দিন পনের হল, ভারতের প্রথম ভেনম ডিটেকশন কিট (VDK) নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে বেশ হৈ হৈ হচ্ছে। আমরা যারা সাপের কামড় নিয়ে কিছু কাজ করি, স্বাভাবিক ভাবেই তাদের কাছে এই খবরটা বার বার আসছে। বিভিন্ন স্তরের মানুষ আমার কাছে অন্তত পনের বার বা তারও বেশি এই খবরটি জানতে চেয়েছেন। আজ ১২ ই ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত আমি যেটুকু জানতে পেরেছি, সবার কৌতূহল মেটাতে সেই সামান্য কিছু তথ্য লিখে জানাতে চাই।
কর্নাটকের ভাট বায়োটেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান, ভারতের প্রথম VDK আবিষ্কার বা তৈরী করতে পেরেছে বলে দাবি করছে। আজ পর্যন্ত আমি অন্তত এর কার্যকারিতা সম্বন্ধে কিছুই তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি। এ রাজ্যের বাজারে এই কিট এখনও আসেনি, এটা বলতে পারি।
আমাদের বিশাল বড় whats app গ্রুপ-এ এই খবর নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে। আসামের ডা গিরির মত যে সকল ডাক্তারবাবু শত শত সাপের কামড় এর রুগীর চিকিৎসা করেন তাঁদের মতামত কিন্তু আশাব্যঞ্জক নয়। আর দেশের একেবারে প্রথম সারির ডাক্তারবাবুরা যারা ভারতের সাপের কামড় এর চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করে দিয়েছেন, তাঁরাও চুপ করে এই নতুন কিটের কার্যকারিতা সম্বন্ধে খোঁজ নিয়ে চলেছেন।
আমার মতামত যদি জানতে চান, আমি বলব, এখনও মতামত জানানোর মত তথ্য আমার কাছে নেই। আমার নিজের কিছু পর্যবেক্ষণ জানাই। ২০১২ সালে, ভেলোরের বিখ্যাত মেডিক্যাল কলেজে আমরা একটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছিলাম। ভারতের প্রথম সারির প্রায় সব ডাক্তারবাবু ওখানে এসেছিলেন। এ দেশ ছাড়াও প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা আর বাংলা দেশের বিখ্যাত কিছু ডাক্তারবাবুও ছিলেন। সাপের কামড় নিয়ে ঐ কর্মশালায়, কেরালার প্রফেসর ওমেন ভি ওমেন জানিয়েছিলেন যে, এই রকম একটা ডিটেকশন কিট ওনারা তৈরী করে নিয়েছেন। আর কিছু সরকারী কাগজ পত্র পেয়ে গেলেই ওনারা সেই কিট বাজারে ছেড়ে দেবেন। কিন্তু আমাদের হতাশ করে, এই তের বছরের মধ্যে আর সেই কিট বাজারে এল না। আর কোথাও ঐ কিটের সম্বন্ধে কিছু শোনাও যায় না।
বছর দশেক আগে, কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের এক অধ্যাপক আমাকে বলেছিলেন, এই ধরনের কিট তৈরী করা সম্ভব, খুব কঠিন কোন ব্যাপার নয়। বছর দুই আগে কল্যাণীর AIIMS-এর এক অধ্যাপক আমাদের সাথে এই কিট তৈরীর একটি প্রকল্প শুরু করেন। আমার প্রিয় ডাক্তার ভাই শুভেন্দু বাগ আমাকে কল্যাণীতে ধরে নিয়ে গেছল। ঐ প্রফেসরের সাথে আমরা দুই জনও ঐ প্রকল্পে যোগ দিই। এই রকম একটি গবেষণা প্রকল্পের জন্য কম করে দুই কোটি টাকা খরচ করতে হবে। এত টাকা কোথায় পাওয়া যাবে, এটাই ছিল সবথেকে বড় সমস্যা। গত বছর এ রাজ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর, গবেষণার জন্য কুড়ি লক্ষ টাকা মঞ্জুর করে। ঐ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বিকাশ ভবনে কল্যাণীর ঐ প্রফেসরের সাথে আমিও গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। এ রাজ্যের বিখ্যাত সব প্রফেসর আর বিজ্ঞানী, AIIMS-এর ঐ ডাক্তারবাবুর কাছে প্রকল্পের বাস্তবতা ও সম্ভাবনার বিষয়গুলি জেনে, অনুমোদন দেন। কাজ তো শুরু হয়েছে। কিন্তু বাকি বিপুল পরিমাণ টাকা কোথায় পাওয়া যাবে, আমি জানি না।
এদিকে ডা শুভেন্দু খড়গপুর IIT এর কয়েকজন অধ্যাপকের সাথে যোগাযোগ করে। ওনারাও জানান যে, ভেনম ডিটেকশন কিট করাই সম্ভব। প্রাথমিক কিছু কাজ এগোনোর পরই এই ভাট বায়োটেক-এর ব্যাপক বিজ্ঞাপন সোশাল মিডিয়ায় দেখতে পাই। ডাঃ শুভেন্দু ঐ কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে। ওনারা গোটা দশেক কিট “ব্যাবহার করে দেখতে” পাঠাবেন বলেছেন। এখনও সেগুলি ডা শুভেন্দুর হাতে আসেনি। আমরা অপেক্ষা করছি। এই সপ্তাহেই একটি অনলাইন মিটিং হল; আমরা দুই জন ছাড়া, IIT র এক অধ্যাপক, মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের এক অধ্যাপক, ভুবনেশ্বর এর এক বিজ্ঞানী আর আমেরিকা থেকে এক বড় কোম্পানির CEO এই মিটিং করলাম। ভাট বায়োটেক এর কিট নিয়েও কথা হল। আমাদের এই প্রকল্পের টাকা কোথা থেকে আসবে, তাই নিয়েও কথা হল। কেন্দ্র সরকার ছাড়া এত টাকা আর কোথাও থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এইবার আসি গোড়ার কথায়। প্রফেসর ওমেন ভি ওমেন এর কিট এতটা এগিয়েও বাজারে এল না কেন?
সাপের কামড় এর ভেনম ডিটেকশন কিট এর সাথে প্রেগন্যান্সি ডিটেকশন কিট এর তুলনা করছেন অনেকে। কিংবা বলেছেন, প্রেগন্যান্সি টেস্ট এর মত কাজ করবে এটা। ব্যাপারটি এত সহজ নয়। গর্ভাবস্থায় রক্তে একটি হরমোন অনেক বেড়ে যায়। কিট মূত্রে ঐ হরমোন আছে কি না ধরে নিয়ে জানায় গর্ভ সঞ্চার হয়েছে কি না। সাপের বিষ শরীরে ঢুকেছে কি না সেটা রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে। সাপের বিষ ঐ গর্ভ সঞ্চার এর হরমোন এর মত একটি মাত্র জিনিষ নয়। এক এক রকম সাপের বিষে চল্লিশ রকমের এনজাইম আর টক্সিন থাকতে পারে। এক এক রকমের বিষধর সাপের বিষ আলাদা আলাদা এনজাইম আর টক্সিন দিয়ে তৈরি। আমাদের দেশে অন্তত ৫০-৬০ রকম বিষধর সাপ আছে। বিশাল এই দেশের এক এলাকার সাপের বিষ হাজার মাইল দূরের সাপের বিষ এর সাথে মেলে না। তামিলনাড়ুর চন্দ্রবোড়া সাপের বিষ আমাদের রাজ্যের চন্দ্রবোড়ার সাথে মেলে না। এই নিয়ে গবেষণা পত্র ২০০২ সালেই প্রকাশিত হয়েছে। মোটামুটি সব বিষধর সাপের বিষে থাকে এইরকম একটা প্রোটিন আবার কিছু কিছু কাঁকড়া বিছের বিষেও থাকে। তাই বিছের হুল ফোটার পর ঐ প্রোটিন রুগীর রক্তে ঢুকবে। ওটিকে যদি কিট ধরে নিয়ে জানায় যে, বিষ ঢুকেছে, তাকে পরিভাষায় বলা হয় “False positive”! তাহলে কোন কিট যাতে False positive রিপোর্ট না দেয় সেই ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তব ক্ষেত্রে সাপের বিষ মনুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার বাঁধা ধরা কোন নিয়ম নেই। আমরা দেখেছি , মাএ কুড়ি মিনিটে চন্দ্রবোড়া সাপের বিষ শরীরে রক্ত তঞ্চনের গণ্ডগোল করেছ। আবার ঐ একই সাপের বিষ চার ঘন্টা পর কাজ করতে শুরু করেছে। এইবার কোন রুগীকে সাপে কামড়েছে বলে হাসপাতালে আনা হলো। প্রথমে ডিটেকশন কিট দিয়ে পরীক্ষা করে রক্তে বিষ পাওয়া গেল না। তখন রুগী অপেক্ষা করতে চাইবে না, বাড়ী চলে যাবে। এরপর যখন শরীরের কোন জায়গা থেকে রক্তপাত শুরু হবে তখন আবার রুগী হাসপাতালে আসবে। সেটা কিন্তু মারাত্মক দেরী; কিডনি বিকল হবেই। আর গোখরো বা কেউটে সাপের কামড় এর রুগী যদি বাড়ী চলে যায়, ফেরার আর সুযোগ পাবে না। রুগী যদি ভর্ত্তি হয়েই থাকে; কতবার আর কতক্ষণ ছাড়া ছাড়া পরীক্ষা করে দেখতে হবে? একজন রুগীর জন্য কতগুলি কিট লাগবে? এসব বাস্তব সমস্যার কথা এখন আমরা আলোচনা করছি। এ ছাড়াও বেশ কিছু প্রায়োগিক সমস্যাও আছে।
আপাতত বাজারে আসা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবেই। ডাঃ শুভেন্দু ভাট বায়োটেক এর কাছ থেকে এখন পর্যন্ত জানতে পেরেছে যে, ওদের কিট শুধু রক্তে বিষ আছে কি না সেটা জানাতে পারবে। কোন প্রজাতির সাপ কামড়েছে, সেটা বলা যাবে না। এখন এই পর্যন্তই থাক; কিট অন্তত বাস্তবে ব্যবহার করে ডা শুভেন্দু কি রকম ফল পাচ্ছে দেখার জন্য অপেক্ষা করছি।
১২.১২.২০২৫.











ধন্যবাদ।
আপনারা কিটের ওপর নজর রাখুন, আমরা আপনার আর্টিকেলের ওপর নজর রাখছি।