আমরা সবাই হেরে যাচ্ছি, ভীষণ ভাবে হারছি, অত্যন্ত অসহায় ভাবে হারছি!! মনে হচ্ছে, আমাদের আশা ভরসা সব কিছুকে শুধু কফিন বন্দী নয়, তার উপর শেষ পেরেকটাও মারার কাজও প্রায় সম্পন্ন!!
২০১৯ সালে যারা সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারা বিলোপে যারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন, আর ভেবেছিলেন কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হয়ে গেল, তারা কী এখন বুঝবেন কোনো সমস্যার সমাধান এক কলমের খোঁচায় সম্ভব নয়?! শাসক দলের বুক চাপড়ানো,’নয়া কাশ্মীর’ এর concept সবই যে আকাশকুসুম,সে কথা কী স্বীকার করতে পারবেন? পারবেন না, আর সেটাই আপনার সবচেয়ে বড় পরাজয়। আপনি হয় সমস্যা বুঝতেই পারেন নি, না হলে বুঝেও মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন। যে কোনো সমস্যা সমাধানে macro level এ জোর (force) খাটানো অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হলেও micro level এ এই জোর খাটানোটাই counter productive হয়ে যেতে পারে। আপনি তা জানতেন না? নিশ্চয়ই জানতেন। কিন্তু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন এক ঝটকায় বাজিমাত করার কৌশল দেখিয়ে।
The Spy Chronicles এ প্রাক্তন RAW প্রধান A S Dulat প্রাক্তন ISI প্রধান Assad Durrani কে বলছেন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীজীর সময়ে। তিনিও তো বর্তমান শাসক দলেরই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তবে, তাঁকে এখনকার শাসকদল কতটা স্বীকৃতি দেয় সে বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে।
আজ থেকে ২২ বছর আগে এই এপ্রিল মাসেই বাজপেয়ীজী ঘোষণা করেছিলেন, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হবে তিনটি সূত্রে, ইনসানিয়াত, জামহুরিয়াত(গণতন্ত্র) ও কাশ্মীরিয়াত অবলম্বনে। কাশ্মীরিয়াত কাশ্মীরের মানুষের স্বতন্ত্র কৃষ্টি সংস্কৃতি অভ্যাস আচরণ অতিথি পরায়ণতা, সব মিলিয়ে যাকে ঠিক কট্টর মৌলবাদী ধর্মীয় আচার আচরণ দিয়ে আদৌ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কাশ্মীরে যতবার গেছি, দেখেছি অন্য গাড়ি থামিয়ে আমাদের যেতে দিয়েছে, ‘আপ হামারা মেহমান হ্যায়, আপ আগে যাইয়ে’! বারবার ‘মেহমান’ কথার উল্লেখ কানে বাজলেও ভদ্রতা ও সম্ভ্রমের কোথাও কোনো ঘাটতি দেখিনি। আজ সেই ‘কাশ্মীরিয়াত’ হেরে গেল বীভৎস ভাবে। নিরীহ ট্যুরিস্ট বা ‘মেহমান’ দের নৃশংস হত্যালীলা চিরতরে কিনা জানিনা, কিন্তু এই মুহূর্তে ভীষণ ভাবে হারিয়ে দিল সেই বোধকে, ‘কাশ্মীরিয়াত’কে !! কাশ্মীরিয়াত বলে আলাদা কিছু থাকুক তা অনেকেই চায় না। ভালো, তাদের আশাই পূর্ণ হবে।
কাশ্মীরে এই মুহূর্তে ঠিক কত মিলিটারি ও প্যারামিলিটারি ফোর্স আছে? সংখ্যাটার বিভিন্ন সময় হেরফের ঘটলেও, সীমান্ত ও রাজ্য (বর্তমানে কেন্দ্রীয় শাসিত) মিলিয়ে কখনোই তিন লক্ষের কম নয়। যার একটা বড় অংশই সতত ব্যাপৃত আছে জঙ্গি দমনে। এ ছাড়াও আছে আশি হাজারের বেশি পুলিশ বাহিনী যারা কিন্তু কাজ করে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নয়, কেন্দ্রের নিয়োজিত উপরাজ্যপালের নির্দেশে, যে নিয়ম চালু আছে সমস্ত ‘কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে’! এত বিশাল বাহিনী যা সারাক্ষণ বিব্রত করছে সাধারণ মানুষকে প্রতি পদক্ষেপে ‘রুটিন সার্চের’ নামে, তাদের কাছে কোনো রকম ‘ইনফরমেশন’ ছিল না?? ঘটনা ঘটার পরেও কোনও ফোর্স এসে পৌঁছতে পারেনি কুড়ি মিনিটের আগে, কিন্তু কেন?? একটাই কারণ, এ রকম কিছু ঘটতে পারে তার মানসিক প্রস্তুতিই ছিল না। মানে, total intelligence failure…..
এমনকি, কয়েক দিন আগেই পাক সেনাবাহিনীর প্রধানের চরম উস্কানি মূলক বক্তৃতার পরেও মনে হয়নি কিছু ঘটানোর চেষ্টা চলছে?
যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর মূল শক্তি হলো তার দক্ষতার চরম উৎকর্ষ ও কঠোর পেশাদারিত্ব। তার উপর নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা(অগ্নিবীর প্রকল্প), পেশা ও রাজনীতির সংমিশ্রণ, এগুলোর কোনোটাই বাহিনীর মূল শক্তি বাড়ায় না বা তার কর্মক্ষমতার সহায়ক হয় না। সেকথা কী আমাদের জাতীয় নেতৃত্বের হৃদয়ঙ্গম হবে? কক্ষণো না, কোনো দিন না! কারণ, অহংকারী মানুষ কোনো দিন তার ভুল বুঝতে সক্ষম হয় না, সেটা যতই দিবালোকের মতো পরিষ্কার হোক! পুলওয়ামাতে ‘ইন্টেলিজেন্স ফেলিওর’ এর কী কোনো পরিষ্কার তদন্ত হয়েছে? কী মনে হয়, এখানেও সেই তদন্ত হবে যথাযথ ভাবে? জানি না, কিন্তু কিছু তো একটা করতেই হবে। সামরিক বাহিনীর উপর মানুষের অগাধ বিশ্বাস, একটা জাতির নির্ভরস্থল। সেটা কোনোক্রমে আঘাত প্রাপ্ত হলে তো তার থেকে বড় পরাজয় কখনোই হয় না!! আগে তো এতো technology ছিল না ; আর এখন এতো উন্নত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও জঙ্গিরা অনায়াসে নাকি সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে তার কাজ শেষ করে আবার সীমান্ত পেরিয়ে চলে যেতে সক্ষম হলো!! এতো বড় ব্যর্থতা,এই বিশাল পরাজয় কী কোনো ভাবেই চাপা দেওয়া সম্ভব??
তবে, সবচেয়ে বড় পরাজয় আমাদের, যারা নিজেদের ‘সেক্যুলার’, অসাম্প্রদায়িক বলে পরিচয় দেওয়া পছন্দ করি। কী উত্তর দেবো, যখন শুনি ধর্মীয় পরিচয় দেখে দেখে মানুষকে খুন করা হয়েছে। বলা হয়েছে Islamic verse আবৃত্তি করতে, আর করতে না পারার পরেই গুলি চালানো হয় সরাসরি। জঙ্গিরা কি একবারও ভেবেছে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে নিজের সম্প্রদায়কে, সবচেয়ে কলঙ্কিত করেছে নিজের ধর্মকে (অন্ততঃ যে ধর্মের কথা সে সোচ্চারে প্রকাশ করেছে)!! সারা পৃথিবীর সামনে ধর্মের সেই দিকটাই তারা সাফল্যের (?) সঙ্গে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছে যা দেখে মানুষ ভয় পায়, আতঙ্কিত হয়!! কোনো অমুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারা নয়, ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে চলেছে এই নিষ্ঠুর ঘাতক দল !! কিন্তু, সেটা কি বুঝতে পারছে, সম্প্রদায়ের অন্যান্য মানুষজন, যারা অন্ততঃ বেঁচেবর্তে থাকতে চায়, অশান্তি ও দাঙ্গা হাঙ্গামা ব্যতিরেকেই? যদি না বুঝতে পারেন, সত্যিই কিছু বলার নেই। আর যদি কিছুটা হলেও সম্যক ধারণা তৈরি হয়ে থাকে তাহলে বলবো, কালবিলম্ব না করে সংঘবদ্ধভাবে এর প্রতিবাদে আওয়াজ তুলুন, পরিষ্কার বোঝান কিছু মানুষের নিকৃষ্ট অপকর্মের দায় সম্প্রদায় কখনো কোনো সময়েই নেবে না, অতি তীব্র ভাবে সমালোচনা করুন এই ধর্মের নামাঙ্কিত হত্যালীলাকে কায়মনোবাক্যে। বাস্তবে কতটা সম্ভব জানি না, কিন্তু আর তো কোনো বিকল্প দেখছি না গভীর বিশাল বিপর্যয়কে বা পরাজয়ের চূড়ান্ত ধাপকে এড়াতে ……..
জীবনে হারা কোনো ব্যাপার নয়, সারা জীবনের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হেরে এসেছি বারে বারে, জয় তো আসে কালেভদ্রে। কিন্তু, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরাজয়ের যে সার্বিক চেহারা দেখতে বাধ্য হচ্ছি, তা বোধহয় কোনো দিন কখনো কল্পনাও করিনি। কখনো ভাবিনি শুধু নিজের দেশ কেন,সারা দুনিয়াব্যাপী এতো ঋণাত্মক, এতো খারাপ থেকে খারাপতর জিনিস ক্রমান্বয়ে দেখেই যেতে হবে, কোনো রকম বিরতি ছাড়াই!!
জানি না এখনো অপেক্ষায় আছে আরও কতো পরাজয়ের অসম্ভব সব মুহূর্ত, অভূতপূর্ব অকল্পনীয়……….










