২৮ জুন, ২০২৫
গতকাল সন্ধ্যেবেলা WBJDF-এর একটি প্রতিনিধি দল কসবা থানায় যায়। থানার অফিসার ইন চার্জ (OC) ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টরদের সঙ্গে আমাদের প্রতিনিধি দলের আলোচনা হয়।আমরা লিখিত ডেপুটেশন জমা দিই ও স্পষ্ট করে জানতে চাই—
তদন্তের অগ্রগতি কী? কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে কি না? অভিযুক্তদের রাজনৈতিক প্রভাব তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না?
পুলিশের বক্তব্য খুব ছোট- “তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছে। তদন্ত চলছে। বিস্তারিত জানতে হলে আমাদের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।” অর্থাৎ, তারা এই বিষয়ে এর বেশি কিছু বলতে অপারগ — এটা তাদের এক্তিয়ারের বাইরে বলে জানানো হয়েছে। জানিনা, কোন উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে সমস্ত জবাব জমা আছে বা আদৌ আছে কিনা!
এছাড়া WBJDF-এর পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক মঞ্চ ও সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে থানার সামনে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি করেছে, করছে। এদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষ এখনও কিন্তু স্পষ্ট করেনি যে, তারা নিজে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কোনো অভিযোগ করেছে কিনা, ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের নিরাপত্তার জন্যে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, কিংবা ক্যাম্পাসে এরকম ভয়াবহ ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষ কীভাবে তার দায়িত্ব এড়াচ্ছে?
WBJDF-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট দাবি জানানো হয়:
• তদন্ত হোক নিরপেক্ষ, দ্রুত ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত — রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কেউ পার না পেয়ে যায়,
• অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে,
• নির্যাতিতার জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে,
• তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে জনসমক্ষে স্পষ্ট ও নিয়মিত তথ্য দিতে হবে।
এই ভয়াবহ ঘটনা বহু আলোচনা কে আবার সামনে এনেছে, কলেজে কলেজে দিনের পর দিন নির্বাচন প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে, শাসক দলের নেতাদের বদান্যতায় মৌরসিপাট্টা জমিয়ে রীতিমতো মাফিয়ারাজ চলছে। মূল অভিযুক্ত একজন প্রাক্তন ছাত্র, এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতার ‘অনুমতি’তে ওই কলেজের অস্থায়ী কর্মী হিসেবেও নিয়োজিত। এবং তার নাকি অসীম ক্ষমতা, তার কথায় কলেজে পাতা নড়বে কিনা ঠিক হয়। (ঠিক এরকম ক্ষমতাই কিন্তু আর.জি.কর এ সন্দীপ ঘোষ বাহিনীর ছিল, প্রায় প্রতিটা কলেজেই এরকম অসীম ক্ষমতাধর সিন্ডিকেট ও তার কিংপিন দের ‘রাজত্ব’ চলছে)
মনে রাখতে হবে, এই ঘটনায় অভিযোগকারিণী নিজেই শাসকদলের কর্মী ছিলেন। তাকে কোনো সেক্রেটারির পদ পাইয়ে দেওয়ার পরিবর্তে যৌন আনুগত্য দাবি করা হয়। রাজি না হওয়ায় অভিযোগ অনুযায়ী জোর করে ধর্ষণ, শারীরিক নিগ্রহ, ভিডিও করে ব্ল্যাকমেল, পরিবার ও প্রেমিককে মেরে ফেলার হুমকি সহ নারকীয় অত্যাচার চালানো হয়!
অভিযোগকারিণীর অভিযোগের একটি কপি সামাজিক মাধ্যমে বহুল শেয়ার হচ্ছে, তাতে অভিযোগের যে বর্ণনা রয়েছে তা পড়লে ভয়ে শিউরে উঠতে হয় ঘটনার নারকীয়তায়! কলেজ ক্যাম্পাস গুলোতে ঠিক কী ধরনের সংস্কৃতি লালন পালন করছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সেই ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায় অভিযুক্ত দের সাহস ও ক্ষমতার বর্ণনা শুনলে। এমন একটা সিন্ডিকেটরাজ, ধর্ষণ সংস্কৃতির ওপর সবটা দাঁড়িয়ে আছে যেখানে এমনকি শাসক দলের রাজনৈতিক পদ পাওয়ার জন্যও মেয়েদের শরীর কে পণ্য করতে বলা হয়, না হলে হেনস্থা, ব্ল্যাকমেল, হুমকি, — আর প্রশাসন নিশ্চুপ!
উল্লেখ্য, মূল অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অতীতেও বহু অভিযোগ আছে, এবং যথারীতি সেসব ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক মদতে। আর জি কর আন্দোলনে রাত দখলের মিছিল এ যাওয়ার ‘অপরাধে’ রীতিমতো তালিকা ধরে ছাত্রছাত্রীদের হয়রানির অভিযোগ ও রয়েছে। অবশ্য এ তো সব কলেজেরই ‘স্বাভাবিক’ নিয়মে পরিণত হয়েছে, খোদ আর জি করের ধর্না মঞ্চে এসে বসার জন্যে সন্দীপ বাহিনীর থ্রেটের সম্মুখীন হতে হতো আর জি করের ছাত্র ছাত্রীদের, আন্দোলনের ওই উত্তুঙ্গ মুহূর্তেও! বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য শাসকদলের মন্ত্রীদের হাত ধরে অধুনা তারাই খোলস পাল্টে WBJDA, PHA নাম নিয়ে কলেজগুলিতে আত্মপ্রকাশ করেছে।
আমরা RG Kar আন্দোলনের উত্তাল সময়ে দেখেছিলাম, ছাত্রছাত্রীরা যদি সাহস করে মুখ খোলে, নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে এবং সংগঠিত ভাবে চাপ সৃষ্টি করতে পারে তাহলে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে, (রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করেই) স্বচ্ছ তদন্ত করতে হয়, এমনকি বহুক্ষেত্রে থ্রেট সিন্ডিকেটের বহু মাথার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হয় অপরাধের গভীরতা অনুভব করে। গুন্ডামি, র্যাগিং, তোলাবাজি, যৌন হেনস্থা, নিপীড়ন, টাকা নয়ছয় — এইসব অপরাধকে এতদিন ধরে যারা স্বাভাবিক করে তুলেছিল, সেই সিন্ডিকেটদের গায়ে আঁচ লাগে আন্দোলনের তীব্রতায়। অনেক মেডিকেল কলেজে ছাত্রছাত্রীরা অভিযোগ জানায়, তদন্ত হয়, এবং কলেজ কাউন্সিল — অর্থাৎ প্রিন্সিপাল, সুপার, ডিন, সমস্ত বিভাগীয় প্রধান ও stakeholder-দের যৌথ বৈঠকে — অনেককেই সাসপেন্ড করা হয়, হোস্টেল থেকে ডিবার করা হয়।
কিন্তু আজ সেই অভিযোগগুলো কেও ঠান্ডাঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হয়েছে। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই লাইভ আলোচনায় বলে দিয়েছেন —
“এসব কলেজ কাউন্সিল আবার কী? আমায় না জানিয়ে সাসপেন্ড করবে?” “অভিযোগ থাকলেও তাকে অভিযুক্ত বলা যাবেনা”, কলেজের প্রিন্সিপালের এক্তিয়ার ও সম্মান এক মুহূর্তে মাটিতে এনে দিয়েছিলেন রাজ্যবাসীর সামনে, লাইভ আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী নিজে! এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই ক্যাম্পাসগুলোতে থ্রেট সিন্ডিকেট নতুন ভাবে অক্সিজেন পায়। WBJDA, PHA — নতুন নতুন মোড়কে পুরনো দখলদারি আর হুমকির সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার রীতিমতো চেষ্টা চলছে আর জি কর সহ সমস্ত মেডিকেল কলেজ গুলোতে এই মুহুর্তে।
আজ আমরা দেখছি, ধর্ষণে অভিযুক্তদের সঙ্গে শাসকদলের নেতা,মন্ত্রী, পদাধিকারী দের সাথে অসংখ্য ছবি ভাইরাল হচ্ছে! সেইসব ছবিতে কেউ হাসিমুখে হাত মেলাচ্ছে, কেউ মঞ্চ আলো করে পাশাপাশি বসে আছে। কিন্তু তার মধ্যেই শাসকদল বলে চলেছে — ‘এই অভিযুক্তদের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই!’ কেউ বলছে ‘বন্ধু বন্ধুকে ধর্ষণ করল নিরাপত্তা আর কে দেবে?’ এই নাটকগুলো এখন আর হাস্যকর পর্যায়ে নেই, তীব্র ঘৃণার জন্ম দিচ্ছে, আর শাসকের রাজনীতির স্বরূপ সবার সামনে উন্মোচন করছে।
আমরা বারবার বলে এসেছি, এই অবস্থা পাল্টানোর জন্যে প্রতিটি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ছাত্র নির্বাচন জরুরি, তদন্ত কমিটি ও ICC-তে নির্বাচিত ছাত্রছাত্রী প্রতিনিধির উপস্থিতি জরুরি, প্রতিটি কলেজে প্রয়োজন GSCASH, প্রয়োজন এটা নিশ্চিত করা যে কোনো
অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তরাই বকলমে যেন তদন্ত কমিটির অংশ না হয়ে ওঠে।
প্রতিটি কলেজে গণতান্ত্রিক ভাবে ছাত্রছাত্রী সংসদ নির্বাচন তো অত্যন্ত প্রাথমিক একটি দাবি। কিন্তু এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, কেবল গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দাবিতে লড়াই করে এই হায়না দের আটকানো সম্ভব। নির্বাচন হলে ক্ষমতার আরও নির্লজ্জ আস্ফালন, প্রলোভন সবকিছুই দেখতে পাওয়া যাবে। তাই, শাসক দলের ক্ষমতার রাজনীতি কে চ্যালেঞ্জ করতে গেলে প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ, সংগঠিত প্রতিরোধ।
WBJDF-এর পক্ষ থেকে আমাদের আহ্বান:
নাগরিক সমাজ, ছাত্রছাত্রী সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন , গনতন্ত্র প্রিয় সাধারণ মানুষ – প্রত্যেককে প্রতিবাদে গর্জে উঠতে হবে! নীরবতা মানেই সম্মতি। গণচাপই পারে প্রশাসন, তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থাকে ন্যায়ের পথে বাধ্য করতে।
আমরা দ্বিতীয় অভয়া হতে দেব না!
এই বাংলা ধর্ষকদের বাংলা হতে পারে না! ধর্ষকামী রাজনীতির বিরুদ্ধে, ক্ষমতার রাজনীতির বিরুদ্ধে, শাসক দলের থ্রেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিটি ক্যাম্পাসে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই হবে! এটাই সময়ের দাবি।









