১.
আমার কিশোর বেলার এক মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা আজ মনে পড়লো। সমীর দা,সমীর সেনগুপ্ত নামে আমাদের পাড়ার এক সিনিয়র দাদা ছিলেন। ছ’ফুটের ওপর লম্বা, রীতিমতো বলিষ্ঠ পেটাই চেহারা। ভালো স্পোর্টসম্যান। পাড়ার ফুটবল দলের বাঁধা স্ট্রাইকার। ভালো খেলার সুবাদে কলেজ টিমেও সহজেই জায়গা পাকা। আমরা বয়সে তার তুলনায় অনেকটা ছোটো হলেও, মেলামেশায় কোনো বেড়া ছিলোনা। এমন এক দিলখোলা, প্রাণোচ্ছল মানুষটি হঠাৎ একদিন আমাদের ছেড়ে কোন্ এক অচিন ময়দানে পাড়ি দিলেন হয়তো আরও বড়ো কোনো ম্যাচ খেলতে। আমরা সবাই শোকাহত হলাম বৃহত্তর সামাজিক পরিবারের একজন সদস্যের আকস্মিক শূন্যতায়।
কী হয়েছিল সমীর দার ? কয়েকদিন পর এর উত্তরটাও স্পষ্ট হয়ে উঠলো – বৃষ্টিভেজা কাদামাঠে খেলতে গিয়ে পায়ে পেরেক ফুটেছিল , তা থেকেই গভীর ক্ষত। সেটাই বিষিয়ে উঠে প্রাণঘাতী হয়ে উঠলো। লোকজন বলাবলি শুরু করলো টিটেনাসের কথা। ঐ শব্দবন্ধের সাথে সেই আমার প্রথম পরিচয় এক বিয়োগান্তক ঘটনার সূত্র ধরে। সমীর দার জীবন কেড়ে নেওয়া সেই রোগটির দেশীয় পরিচিতি ধনুষ্টংকার নামে। যন্ত্রণা কাতর মানুষের শরীরের পেশী সংকোচনের ফলে ধনুকের মতো বেঁকে যায় বলেই কি এমন নামাকরণ?
২.
টিটেনাস শব্দটির সঙ্গে হালফিলের মানুষের পরিচয় বোধহয় এখন অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। কেটে বা ছড়ে গেছে দেখলেই লোকজন এখন টিটেনাসের শঙ্কায় আশঙ্কিত হয়ে এন্টি টক্সিন ইনজেকশন নিতে কাছাকাছির কোনো ওষুধের দোকানে ছোটেন। জঙ্ ধরা পেরেক বা টিন বা লোহার শিক যদি ক্ষত সৃষ্টির কারণ হয় তাহলে শরীর বিষিয়ে যাবার শঙ্কায় অনেকেই সাবধানতা অবলম্বনের উদ্দেশ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।এমনটা অসঙ্গত নয়। তবে জেনে রাখা ভালো যে কোনো ধরনের ক্ষত থেকেই কিন্তু টিটেনাসের আশঙ্কা থাকে যদি না তার যথাযথ পরিচর্যা করা হয় একেবারে শুরুতেই।
প্রথমেই বলি টিটেনাস বা ধনুষ্টংকার একটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগ বা সমস্যা। পায়ে পেরেক ফুটলেই তা থেকে টিটেনাসের উপসর্গগুলো দেখা দেবে এমন নিশ্চয়ই নয়। তবে অকুস্থলে যদি Clostridium tetani ব্যাকটেরিয়া আগে থেকেই ঘাপটি মেরে থাকে, তাহলে তা থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্ষত স্থানই হলো ক্লসট্রিডিয়াম টিটানি ব্যাকটেরিয়ার শরীরে ঢোকার প্রবেশদ্বার।শরীরে এক বার সিধিয়ে যেতে পারলে তাকে আর রুধিবে কে? শরীরের মধ্যে ঢুকেই এরা এক টক্সিন পদার্থ তৈরি করে যার প্রভাবে আক্রান্ত মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রাণঘাতী হামলা শুরু হয়। শরীরে আগে থেকেই কোনো ক্ষত বা চেরা অংশ থাকলে এই প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়া সেই পথেই মানব শরীরে ঢুকে পড়ে। যেহেতু সমস্যার মূল হোতা ব্যাকটেরিয়া, সেই কারণে একাধিকবার এই ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সমস্যা ছোঁয়াচে নয় অর্থাৎ একজনের থেকে অন্যজনের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু একবার ক্ষতস্থান বিষিয়ে উঠে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ তীব্র হয়ে উঠলে আক্রান্ত মানুষের প্রাণহানির সম্ভাবনা প্রায় সুনিশ্চিত।
৪.
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় টিটেনাস সংক্রমণ চার ধরনের –
অ. জেনারালাইজড বা সাধারণধর্মী
এই ধরণের সংক্রমণ খুব সাধারণ। ক্ষতপথে শরীরে ঢুকে ব্যাকটেরিয়া যে টক্সিন পদার্থ তৈরি করে তার প্রভাবে ঘাড় এবং চোয়ালের পেশিগুলো আক্রান্ত হয়। এজন্যই মনে হয় টিটেনাসকে লক জ ( lockjaw ) সিনড্রোম বলে।
আ. নিওনাটাল বা জন্ম পরবর্তী
এই ধরনের সমস্যার শিকার হয় সদ্যোজাতরা। সাধারণত জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে এই সমস্যার প্রকোপ দেখা যায়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এই সংক্রমণ দেখা না গেলেও উন্নয়নশীল দেশে এই সমস্যা এখনও বহু শিশুর মধ্যে দেখা যায় যা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
ই.লোকালাইজড বা স্থানিক
দেহের যে অংশের ক্ষতস্থান দিয়ে ব্যাকটেরিয়া শরীরের ভেতর ঢোকে সেই অংশের পেশী মুখ্যত আক্রান্ত হয়। তবে এই ধরনের স্থানিক সমস্যা খুব বেশি দেখা যায় না, কালক্রমে এটি সাধারণধর্মী সংক্রমণের চেহারা নেয়।
ঈ. সেফালিক বা মস্তিষ্ক ঘটিত
উপসর্গগুলো অনেকটাই স্থানিক সংক্রমণের মতো হলেও এর প্রভাবে আক্রান্ত মানুষের কার্ণিয়াল নার্ভকে আক্রমণ করে। এর অর্থ হলো এ ধরনের সংক্রমণে রোগীর মাথা ও মুখমন্ডল প্রভাবিত হয়।
আগেই বলেছি যে টিটেনাস একটি ব্যাকটেরিয়া ঘটিত সমস্যা এবং শরীরের বিশেষ কোনো ক্ষতস্থান দিয়ে ক্লসট্রিডিয়াম টিটানি ব্যাকটেরিয়া দেহের ভেতর ঢুকে একধরনের টক্সিন বা বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে যা শরীরের সুস্থতার পক্ষে বিপজ্জনক। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে ক্ষতস্থান দিয়ে
ব্যাকটেরিয়া স্পোর বা বীজগুটির আকারে অথবা সক্রিয় ব্যাসিলির চেহারায় শরীরে ঢুকতে পারে। স্পোরগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা সহজ নয় কেননা এগুলো গরম ফুটন্ত জলেও টিকে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে এই ব্যাকটেরিয়ার বীজগুটি বা স্পোর মাটির মধ্যে বিশেষ করে সার মেশানো মাটির গভীরে থাকতে পারে। ফলে ক্ষতস্থান বয়ে শরীরে ঢুকে পড়ে সহজে । শরীরের ক্ষত যত গভীর হবে, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের তীব্রতা তত বেশি হবে এবং এরফলে বাড়বে জীবনহানির আশঙ্কা।
আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসার বিষয়টি সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,ফলে এই রোগটিও তার ব্যতিক্রম নয়। বিদেশে টিটেনাস ভ্যাকসিনের সাহায্যে এই সমস্যার হাত থেকে থেকে রেহাই পাওয়া যায়। আমাদের দেশে এই সম্পর্কে সচেতনতা কম ফলে আশঙ্কায় থাকতে হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসার কল্যাণে আমাদের দেশেও এই রোগটির প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে, বিশেষ করে নিও নাটাল বা জন্ম পরবর্তী শিশুদের মৃত্যু উপযুক্ত প্রতিষেধকের সাহায্যে কমানো সম্ভব হয়েছে। টিটেনাসের প্রাথমিক উপসর্গগুলো আক্রান্তের শরীরে লক্ষ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণ সতর্কতার মধ্যে রয়েছে ক্ষত স্থানের যথোপযুক্ত পরিচর্যা, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো টিটেনাস এন্টি টক্সিন গ্রহণ করা, উপযুক্ত এন্টিবায়োটিক ওষুধ সেবন, পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম এবং বিশেষ অবস্থায় ব্রিদিং সাপোর্ট গ্রহণ করা। এসব করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে।
৬. 
ঋণ স্বীকার
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক বুলেটিন
উইকিপিডিয়া
১৮ জুন ২০২৬












