ছোটোবেলায় একটা হিন্দি ছবিতে একটা দৃশ্য দেখেছিলাম, প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে এক শিশু — হাফপ্যান্ট পরা, অসহায়ের মতো তার অসুস্থ বাবাকে কোনো একটা ঠেলাগাড়িতে তুলে নিয়ে ঠেলে ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছতে চাইছে। তার সেই আকাশভাঙা বিপন্নতা আর বাবাকে বাঁচানোর মরীয়া চেষ্টার ছবি ঐ বয়সে, যাকে বলে _impressionable age_ , মনে গেঁথে গেছিল। (প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ছেলের সেই প্রচেষ্টা সম্ভবত সফল হয়নি।)
সে সময়ে মূলধারা/ বাণিজ্যিক ধারা/ব্যতিক্রমী ধারার ছবির বৈশিষ্ট্য বা তফাৎ সম্পর্কে তেমন কোনো সম্যক ধারণা ছিল না। অনেক পরে বাণিজ্যসফল তথাকথিত মূলধারার হিন্দি ছবিতেও সেই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অসুস্থ বাবাকে বাঁচানোর চেষ্টা, তাঁর সন্তানের (সুযোগ্য) বন্ধুদের সম্মিলিত প্রয়াসে সার্থকতা পায়। (জনপ্রিয় ছবি _থ্রি ইডিয়টস্_ মনে পড়ে না কি?) অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ছবিতে অসুস্থ বাবাকে (অথবা মাকে) বাঁচানোর জন্য সন্তানের প্রচেষ্টা চিত্রনাট্যে চলে আসছে।
এর পেছনে যেমন এক স্বাভাবিক মানবিকতা ও সম্পর্কের আন্তরিকতা ন্যারেটিভ হিশেবে থাকে, তেমনই থেকে যায় স্বাস্থ্য তথা চিকিৎসা পরিষেবা সম্পর্কে ব্যক্তির বিপন্নতা, অনিশ্চয়তা — যার গভীরে অনস্বীকার্য বাস্তব হিশেবে থাকে স্বাস্থ্য পরিষেবার অর্থনীতি।
আমাদের দেশের মতো দেশে যখন সকলের জন্য স্বাস্থ্য এখনও দূর অস্ত্, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়বরাদ্দ যথেষ্টই অপ্রতুল, সেখানে এই ধরনের বিপন্নতার ছবি ব্যক্তিগত হয়েও সামাজিক। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও অন্য কোনো রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি দায়বদ্ধতায় ছোটো ছোটো গোষ্ঠীর উদ্যোগে, বিকল্প নির্মাণের লক্ষ্যে কখনও সমবায়িক ভাবনায়, কখনও সামাজিক যৌথতায় চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে, এটাও ঘটনা। এ রাজ্যে _রেড এইড কিওর সেন্টার_ বা _স্টুডেন্টস হেলথ হোম_ , পরবর্তীতে গড়ে ওঠা শ্রমজীবীদের জন্য হাসপাতাল বা _শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ_ , _হিউম্যানিটি হাসপাতাল_ , অথবা অন্য রাজ্যের সংঘর্ষ ও নির্মাণের চিহ্ন _শহীদ হাসপাতাল_ —- এ ধরনের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে যারা কর্পোরেট পুঁজির অধীন বেসরকারি হাসপাতালের বিপ্রতীপ ভাবনায় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যর অধিকারকে সম্মান জানাতে পারে। সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার অপ্রতুলতা, দুর্নীতি ও হৃদয়হীনতা সাধারণ নির্বিত্ত মানুষকে অসহায় করে দেয়। সেখানে লুঠেরা পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের সুযোগে বেসরকারি চিকিৎসাক্ষেত্রে — পরিষেবা থেকে শিক্ষা — সর্বত্রই লোভ ও লাভের আক্রমণ। সেখানে বিকল্প ভাবনা রীতিমতো দুঃসাহস। এ এক জটিল অঙ্ক, নিশ্চিতভাবেই এক বা একাধিক অসমীকরণকে সমাধান করার দুষ্প্রয়াস।এই অঙ্ক কঠিন ঠিকই, কিন্তু স্বপ্নপূরণের ছবিতে বারবার ফিরে আসে এই দুরূহ বিষয়।
সৌরভ পালোধি পরিচালিত _অঙ্ক কি কঠিন_ ছবি দেখে এই কথাগুলো মনে পড়ল।
ভাবতে গেলে,এ ছবিও শেষ পর্যন্ত এক স্বপ্নপূরণের কাহিনি বলে, বিবিধ আর্থসামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বাঁচতে চাওয়া অস্তিত্বকে এক ধরনের স্বস্তির নিশ্চয়তা দেয়।
কলকাতার আশপাশে, এমনকি কলকাতার পেটের মধ্যে, এমন অসংখ্য জায়গা রয়েছে, যেখানে বেঁচে থাকাটাই এক কঠিন অঙ্ক।
এমনই এক পটভূমিতে ছবিটা শুরু হচ্ছে এক স্বপ্নসন্ধানী মাস্টারমশাই এর সঙ্গে ইশকুলের ছাত্রছাত্রীদের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে, যে ইশকুলটা, এই রাজ্যের আরও অসংখ্য ইশকুলের মতোই বন্ধ হয়ে যাবে করোনা অতিমারির পরে। জানালাগুলো খুলে আকাশ দেখা ও দেখানোর এমন অনেক সম্ভাবনা আমাদের দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু ইশকুলে যাওয়ার সুযোগ না পেলেও পড়ুয়া ঐ ছোট্ট শিশুদের স্বপ্ন তো বদ্ধ হয়ে থাকে না, সেই স্বপ্নরা চায় ডানা মেলে উড়তে, অনেক ঝড় ঝঞ্ঝা পেরিয়ে পৌঁছতে নিজস্ব গন্তব্যে। সেই ইশকুলের দুই ছাত্র ও এক ছাত্রী,যারা স্বপ্ন দেখেছিল ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ও নার্স হওয়ার (দর্শকের কাছে অনুরোধ, এখানে কেন ছাত্রীকে ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখানো হয়নি সেই কূটতর্কে প্রবৃত্ত না হতে)। তারা তাদের সেই স্বপ্নকে জুড়ে জুড়ে একটা হাসপাতাল বানিয়ে তুলতে চায়। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি কলোনি আর নতুন গড়ে ওঠা শহরের একটা না-হয়ে-ওঠা বহুতলের একটা তলায় নানান সরঞ্জাম জোগাড় করে তারা তাদের স্বপ্নের হাসপাতাল বানাতে থাকে। তাদের এই অদ্ভুত বিচিত্র উদ্যোগে সাহায্য করে শাহরুখদা, যে আসলে ঐ গড়ে ওঠা শহরের একজন ডেলিভারি বয়। এবং এই শাহরুখের একজন প্রেমিকা আছে,কাজল [≈কাজোল] যে হিন্দু, ও তার বাবাও সেই তুমুল জনপ্রিয় হিন্দি ছবির _বাবা_ চরিত্রে অভিনয় করা অমরীশ পুরি-র মতোই এই সম্পর্কের প্রতিবন্ধক।
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেলেটির বাবা দিনমজুর (অসাধারণ বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করেছেন শঙ্কর দেবনাথ), যাঁর স্ত্রী ঐ গড়ে ওঠা নগরীতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন, তাঁর কাশির সমস্যা ক্রমশ বেড়ে ওঠে ও শ্বাসকষ্ট চরমে পৌঁছয়।
ইঞ্জিনিয়ার হতে চাওয়া ছেলেটির বানানো ঠেলাগাড়ির এক বিচিত্র সংস্করণে চাপিয়ে বন্ধুর অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ঐ নিজেদের বানানো হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেয় তিন বন্ধু, তিনটি শিশু, সঙ্গী ঐ শাহরুখদা ও তার প্রেমিকা নার্স কাজল যাকে এই অসম ধর্মে প্রেমের কারণে বাবা বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। শেষ পর্যন্ত এক বিচিত্রতর প্রক্রিয়ায় জোগাড় করা অক্সিজেন সিলিন্ডার কাজে লাগিয়ে অসুস্থ বাবাকে বাঁচিয়ে তোলেন নার্স ও এক চিকিৎসক, এবং অবশ্যই ঐ শিশু ত্রয়ী ও তাদের শাহরুখদা।
নিশ্চিতভাবেই এ এক ইচ্ছেপূরণের কাহিনি, যা আমাদের সামাজিক বৈষম্য ও বিভাজনের প্রেক্ষাপটে পরম কাঙ্ক্ষিত এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন। চারপাশের নৈরাজ্য অনৈতিকতা অত্যাচার আক্রমণের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে হওয়া স্বাভাবিক যে এখন এই ইচ্ছেপূরণ নিতান্তই পরাবাস্তব।
কিন্তু তা সত্ত্বেও ঐ তিন শিশুর আরেক বন্ধুর সংলাপে যখন শোনা যায় যে সে শিক্ষক হতে চায়, তাই সে কোনো লোভের ফাঁদে পা দেবে না, ঘুষ দেবে না বা নেবেও না, কিংবা যখন সিলিন্ডার আর সিন্ডিকেট শব্দদু’টো গুলিয়ে ফেলে একটি শিশু একজনকে বিস্ময়ের সুরে বলে যে হাসপাতালে কাজ করে সিন্ডিকেট কাকে বলে জানে না কেন, অথবা ঐ তিনটি শিশুর শ্রমজীবী মা যখন তাঁদের শিশুদের স্বপ্নগুলোকে আগলে রাখেন —- তখন এই শ্লেষের আড়ালে আমাদের পরিচিত পারিপার্শ্বিক সমাজকে চিনতে অসুবিধে হয় না, এবং দর্শকের আন্তরিক প্রয়াসে ছবির চরিত্রগুলোকে স্পর্শ করতে ইচ্ছে হয়, অনুকম্পা নয় বরং সহমর্মিতা জন্মায়।
এমনকি যে জটিল অঙ্কের হিশেব মেলানোর অক্ষম অথচ যন্ত্রণাবিদ্ধ প্রয়াস দেখা যায় ঐ শিশুদের একজনের মাযের চরিত্রে (পোশাক- লিপস্টিক -উচ্চারণ- জমানো টাকার কৌটো সব মিলিয়ে যথাযথ অভিনয় করেছেন দীপান্বিতা),যার পাশাপাশি ধর্মীয় দূরত্বকে অতিক্রম করে ঘর বাঁধতে চাওয়ার অঙ্ক —- এগুলো সবই সেইসব বিভিন্ন স্বপ্নর খণ্ডচিত্র, যেসব স্বপ্নগুলো আজকের ভারতে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
(তবে নাগরিক লাম্পট্য বোঝাতে মদিরাসক্ত পুরুষ যৌনসঙ্গিনীর পাশে আধশোয়া হয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা প্রেমেন্দ্র মিত্রর কবিতার লাইন আওড়াবে, এটা কিঞ্চিৎ সরলীকরণ বলে মনে হয়েছে।)
এই ছবি সেই মানবিক তথা সামাজিক সংকটের কথা বলে, ইচ্ছেপূরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েও শিক্ষা স্বাস্থ্য তথা বেঁচে থাকার অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এমন পরিচ্ছন্ন ছবি দেখা উচিত।












অতি প্রাঞ্জল অথচ সংক্ষিপ্ত বিবরণি। খুব ভাল লাগল।