উপমা জিনিসটা এমনভাবে মানুষের মাথায় গেঁথে থাকে যে, তার থেকে জীবনে পরিত্রাণ অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমার বাবাকে যখন দাহ করা হচ্ছে, তখন সেই ধোঁয়া দেখে আমার মনে ডাচাও বা অসউইচ-এর চিমনির ধোঁয়ার কথা মনে পড়েছিলো। প্রত্যেকের জীবনেই এরকম কিছু চিত্রকল্প থাকে। যারা আজীবনের সঙ্গী হয়ে যায়। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প আমার মাথায় স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছে। পুরো সভ্যতাকে আমার মনে হয় এক বিরাট কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। অথবা পৃথিবীর মিনি মডেল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। এটা আজও আমার কাছে এক বিরাট প্রশ্ন যে, সভ্যতার ইতিহাস অত্যাচারের ইতিহাস নাকি চূড়ান্ত অত্যাচারের মধ্যেও মানুষের মানবিক থাকা আশাবাদী থাকার অদম্য লড়াই এর ইতিহাস। মানুষ চূড়ান্ত সুখে থেকেও অত্যাচার করেছে। অন্যদিকে কিছু মানুষ চূড়ান্ত অত্যাচারিত হয়েও মানবতার কথা বলে গেছে। এক ভালবাসায় ভরা আগামীর কথা ভেবেছে।
ডাচাও ক্যাম্প জার্মানির প্রথম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। মিউনিখের কাছে। পরে এই ক্যাম্পের আদলেই তৈরি করা হয়েছে অন্যান্য ক্যাম্পগুলো। প্রথমে এটি তৈরি হয়েছিলো রাজনৈতিক বন্দীদের রাখার জন্য। পরে এতে স্থান পায় ইহুদী সমকামী কমিউনিস্ট মানসিক রোগী ইত্যাদিরা। প্রচুর মানুষ খুন হয়েছে। রোগে মরেছে। অনাহারে মরেছে। ডাচাও এর ইট কাঠ পাথরে লেখা আছে এই কান্নার নীরব ইতিহাস।
এখানে ক্যাম্প নয়। একটি ভায়োলিন-এর কাহিনী বলবো।
এই দশকে হাঙ্গেরীতে একটি পুরোনো শিল্পকর্মের এক নিলামের দোকানে একটি ভায়োলিন আসে বিক্রির জন্য। অজানা অনামা একটি ভায়োলিন। এটা কার, কবেকার কোনো ইতিহাস জানা নেই। দোকান মালিকের শিল্পীর চোখ। বাদ্যযন্ত্রের জাত তিনি বিলক্ষণ জানেন। যন্ত্রটি দেখেই তিনি চিনেছেন এ এক উচ্চ জাতের যন্ত্র। বিশাল মাপের কোনো এক বাদ্যযন্ত্র শিল্পীর হাতে বানানো। শুধু একটা বিষয়েই ধন্দ থেকে যায়। যে মাত্রার শৈল্পিক ছাপ ওই যন্ত্রে আছে, তার তুলনায় যে মাল মশলা দিয়ে ওটি বানানো হয়েছে তা নেহাতই মামুলী, সস্তা। এই বিষয়টাই ভাবিয়ে তোলে নিলাম ঘরের মালিককে। তার মনে হয় এই আপাত বৈচিত্র্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বিরাট কোনো রহস্য। এই রহস্যের সমাধান করার জন্য যন্ত্রটি তিনি পাঠান বাদ্যযন্ত্র সারাইয়ের দোকানে। সেখানে যন্ত্রটি খোলা হয়। খোলামাত্র উপস্থিত সকলের শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় একটি শিহরণের স্রোত। মুহূর্তে উন্মোচিত হয়ে যায় এক অজানা ইতিহাসের অধ্যায়। ভায়োলিনের ভেতরে লুকিয়ে রাখা আছে একটি ছোট্ট চিরকুট। তাতে ঠিকানা লেখা মৃত্যুপুরীর। ডাচাও কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। নিচে নাম ফ্রানজিসজেক ফ্রানজ কেম্পা। সাল ১৯৪১। যা লেখা আছে তার তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘ আশার ভায়োলিন’।
এরপর খোঁজ করে জানা যায় ফ্রানজিসজেক ফ্রানজ কেম্পা একজন বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক শিল্পী। পোল্যান্ডের অধিবাসী। বন্দী হয়েছিলো ডাচাও ক্যাম্পে। যে পরিবেশে মৃত্যুই একমাত্র ভবিতব্য, সেখানে এই মানুষটি একটি ভায়োলিন বানাতে শুরু করে। হাতের কাছে ক্যাম্পের যা বাতিল জিনিস তাই দিয়েই এই ভায়োলিন বানায়। তার মধ্যে পুরে দেয় আশার কথা। ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য। এই আশার কথা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্বই হয়তো মানুষটিকে বাঁচার রসদ জুগিয়েছিল।
ক্যাম্পের পরিবেশ নিয়ে বাইরের বিশ্বের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছানোর জন্য গানবাজনার আসর বসতো ক্যাম্পে। সেখানে ভায়োলিন আসতো বাইরে থেকে। সেগুলোর থেকে এই ভায়োলিন সম্পূর্ণ আলাদা।
যারা মৃত্যু শিবির বানিয়েছিলো, লাখো মানুষ মেরেছিলো তারা এখন ঘৃণিত চরিত্র হয়ে ইতিহাসের পাতায়। আর এই ভায়োলিন আজকে হাজার হতাশার মাঝেও আশার প্রতীক হয়ে বর্তমানের হাতে। ইতিহাসের খলনায়কদের হাজার অত্যাচার, হাজার হত্যালীলা পাল্টাতে পারেনি ভায়োলিনের সুর আর তার মধ্যে পুরে রাখা আশার চিরকুট।
আজকেও যখন সীমান্তে গুলি চলে, তিলোত্তমা খুন হয়, তখনও কিছু মানুষ ভায়োলিন বানায়, ভায়োলিন বজায়, ভায়োলিনে পুরে দেয় আশার চিরকুট। আজকের দুনিয়ায় যারা নরকের যোগান দিচ্ছে, তারাও ঘৃণিত চরিত্র হিসেবে ইতিহাসে ঢুকবে। ভবিষ্যতের হাতে পৌঁছাবে স্লোগান, গ্রাফিতি আর গানের সুর। কবিতার পংক্তি। প্রতিবাদী লিফলেট।অত্যাচারী সব ভাঙতে পারে, শুধু পারে না মানুষের দুর্মর আশাকে শেষ করতে। পারে না সুরের সরগম পাল্টে দিতে। যতই ঘৃণার চাষ হোক, তার মাঝেই তৈরি হবে আরো আরো আশার ভায়োলিন, বাজবে কিছু মানুষের বুকে। চূড়ান্ত হতাশার মাঝে এটুকুই আশার আলো।
কেম্পা বেঁচে বেরিয়েছিল ক্যাম্প থেকে। পোল্যান্ড ফিরে গিয়েছিলো। বাকি জীবন অনেক বাদ্যযন্ত্র বানিয়েছিলো। তবুও এই ভায়োলিন অনন্য। মৃত্যুর মুখে বিদ্রুপ ছুঁড়ে দেয়া ‘আশার ভায়োলিন’। এটিই একমাত্র ভায়োলিন যেটা তৈরি হয়েছিলো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে।
যারা পৃথিবীতে যুদ্ধ বাধায়, দাঙ্গা বাধায়, গণহত্যা করে তারা জানে মৃত্যুর কথা। তারা জানেনা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে একটি ভায়োলিনও কিভাবে অদম্য বাঁচার ইচ্ছা জাগিয়ে রাখতে পারে। আশার কথা শোনাতে পারে আট দশক পরেও।









