
স্বাধীনতা লাভের পর বহুমুখী নদী পরিকল্পনার আওতায় অসংখ্য নদী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্ক যে হয়নি তা কিন্তু নয়। সর্দার সরোবর নদী প্রকল্পের রূপায়ণ ও তেহরি বাঁধের নির্মাণের প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা দেশ। নদীতে বড়ো বাঁধের নির্মাণ সবক্ষেত্রেই স্থায়ী আবাসিকদের জীবনকে অস্থিত করে তোলে। এই মূহুর্তে যেমন ব্রহ্মপুত্র নদের বিখ্যাত বাঁকের মুখে সুবিশাল বাঁধ তৈরির চিন্তা ভাবনা চলছে প্রতিবেশী চীন দেশে। এই বাঁধ নির্মাণ নিয়ে ইতিমধ্যেই নাসার তরফে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে এই বলে যে, এই সুবিশাল বাঁধ নির্মাণের ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি কমে যাবে যার প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। 
এই মূহুর্তে সিয়াঙ্ নদীতে মেগা বাঁধ নির্মাণ নিয়ে এক প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের অরুণাচল প্রদেশে এখোমে মোউয়ো ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ব্যানারে। জেলা সদর আনিনি কেন্দ্রিক এই সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে , এই অঞ্চলের আদিবাসী মানুষদের গ্রাম সভাকে সম্পূর্ণভাবে অন্ধকারে রেখে, আগে থেকে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্পূর্ণভাবে অনৈতিক এবং এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষদের অস্তিত্বের পক্ষে বিপদজ্জনক। বর্তমান এন. ডি. এ. পরিচালিত বিজেপি সরকারের এই একতরফা সিদ্ধান্ত তাঁদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে সিয়াঙ্ নদীর ওপর প্রস্তাবিত মেগা নদী বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে, স্থানীয় মানুষেরা আজ প্রতিবাদ মুখর।
এই নদীর ওপর নতুন বাঁধ নির্মাণ করা নিয়ে এই মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী শ্রী পেমা খান্ডু শাসিত অরুণাচল প্রদেশ রীতিমতো সরগরম। মন্ত্রী মশাই অবশ্য তাঁর মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্তে অবিচল।
আপার সিয়াঙ্ জেলার অন্তর্গত ২৯ গ্রামের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি সম্মিলিতভাবে ডিবঙ্ ভ্যালি জেলা কর্মকর্তাদের এক স্মারকলিপি পেশ করেছেন । তাঁদের পক্ষ থেকে প্রবল এবং সঙ্গত দাবি জানিয়ে বলা হয়েছে যে, দ্রি নদীর ওপর প্রস্তাবিত ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার মিহুমডঙ্ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ বন্ধ করতে হবে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোরে মোলো এবং কোষাধ্যক্ষ আইসি মো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়ে বলেছেন – “আমরা ভূমিকম্প প্রবণ এবং বাস্তু তান্ত্রিক ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এমন একটি এলাকায় বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমাদের জেহাদ ঘোষণা করছি। আমরা আমাদের এলাকায় বাঁধ কেন্দ্রিক উন্নয়নের বিরুদ্ধে। এই বাঁধ নির্মাণ একটি আত্মঘাতী প্রকল্প। আমাদের আপত্তি ও আন্দোলনকে উপেক্ষা করে এই বাঁধ নির্মিত হলে আমরা আমাদের পিতৃভূমি থেকে উৎখাত হবো।”
আন্দোলনকারীদের অভিমত – “ সিয়াঙ্ নদী আমাদের কাছে কেবলমাত্র একটি নদী নয়,সিয়াঙ্ আমাদের আনে , মা। মাকে কেউ এভাবে বিকিয়ে দেয়? যাঁকে আমরা শ্রদ্ধা করি,পুজো করি তাঁর এই পরিণতি আমরা মেনে নেব না। এই বাঁধ নির্মাণ করা হলে আমরা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাব। আমাদের সবার পৈতৃক জমিজমা ও খামার ধ্বংস হয়ে যাবে।”

পনের বছরের কাছাকাছি সময় ধরে চিন্তন কাজ করছেন অরুণাচল প্রদেশ সরকারের সঙ্গে। এতোদিনে রাজ্যটাকে চিনেছেন, জেনেছেন নিজের হাতের তালুর মতো করে ফলে তাঁর মতামতের গুরুত্ব রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন – “সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও পশ্চিম কামেঙ্ জেলায় অজানা কারণে গাছেরা মারা যাচ্ছে। এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের জলাধার থেকে নিঃসৃত মিথেন গ্যাসের প্রভাবে এমন বিপর্যয় অসম্ভব নয়। আসলে প্রকৃতির সমস্ত ক্ষেত্রগুলো পরস্পর নিবিড় সম্পর্কে বাঁধা,একটার পরিবর্তন ঘটলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই সত্যকে যত দ্রুত আমরা অনুভব করবো , ততই মঙ্গল হবে এই বিপন্ন ধরিত্রীর।”
আসলে এরমধ্যে জড়িয়ে আছে “জল রাজনীতির” একটি বিশেষ অধ্যায় – এই রাজনীতি হলো আস্ফালনের রাজনীতি। ভারত চীন সীমান্তবর্তী এলাকায়, শক্তিশালী প্রতিবেশীর একেবারে নাকের ডগায় বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের চলতি শাসকেরা বুঝি প্রমাণ করতে চান – হাম কিসিসে কম নহী। তুমি ৬০ গিগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন সুপার মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে আমিও ১০ গিগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করবো তাতে করে যদি আমার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়,খান ৩০ গ্রামে শান্তিতে বসবাসকারী আদিবাসী মানুষদের গ্রামছাড়া হতে হয়, বাস্তুতন্ত্রের শৃঙ্খলা ভেঙে বিশৃঙ্খল হয়ে যায়, চারিদিক যদি সবহারাদের কান্নার কলরোলে ভরে ওঠে তাতেও কুছ পরোয়া নেহি। উন্নয়ন তো হলো, নাকের বদলে নরুণ তো পেলাম! আর কে না জানে কিছু পেতে গেলে, কিছু দিতে হয়! আমরা না হয় একটু বেশিই দিলাম!
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সর্বভারতীয় বিভিন্ন পত্র পত্রিকার প্রতিবেদন ।
জুন ১০, ২০২৫.











যুদ্ধও চলছে। বাঁধও হচ্ছে।মাঝে মাঝে ছোট মাথা গুলিয়ে যায়।
শেষপর্যন্ত কোথায় দাঁড়াব কি জানি!
সময়টা বড়ই কঠিন। মাথা গুলিয়ে যাওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়।
খুব পরিচ্ছন্ন বক্তব্য। প্রয়োজনীয় এবং সুন্দর লেখা।
জয়ন্ত বাবুকে ধন্যবাদ জানাই পরিচ্ছন্ন মন্তব্যের জন্য। আমি মন্থনের পক্ষে। লেখক ও পাঠকের নিরন্তর সংলাপ আমাদের উভয়ের ভাবনাকেই পরিণত করে, পরিশুদ্ধ করে। ভালো থাকবেন।
সিয়াঙ কে বাঁচাতে সত্যিই অনেক ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন আছে। শুধুমাত্র শক্তি প্রদর্শন ই যেন বাঁধ নির্মাণের মূল কারণ না হয়। স্থানীয় অধিবাসীদের ভাবনা চিন্তা কেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প রূপায়ন করা উচিত।
এই মূহুর্তে আমরা সবাই উন্নয়ন নামের এক পাগলা ঘোড়ার পিঠে উঠে বসেছি। ও ছুটছে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে। সব ছারখার হয়ে গেল। সেসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। স্থানীয় মানুষের কথা শুনলে যে উন্নয়ন পিছিয়ে যাবে।