কলকাতা ফুটবলের হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যবাহী ক্লাবকে ফের আলোয় তুলে আনার লড়াইয়ে সামিল বাংলার এক প্রতিবাদী ডাক্তার।
অভয়া মঞ্চের সেই ডাক্তারের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই অন্য সবুজ মেরুনে।
লিখেছেন পার্থ দত্ত।
যাঁরা কলকাতা ময়দানে ঘুরে ছোট ক্লাবদের প্র্যাক্টিস বা ম্যাচ দেখেন, তাঁরা যদি এখন কোনও দিন সকাল সাড়ে ন’টা-দশটা নাগাদ ইডেনের উল্টো দিকের রাস্তায় তালতলা মাঠ আসেন, তাহলেই দেখা মিলবে এক অন্য জগতের এক অতি পরিচিতের।
দেখতে পাবেন মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে একঝাঁক কাদা মাখা জুনিয়র ফুটবলারকে উৎসাহ দিচ্ছেন সাদা হাফ শার্ট পরা ছোট করে ছাঁটা কাঁচা-পাকা চুলের এক ভদ্রলোক। নাম ডাঃ তমোনাশ চৌধুরী। ইনি কলকাতার অন্যতম নামী ল্যাপারোস্কোপিক সার্জেন। তবে গত এক বছরে তিনি বিশেষভাবে প্রচারের আলোয় উঠে এসেছেন আন্দোলনকারী এক চিকিৎসক নেতা হিসেবে। গত বছর আরজি কর হাসপাতালের মধ্যে অত্যাচারিত হয়ে খুন হওয়া জুনিয়র ডাক্তারের দোষীদের খুঁজে বের করে তাদের শাস্তি দেওয়ার দাবি তুলে যে অভয়া মঞ্চ গড়া হয়েছে তমোনাশ হলেন সেই মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক। প্রশাসনের টনক নড়ানোর জন্য নিরন্তর আন্দোলন চালিয়ে চলেছেন তমোনাশ। গত সপ্তাহেও অভয়া মঞ্চ থেকে সাইকেল মিছিলে আন্দোলন করায় তাঁকে পুলিশী জেরার মুখে পড়তে হয়েছিল। এই আন্দোলনের জন্যই তিনি এখন রাজ্য প্রশাসনের কাছে এক প্রতিবাদী মুখ।

তালতলা মাঠে টিমের প্র্যাক্টিসের পরে ফুটবলারদের খোঁজখবর নিয়ে কোচ দিব্যেন্দু ঘোষের সঙ্গে পরবর্তী ম্যাচের আলোচনা সারার পরে তমোনাশ শুরু করলেন কথা। তিনি বলছিলেন, ‘বাঁকুড়ার জয়পুর থানার অন্তর্গত মাগুরা গ্রামে আমি পাঁচ বছর ধরে একটা ফুটবল অ্যাকাডেমি চালাই, আমার মায়ের নামে। গীতা স্পোর্টস অ্যাকাডেমিতে প্রায় ১০০ জন ছেলে আর ৫০ জন মেয়ে নিয়মিত প্র্যাক্টিস করে। যার মধ্যে আছে অনেক প্রতিভা। কিন্তু এরা খেলবে কোথায়? তাই আমি কলকাতা লিগে এমন একটা ক্লাব খুঁজছিলাম, যেখানে আমার অ্যাকাডেমির ছেলেরা খেলবে। তালতলা ইনস্টিটিউটের কর্তারা আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছেন।’
তালতলা ইনস্টিটিউট ময়দানে ‘ছোট মোহনবাগান’ হিসেবে চিহ্নিত ছিল সাতের-আটের দশকে। অমল চক্রবর্তী, মোহন সিং, অমিত ভদ্রের মতো জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলাররা ছিলেন এই ক্লাবের প্রডাক্ট। এই ক্লাব বরাবরই সবুজ মেরুন জার্সিতে খেলে। সেই জার্সি পরার জন্যই ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের পরে ওই মাঠের সমর্থকেরা তালতলা টেন্টের দিকে ইট-পাটকলেও ছুঁড়ে যেত। এখনও তালতলা সবুজ মেরুন জার্সি পরেই খেলে। কিন্তু ‘তালপুকুরে ঘটি না ডোবা’ জমিদারের মতো অবস্থা। নামতে নামতে তারা তৃতীয় ডিভিশনে।
সেই জায়গা থেকেই আবার ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু হয়েছে প্রতিবাদী ডাক্তার তমোনাশের হাত ধরে। তালতলা ইনস্টিটিউট এ বার তৃতীয় ডিভিশনে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে। তমোনাশের সঙ্গে রয়েছেন কোচ দিব্যেন্দু। ময়দানে যিনি পরিচিত কাটু নামে। তিনি ছোট টিমের বড় কোচ। ভবানীপুর ক্লাব থেকে অ্যালবার্ট—যে ক্লাবেরই দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের দিব্যেন্দু তুলে এনেছেন উপরের ডিভিশনে।
দিব্যেন্দু বাঁকুড়ায় তমোনাশের অ্যাকাডেমিতে গিয়ে বাছাই করে কিছু ফুটবলার এনেছেন তালতলা ইনস্টিটিউটের জন্য। যেহেতু এই ডিভিশনে খেলে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সিরা, তাই অ্যাকাডেমির সব ছেলেদের এখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তারা অনেকেই খেলে ময়দানের অন্য ক্লাবে। দিব্যেন্দুই বলছিলেন, ‘জেলার ছেলেদের কলকাতা লিগে খেলার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। আমাদের সুবিধে হয়েছে, ডাক্তারবাবু সিঁথিতে তাঁর বাড়িতেই ছেলেদের থাকা খাওয়া দিয়ে রেখে দিয়েছেন। ফলে এই সব ছেলেরা কলকাতা লিগে খেলে আগামী দিনে বাংলার ফুটবলের সাপ্লাইলাইন হতে চলেছে।
ডাক্তারি, আন্দোলন, তার পাশাপাশি এই ফুটবল প্রীতি কী ভাবে? তমোনাশের ব্যাখ্যা, ‘করোনার পরে গ্রামে ফিরে দেখি, সেখানকার ছেলেরা স্কুলে যায় না। সারাদিন ডুবে থাকে মোবাইলে। মানসিকভাবে কার্যত অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তখনই মনে হয়েছিল, কম খরচে ফুটবল খেলার মাধ্যমেই সমাজ সংস্কার করা সম্ভব। মায়ের ইচ্ছাতেই তাঁর নামে আমি গ্রামের স্কুলের মাঠে অ্যাকাডেমি গড়ি। পঞ্চায়েত সাহায্য করে। গ্রামবাসীরাও পাশে এসে দাঁড়ান। খুব দ্রুত ছেলেরা মাঠমুখী হয়।’ এই কোচিং ক্যাম্পের ব্যাপারে ডাঃ চৌধুরীকে সাহায্য করেন সন্তোষ ট্রফি জয়ী বাংলা টিমের কোচ মৃদুল বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃদুলের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছেন দিব্যেন্দুও।
এই অ্যাকাডেমির ছেলেরা শুধু খেলেই না ডাক্তারবাবুর আদর্শে উদ্ধুদ্ধ হয়ে সামাজিক কাজকর্মেও যোগ দেয়। এক ফুটবলার বললেন, ‘কারও প্রয়োজন পড়লে আমরা রক্তদান করে আসি। এলাকার মানুষ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়াই। ডাক্তারবাবুর সাহায্য নিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পড়া মানুষের সেবা করারও চেষ্টা করি।’
পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে তমোনাশ বলছিলেন ‘এত দিন অ্যাকাডেমি ছিল অনাবাসিক। এখন আমি এক স্কুলের সঙ্গে চুক্তি করে থাকা ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করে আবাসিক বিভাগও শুরু করছি। কারণ শুধু তো আমার গ্রামের নয়, বাঁকুড়ার বিভিন্ন প্রান্তের ও অন্য জেলার ছেলেরাও আমার অ্যাকাডেমিতে প্র্যাক্টিসে আসছে। মেয়েদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। মেয়েদের সুবিধের জন্য ড্রেসিংরুম করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য মাঠে লাগানো হয়েছে সিসিটিভিও। সব মিলিয়ে আমার চোখে ফুটবল নিয়ে অনেক স্বপ্ন।’
স্বপ্ন দেখছেন প্রায় হারিয়ে যেতে বসা তালতলা ইনস্টিটিউটের কর্তারাও। ক্লাবের প্রবীণ কর্তা সরোজ ঘোষ বলছিলেন, ‘ডাক্তারবাবু ভীষণ সজ্জন মানুষ। গত বছর উনি আমাদের ফুটবল টিমের দায়িত্ব নিতে চাইলেও আমরা কিছু সমস্যার জন্য তা দিতে পারিনি। এ বার দিয়েই আমরা সাফল্যের মুখ দেখতে চলেছি। আশা করি, ডাক্তারবাবুর হাত ধরেই তালতলা ইনস্টিটিউট ফের ছোট মোহনবাগানের তকমা ফিরে পাবে।’
প্রতিবাদীর লড়াইয়েই যেন এক নতুন স্বপ্ন।










