১৭ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর মতো সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবরের শিরোনাম ছিল “In India, Some Doctors Go on Hunger Strike to Protest Killing of Colleague”। এ রিপোর্টেই বলা হয় – “Six of those doctors have been subsisting only on water and been taken to the hospital for care, a doctors’ group formed after the episode said on Thursday. At least two of them were in critical condition. The brutalized body of the female doctor was found on Aug. 9 in a seminar room at R.G. Kar Medical College and Hospital, a state-run institution in Kolkata, where she was completing a residency. She had many injuries, including a broken neck, according to local news media reports. The name of the 31-year-old victim may not be published under Indian law because of privacy laws relating to sexual assaults. The episode shocked India, where violence against women remains a scourge, and galvanized thousands of doctors who demanded a thorough investigation to bring the victim justice.” এরকম “shock” আমরা আগেও পেয়েছি। ভুলে গেছি। স্মৃতি বড়ো পিচ্ছিল এবং ক্ষণস্থায়ী। প্রতিদিন দৃশ্য-শ্রাব্য খবরে, সোশ্যাল মিডিয়ার অগুন্তি পোস্টে এবং হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত প্লাবনে আমরা ভেসে যাই। যেতে ভালোবাসি।
২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বরের সকালের সেই খবরটি স্মৃতির কোণে কোনভাবে বেঁচে আছে কী? মুম্বাইয়ের সিবিআই-এর স্পেশাল কোর্টের বিচারপতি ৪৮ বছরের ব্রিজগোপাল হরিভূষণ লোয়া-র রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে নাগপুরে। তিনি ২০০৫ সালের সোহরাবুদ্দিন শেখকে “ফেক এনকাউন্টা”-এ হত্যার মামলার শুনানির প্রধান বিচারক ছিলেন। আবার এই সোহরাবুদ্দিন শেখ হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ছিলেন অমিত শা। পরবর্তী সময়ে লোয়ার মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী, অসঙ্গতিপূর্ণ বয়ান উঠে এসেছে। ক্যারাভানব নিউজ পোর্টাল লিখেছিল – “Though the family asked for an inquiry commission to probe Loya’s death, none was ever set up.” (https://caravanmagazine.in/vantage/shocking-details-emerge-in-death-of-judge-presiding-over-sohrabuddin-trial-family-breaks-silence)
এনডিটভ-র খবর অনুযায়ী, “No Probe Into Judge BH Loya’s Death: Supreme Court Rejects Review Petition” (জুলাই ৩১, ২০১৮ – https://www.ndtv.com/india-news/no-probe-into-judge-bh-loyas-death-says-supreme-court-1892856)
যাহোক, শেষ অব্দি সবই নির্বিঘ্নে মিটে গেছে – “আপাতত শান্তিকল্যাণ”! সে কবেই না মানুষের বিবেক এবং প্রতিবাদের মুখ শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন –
“তরল আগুন ভরে পাকস্থলী
যে-কথাটাই বলাতে চাও বলি।
সত্য এবার হয়েছে জমকালো।
গলায় যদি ঝুলিয়ে দাও পাথর
হালকা হাওয়ায় গন্ধ সে তো আতর
তাই নিয়ে যাই অবাধ জলস্রোতে…
এখন সবই সবই শান্ত সবই ভালো
সত্য এবার হয়েছে জমকালো
বজ্র থেকে পাঁজর গেছে খুলে
এ-দুই চোখে দেখতে দিন বা না দিন
আমরা সবাই ব্যক্তি এবং স্বাধীন
আকাশ থেকে ঝোলা গাছের মূলে।“
এর পরে আর কোন কথা থাকতে পারে কী? আর আমরা তো সংবাদপত্রের খবর থেকে জেনেছিলাম যে, সিবিআই-এর যে তদন্তকারী দল কলকাতায় আমাদের “অভয়া”র নৃশংসতম খুন এবং ধর্ষণ মামলার তদন্ত করতে আসছে তাদের মধ্যে দুঁদে দুজন মহিলা অফিসার আছেন, যারা হাথরাসের মতো ঘৃণ্য এবং সংবেদনশীল মামলার তদন্ত করে সমাধানে পৌঁছেছেন। এ কী মুখের কথা? কিন্তু শেষ অবধি –
“এ-দুই চোখে দেখতে দিন বা না দিন
আমরা সবাই ব্যক্তি এবং স্বাধীন
আকাশ থেকে ঝোলা গাছের মূলে।“
সবাই নজর করেছেন নিশ্চয়ই, শিয়ালদা কোর্টে (যেখানে এই মামলার প্রাত্যহিক শুনানি চলছিল) সিবিআই যেদিন চার্জশিট জমা দিল না (বা দিতে পারল না) তার আগের দিন নির্যাতিতার পরিবারের প্রখ্যাত আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার কিছু অস্পষ্ট কারণ দেখিয়ে সরে দাঁড়ালেন। নিতান্তই কাকতালীয়? যারা এতদিন আন্দোলনের সাথে আষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন সেসব বিবেকী মানুষেরা কী বলেন?
এবার?
একদল মেধাবী, মানুষের চিকিৎসা করার স্বপ্ন-মাখা চোখ নিয়ে তাদেরই সাথী আরেক স্বপ্ন দেখা সাথী “অভয়া”র নৃশংস খুন এবং নৃশংসতম হত্যার (বিশেষণদুটোর স্থান বদলও হতে পারে) বিচার (সুবিচার অনেক দূর গ্রহের কোন ছায়াময় অস্তিত্ব!) এবং সরকার ও রাষ্ট্রের তরফে সযত্নে তৈরি করা “আইনসিদ্ধ আইনহীনতা” (legalized lawlessness)-এর বিরুদ্ধে তখন দীর্ঘ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, একটি সিস্টেমের মধ্যেকার নীরব “সন্ত্রাস সিন্ডিকেট”, সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিকভাবে টাকার বিনিময়ে ছাত্রছাত্রীদের পাস-ফেল করানো বা নম্বর বাড়ানো, মর্গের মৃতদেহ বিক্রী থেকে নিম্ন মানের ওষুধ (কোন কোন ক্ষেত্রে ওষুধই নয়, গায়ে দেবার পাউডার) সরবরাহের ঠিকাদারি থেকে কয়েক শ’ কোটি টাকা কামানো, ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং মেডিক্যাল শিক্ষাবিভাগের অভ্যন্তরের অবর্ণনীয় দুর্নীতি – সমস্ত কিছুর ক্লেদাক্ত আবরণকে একটানে খুলে ফেলে দিচ্ছে আমজনতার সামনে। এ সাম্রাজ্যের রাজধানী আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ।
তুই তো লড়েছিলি শিরদাঁড়া সোজা রেখে এই কুনাট্য রঙ্গের বিরুদ্ধে, “অভয়া” – তোকে হারিয়ে ফেললাম চিরকালের জন্য।
জানিস “অভয়া, হরিয়ানার নির্বাচনের আগে ধর্ষক বলে সুপরিচিত রাম রহিমের দীর্ঘ সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি পায়। আমাদের স্মৃতিতে তাড়া করে ফেরে পেশাদার ধর্ষক “বাবা” রাম রহিম ২০ বার প্যারোলে ছাড়া পেলেও, বিলকিস বানুর খুনিদের বেকসুর খালাসের পরে মালা পরিয়ে বরন করা হলেও (এরকম হাত-ভরা দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়) জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনারত স্কলার উমর খালিদ “দেশদ্রোহিতা”র অভিযোগে এখনও মুক্তি পাননি। এছাড়া অশীতিপর বৃদ্ধ খ্রিস্টান যাজক ফাদার স্ট্যান স্বামী বা জি এন সাইবাবার মতো মানুষদের এক বিশেষ পদ্ধতিতে “প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা”র কথা তো আমরা জানিই।
তদুপরি সিবিআই-এর তদন্ত প্রক্রিয়া! সে যে কী চায়, কিভাবে এগোতে চায় – সে কেবল “ভগায় জানে”! এটা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। স্বাভাবিক নিয়মেই কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী চলবে। এবং আমরাতো দেখেছি, সর্বশক্তিমান কেন্দ্রের রাজারা আরজি কর নিয়ে কী ধরনের হিরণ্ময় নীরবতা পালন করছেন। শুধু তাই নয়, সিবিআই-এর ডিরেক্টর কেন্দ্রের নির্বাচিত। ফলে কেন্দ্র-রাজ্য দু’তরফা মাধুর্য্যের ওপরে নির্ভর করবে তদন্তের গতিপ্তহ।
আমাদের আইনি পথগুলো কণ্টকাকীর্ণ। এর শেষ কোথায় আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। অনেকটা আবু সৈয়দ আয়ুবের রবিঠাকুরকে নিয়ে লেখা “পথের শেষ কোথায়?”। ফলে পথেই হবে আমাদের নতুন করে এবং বারেবারে পথ চেনা। আমরা পথ ছাড়িনি। পথ ছেড়ে দিচ্ছি না।
এ আন্দোলনের অভিঘাতে নারীরা সামাজিক সুরক্ষা এবং ব্যক্তি নারীর স্বাতন্ত্র্যচিহ্ন খুঁজে পেয়েছে। সমস্ত নাগরিক সমাজ – সবরকমের দলীয় প্রভাবকে দূরে সরিয়ে রেখে – একটি নতুন পরিসর তৈরি করেছে। এরকম তৃতীয় পরিসর বা নাগরিক পরিসর স্মরণীয় কালের মধ্যে উন্মোচিত হয়নি।
রাজনৈতিক দল এবং ঝান্ডা ছাড়া মানুষের বিশুদ্ধ আবেগ এবং পবিত্র ক্রোধকে রাষ্ট্র সবসময় ভয় পায়। চায়, একে বারংবার সহিংস হবার পথে ঠেলে দিতে। সফল না হলে একে প্রশমিত করার জন্য গণতন্ত্রের তথাকথিত চারটি স্তম্ভই কাজ করে – বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন মাত্রায়। সে কাজ করা শুরু হয়েছে, এবং করবেও। আমাদের রাস্তা ধর্ণায় বসে থাকা, পথে নেমে বন্ধু এবং সাথীকে চিনে নেওয়া। নাগরিক সমাজের বিপুল অংশগ্রহণ আমাদের নতুন ‘Human Bondage’ তৈরি করেছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হল – (১) আমাদের সন্তানসম জুনিয়র ডাক্তারেরা একটি অতি শীলিত, দৃঢ় এবং প্রত্যয়ী সামজিক যুক্তিবোধের জন্ম দিয়েছে, যুক্তি এবং শিষ্ট বিতর্কের সীমানা কোন সময়েই অতিক্রম করেনি, (২) এর পরিণতিতে অগণন মানুষের অংশগ্রহণের মাঝেও নিঃসারে এই শিষ্ট যুক্তির প্রয়োগ ও পরিণতিতে অনুশীলনের সূচনা করেছে। আজকের অশিষ্ট, কদর্য, ক্লেদাক্ত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবেশে এ এক জীবন্ত সামাজিক যুক্তির প্রতিরোধ।
এটুকু প্রাপ্তি আমাদের ইতিহাসের মহাফেজখানায় চিরকালীন স্থান করে নেবে – এ আমাদের বিশ্বাস। তবে একটি প্ররোচনার ব্যাপারে সয়াবিকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অপ্রাপ্তি পূরণের ক্ষেত্র হিসেবে যেন আমরা এদের আন্দোলনকে বেছে না নিই। তেমনি এ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোন রাজনৈতিক দল তৈরি করার স্বপ্নবিলাসকে আমরা যেন আমল না দিই। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন অব্দি ওদের ওপরে আরও জানা-অজানা নানা পথে বিভিন্ন আক্রমণ নেমে আসবে। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব ওদেরকে আগলে রাখার।
আমরা কোথায় যাব?
আমরা তো মানুষকে নিরাময় করে তোলার অতিরিক্ত কোন হাতিয়ার জানা নেই। এজন্য আমরা বারেবারে মানুষের কাছেই যাবো। পথেই থাকবো। লড়াইয়ের মাঠে থাকবো। আর সবকিছুর পরে বিচারব্যবস্থার কাছেই বিচার চাইবো?
বিচার চাইবো জনতার দরবারে। জনতার বিবেকের কাছে, তাদের অংশগ্রহণের মধ্যে।
তাই আমরা আবার এই ডিসেম্বরের ঠাণ্ডায় এসপ্ল্যানেড চত্তরে আবার ধর্ণায় বসেছি। এত নিষ্করুণ একটি তদন্তকারী সংস্থা হতে পারে? আমরা বুঝতে পারছি – সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র এবং সরকারের বিরুদ্ধে একটি অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছি। বাংলার সর্বাধিক প্রচারিত এবং পঠিত সংবাদপত্র এখনো আমাদের জন্য খবর করছে। কিছু ভরসা তো বেঁচে থাকেই। যদিও জানি এ লড়াই আদৌ সহজ নয়।
মানুষের দরবারে আমরা আবার ফিরে এসেছি – “জনস্রোতের নানান মতে পথেই হবে এ পথ চেনা।” এ বিশ্বাসটুকুই আমাদের পুঁজি।












আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান ভারতে মহামান্য আদালত অনেক বিচারের তাৎপর্যপূর্ণ রায় দিচ্ছেন যেগুলো অনেকক্ষেত্রেই সরকারের পক্ষে হজম করা মুশকিল। তখন সরকার সেই রায়গুলো হাতে নিয়ে বসে থাকছে চুপ করে। এ অসুখ চিরকালের তবে ইদানীং খুব বৃদ্ধি পেয়েছে। এমত অবস্থায় আমাদের মতো সাধারন মানুষের কি করনীয় সেটা একটা কঠিন প্রশ্ন। আবার ভারতবর্ষের সবচেয়ে ক্ষমতাবান তদন্ত সংস্থাকে যখন দাঁতহীন কাগুজে বাঘের মতো দেখতে লাগে (অভয়ার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত তার সর্বশেষ উদাহরন) তখন আমরা, সাধারন মানুষরা স্বাভাবিকভাবেই খুব অসহায় বোধ করি। এ এক বড়ো কঠিন সময়। কেমন করে পার হবে জানা নেই।
Excellent 🙏🙏🙏
খুব ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে
আপনার লেখা সত্যি অসাধারণ 🙏🙏🙏
Lekhata khub valo laglo.
Bortoman poristhitite sadharon
Manus er jonno Bichar byabostha
………. baddo Kothin…….. agamite aro katodur ki abostha hobe ke jane