হাঙ্গার স্ট্রাইক। ভুখ হরতাল। অনশন আন্দোলন। যে নামেই ডাকুন না কেন এটিকে, এই একটি বিশেষ পদ্ধতি বরাবরই ‘সরকার’, ‘শাসক’, ‘রাজা’ র জন্য সবিশেষ অস্বস্তির কারণ। বা বলা ভালো যে, অন্তত ছিল– কারণ; অস্বস্তিতে পড়বার। ঢোঁক গেলার। নড়েচড়ে বসার। শাসকের। ছিল ছিল ছিল। বরাবরই। আবহমান-কাল ধরেই।
কিন্তু কেন? অস্ত্র নয়, শস্ত্র নয়, নখ দাঁত বা এমনকি মুঠো করা হাতও নয়। সবচাইতে অস্বস্তি এই আমরণ-অনশনেই। আশ্চর্য না? নাঃ, মোটেও আশ্চর্য না এটা। আচ্ছা বুঝিয়ে বলি বরং ।
খুবই অপ্রাসঙ্গিক এবং ফালতু টাইপের একটা উদাহরণ-সহ বলি আমি শুনুন। বুঝাইয়া। হ্যাঁ, পুনর্বার সতর্ক করা প্রয়োজন এমত যে, যে উদাহরণটি আমি পেশ করিতে চলিয়াছি তাহা, একেবারেই সস্তা। বর্তমানের সহিত তাহার তুলনা করা একপ্রকার মহা-পাপের সমতুল্য। বুঝিয়াছেন? বেশ। মনোনিবেশ করুন এইবারে তবে–
ধরুন একজন তস্কর। অর্থাৎ মামুলি ছিঁচকে চোর একজন। চুরি করতে গিয়ে সে ব্যাটা একদিন ধরা পড়লো গেরস্থের বাড়িতে বমাল। এক্কেবারে যাকে বলে–ক্যাচ কট কট। চুরির মালপত্তর সমেত, চোরব্যাটা পাকড়াও হলো হাতেনাতে। অতঃপর…,যা হয় আর কি! সুসভ্য সমাজে! চোর বাবাজিকে জমা করে দেওয়া হলো আইন-রক্ষকদের জিম্মায়। বিচার হলো তার ‘All rise’ ধর্মাবতারের ন্যায়ালয়ে। দোষও প্রমাণ হলো নির্ভুল। এবং সাজা হলো তিন মাসের জেল, দেড়শত টাকা জরিমানা। অনাদায়ে, আরো পনেরো দিনের জেল-হাজত এক্সট্রা।
সব মিলিয়ে মামুলি বিষয়। পেটি-কেস। আকছার ঘটে, ঘটেই চলে যেমত। তাই তো! তাই না! কিন্তু গোলটা বাঁধলো এরপর-পরই। চোর বাবাজীবন জেলে গিয়েই আচমকা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিলেন। বললেন, অবিচার হয়েছে নাকি তাঁহার উপরে। এবং সেই অবিচারের বিরুদ্ধেই এই প্রতিবাদ। একদিন গেল, দুই দিন গেল, চার, সাত, একুশ দিনও গেল পেরিয়ে। সান্ত্রী এসে খটাস স্যালুট ঠুকে বললো কারাধ্যক্ষকে– হুজুর, চোরটা তো মরে যাবে হুজুর মনে হচ্ছে হুজুর।
জেলার সাহেব বেঁকা হাসলেন যদিও,- ধ্যাস চোর মরলো তো বয়েই গেল। মরতে দাও। ফোটো দেখি এখন মানেমানে তুমি! যাও!
তা, চলে গেল বটে সান্ত্রী। এবং সান্ত্রীও চলে গেল আর সেই দিনের ভোরেই মরে গেল চোরটি। হুলুস্থুল বেঁধে গেল মুহূর্ত থেকেই।
কেন? কারণ একটা মানুষ না খেয়ে খেয়ে, স্বেচ্ছায় তড়পে তড়পে মৃত্যুবরণ করলো যখন, তখন আলবাত এ লোকটার প্রতিবাদের যুক্তি আছে কিছু না কিছু একটা।
– জেলের পরিবেশ দূষিত। এই পরিবেশে মানুষের সংশোধন তো দূরস্থান, কুকুরও বেঁচে থাকতেও পারে না একদিনের বেশি। তার বিরুদ্ধেই তস্কর-বাবুর প্রতিবাদ ছিল এটা।
বললো, অ- সংবাদপত্র।
– একটা লোক না খেতে পেয়ে ধুঁকছে অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার হর্ম্য-হাঁকিয়ে বিলাস করছে কিছু হাতে গোনা লোক। চুরি করবে না তো কী করবে? এটাই, তস্কর-চূড়ামণির প্রতিবাদের প্রধান কারণ।
বললো, আ–মিডিয়া।
আচমকা দেশ জুড়ে দেখা গেলো অসংখ্য জনতাকে যাদের বুকে লেখা– মেরা বাপ চোর হ্যায়। গান লেখা হলো– বেশ করেছি, বেশ করেছি, নিজেকে নিজেই আমি শেষ করেছি। আর সামান্য তস্কর চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে হয়ে গেলেন দ্রোহী। শহীদ। বিপ্লবী।
আর গদি টলমল করছে দেখে রাজাকে বাধ্য হয়ে নিজের রাজসভায় পাস করাতে হলো, কারা-সংশোধনী বিল( জেলখানার পরিবেশ উন্নতি প্ৰকল্প)। ক্রোক করতে হলো বেশ কিছু বেমক্কা-বড়লোকের সম্পদ। আর লজ্জার মাথা খেয়ে নিজের রাজ্যেই ফিতে কাটতে হলো, তস্কর-মূর্তির।
অর্থাৎ, অনশন বেশ ভয়ের বটে। সে অনশন অকারণ বা অযৌক্তিক হলেও।
******
আর ঠিক এ কারণেই বরাবর এসবকে এড়িয়ে এসেছে সভয়ে সরকার। ব্রিটিশ নাগরিক ম্যারিয়ন ডানলপ একশত খানিক বছর পূর্বে, 1909 এ যখন আচমকা অনশন শুরু করেছিলেন– রাজনৈতিক-বন্দী স্ট্যাটাস পাওয়ার জন্য তখন তড়িঘড়ি তাঁকে এ জন্যই মুক্ত করেছিল তৎকালীন বিলেতি-সরকার। আর সেই দেখে বাকি কয়েদীরাও যখন শুরু করলো হাঙ্গার স্ট্রাইক তখন তাদের নাকে নল গুঁজে জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া শুরু হলো খাদ্য। মোটমাট কথা, এসব অনশন-ফনোশন বরদাস্ত করা যাবে না মোটেই। এ বড় অস্বস্তির। এসব মানুষকে, মুখহীন জনতাকে, ভোটব্যাংককে…প্রশ্ন করার, আঙুল তোলার সাহস যোগায়। আন্দোলন গড়ে তোলে অচলায়তনে।
হ্যাঁ, ইতিহাস সাক্ষী যে ,এ ঘটনার বছর বিশেক পরে, অর্থাৎ 1929 সালে, 1909-এ ঘটে যাওয়া এই ডানলপের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্রিটিশ-বেনিয়ারা নল গুঁজে খাদ্য ঢোকাতে চেয়েছিল যতীন নামক বাঙালির পেটের পাকস্থলীতে। হয়নি সফল। যতীন দাস মরে গিয়েছিলেন। আর তার ফলাফল দেখুন। ভালো করে দেখুন। চোখ কচলে। অনেক মেট্রো স্টেশনের নাম স্পর্ধাভরে পরিবর্তন করে ফেললেও ‘যতীন দাস পার্ক’ স্টেশনটির নাম এখনো পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি । আজও। যতীনের কারা-যাপনের আরো একশত বছর পরেও।
হ্যাঁ! এই হলো অনশন আন্দোলনের জোর। তাকৎ। ক্ষমতা।
ফ্যালফ্যাল করে কোটরে ঢুকে যাওয়া দুটো চোখ যখন মরতে মরতে মরতে মরেই যায় পুরোপুরি তখন কায়ামত আসে ‘শেষের সে দিন’ ভয়ঙ্কর হয়ে যাওয়ার বহু বহু আগেই।
****
অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা হলো। ফেলে দিন। ফেলে দিন। ফেলে দিন সেসব সটান,– উপচে পড়া পুতিগন্ধময় ডাস্টবিনে।
আসুন এই ক্ষণে আমরা দুই হাজার চব্বিশ সন দেখি চোখ বড়বড় করে। চিমটি কাটি। হাতে। ভাবি, যা হচ্ছে তা কি সত্যিই হচ্ছে? হতে পারছে? এখনো কি সত্যিসত্যিই মাথার উপর আবর্তিত হচ্ছে চন্দ্র-সূর্য-তারা! হতে পারছে! আমরা, রাজাকে ক্ষমতায় বসাই যারা তারা, এতটা অ-মানুষ হলাম বা হতে বেছে নিলাম…. কবে! কেন! কী প্রকারে!।
আসুন প্রত্যক্ষ করি এক আশ্চর্য যুগসন্ধিক্ষণ, শ্বাস বন্ধ করে।
এতদিন অনশন-আন্দোলন বিষয়টি শাসকের চেয়ারে বিঁধে থাকা চোরকাঁটার মতই খচখচ করতো, করে এসেছিল….করেই যেত। বরাবর। এরকমটাই হতো। মানবের, জনতার , আমার-আপনার মানবিক বৃত্তি বারবার বুঝিয়ে এসেছিল এরকমটাই।
কিন্তু ওই যাঃ! ওই ওই ওই…ধরুন ধরুন ধরুন ডানা চিপে…ধ্যাৎ! পারলেন না তো! বেশ! তাহলে ভোগ করুন। যোগ করুন নিজের ডায়েরিতে যে এই যে এই দুর্গোৎসবে সবটা বদলে গেল। আমরা হারিয়ে ফেললাম ‘অনশন’ নামক ভোঁতা অথচ কার্যকরী অস্ত্র।
******
এ এক আশ্চর্য যুগ সন্ধিক্ষণের সাক্ষী থাকছি আমরা। আমরা যারা, পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণের ডায়মন্ড রিং দেখেছি। আমরা যারা, হেল-বপ ধূমকেতুর ল্যাজ দেখেছি সন্ধ্যার আকাশে। আমরা যারা দেখেছি– সুনামি, কিম জং, থ্রি ডি সিনেমা, y2k, টুইন টাওয়ার্স, এবং কোভিড নামক কল্পবিজ্ঞান দুনিয়া।
সেই আমরাই এবার নতুন জিনিস দেখব।
আসুন, হাত ধরে দেখাই। দেখুন। দেখুন। দেখুন না, চোখ তাকিয়ে! ওকি! লজ্জা পেলেন! ধ্যাস! আসুন, লজ্জা পাবেন না! আসুন না আমার জাদু-মানিক, আমার সোন্টামনা, দেখুন এবং স্বীকার করুন না যে–
সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত কারণে, আমার-আপনার সকলের জন্য অনশন করছে যে ছয় সাতটি যুবক যুবতী…তার ফার্লং, কয়েক মিটার দূরেই আমরা যাপন করছি গত বছরের রেকর্ড ভাঙা উৎসব।
শাসকের আর অস্বস্তির কারণ নেই।
আমরা, অভিযোজিত হয়ে গেছি।
অতএব যা হবে এরপর ধরে নেবেন সেসব এই আশ্চর্য নির্লজ্জ অভিযোজনের মাশুল।
(নিচের কোটেশনটা জোকারের। গথামের জোকারের। যে বেচারি Folie à deux এ ভুগতো। এ এক আশ্চর্য মানসিক ‘রোগ’। যেখানে একাধিক ব্যক্তি একই দুঃস্বপ্নে ভুগে চলেন।
আমি চাই এটাই কোভিড পরবর্তী বেমারি হোক সর্বগ্রাসী। সুদিনের দুঃস্বপ্ন যেন ধ্বনিত হয় প্রতিটি প্রাণীতে।)










