জ্যেষ্ঠভ্রাতা মহারাজ রাজ্যবর্ধন যখন তাঁহার উপর সাম্রাজ্যের শাসনভার সমর্পণ করিয়া দুরাচারী দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গমন করিলেন, সপ্তদশবর্ষীয় কুমার হর্ষবর্ধন প্রাথমিকভাবে কিছুকাল মুহ্যমান হইয়া রহিলেন।
পিতামাতার মহাপ্রয়াণ, মৌখরীরাজ গ্রহবর্মার নিষ্ঠুর নিধন এবং সর্বোপরি প্রাণপ্রিয় ভগিনী রাজ্যশ্রীর অপহরণ তাঁহাকে সাময়িক হতবুদ্ধি করিয়া দিয়াছিল। তাঁহার স্বভাবের স্বাভাবিক স্থৈর্য্য, ব্যবহারের মাধুর্য্য অল্পকালের জন্য হইলেও অন্তর্হিত হইয়াছিল।
এই মানসিক চঞ্চলতাকালে এক রাত্রে তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিলেন।
হর্ষ দেখিলেন একটি অজানা উন্মুক্ত প্রান্তরে তিনি একাকী দণ্ডায়মান, তাঁহার সম্মুখস্থ এক সুউচ্চ লৌহস্তম্ভ ধীরে ধীরে ভাঙিয়া পড়িতেছে। প্রথমে চূড়াটি ভাঙিয়া পড়িল, তাহার পরে স্তম্ভের মধ্যবর্তী স্থান তীব্র শব্দে বিদীর্ণ ও দ্বিখণ্ডিত হইয়া অল্পক্ষণের মধ্যেই ধরণীর রক্তিম ধূলির সহিত মিশিয়া গেল — তাহার আর চিহ্নমাত্র রহিল না।
মধ্যরাত্রে এমন অসম্ভব স্বপ্ন দেখিয়া হর্ষবর্ধন চমকিয়া জাগ্রত হইলেন। তাঁহার হৃদস্পন্দন দ্রুত হইয়াছে, মস্তক ঘর্মাক্ত — দেহনিঃসৃত স্বেদে দুগ্ধফেননিভ চীনাংশুকের শয্যা সিক্ত হইয়া উঠিয়াছে।
এই দুঃস্বপ্নের অর্থ জানিবার নিমিত্ত হর্ষকে দ্বিতীয়বার চিন্তা করিতে হইল না। বস্তুত স্বপ্নটি সম্বন্ধে তিনি রাজপুরোহিত শুভদেব শর্ম্মার ব্যাখ্যা পর্যন্ত শুনিবার জন্য উদগ্রীব হইলেন না। তিনি মূর্খ নহেন।
কুমার হর্ষবর্ধন স্থির বুঝিলেন, প্রলয়ঙ্কর ঝড় আসিতেছে। তাঁহার প্রপিতামহ, পিতামহ এবং সদ্যপ্রয়াত পিতার সযত্নশাসিত পুষ্যভূতি সাম্রাজ্যের উপর ‘মারে’র দৃষ্টি পড়িয়াছে। একে একে বংশপ্রদীপ নির্বাপিত হইতেছে, এইবার সম্ভবত রাজা রাজ্যবর্ধনের পালা।
হর্ষ বিচলিত হইলেন ঠিকই, কিন্তু তাহা প্রকাশ করিলেন না। অদৃশ্য নিয়তির সহিত ছায়াযুদ্ধ করিয়া লাভ নাই, বরং অচঞ্চল হৃদয়ে তাহার সম্মুখীন হওয়াই শ্রেয়।
শোক, ভীতি এবং হতাশার সম্মিলিত সাগরে নিমজ্জিত দেশবাসীকে জাগ্রত করিতে হইবে, প্রত্যেককে নিজ নিজ কর্মে পুনরায় রত হইবার আদেশ দান করিতে হইবে। এক রাজা যাইবেন, পরবর্তী নূতন রাজার অভিষেক হইবে — কিন্তু রাজ্যের প্রজাদিগের জীবনের রথচক্রকে নিশ্চল হইতে দেওয়া চলিবে না।
রাজ্যবর্ধনের স্থানীশ্বরে প্রত্যাবর্তনের কাল অবধি সুস্থ স্বাভাবিকভাবে রাজ্য পরিচালনা করিতে হইবে — অজানিত আশঙ্কায় দিন অতিবাহিত করা নিরর্থক।
পরদিন কুমার হর্ষ স্থানীশ্বরে স্থিত পুষ্যভূতি- সৈন্যবাহিনীর দশ সহস্রাধিক সেনানীকে রাজ্যের উত্তর সীমান্তের উদ্দেশ্যে নিষ্ক্রমণের আদেশ দিলেন। হূণ দলপতি প্রবরসেন অবশ্যই পুষ্যভূতি ও মৌখরীরাজত্বের বর্তমান অস্থিরতার সংবাদ পাইয়াছেন। তিনি যাহাতে পুনরায় আক্রমণ করিবার দুঃসাহস না করেন, সেই অভিপ্রায়ে হর্ষবর্ধন বর্তমানে গান্ধারসীমান্তে প্রহরায় নিয়োজিত বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দ্বিগুণ করিতে মনস্থ করিলেন। গান্ধাররাজ যেন বর্ধনসাম্রাজ্যকে অপ্রস্তুত জ্ঞান করিবার মূঢ়তা না করেন — তাহা হইলে সমুচিত উত্তর পাইবেন।
কামরূপরাজ ভাস্করবর্মা সসৈন্যে পুষ্যভূতি-রাজধানীতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ও তাঁর বাহিনী রাজ্যবর্ধনের সহিত গান্ধারসীমান্ত হইতে একত্রে স্থানীশ্বরে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলেন। কিন্তু মালবরাজ-দমনের উদ্দেশ্যে উত্তেজিত রাজ্যবর্ধন কেবল আপন পুষ্যভূতি বাহিনী লইয়াই নিষ্ক্রান্ত হইলেন — মিত্রকে তাঁহার অনুগামী হইবার আহ্বান জানাইলেন না।
হর্ষবর্ধন যথোচিত বিনয় সহকারে তাঁহাকে রাজ্যবর্ধনের সাহায্যার্থে বিন্ধ্যাঞ্চল অভিমুখে যাত্রা করিবার জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করিলেন।
“মহারাজ, আপনি আমার বয়োজ্যেষ্ঠ। ইহা ব্যতিরেকে রাজা রাজ্যবর্ধনের পরম মিত্র আপনি — কুচক্রী দেবগুপ্তের জঘন্য কর্মের সম্বন্ধে আপনি নিশ্চিতরূপে অবগত আছেন। আমার অগ্রজ তাঁহাকে পর্যুদস্ত করিয়া আমাদিগের বন্দিনী ভগিনীকে উদ্ধারার্থ মালব রাজধানীর উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রা করিয়াছেন। এমতাবস্থায় আপনি যদি তাঁহার সহিত যোগ দেন, আমাদিগের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। ভাবিয়া দেখুন রাজন”।
ভাস্করবর্মাকে নীরব দেখিয়া হর্ষ পুনরায় কহিলেন — “এই অন্যায়যুদ্ধে দেবগুপ্তের একজন সহযোগী রহিয়াছে — গৌড়ের অধিপতি শশাঙ্ক। যদি আপনি আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতার সহিত দেবগুপ্ত ও শশাঙ্কের যৌথবাহিনীকে পরাস্ত করিতে সক্ষম হ’ন, গৌড় আপনার হইবে মহারাজ। প্রাগজ্যোতিষ হইতে দণ্ডভুক্তি আপনার প্রভুত্ব স্বীকার করিবে, ইহা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়।”
চিরশত্রু শশাঙ্কের উল্লেখে ভাস্করবর্মার হৃদয়ে অকস্মাৎ অদম্য রণস্পৃহা জাগিয়া উঠিল — তিনি মনোমধ্যে তরবারির ঝনৎকার, হস্তীর বৃংহণ, অশ্বের হ্রেষা শ্রবণ করিতে করিতে স্বীয় রক্তে প্রবল যুদ্ধোন্মত্ততা অনুভব করিতে লাগিলেন। অর্বাচীন সামন্তপুত্র, অপদার্থ শশাঙ্ককে উৎখাত করিয়া কর্ণসুবর্ণ অধিকার করিতে হইবে — পুষ্যভূতি ভ্রাতৃদ্বয়ের সহায়তায় তাহা সম্ভব হইতে পারে। অতঃপর, তিনি সসৈন্য বিন্ধ্যাঞ্চলের পথে অগ্রসর হইয়া রাজ্যবর্ধনের অনুগামী হইতে সম্মত হইলেন।
এই সপ্তদশবর্ষীয় তরুণের প্রতি তাঁহার মনে কিছুটা সম্ভ্রম জাগিল — বয়স অল্প হইলেও এই পরিণতমনস্ক কিশোর উত্তম কূটনীতিক বলিয়া তাঁহার দৃষ্টিতে প্রতিভাত হইল।
বিন্ধ্য পর্বতের সানুদেশের অগভীর পর্ণমোচী অরণ্যানীর মধ্য দিয়া অনধিক পাঁচশত পদাতি এবং সমসংখ্যক অশ্বারোহী সৈন্য দক্ষিণ দিকে চলিয়াছে। এই সৈন্যযূথের কেন্দ্রস্থলে চারিজন শক্তিশালী পুরুষ দ্বারা বাহিত একটি সুসজ্জিত শিবিকাও চলিয়াছে — শিবিকার আচ্ছাদন সরাইয়া এক মধ্যবয়স্কা রমণী মধ্যে মধ্যে বনের গভীরে সংশয়সঙ্কুল, সতর্ক দৃষ্টি প্রেরণ করিতেছে — রমণীর নাম লক্ষ্মী।
শিবিকার অপ্রশস্ত অভ্যন্তরে, তাহার পার্শ্বে একটি অর্ধচেতন নারী পড়িয়া রহিয়াছে — লক্ষ্মী কিয়ৎকাল অন্তর তাঁহার স্বেদাক্ত ললাট শিবিকায় রক্ষিত মৃত্তিকাপাত্রের শীতল বারিসিঞ্চিত বস্ত্রখণ্ডের দ্বারা মুছাইয়া দিতেছে, ময়ূরপুচ্ছের ব্যজনী দিয়া বাতাস করিতেছে, তথাপি নারীর পাণ্ডুর কপোলে বিন্দুমাত্র রক্তাভার সঞ্চার হইতেছে না।
বলাই বাহুল্য, নারী মৌখরীরাজ্যের রাণী, মালবরাজ দেবগুপ্তের বন্দিনী রাজ্যশ্রী।
লক্ষ্মী দেবগুপ্তের রাজ অবরোধের বহু পুরাতন দাসী। যৌবনে তাঁহার অনুগৃহীতা ছিল — বর্তমানেও রণক্ষেত্রে, অরণ্যে, প্রান্তরে তাঁহার ছায়াসঙ্গিনী হইয়া রহিয়া গিয়াছে। উজ্জয়িনীর রাজ অন্তঃপুরের সে প্রধানা প্রতীহারিণী। অসি ও বল্লমচালনায় নিপুণা এই বিশ্বস্তা অনুচরীকে দেবগুপ্ত তাঁহার বন্দিনীর দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন।
লক্ষ্মী সর্বান্তঃকরণে দেবগুপ্তের প্রতিটি আদেশ শিরোধার্য করিয়া মানিয়া চলিত, কিন্তু এই শত্রুপক্ষীয় দুর্ভাগিনী কিশোরীটি তাহার অন্তরে অভূতপূর্ব করুণার সৃষ্টি করিয়াছিল, সে কিছুতেই ইহার প্রতি রূঢ় মনোভাবাপন্ন হইতে পারে নাই।
তাহার মালবসম্রাটের প্রতি অটুট আনুগত্যে কোথাও বুঝি সামান্য চিড় ধরিতেছিল।
কান্যকুব্জ হইতে উজ্জয়িনী ন্যূনাধিক চারিশত ক্রোশ দূরে অবস্থিত। দেবগুপ্তের ক্ষুদ্র সৈন্যদল তাহার অর্ধপথ অতিক্রম করিয়া আসিয়াছিল। সূর্য পাটে বসিবার ক্ষণে বনানীমধ্যে একটি অপেক্ষাকৃত মহীরূহহীন প্রান্তরে নাতিহ্রস্ব জলাশয়ের পার্শ্বে সেই রজনীতে বিশ্রামের জন্য বাহিনীর গতি স্তব্ধ হইল।
লক্ষ্মী শিবিকা হইতে উত্তরণ পূর্বক মৃত্তিকাপাত্রটি লইয়া জলাশয়ের নিকটে গেল। মুখ এবং হস্তপদ প্রক্ষালন করিয়া, পাত্র ভরিয়া সে শিবিকাপার্শ্বে আসিয়া চমকিত হইল। মহারাজ দেবগুপ্ত অন্ধকার মুখে অস্থিরভাবে পাদচারণা করিতেছেন।
তাহাকে দেখিয়া তাঁহার মুখভাব ভয়ঙ্করতর হইয়া উঠিল। তীক্ষ্ণ অনুচ্চকণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করিলেন — “বন্দিনীকে অরক্ষিত রাখিয়া কোথায় প্রস্থান করিয়াছিলে?”
পূর্বে এমন বিপাকে পড়িলে লক্ষ্মী ভীতা হইত, কিন্তু এই কয়দিন অর্ধচেতন রাজ্যশ্রীর সহিত একত্র অবস্থানে তাঁহার পরিচর্যা করিয়া, তাঁহার অর্ধোস্ফুট দুই চারিটি হুতাশবাক্য শুনিয়া লক্ষ্মী যেন অন্তর্মধ্যে এক প্রবল মায়ার উচ্ছ্বাস অনুভব করিয়াছিল — দেবগুপ্তের কঠিনবাক্য তাহাকে তিলেকমাত্র ভয়চকিত করিতে পারিল না।
পূর্ণ মৃত্তিকাপাত্রটি ধীরেসুস্থে শিবিকার অভ্যন্তরে রাখিয়া আসিয়া সে দেবগুপ্তের সম্মুখে দাঁড়াইয়া সহজ স্বরে বলিল — “জল ফুরাইয়াছিল। আনিতে গিয়াছিলাম।”
তাহার নির্ভয় উত্তরে দেবগুপ্ত কিছু বিস্মিত হইলেন, কিন্তু প্রকাশ করিলেন না। কঠোর কণ্ঠেই জিজ্ঞাসা করিলেন — “অরক্ষিত অবস্থায় বন্দিনী পলায়ন করিলে কি হইত? মনে রাখিও, বিশ্বাস করিয়া তোমার হস্তে উহার দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছি — ভালমন্দ কিছু ঘটিয়া গেলে তুমি কঠিন শাস্তি পাইবে।”
লক্ষ্মী পূর্ববৎ স্বচ্ছন্দস্বরে বলিল — “চতুর্দিকে বন। মহারাজের সৈন্য আমাদের রক্ষা করিবার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রহিয়াছে। আর, রাণী রাজ্যশ্রীর চেতনা এখনও সম্পূর্ণরূপে ফিরে নাই — তিনি অদ্যাপি অসুস্থ। এই রূপ অবস্থায় তিনি কোথায় যাইবেন? আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি তাঁহার উপর দিবারাত্রি লক্ষ্য রাখিতেছি — জীবন থাকিতে তাঁহার কোনওরূপ অনিষ্ট হইতে দিব না।”
সাধারণ বাক্য হইলেও তাহার শেষোক্ত কথাগুলি মালবরাজের কর্ণে কিঞ্চিৎ ভিন্ন ব্যঞ্জনা লইয়া প্রবেশ করিল। তিনি পুনরায় বিস্মিত হইলেন। লক্ষ্মী তাঁহার বেতনভুক, অনুগ্রহভাগিনী এক সামান্যা রমণী — রাজার সহিত কথোপকথনে তাহার দাসোচিত সমীহ ও ভীতি প্রকাশ পাইতেছে না কেন, ইহা অন্যমনে জল্পনা করিতে করিতে বন্দিনীকে রক্ষার ক্ষেত্রে যথোচিত সাবধানতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়া তিনি আপাতত অকুস্থল ছাড়িয়া প্রস্থান করিলেন।
রাজার নিষ্ক্রমণের পরে শিবিকায় প্রবেশ করিয়া লক্ষ্মী দেখিল, রাজ্যশ্রীর জ্ঞান পূর্ণরূপে ফিরিয়া আসিয়াছে। সে বংশনির্মিত পেটিকা হইতে কিছু দ্রাক্ষাফল ও শুষ্ক খর্জুর বাহির করিয়া রাজ্যশ্রীর সম্মুখে ধরিল। তিনি মুখ ফিরাইয়া লইলেন। লক্ষ্মী হ্রস্বকণ্ঠে কহিল — “খাদ্য গ্রহণ করুন দেবি। নচেৎ এই দুর্গম জঙ্গল পদব্রজে অতিক্রম করার শক্তি পাইবেন কি রূপে?”
রাজ্যশ্রী যেন বিদ্যুদাহত হইয়া দাসীশ্রেণীর এই রমণীর দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন। স্খলিত ক্ষীণকণ্ঠে কহিলেন — “কি বলিলে? পদব্রজে? কেন? দেবগুপ্ত আমার সর্বনাশ করিয়া ক্ষান্ত হয় নাই? বনমধ্যে পদব্রজে চলিতে বাধ্য করিয়া মারিয়া ফেলিতে চায়? এত সৌভাগ্য আমার সহিবে তো?”
লক্ষ্মী মৃদু হাসিল। বাহিরে অন্ধকার হইয়া আসিতেছে দেখিয়া সে শিবিকার আচ্ছাদন উত্তোলিত করিয়া দিল। তাহার পরে স্বগতোক্তি করিল — “পালকির ভিতরে বাতাস বড়ই বদ্ধ হইয়াছে — বাহিরের বায়ুচলাচল আবশ্যক।”
আরো কিছুকাল পরে সন্ধ্যার আঁধার গাঢ়তর হইল। স্থানে স্থানে অগ্নিকুণ্ড জ্বলিয়া উঠিয়াছে — সহস্রাধিক সৈনিকের রাত্রির আহার প্রস্তুত হইতেছে। অশ্বগুলিকে পর্যাপ্ত জলপান করাইয়া একটি স্থানে বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে, তথাপি তাহাদের অধৈর্য হ্রেষাধ্বনি, নাসিকানির্গত বিরক্তির শব্দ বহুদূর অবধি বনের অন্যান্য জীবদের কর্ণগোচর হইতেছে সন্দেহ নাই।
সৈনিকগণ পরস্পর বিশেষ বাক্যালাপ করিতেছে না, তথাপি এতগুলি সপ্রাণ উপস্থিতির স্থান কখনও সম্পূর্ণরূপে নিঃশব্দ হইতে পারে না।
বহুক্ষণ পরে একজন সেনানী আসিয়া লক্ষ্মীর হস্তে একটি মৃৎপাত্রে কিছু ঘৃতলেপিত চর্পটিকা এবং শূল্যপক্ক কুক্কুটমাংস দিয়া প্রস্থান করিল।
খাদ্য দেখিয়া রাজ্যশ্রীর বমনোদ্রেক হইল, তিনি পূর্ববৎ ক্ষীণকণ্ঠে উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন।
তাঁহার উপর্যুপরি প্রত্যাখ্যানে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হইয়া লক্ষ্মী স্নেহক্ষরিত স্বরে কহিল — “দেবি, আপনার অভাবনীয় লাঞ্ছনায় আপনি অদ্যাপি মর্মাহত হইয়া রহিয়াছেন। আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, কিছু খাদ্য গ্রহণ করুন। তাহার পরে আমার বক্তব্য সঠিক অনুধাবন করিতে পারিবেন।
রাত্রির তৃতীয় প্রহর অতিক্রান্ত হইলে সৈন্যদলের সীমান্তপ্রহরী ব্যতিরেকে আর কেহই জাগিয়া থাকিবে না, বিশেষ করিয়া এই দুর্গম বনাঞ্চলে নিঃশব্দে শত্রুদলের পক্ষে আমাদিগকে আক্রমণ করা একপ্রকার অসম্ভব।
তাই পলায়নের পক্ষে তৃতীয় প্রহরই উপযুক্ত হইবে।
মন দিয়া শ্রবণ করুন। আমি জলাশয়ে যাইবার অছিলায় দেখিয়া আসিয়াছি, অশ্বগুলিকে উত্তরদিকে বাঁধিয়া রাখা হইয়াছে। ঐদিক সৈন্যদ্বারা সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত নহে। তাহাদের মধ্য দিয়া প্রহরীদের চক্ষু এড়াইয়া আমি আপনাকে লইয়া যাইতে সক্ষম হইব নিশ্চয়। অশ্বদল পার করিয়া অদূরে একটি নাতিউচ্চ পর্বত রহিয়াছে — তাহার প্রান্তদেশ অবধি আমি আপনাকে পৌঁছাইয়া দিব। আপনি স্পষ্ট উত্তরদিকে চলিবেন — লক্ষ্য রাখিবেন কোনওভাবেই যেন দিগভ্রষ্ট না হ’ন। রাত্রি থাকিতে থাকিতে পর্বত পার হইয়া যাইবার চেষ্টা করিবেন। আমি আপনার সঙ্গে কিছু বহনযোগ্য খাদ্য দিব — যদি উহা সম্বল করিয়া, জঙ্গলাকীর্ণ পথের সম্ভাব্য বিপদ হইতে সুরক্ষিত থাকিয়া আনুমানিক পাঁচ-ছয়দিন সমানে উত্তরদিক বরাবর চলিতে পারেন, মালবরাজ্যের সীমানা পার হইয়া যাইবেন। অন্যপারে পুষ্যভূতি সামাজ্য — আপনার আর কোনওরূপ চিন্তা থাকিবে না।
উপস্থিত ইহার অধিক সাহায্য আমি আপনাকে করিতে পারিব না দেবি — ক্ষমা করিবেন। এই সঙ্কটকালে শারীরিক বলের প্রয়োজন রহিয়াছে, তাই আমি আপনাকে পুনরায় অনুরোধ করিতেছি, দয়া করিয়া কিছু খাদ্যগ্রহণ করুন আর্যা।”
ম্লান দীপের আলোকে রাজ্যশ্রী দুই নয়নে গভীর অবিশ্বাস লইয়া বহুক্ষণ এই কুরূপা বয়স্কা রমণীর প্রতি চাহিয়া রহিলেন। তাহার পর অপেক্ষাকৃত স্পষ্টস্বরে কহিলেন — “তুমি দেবগুপ্তের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া আমাকে সাহায্য করিবে কেন? ইহাতে তোমার কি লাভ?”
লক্ষ্মী অধোবদনে নিরুত্তর রহিল।
রাজ্যশ্রী একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন — “ইহা দুরাচারী দেবগুপ্তের কোনও কৌশল কিনা জানি না। সে হয়ত তোমার দ্বারা আমাকে বশীভূত করিবার কোনও নূতন প্রচেষ্টা করিতেছে। তোমার মুখনিঃসৃত এই সকল কথা হয়ত তাহারই শিখানো বাক্য! তবু, উপস্থিত তোমাকে বিশ্বাস করা ব্যতীত আমার দ্বিতীয় পথ নাই। রাত্রির তৃতীয় প্রহরে তোমার সহিত যাইতে আমি প্রস্তুত। যেদিন স্বামীকে হারাইয়াছি, জগৎসংসার নিরর্থক হইয়াছে — জীবনমরণ আমার নিকট উভয়ই সমান। তবে, সসম্মানে মরিবার জন্যও তো বন্দিদশা হইতে মুক্তির প্রয়োজন।”
লক্ষ্মী মুখ তুলিল। অবরুদ্ধ, জড়িতস্বরে কহিল — “মহাকালেশ্বর আপনার সহায় হউন।”
রাজ্যশ্রী সবিস্ময়ে দেখিলেন, নিঃশব্দ অশ্রুতে তাহার গণ্ড ভাসিয়া যাইতেছে।
সেই রাত্রিতে, তৃতীয় প্রহরে মালব-প্রতীহারিণী লক্ষ্মী বিনা উপদ্রবে রজ্জুবদ্ধ অশ্বযূথের মধ্য দিয়া স্কন্ধাবারের সীমান্তপ্রহরীদিগের সতর্ক চক্ষুকে প্রতারণা করিয়া রাজ্যশ্রীকে বিন্ধ্যাঞ্চলের সেই ক্ষুদ্র পর্বতটির পদপ্রান্তে লইয়া আসিতে সফল হইল।
রাজ্যশ্রী তাহার হস্ত ধরিয়া অনুনয় করিলেন — “আমার দুর্দিনের সঙ্গিনী, তুমি আমার সহগামিনী হইলে আমি সুখী হইব।”
লক্ষ্মী সাশ্রুনয়নে কিছু শুষ্ক চণক, খর্জুর এবং ক্ষীরপক্ক মিষ্টান্ন তাঁহার অঞ্চলপ্রান্তে বাঁধিতে বাঁধিতে কহিল — “আর্যা, আমি মালবরাজ্যের প্রজা, মহারাজ দেবগুপ্তের অন্নে প্রতিপালিতা। রাজার অন্যায়কে সমর্থন না করিয়া বৃহত্তর কোনও অন্যায় করিলাম কিনা, সে বিচার পরকালে ঈশ্বর করিবেন, কিন্তু ইহকালে আমি মালবরাজকে ছাড়িয়া যাইতে পারিব না। আপনি স্বর্গের দেবী, কোনওরূপ পাপ আপনাকে স্পর্শ করে নাই, আমি জানি আমার অন্তরের কথা আপনি নিশ্চিত বুঝিবেন।”
এইমাত্র বলিয়া সে পশ্চাদপসরণ করিল এবং দ্রুত পদক্ষেপে নীরন্ধ্র অন্ধকারের মধ্যে বিলীন হইয়া গেল।
রাজ্যশ্রী সেই নিশ্ছিদ্র তমিস্রার দিকে চাহিয়া দীর্ঘক্ষণ একাকিনী দণ্ডায়মান রহিলেন, তাহার পরে নক্ষত্রের চিহ্ন নির্ণয় করিয়া উত্তরদিকের পথ ধরিলেন। সম্মুখের প্রস্তরময় পার্বত্য বনাঞ্চল আজি রাত্রিতেই অতিক্রম করিয়া যাইতে হইবে।
স্কন্ধাবারে নিজস্ব পট্টাবাসের নিভৃত শয্যায় মালবরাজ দেবগুপ্ত সহসা নিদ্রা ভাঙিয়া জাগিয়া উঠিলেন। বাহিরে তখনও প্রত্যুষের প্রথম আলোকরশ্মির উন্মেষ হয় নাই। দীপাধারের তৈল নিঃশেষিত, শিবিরের অন্দরে গাঢ় অন্ধকার। দ্বারে প্রহরীগণের পাদচারণার শব্দও কর্ণগোচর হইতেছে না। দেবগুপ্ত কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করিলেন — তাঁহার ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাঁহাকে সতর্ক করিয়া দিল। তাঁহার প্রতীতি হইল, শিবিরমধ্যে তিনি একাকী নহেন, আর কাহারও যেন আগমন ঘটিয়াছে। তালি বাজাইয়া মালবরাজ প্রতীহারদিগকে আহ্বান করিলেন — কেহ আসিল না। এইবার তিনি সাবধানে শয্যা হইতে অবতরণ করিয়া দ্রুত আপন কটিদেশ হইতে তরবারি নিষ্কাশিত করিতে গেলেন, কিন্তু অসমর্থ হইলেন। সহসা আপন বক্ষস্থলে প্রবল বেদনা অনুভব করিয়া দেবগুপ্ত আর দণ্ডায়মান থাকিতে পারিলেন না, সবেগে ভূপতিত হইলেন। চেতনা চিরতরে লুপ্ত হইবার পূর্বমুহূর্তে মালবরাজ সবিস্ময়ে দেখিলেন, দীপাধারের একটি দীপ প্রজ্বলিত হইয়াছে, সম্মুখে এক রাজপুরুষ তাঁহার হস্তধৃত তরবারির অগ্রভাগ দেবগুপ্তের বক্ষমূলে সজোরে প্রোথিত করিয়া বিজয়গর্বে দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন।
দেবগুপ্তের দৃষ্টি ক্রমশ অস্বচ্ছ হইয়া আসিল, মুখগহ্বর হইতে উষ্ণ শোণিতের ধারা অনর্গল তাঁহার ওষ্ঠপ্রান্ত বাহিয়া পড়িতে লাগিল, অবশেষে অন্তিম শ্বাসের সহিত একটি শব্দমাত্র উচ্চারণ করিয়া তাঁহার নেত্রপল্লব চিরতরে মুদিত হইয়া গেল।
দন্তে দন্ত ঘর্ষণ করিয়া রাজ্যবর্ধন সেই অর্ধোচ্চারিত নামটি শুনিলেন —
“যশোমতী।”
সবলে দেবগুপ্তের পঞ্জর হইতে রক্তরঞ্জিত তরবারিটি টানিয়া বাহির করিয়া রাজ্যবর্ধন তাহা পুনরায় তাহার বক্ষে প্রোথিত করিয়া দিলেন।
পামর মৃত্যুকালেও তাঁহার জননীর নাম বিস্মৃত হয় নাই — ক্রোধে, ক্ষোভে, বেদনায় তাঁহার হৃদয় যেন ফাটিয়া পড়িবার উপক্রম হইল।
রাজ্যবর্ধন তরবারি দূরে নিক্ষেপ করিয়া নতজানু হইয়া উপবেশনপূর্বক তদ্গতচিত্তে মাতাকে স্মরণ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি স্পষ্ট অনুভব করিলেন অদৃশ্য অন্তরীক্ষ হইতে জ্যোতির্ময়ী মহাসতী যশোমতী তাঁহার জ্যেষ্ঠপুত্রকে পরিতৃপ্ত স্মিতমুখে অজস্র আশীর্বাদ করিতেছেন।
(ক্রমশ)










