বিচ্ছিরি গরমে ঘামতে ঘামতে রোগী দেখছিলাম। ছোট্ট একটা খুপরি। জানলা নেই। একপাশে শুধু রোগী ঢোকার দরজা। যা হাওয়া বাতাস আসে ওই দরজা দিয়েই আসে।
দেয়ালে একটা টেবিল পাখার মাথা লাগানো। সেটা গরমের সাথে পাল্লা দিতে পারছে না। তাও মন্দের ভালো আজ রোগী সংখ্যা কম। ভোটের মরসুম চলছে। কোনো এক মন্ত্রী আজ বিকেলে রোড শো করতে আসবেন। তার জন্য এখন থেকেই রাস্তাঘাট ফাঁকা। টোটো অটো বিশেষ চলছে না।
গলা শুকিয়ে ঝাঁঝা করছে। বোতলে হাফ লিটার জল ছিল। সেটা অনেকক্ষণ আগেই শেষ। তারপর অন্তত দেড় লিটার ঘাম হয়ে গেছে।
ডিহাইড্রেটেড অবস্থায় ঝিমাতে ঝিমাতে রোগী দেখছিলাম। মনঃসংযোগ করতে পারছিলাম না। একটা প্রশ্ন দুবার- তিনবার করছিলাম।
বাইরেও রোগীদের সাড়া শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁরাও বেঞ্চে বসে ঝিমাচ্ছিলেন। হঠাৎ হৈ হট্টগোল আরম্ভ হলো।
একজন বয়স্ক মহিলাকে ধরে ধরে এক যুবক খুপরিতে ঢুকলো। ঢুকেই বলল, ডাক্তারবাবু, তাড়াতাড়ি দেখুন। একটু আগে মা অজ্ঞান হয়ে গেছিল।
মহিলার বয়স সত্তরের কাছাকাছি। জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে?
যুবক বলল, মাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। মায়ের কথা বন্ধ হয়ে গেছে।
আমি বললাম, কথা আবার কখন বন্ধ হলো?
অজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই । জ্ঞান ফিরেছে, সবকিছু শুনছে, সবকিছু বুঝতে পারছে, কিন্তু কথা বলতে পারছে না। মনে হয় স্ট্রোক হয়েছে।
আমি বললাম, কিন্তু দেখে যে স্ট্রোক বলে মনে হচ্ছে না। হাত-পা সব নড়ছে। নিজেই হাঁটছেন। হয়েছিল কী?
যুবকটি বলল, কিছুই হয়নি। সকালেও দিব্যি ছিল। দুপুরে এক বন্ধুর সাথে ব্যাংকে গিয়েছিল। সেই বন্ধুই ফোন করে জানালেন মা খুব অসুস্থ। ব্যাংকে অজ্ঞান হয়ে গেছেন। গিয়ে দেখি এই অবস্থা। লোকজন জলের ছিটে টিটে দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়েছে। কিন্তু কথা বলতে পারছে না।
ভদ্রমহিলাকে দেখে কিছুতেই স্ট্রোকের পেশেন্ট মনে হচ্ছে না। দিব্যি মনোযোগ দিয়ে আমাদের কথা শুনছেন। ঘাড় নাড়ছেন। শুধু কথা বলছেন না। মানে বলার চেষ্টাই করছেন না। এমন একটা মুখভঙ্গি করে রেখেছেন দেখে মনে হচ্ছে জগত সংসারের উপর তিনি তিতি বিরক্ত।
এসময়ে স্ট্রেট ব্যাটে খেলাই শ্রেয়। বললাম, ওনার কি কারুর সাথে ঝগড়া হয়েছে? মানে কথা কাটাকাটি? আপনার সাথে বা আর কারো সাথে?
যুবকটি বলল, আমার সাথে হয়নি। তবে ব্যাংকে মায়ের বন্ধুর সাথে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছে। কী নিয়ে সেটা জানিনা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন বন্ধু? আত্মীয়স্বজন কেউ?
যুবকটি বলল, নানা আত্মীয়-স্বজন নয়। শুধু বন্ধু। আসলে আমি বিয়েথা করিনি। পুনেতে চাকরি করি। মা বাড়ি বিক্রি করে কাছেই একটা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। বাড়ির জমিতে যে ফ্ল্যাট হয়েছে সেখানে আমাদের একটা ফ্ল্যাট নেওয়া আছে। বছরে তিন-চারবার এসে মায়ের সাথে সময় কাটিয়ে যাই। মায়ের ওই বন্ধু ভদ্রলোক আশুকাকু ওই বৃদ্ধাশ্রমেই থাকেন। ওনার সাত কূলে কেউ নেই। মার ছোটোবেলার স্কুলের বন্ধু। বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার পর নতুন করে আবার যোগাযোগ হয়েছে। আজ ওনার সাথেই ব্যাংকে গেছিলেন। সেখানেই দুজনের কিছু একটা নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছে। আশুকাকু এসেছেন। বাইরে আছেন। ডাকব?
হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই । উনিই ভালো বলতে পারবেন কী হয়েছে।
যুবকটি গিয়ে আশুবাবুকে ডেকে আনল। ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখ করে ঘরে ঢুকলেন। ওনার অপরাধী অপরাধী মুখ দেখেই আমার হাসি পেয়ে গেল। কিন্তু খুপরিজীবী ডাক্তারকে সবসময় গম্ভীর মুখে থাকতে হয়। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাস করলাম, কী হয়েছে? হঠাত আপনাদের দুজনের মধ্যে ঝগড়া হলো কেন?
বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখা মাত্র ভদ্রমহিলা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বিরক্তিতে তাঁর ভ্রু কুঁচকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে হাসা উচিৎ নয়। তবু হেসে ফেললাম।
ভদ্রমহিলা রোষকষায়িত নয়নে আমার দিকে তাকালেন। সত্যযুগ হলে শিওর ভস্ম হয়ে যেতাম।
ভদ্রলোক বললেন, আমি এক্সট্রিমলি সরি অপর্ণা। যদিও আমি এখনও বুঝতে পারছি না আমার দোষটা কোথায়?
কী হয়েছে সেটা বলুন। ঝামেলা কী নিয়ে? কোনও অর্থ নৈতিক ব্যাপার?
ভদ্রলোক কেমন ইতস্তত করছেন। তারপর যুবকটিকে বললেন, বাবা, তাপস। তুমি একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াবে?
যুবকটি বলল, শিওর কাকু।
সে বেরোতেই ভদ্রলোক বলতে লাগলেন, আমি ব্যাংকে চাকরি করতাম। তাই অপর্ণা ব্যাংকের কাজে গেলে আমায় নিয়ে যায়। ও ছেলে এসেছে বলে সাতদিন আগে বাড়ি গেছে। আজ সকালে ফোন করে আমাকে ডাকল। ব্যাংকের কাজ মিটলে আমার খবর জানতে চাইল। বললাম, ভালোই আছি। কাল বৃদ্ধাশ্রমের ছাদে রাত দেড়টা অবধি পিকনিক করেছি। ভাত, ডাল, আলু ভাজা, পাতলা মাংসের ঝোল। তাই শুনে ও হঠাত রেগে গেল। তারপর একটু কথা কাটাকাটি হলো। তারপরই ও অসুস্থ হয়ে পড়ল।
ভদ্রমহিলা এতক্ষণে একটাও কথা বলেন নি। আমাকে অবাক করে তিনি হঠাত বলে উঠলেন, পুরো মিথ্যে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী বলছেন?
পুরো মিথ্যে বলছে। স্কুল জীবনেও এমন মিথ্যাবাদী ছিল। এখনো আছে।
ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন, কী মিথ্যে বললাম আবার?
লুকাচ্ছিস কেন? ওইটা বল। পিকনিকে চারজন মহিলার সাথে বসে বিয়ার খেয়েছিস।
হ্যাঁ খেয়েছি। একটা বোতল। ভাগ করে তিনজনে খেয়েছি। তবে মহিলাদের সাথে বসে খাইনি। আর মহিলারাও কেউ খায়নি। আমরা তিনজন পুরুষ ছিলাম, আলাদা ঘরে খেয়ে এসেছি।
ভদ্রমহিলা বললেন, হ্যাঁ। তারপর মাতাল হয়ে চার বুড়ির সাথে রসালাপ করেছিস?
ভদ্রলোক হতাশ হয়ে বললেন, কী সব ভাষা বলছিস। তুই না সাহিত্যের ছাত্রী। তাছাড়া একবোতলের তিনভাগের একভাগ বিয়ার খেয়ে কেউ মাতাল হয় না।
ভদ্রমহিলা বললেন, তাপস পরশু পুনে ফিরবে। বৃদ্ধাশ্রমে ফিরি। তারপর দেখাচ্ছি, কত ধানে কত চাল।
তাপস উঁকি মেরে বলল, আমি কী আসতে পারি?
ভদ্রলোক যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। নিশ্চয়ই। আস বাবা।
আমার ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বেমাক্কা হাসি পেল। আশুবাবুর কপালে দুঃখ আছে। তবু মনে হচ্ছে উনি পরশুদিনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকবেন।










