তুই তো মা চলে গেলি ৯ আগস্ট ভোরবেলা মহাকালের স্রোতে। এমন এক মরণ বেছে নিলি যা সাধারণ নয়। ধর্ষিতা এবং অত্যাচারিতা হয়ে এক তীব্র যন্ত্রণার মরণ। তোর দেহ লোপাট হয়ে গেলো অত্যন্ত দ্রুততায়। প্রশাসনিক তৎপরতা এমন জায়গায় গেলো মনে হলো তুই একদিনের জন্য দেশের সর্বোচ্চ ভিআইপি হয়ে গেছিস। মিথ্যার পসরা নিয়ে হাজির হলো অনেকেই। তুই তো নাকি আওয়াজ তুলেছিলি দুর্নীতির বিরুদ্ধে, নিম্নমানের ওষুধ এর বিরুদ্ধে। যে গলায় আওয়াজ তুলেছিলি সেই গলা টিপে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে চাইলো ক্ষমতার বৃত্ত। তোর গলার হাড় ভেঙে গেলো।যে আওয়াজ তুই তুলতে চেয়েছিলি সেই আওয়াজ লক্ষ কন্ঠে ধ্বনিত হয়ে গেলো রাজপথ থেকে আলপথ।
এই প্রাণ দিয়ে তুই কি পেলি?
স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে একজন আম আদমির যা প্রাপ্য, সেই ন্যায় বিচারের দাবি করলাম আমরা। তোকে যারা খুন করেছে, খুনের পরিকল্পনায় যারা আছে, আর যারা খুনের প্রমাণ লোপাট করেছে তাদের সবাইকে চিহ্নিত করা। চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট বিচার করা।
পনেরোই আগস্ট পতাকা তুলে যে গর্ব আমরা অনুভব করি, সেই গর্বের অনুরণন চেয়েছিলাম তোর বিচারে। এই গর্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আস্থা। তিরঙ্গা পতাকার ওপর আস্থা। তিরঙ্গা হাতে নিয়েই রাজপথে চেয়েছিলাম তোর খুনিদের বিচার।
জঙ্গল থেকে বাঘ বেরিয়ে এসে যখন মানুষ মারে তখন আমরা আদালতে যাইনা। বাঘের বিচার আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। বাঘে আক্রমণ করলে আমরা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ি নিজেরা। লোকালয় থেকে বাঘ তাড়িয়ে জঙ্গলে ফিরিয়ে দিই। জানোয়ারের অপরাধের বিচার আমরা নিজের হাতে তুলে নিই। মানুষের অপরাধের বিচার আলাদা। রাষ্ট্র আমাদের বারণ করেছে মানুষের বিচারের ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে। পরিবর্তে তদন্ত সংস্থা আদালত রাষ্ট্র আমাদের আশ্বস্ত করেছে ন্যায় বিচার দেবার। এই আশ্বাসের দাম আমরা দিয়েছি নিজেদের হাতে বিচার তুলে না নেবার চুক্তিতে।
আজকে দুনিয়ার মানুষ জানে তোর খুনে কারা জড়িত। ব্যক্তি মানুষগুলোকে না চিনলেও কোন গোষ্ঠী জড়িত সেটা জানে। প্রমাণ লোপাট কারা করেছে সেটাও জানে। তোর দেহ ছিনতাই করে কারা দ্রুত পুড়িয়ে দিয়েছে সেটাও সবাই আমরা জানি। তোর দেহ ছিলো অপরাধের সবচেয়ে বেশি প্রমাণ। তাই সেটাই দ্রুত লোপাট করেছে। কারা পেস কনফারেন্স করে লাল জামার মহাপুরুষকে সত্যি গোপন করার জন্য ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট বানিয়েছে সেটাও আমরা জানি।
আইন নিজের হাতে তুলে না নেবার অঙ্গীকারে যারা বলেছিল সঠিক বিচার দেবে, তাদের ওপর আমরা আস্থা রেখেছি। পুলিশ সিবিআই জন প্রতিনিধি, আদালত সবার ওপর এখনো আস্থা রেখেছি তোর ন্যায় বিচারের।
বিগত চারমাস তদন্ত আর বিচারের নামে যা দেখছি সেটা প্রহসন বলে মনে হচ্ছে। এখনো তোর খুনিরা আইনের হাতে ধরা পড়েনি। ষড়যন্ত্র যারা করেছে আর যারা প্রমাণ লোপাটে জড়িত তাদের কেউ এখনো আইনের আওতায় আসেনি। আমরা ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছি। দিয়েও যাবো। আমাদের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা এখনো অটুট। এই আস্থাই আমাদের দেশকে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণতন্ত্র হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।
তুই তো মা এখন আর শুধু পানিহাটির একটি বাড়ির মেয়ে নয়, যারা মিছিলে হেঁটেছে, মোমবাতি জ্বালিয়েছে, মনে মনে হলেও একবার বলেছে উই ওয়ান্ট জাস্টিস, তুই এখন তাদের সবার মেয়ে বোন বা দিদি হয়ে গেছিস।
আজকে তদন্তের প্রহসন, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা আর প্রশাসনের অপরাধী আড়াল করার প্রচেষ্টা দেখে একটা কথাই মনে হচ্ছে। অপরাধের তদন্ত আর বিচার করার ভার যদি কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর না থাকতো, আইন হাতে তুলে নেবার অধিকার যদি আমজনতার ওপর থাকতো, বিচারের ভার যদি আদালতের ওপর না থেকে আম জনতার হাতে থাকতো তাহলে হয়তো যারা তোর খুনের বিচার চেয়েছে, তারা এতদিনে তোর বিচার এনে দিতে পারতো।
ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমি এখনো চাই আদালত সিবিআই প্রশাসন তোর সুবিচার এনে দিক। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বিচার ব্যবস্থা আর প্রশাসনের ওপর আমাদের আস্থা ভরসা অটুট থাকুক, এটাই আমার মনে প্রাণে প্রার্থনা।
যদি দেখা যায় যাদের বিচার দেবার কথা তারা বিচার দেবার থেকে বিচার দেবার পথে অন্তরার হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন এই পুরো তদন্ত আর বিচার ব্যবস্থার বিচারের প্রয়োজন হয়ে পড়বে। অতীতে একবার বিচার ব্যবস্থা এরকম সংকটে পড়েছিলো। জেসিকা লাল হত্যাকাণ্ডের বিচারে। তদন্ত আর বিচারে অপরাধীরা প্রথমে ছাড়া পেয়ে যায়। অপরাধীরা সেখানে প্রভাবশালী ছিলো। তদন্ত আর বিচার ব্যবস্থা তাদের ওপর আস্থা ফিরিয়েছিলো পুনরায় তদন্ত এবং বিচার করে দোষীদের শাস্তি দিয়ে।
তিলোত্তমা কেস জেসিকা লাল কেসের থেকে ভয়ঙ্কর। এখানে শুধু প্রভাবশালী যোগ নয়, খুনটিই একটি প্রাতিষ্ঠানিক খুন।
এখানে যদি দেখা যায় অপরাধীরা কেউ ধরা পড়লো না, কোনো এক উলূখাগড়া কে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারের প্রহসন হলো, তাহলে বিচার ব্যবস্থা আর প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা জেসিকা লাল কেসের থেকে বেশি টলে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিলোত্তমার বিচারহীনতার জন্য যদি মানুষ সিবিআই আর আদালতকে কাঠগড়ায় তোলে তাহলে সেটা হবে ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে কালো দিন। আমরা সেই কালোদিন অবশ্যই দেখতে চাইবো না। আমরা আশা রাখবো ভারতীয় গণতন্ত্র তিলোত্তমা কে সঠিক ন্যায় বিচার দেবে।











