আর্থ – রাজনীতি, সমাজ – সংস্কৃতি, প্রকৃতি – পরিবেশ প্রভৃতির বিরাট পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চারপাশের দুনিয়াটাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চমক, আনন্দ, ঘটনা সবই যেন ক্ষণস্থায়ী। আজ যে কেন্দ্র বাজেট নিয়ে আলোচনা আগামীকালই হয়তো অন্য কোন আলোচনার ইস্যু চলে আসবে। তথাপি বাজেটপূর্ব আর্থিক সমীক্ষার একটি বিশ্লেষণ প্রচলিত ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভোটকেন্দ্রিক জনমোহিনী খয়রাতি প্রকল্পগুলির কঙ্কালকে উন্মোচিত করেছে।
তৎকালীন অন্ধ্রপ্রদেশের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী এন টি রামা রাও ১৯৮৩ তে দারিদ্রসীমার নিচে থাকা পরিবার এবং মাসিক ৫০০ টাকার নিচে আয় কৃষি শ্রমিকদের জন্য পরিবার পিছু দু টাকা কিলো দরে চাল এবং ‘ এন টি আর ক্যান্টিনে ‘ তিন টাকায় দইভাত (দক্ষিণ ভারতের প্রচলিত ও জনপ্রিয় আহার) এর ব্যবস্থা করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। এরপর তামিলনাড়ুর ছয় বারের মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতা ১৯৯২ তে ঐতিহাসিক ‘ Cradle Baby Scheme’, তারপর থেকে একের পর এক ‘Tamilnadu Village Habitation Improvement Scheme’, ‘ Girl Child Protection Scheme ‘, গ্রামাঞ্চলে বিনামূল্যে গরু, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি বিতরণ প্রভৃতি প্রকল্প রূপায়ণ করে সাড়া ফেলে দেন। ২০১৩ তে তিনি তামিলনাড়ু জুড়ে যে ‘ আম্মা ক্যান্টিন ‘ প্রকল্প চালু করেন তাতে এক টাকায় ইডলি, তিন টাকায় দইভাত ও পাঁচ টাকায় সম্বর – ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এই প্রকল্পগুলি ‘ জারজ ‘ সন্তানদের পুনর্বাসনে, কন্যা সন্তানদের বিকাশে এবং গরীব ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির
জীবনধারণের সুবিধা করে দেয়, অন্যদিকে নিবার্চনে ‘ তেলেগু দেশম ‘ ও ‘ এআইডিএমকে ‘ – রও সুবিধা করে দেয়। এরপর তাঁদের দেখাদেখি অন্য রাজ্যগুলিও এই ধরনের বিবিধ প্রকল্প রূপায়ণ করতে শুরু করে।
ক্রমে রাজ্যগুলি এবং ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে প্রকল্প নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। আরও জনপ্রিয়তা পেতে এবং ভোটে জিততে এরপর Conditional Cash Transfer (CCT) থেকে তারা Unconditional Cash Transfer (UCT) এ চলে যেতে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের ‘ লক্ষীর ভাণ্ডার ‘, মধ্যপ্রদেশের ‘ লাডলি বহনা যোজনা ‘, মহারাষ্ট্রের ‘ লড়কি বহিন ‘, বিহারের ‘ জীবিকা দিদি ‘, অসমের ‘ বিহুর উপহার ‘, কেন্দ্রের ‘ প্রধানমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা ‘ পরপর রূপায়িত হয়ে জনপ্রিয়তা পায়, পাশাপাশি ভোটের বাক্সও ভরিয়ে দেয়। অবস্থা এমনি দাঁড়ায় যে রাজনৈতিক নেতারা কুর্সি ও ক্ষমতা ধরে রাখতে এরকম একের পর এক জনমোহিনী (Captivating) বা জনবাদী (Populist) প্রকল্প নিয়ে চলতে থাকেন। দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থায় তারা এতদিন বাজার থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চালাচ্ছিলেন, কর্মীদের মাইনে দিচ্ছিলেন, এবার ঋণ নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি এবং শেষমেষ ঋণ নিয়ে এই ধরনের খয়রাতি প্রকল্প চালিয়ে যেতে থাকেন।
ফলে যেটা দাঁড়ায় চক্রবৃদ্ধি হারে সরকার এবং দেশ ও রাজ্যগুলির নাগরিকদের ঋণ বেড়ে চলে। ২০২৫ – ‘ ২৬ আর্থিক বর্ষে এই খয়রাতি প্রকল্পগুলিতে ব্যয় হয় ১.৭ লক্ষ কোটি টাকা যা রাজ্যগুলির জিডিপি এবং বাজেটের যথাক্রমে ১.২৫% ও ৮% পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তামিলনাড়ু (৯.৬ লক্ষ কোটি টাকা), উত্তর প্রদেশ (৮.৬ লক্ষ কোটি টাকা), মহারাষ্ট্র ৮.১ লক্ষ কোটি টাকা), কর্নাটক (৭.৩ লক্ষ কোটি টাকা), পশ্চিমবঙ্গ (৭.১ লক্ষ কোটি টাকা) ক্রমশ ঋণের গভীর খাদে ডুবে যায়। ঋণবৃদ্ধির বার্ষিক চক্রবৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে যায় ছত্তিশগড়, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গ। ঋণ – জি এস ডি পি এর একদম শীর্ষে চলে যায় পশ্চিমবঙ্গ। এর ফলে রাজগুলির আর্থিক কঙ্কাল বেআব্রু হয়ে পড়ে যা সরকারি কর্মচারীদের ডি এ প্রদান থেকে বিরত থাকা থেকে নিয়োগ সংকোচন থেকে প্রতিটি সরকারি উন্নয়নমূলক ও পরিকাঠামোগত কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রকল্প বাতিল অথবা ব্যয় সংকোচ বা কাটছাঁটে পর্যবসিত হয়। প্রকৃত ও প্রযোজনীয় উন্নয়ন ও বৃদ্ধি ব্যহত হয়। পাশাপাশি বর্তমান ও ভাবী প্রজন্মগুলি অনাবশ্যক ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে উপভোক্তা পরিবারগুলির রোজগার কিছুটা বাড়লেও এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাৎক্ষণিক কিছুটা সুরাহা ও সংস্থান হলেও এই অর্থ স্থায়ী আমানত ও সম্পদ সৃষ্টি করতে অনেকক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয় এবং অনেকক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক খরচ, অপ্রয়োজনীয় খরচ বা ভোগ্য পণ্য ক্রয় কিংবা বিনোদনে ব্যয় হয়ে যায়। উপভোক্তাদের মধ্যেও কাজের বাজারে অংশ না নেওয়া, নিজেদের কর্ম দক্ষতা না বাড়ানো, নিজেদের রোজগার না গড়ে তোলা, অনুদান ও ডোল নির্ভর অলস জীবনযাত্রার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে স্থায়ী অর্থ ও মানব সম্পদ গঠন বাধাপ্রাপ্ত হয়। পরিকাঠামো গঠন সহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, মানব উন্নয়ন প্রকল্পগুলিতে বরাদ্দ কমে গিয়ে সুস্থায়ী ও সর্বজনীন উন্নয়ন ও বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার বিশ্বায়নের কারণে আন্তর্জাতিক ঋণ দাতা সংস্থাগুলি কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির রুগ্ন কোষাগার যাচাই করে ঋণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ বৃদ্ধি করে, ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে, ঋণ পত্রে বেশি সুদ গুনতে হয়। সুতরাং দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্য , শিক্ষা, গণ পরিবহন, পরিকাঠামো উন্নয়ন সহ সর্বজনীন উন্নয়নের এবং রাজকোষের ক্ষতি না করে আর্থিক ক্ষমতার মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে (Targeted) প্রকল্পগুলি বিবেচনা ও গ্রহণ করা উচিত।
এবার আমরা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে Targeted এবং Conditional Cash Transfer এর কয়েকটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরব। (১) ভারত (জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি, বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে জনবহুল দেশ; মোট জিডিপি পিপিপি ১৭.৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার, বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় স্থান; জনপ্রতি জিডিপি ১২,১৩২ ডলার, বিশ্বের মধ্যে ১১৯ তম স্থান); (২) ব্রাজিল (জনসংখ্যা ২১.৩৪ কোটি, বিশ্বের মধ্যে সপ্তম; মোট জিডিপি ৪.৯৭ ট্রিলিয়ন ডলার, বিশ্বে অষ্টম; জনপ্রতি জিডিপি ২৩,৩১০ ডলার, বিশ্বে ৭৮ তম); (৩) মেক্সিকো (জনসংখ্যা ১৩.১৯ কোটি, বিশ্বে ১০ম; মোট জিডিপি ৩.৪০ ট্রিলিয়ন ডলার, বিশ্বে ১৩ তম; জনপ্রতি জিডিপি ২৫,৪৬৩ ডলার, বিশ্বে ৭৫ তম) এবং (৪) দক্ষিণ আফ্রিকা (জনসংখ্যা ৬.৩০ কোটি, বিশ্বে ২৩ তম; মোট জিডিপি ১.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার, বিশ্বে ৩৩ তম; জনপ্রতি ১৬,২৮০ ডলার, বিশ্বে ১০৭ তম) – চারটি তৃতীয় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ যেখানে দারিদ্র, অশিক্ষা, অপুষ্টি, স্বাস্থ্যহীনতার সঙ্গে লড়াই জারি রয়েছে। চারটি দেশই সামগ্রিকভাবে বড় অর্থনীতি ( ভারত প্রকাণ্ড) হলেও মাথাপিছু আয় ধনী ও উন্নত দেশগুলির তুলনায় কম, দারিদ্র প্রকট। এর মধ্যে আর্থিক বৈষম্য ও দারিদ্র ভারতে অনেক বেশি, মানব উন্নয়ন সূচক গুলিতেও ভারত অন্যদের থেকে অনেক পিছিয়ে। ভারতের মোট সম্পদের ৯০%, ১০%ধনী ব্যক্তির কাছে পুঞ্জীভূত এবং ১% অতি ধনী পরিবারের কাছে অতি পুঞ্জীভূত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ‘ নিটি আয়োগে’ র ভাষায় Aspirational category তে জায়গা পেয়েছে (জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি, দেশের মধ্যে চতুর্থ স্থানে; মোট জিডিপি ২২০ বিলিয়ন ডলার, দেশের মধ্যে ষষ্ঠ; জিডিপি জনপ্রতি ২০০০ ডলার, দেশের মধ্যে ২০ তম) এবং বিপুল জনসংখ্যা, বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশ দেশগুলি থেকে ক্রমাগত অভিবাসন, শিল্পে সংকট, কৃষিতে স্থিতাবস্থা, কর্মসংস্থানের অভাব, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হানাহানি, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি, জলবায়ুগত সমস্যা ও সংকট, পরিকাঠামো ও পরিষেবাগত দুর্বলতা ও দুরবস্থা, অবহেলিত ও বেহাল শিক্ষা স্বাস্থ্য ও গণ পরিবহন ব্যবস্থা প্রভৃতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী একটি চ্যালেঞ্জিং রাজ্য। সামগ্রিক নীতি কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে এই বাস্তব পরিস্থিতিগুলি অবশ্যই বিবেচ্য।
১৯৯৭ সালে মেক্সিকোর ‘ Institutional Revolution Party (PRI) ‘ এর তরফে নির্বাচিত অর্থনীতিবিদ প্রেসিডেন্ট আর্নেস্তো জেডিলো পন্সে দেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিরাজমান দারিদ্র প্রশমন ও দূরীকরণের লক্ষ্যে PROGRESA (Programa de Educacion, Salud y Alimentacion) পথনির্দেশক প্রকল্প টি চালু করেন। এটি সরকারি Targeted এবং Conditional Cash Transfer প্রকল্প। World Bank (WB) ও Inter American Development Bank (IDB) এর আর্থিক সহায়তা রয়েছে। এরপর বেশ কয়েকবার সরকার বদল হলেও প্রকল্পটি ভালোভাবে চলেছে। সমীক্ষার ভিত্তিতে গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র পরিবারগুলির মূলত মহিলাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় এবং উপভোক্তাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে অন্তত ৮৫ % হাজিরা, পরিবারের সকলকে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়মিত হেল্থ চেক আপ করা, শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের পুষ্টি সম্পূরক (Nutritional Supplements) গ্রহণ করতে হয়। প্রকল্পটিতে নজরদারি রাখা (Monitoring) ও পর্যালোচনা (Evaluation) করা হয়। প্রকল্পটি সফল হওয়ায় বিশ্বের ৬০ টিরও বেশি দেশে একে মডেল করা হয়েছে। মেক্সিকোতেও ২০০২ সালে এটিকে পুনর্গঠিত করে OPORTUNIDADES নামকরণ করা হয়েছে এবং শহরাঞ্চলে PROSPERA নামে এই প্রকল্পকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ব্রাজিলে দারিদ্র মোচনে ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে Bolsa Escola এবং Bolsa Almentacao নামে দুটি প্রকল্প ছিল। মেক্সিকো মূলত স্প্যানিশভাষী এবং ব্রাজিল মূলত পর্তুগিজভাষী দেশ। ২০০৩ এ ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টির তরফে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা এই দুটি প্রকল্প এক করে আরও বড় করে FOME ZERO (অনাহার যেখানে শূন্য) কর্মসূচির অধীনে BOLSA FAMILIA (পারিবারিক অনুদান) প্রকল্প টি চালু করেন। ব্রাজিলে গিয়ে এই প্রকল্পের নিদর্শন কিছু দেখি এবং ‘ স্বাস্থ্য শিক্ষা উন্নয়ন ‘ পত্রিকায় লিখি। সংক্ষেপে এটিও একটি Targeted এবং Conditional Cash Transfer প্রকল্প। সরকার এটি চালালেও, বিশ্ব ব্যাঙ্ক ও IDB থেকে ঋণ নেওয়া হয়। এর ক্ষেত্রেও পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে হাজিরা, টিকা নেওয়া প্রভৃতি শর্ত রয়েছে। রয়েছে নজরদারি ও পর্যালোচনা। ব্রাজিলের জনসংখ্যার এক বড় অংশ এর উপভোক্তা। এর সাফল্য সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান Bolsa Familia ধাঁচে বৃহৎ Social Grant System যেখানে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা থেকে বৃদ্ধ – বৃদ্ধাদের পেনশন এর ব্যবস্থা রয়েছে। এটিও একটি Targeted CCT। আমাদের শাসক এবং প্রশাসকদেরও রাজকোষ উজাড় করে দেউলিয়া হয়ে ভোটের জন্য খয়রাতির অপচয়ের অন্ধগলি থেকে বেরিয়ে এসে আর্থিক সাধ্যের মধ্যে থেকে সুপরিকল্পিতভাবে সুনির্দিষ্ট দারিদ্রমোচন সহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নয়নের প্রকল্প গুলি গ্রহণ করে কর্মক্ষম মানুষকে অলস – অক্ষম না করে নিজেদের পায়ে সোজা হয়ে সম্মানের সঙ্গে দাঁড়াতে সাহায্য করতে হবে।
০১.০২.২০২৬











