এ নিয়ে কিছু বলার আগে ছোট্ট করে ডিসক্লেইমার: আমাদের দেশের কোটা সিস্টেম আর বাংলাদেশের কোটা সিস্টেম এর মধ্যে কিছু অমিল আছে, আবার মিল ও আছে। ব্যাস এই বার পড়তে থাকুন।
প্রথমেই যেটা বলার মেধা জিনিসটা কিন্তু আকাশ থেকে আসে না, বাতাস থেকে ঢোকে না, এর একটা বস্তুগত ভিত্তি আছে। মেধার মূল উৎস হল সোশ্যাল ক্যাপিটাল। এখনও দেখবেন যে ফার্স্ট জেনারেশন লার্নারদের সিংহভাগ হল বিশেষ জনগোষ্ঠী (উপযুক্ত পরিভাষার অভাবে যাদের দলিত বলে চিহ্নিত করলাম, কারণ এর ঐতিহাসিক ভাবে দলিত ও প্রান্তিক)। অর্থাৎ যাদের বাবা ঠাকুরদা এরা বিদ্যায়তনিক শিক্ষার কোনো সুযোগই পায় নি। এই বাচ্চাটির সাথে আমার আপনার ঘরের বাচ্ছা যার উর্দ্ধতন চোদ্দ পুরুষ লেখাপড়ার মধ্যেই ছিল তার তুলনা কি ভাবে করবেন ?
সোশ্যাল ক্যাপিটালেই খেলাটা শেষ হয়ে যাচ্ছে না।।মেধার সাথে শারীরিক পুষ্টির মতো বস্তুগত উপাদানেরও সম্পর্ক আছে। যেমন রক্তাল্পতা এর সাথে, আয়োডিনের সাথে বুদ্ধির সম্পর্ক সুপ্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য। আন্ডার ওয়েট বাচ্ছাদের অধিকাংশই দেখবেন ঐ দলিত পরিবারের।
সবটা মিলিয়ে জীবনে সফল হওয়ার প্রতিযোগিতার জন্য একটি সমানুপাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যতদিন না তৈরি হচ্ছে, ততদিন সংরক্ষণ নামক এই পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন থাকার কারণ থাকবে। হ্যাঁ, ডিক্রিমিনেশন অর্থাৎ বৈষম্যবাদ বা পক্ষপাতিত্ব, কিন্তু ইতিবাচক। এই পক্ষপাতিত্ব এর ফলে আপনি রেগে গেলেও এই তথ্য বদলাবে না যে এক সময়ে আপনার পূর্বপুরুষের তৈরি বৈষম্যবাদ এর শিকার ছিল ঐ জনগোষ্ঠী।
সংরক্ষণের পদ্ধতিগত খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা বিতর্ক চলতেই পারে, তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়। একজন দলিতের পরিবার কয় প্রজন্ম এই সুবিধা পেতে পারে, এখন দলিত তার চাকরি জীবনে কয়বার এই সুবিধা পেতে পারে, ভুয়ো দলিত সংসাপত্র জোগাড় কি ভাবে আটকানো যায়, কোন কোন জনগোষ্ঠী কি ভাবে এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হবে, কোটার সুবিধার সাথে তার বর্তমান আয়ের ঊর্ধ্বসীমা থাকবে কি থাকবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিতর্ক চলার সময় দুটি প্রেক্ষিত মাথায় রাখবেন, এক) এই কোটা সিস্টেম কেবল সরকারি শিক্ষা বা চাকরি ব্যবস্থায় প্রযোজ্য আমাদের দেশে, বিপুল সংখ্যক বেসরকারি শিক্ষা বা চাকরি ব্যবস্থার তুলনায় সেটা যৎসামান্য, দুই) আরেক রকম কোটা আছে শিক্ষা ব্যবস্থায় যার একটি পরিচিত নাম ম্যানেজমেন্ট কোটা অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে উচ্চ শিক্ষার সিট।
শেষ কথা যেটা বলার, আমাদের দেশে কিংবা ওদের দেশে, এই কোটা সিস্টেমটা একেবারেই সংস্কারবাদী একটি পদক্ষেপ, বৈপ্লবিক কিছু নয়। সরকারি শিক্ষা বা সরকারি চাকরিতে এই সংরক্ষণ প্রথা বজায় রাখার জন্য ঐ সব সম্প্রদায়ের মানুষের বিরাট কিছু উপকার হচ্ছে না, তাদের খুব কম অংশেরই জীবনযাত্রার মানের মৌলিক পরিবর্তন হচ্ছে বা হয়। বঞ্চিত নিপীড়িত মানুষের একটি অংশের ক্ষোভ নিরসনের সেফটি ভালব মাত্র। এবং সেই সঙ্গে নির্বাচনী বৈতরণী পার করার একটি প্রকৃষ্ট উপায়। কারণ উপায় নেই। শোষিত, বঞ্চিত, দলিত মানুষের শোষণ মুক্তির আসল উপায় জানা থাকলেও শাসক শ্রেণী সেটা কখনও হতে দেবে না, তাই কোটা নামক কনসেসন বা ছাড় এর ব্যবস্থা করছে ওরা।
মেহনতি জনগণের পক্ষ থেকে এই সব টুকরো টাকরা ছাড় পেয়েই খুশি থাকতে হচ্ছে। পূর্ণ অধিকার অর্জনের লড়াই এর যাত্রা পথে তাই কোটা ব্যবস্থা একটা মধ্যবর্তী স্টেশন মাত্র, প্রান্তিক স্টেশন নয়। তাই বলে গাড়ি ঘুরিয়ে, মেধা না কোটা জাতীয় কুতর্ক তুলে কেউ যাত্রা শুরুর স্টেশনে আশাকরি ফিরে যেতে চাইবো না। কারণ সেটা প্রতিক্রিয়ার যাত্রা, প্রগতিশীলতার যাত্রা নয়। মেধা আকাশ বাতাস থেকে পরে না, এর বস্তুগত ভিত্তি আছে এই বৈজ্ঞানিক সত্যটা প্রতিষ্ঠা করার একটা মানবিক জেসচার, টোকেনিজম হল সংরক্ষণবাদ। আপনি এই মতবাদের সপক্ষে দাঁড়াবেন কি না সেটা আপনার ব্যাপার সে আপনি ভারতীয় হন বা বাংলাদেশি। মানুষের ছদ্মবেশে অমানুষ অমানবিক হলে অবশ্য আলাদা কথা।।











ওরেব্বাস্ আজকাল কী লিখছো গো ।
সেটাই লাস্ট লাইন টাই।।মানুষের ছদ্মবেশে অমানুষ অমানবিক। এই এইটাতেই তো বুক ফুলিয়ে খুঁজতে খুঁজতেই জীবন গেলো যে।
অন্যান্য অফিসিয়ালের মতো লেখাটা নিয়মিত রাখো গো। 🙏💕🩵