খবরের কাগজের পাতাটা খুলে পন্ডিত বিস্মিত হয়ে গেলেন ছবিটা দেখে। চটি জুতোর একটা ছোটখাটো পাহাড়। হলটা কি! অনেকদিন বাদে পন্ডিত এসেছেন কলকাতা শহরে। শহরটা আগের থেকে অনেক ঘিঞ্জি হয়ে গেছে। প্রচুর লোকজন প্রচুর যানবাহন। শেষবার যখন এসেছিলেন তখন অনেক ফাঁকা ফাঁকা ছিল। পন্ডিতের কাছে চটি জুতো বিষয়টা খুব প্রিয়। ছবিটা দেখে পুরোনো দিনের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে যাওয়াতে পন্ডিতের মুখে এক চিলতে হাসি খেলে গেল।
সেবার বন্ধু বিখ্যাত হিন্দি কবি হরিশ চন্দ্রের অনুরোধে তাঁকে আর বন্ধু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিকে সঙ্গে নিয়ে দেখাতে গেছেন ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম। বাকি দুজনেই ধোপদুরস্ত। ফিটফাট। চোগা চাপকান, মাথায় পাগড়ি, পায়ে ইংলিশ জুতো। তিনি নিজে যথারীতি চাদর আর বাংলা চটি শোভিত। গেটের কাছে দারোয়ান আটকে দিল। চটি পায়ে ফটফটিয়ে এর মতো লোকের প্রবেশ নিষেধ। চটি ছেড়ে আসতে হবে। রেগেমেগে অতঃপর জুরি গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে বাড়ি। চটি ছাড়া যাবে না। প্রতিবাদে এশিয়াটিক সোসাইটির কাউন্সিলে চিঠি। পন্ডিতের মনে পরে গেল সেই চটি নিয়ে হিন্দু পেট্রিয়ট খবর করেছিল। ইংলিশম্যান কাগজেও বেরিয়ে ছিল।
আজ এতদিন বাদে আবার কাগজের পাতায় চটি। খবরটা পড়তে পড়তে পন্ডিতের মুখের হাসিটুকু মুছে যাচ্ছে, ভ্রূ কুঁচকে আসছে। পন্ডিত জানতে পারলেন যে ছবিতে যে অসংখ্য চটিজুতো দেখছেন সেগুলো কোনো একদল পাগল শখ করে রাস্তার ওপর ফেলে যায়নি। এটা বছর কয়েক আগের মুম্বাই-এর বান্দ্রা রেল স্টেশনের সামনের রাস্তায় ছবি। একদল শ্রমিক যারা বাড়ি ছেড়ে ওখানে কাজ করতে গিয়ে গেছে তারা বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল। লকডাউনে রোজগার বন্ধ। পেটে ভাত নেই। দেশের বাড়ি ফিরে আসলে যদি দুটো খেতে পায়। তাই সরকারি আদেশ ভেঙ্গে ওরা মরিয়া চেষ্টা করেছিল ঘরে ফেরার। পুলিশ লাঠি চালিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পালিয়ে যাওয়ার সময় ওদেরই ফেলে যাওয়া চটিজুতোর সারি।
কাগজটা ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন পন্ডিত। হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। কোথায় কোনদিকে যাচ্ছেন, পন্ডিত জানেন না। দেশের এই হাল দেখে ক্ষোভে পন্ডিতের মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে। রাগ হচ্ছে। প্রচণ্ড রাগ। ঠিক যেমনটা হয়েছিল সেদিন মিউজিয়ামের গেটে। হাঁটতে হাঁটতে পন্ডিত হঠাৎ দেখেন পৌঁছে গেছেন তালতলার মোড়ে।
মনে পড়ে গেলো এখানেই তো ছিল সেই মুচির দোকান। সেই মুচি যার দোকানে একদিন চটি সারাই করতে গেছিলেন। অনেকক্ষণ সময় লাগবে বলে সেই মুচি আদর করে একফালি চট পেতে দিয়েছিল। তিনিও তাঁর যাবতীয় মান মর্যাদা ভুলে গিয়ে অম্লান বদনে বসে পড়েছিলেন সেই চটের ওপরে। মুচি তো কি হয়েছে। সৎপথে থেকে খেটে খায়। শ্রমিক। ওই সেই জার্মান দার্শনিকের ভাষায় প্রলেতারিয়েত। এক জমিদার বন্ধু এটা দেখতে পেয়ে অবশ্য আওয়াজ দিয়েছিল। দিক গে। ও কিভাবে বুঝবে শ্রমের মর্যাদা। পয়সাই করেছে, শিক্ষা দীক্ষার তো বালাই নেই।
যাক গে সে সব কথা। ছবির চটিগুলো আবার ভেসে আসলো পন্ডিতের মনে। ওই আধময়লা, তোবড়ানো, সস্তার চটি জুতোগুলোকে। ওগুলো আসলে চটি জুতো নয়, ওগুলো লাশ। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স্বপ্নের লাশ, যারা নিজে দুটো ভালো খেতে পাবো, বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাতে পারবো এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল দূরদেশে। সেই লাশের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। দিতেই হবে।
অন্য কে কি ভাবলো তাতে পন্ডিতের কিছু এসে যায় না। কোনোকালেই এসে যায় নি। যখনই মনে হয়েছে অন্যায়, পন্ডিত রুখে দাঁড়িয়েছেন। সেই বিধবা বিবাহ নিয়ে গোলমালের সময় থেকেই। কম লোক তো ভয় দেখায় নি। প্রাণে মেরে দেওয়ার হুমকি অবধি দিয়েছিল পণ্ডিতকে। তাতে তাঁকে দমিয়ে রাখা যায় নি। পন্ডিত আবার আরেকবার মধ্য দুপুরের সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। আবার কাজে নামতে হবে। বাংলার মানুষজনকে আবার বলতে হবে, লিখতে হবে। তাদের শেখাতে হবে প্রতিবাদের ভাষা। তারা যাতে শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করতে পারে একজোড়া চটি জুতোর প্রকৃত দাম কি/
সুদর্শন অভিনেতা ভোটের প্রচারে নেমে বলবেন, “বিশ্বাস করুন, দেশের সেবা করার জন্যই আমার রাজনীতিতে আসা, তখন তাঁকে প্রশ্ন করতে হবে, হ্যাঁ বিশ্বাস করলাম, কিন্তু আপনি কি পারবেন একজোড়া জুতোর দাম দিতে। হেলিকপ্টার থেকে নেমে এসে রাজনেতা যখন বলবেন, “সত্তর বছরের পরে আমাদের একবার সুযোগ দিন সেবা করার, বিশ্বাস করুন সোনার বাংলা গড়ে দেবো আমরা” তখন তাঁকে প্রশ্ন করতে হবে, হ্যাঁ বিশ্বাস করলাম, কিন্তু আপনি কি পারবেন একজোড়া জুতোর দাম দিতে। টিভির পর্দায় সদ্য দলবদল করা কেউ যখন ছলছল চোখে বলবে, “বিশ্বাস করুন, পুরোনো দলে দম বন্ধ হয়ে আসছিল তাই দলবদল করলাম”, তখন তাকে প্রশ্ন করতে হবে, হ্যাঁ বিশ্বাস করলাম, কিন্তু আপনি কি পারবেন একজোড়া জুতোর দাম দিতে। হেলিকপ্টার থেকে নেমে এসে কোনো রাজনেতা যদি বলে, “সব উন্নয়নই তো করে দিয়েছি, আবার আসলে বাকিটাও করে দেব বিশ্বাস করুন”, তখন তাকে প্রশ্ন করতে হবে, হ্যাঁ বিশ্বাস করলাম, কিন্তু আপনি কি পারবেন একজোড়া জুতোর দাম দিতে। পন্ডিত জানেন যে এ প্রশ্নের উত্তর ওরা কেউ দিতে পারবে না। এই একজোড়া জুতোর কত দাম ওরা কেউ জানে না।
পন্ডিত আমাকে শিখিয়ে যাচ্ছেন যে ঝাঁ চকচকে লক্ষ কোটি টাকার হাইটেক প্রচারে আর প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যাওয়ার আগে একবার আবার আমাদের মনে করা দরকার, একবার ভাবা দরকার, কাদের আছে সেই সত্যিকারে দম যারা সেই জুতোর দাম ওই মানুষগুলোকে ফিরিয়ে দেবে। পন্ডিত আমাকে শিখিয়ে যাচ্ছেন যাদের আছে সেই দম, আমার ভোট তাদের জন্য। আমার ভোটের দাম তাই বেশি নয়, স্রেফ একজোড়া জুতোর সমান। হ্যাঁ আমাকে পন্ডিত তাই শিখিয়ে যাচ্ছেন। সেই পন্ডিত যাঁর নাম ঈশ্বরচন্দ্র। এই ঈশ্বরকে স্মরণ করেই কাল ভোট দিতে যাবো। আমার । প্রতিবাদের ধর্ম পালন করতে যাব। যে ধর্ম আমায় শিখিয়ে গেছেন ঈশ্বর। আমাদের একটাই ধর্ম, আমাদের একটাই ঈশ্বর।










