(ক্লিনিকে বসে যা শুনেছি তাই লেখার চেষ্টা করছি)
আমার নাম তামান্না (নাম পরিবর্তিত)। বয়স তেইশ। বাড়ি ক্যানিং। গরীব ঘরে জন্ম। মাত্র ষোল বছর বয়সে শ্বশুরবাড়ি। শিক্ষাদানের চেয়ে কন্যাদান ছিল আমার বাড়িতে বেশি জরুরি। স্কুলের বদলে সেই বয়সেই যেতে হলো এক বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে । ক’দিনের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ির লোকেদের আসল স্বরূপ সামনে এলো। শুরু হলো মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার। এসব সহ্য করেই কাটতে থাকলো দিন। তার সাথে দুবেলা পেট ভরে ভাতটুকুও জুটতো না। কিন্তু কোথায় যাবো? মা বাবা বারবার শ্বশুরবাড়িতেই মানিয়ে নিতে বলতেন। বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে আসতে সাহস দিতে পারতেন না। এসবের মধ্যেই এক বছরের মাথায় আমি এক ছেলের মা হয়ে গেলাম। কিছু দিন ভালো সময় কাটলো। কিন্তু আমার কপালটা তো ভালো নয়! জন্ম থেকেই বাচ্চাটা একটু রুগ্ন ছিল। ফ্যকাশে। অল্পেই ক্লান্ত। এক বছরের মাথায় ডাক্তাররা বললেন ওর থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগ আছে। ওকে সারা জীবন ব্লাড দিতে হবে। আমার তো মাথায় বাজ পড়লো! সত্যি বলতে কি আমি যে থ্যালাসেমিয়া বাহক তা জানতাম না। তবে আমার শরীর চিরকালই ছিল দু্র্বল। রক্তের হিমোগ্লোবিন একটু কম থাকতো।
ডাক্তাররা বোঝালেন আমি আর আমার স্বামী দুজনেই রোগটার বাহক। এই অবস্থায় প্রতি চার জনে একজনের রোগটা হবে। বাকি তিন জনের হবে না। আমার কপাল – আমি হয়ে গেলাম চারে এক। বার কয়েক রক্ত দেওয়াতে পেরেছিলাম। শ্বশুরবাড়ি থেকে কোনো সহযোগিতা করতো না জানেন। উল্টে সব দায় গিয়ে পড়তো আমার উপর। ওদের ছেলেও যে আমার মতনই বাহক সেটা একবারও স্বীকার করলো না! সব চেয়ে বেশি অত্যাচার করতো আমার শ্বাশুড়ি। আমাকে বলতো আমার নিঃশ্বাসের বিষেই নাকি ছেলের থ্যালাসেমিয়া হয়েছে। এটা কি কখনও সম্ভব বলুন- এটা কি টিবি?
তাও চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ছেলেটা বড্ড অসুস্থ হয়ে পড়লো।ওর বয়স তখন মাত্র চার। হাসপাতালে ভর্তি করতে হলো। আমার স্বামীটাও তেমনি। বাবা হিসাবে পাশে দাঁড়ানোর বদলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলো। একটা সময় ডাক্তাররা হাল ছেড়ে দিলেন। আমি তখন বাপের বাড়িতে। শেষ সময়টুকুতে ছেলেটাকে বাড়ি এনে রাখলাম। একদিন পরেই ও আমার কোল ফাঁকা করে চলে গেলো। একুশ বছর বয়সেই আমি হয়ে গেলাম সন্তানহারা মা। শাশুড়ি বললেন আমি নাকি ডাইনি। আমার দৃষ্টিতে দোষ- আমি বাড়ির সবার রক্ত শুষে নিতে পারি। আমাকে বাপের বাড়িতেই থেকে যেতে হলো। তবে খুব শিগগির আমার বাবা ঘুরে দাঁড়ালেন। আমার ডিভোর্সের ব্যবস্থা করলেন। আমি মুক্ত হলাম। ছেলের মুখের দিকে চেয়ে এতদিন সবকিছু সহ্য করেছি, আর কেন করবো বলুন তো?
কষ্ট হলেও একটু একটু করে আমি আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করলাম। ইতিমধ্যে আমাদের গ্রামেরই একটা ছেলে আমাকে খুব ভালোবেসে ফেললো। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আমরা বিয়ে করলাম। জানেন ডাক্তারবাবু, এটা ওর প্রথম বিয়ে। বলে বোঝাতে পারবো না ও আমাকে কতখানি ভালোবাসে। রোজগারপাতি তেমন কিছু করেনা, তবে ওকে ভরসা করা যায়। সত্যি বলতে কি ও একটা দেবদূত। কিন্তু দেখুন ভগবানের মার। সেও থালাসেমিয়া বাহক! আর সে জন্যই তো আপনার কাছে আসা। দেখুন তো এবারে আমি চারে তিন, না কি চারে এক?
আমি শুধু বললাম, তোমার নাম যে তামান্না। তোমাকে তো আশা রাখতেই হবে।
ডাক্তারি ফুটনোটঃ
সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগ থাকা মানে তার বায়োলজিকাল পিতা-মাতাকে বাহক হতেই হবে। এর কোন অন্যথা হতে পারেনা। এটি ছোঁয়াচে রোগ নয়।









