে লড়ে যাচ্ছে, যারা সবকিছু তুচ্ছ করে লড়ে চলেছে – মনে রাখুন, মোটিভেশন-মূলক গ্রন্থাবলীতে যা-ই লেখা থাকুক, এমন একবগ্গা লড়াইয়ের পরেও অধিকাংশ লড়াকু মানুষ সাফল্যের দেখা পান না – তাঁদের সেই লড়াইগুলোর পাশে থাকুন, তাঁরা ব্যর্থ হলেও সেই ব্যর্থতার মুহূর্তে মানুষগুলোর পাশে থাকুন – এবং ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতা নিয়ে যারা খোঁটা দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে থাকুন। সবসময় যদি সরব হতে না পারেন, অন্তত মনে মনে থাকুন।
মনে রাখুন, নিজের আবেগের কথা শুনে, সহজ ও বাজারচলতি পথ বাদে অন্য পথে চলার চেষ্টা করার মতো সাহস, বা দুঃসাহস, যাঁরা দেখিয়েছিলেন – যেটা হয়তো আপনি নিজে পেরে উঠেননি – তাঁরা শ্রদ্ধেয়। সাফল্যই আসুক কিংবা ব্যর্থতা, শ্রদ্ধাটা তাঁরা ডিজার্ভ করেন। এটুকুই বলার।











