২২ শে এপ্রিল মঙ্গলবার অভয়া মঞ্চের আহবানে জোড়াসাঁকো থেকে ধর্মতলায় স্টেটসম্যান হাউস পর্যন্ত একটি সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মিছিল সংগঠিত হয়।
বিগত শতাব্দীতে রাখিবন্ধন, সঙ্গীতরচনা ও আত্মশক্তির উদ্বোধনের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনে বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ। বিংশ শতকের সূচনাপর্বে স্বদেশী আন্দোলনের প্রবল জোয়ারের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি রাজনৈতিক আবেগ আর ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদী চিন্তার মেলবন্ধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, বিভেদকামী শাসক কে প্রতিহত করতে সম্প্রদায়গত ঐক্য গড়ে তোলার উপর বারংবার গুরুত্ব আরোপ করেন । রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে পাঁচ শতাধিক মানুষের একটি বর্ণাঢ্য মিছিল বেরোয়।
‘হাতে হাত রেখে পার হব এই বিষের বিষাদসিন্ধু’ -এই শপথ লেখা ব্যানার নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে ধর্মতলার দিকে। মিছিলের দ্বিতীয় ব্যানার দাঙ্গা বিধ্বস্ত শামসেরগঞ্জের সরকারি স্কুলের ছাত্র সন্দীপ আর সুলেমানের অমলিন বন্ধুত্বকে কুর্ণিশ জানিয়ে- ‘তাই তো ওরা বন্ধু আছে অনেক বাধা বিঘ্ন সয়ে/ আকাশ বাতাস বলছে যেন, বন্ধু থাকো বন্ধু হয়ে’। মিছিলে অংশ গ্রহণকারী প্রায় সকলের হাতে বর্ণময় প্ল্যাকার্ডে বিভেদবিনাশী ঘোষণা – ‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো/ এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো‘, ‘ভারত ভূমির সন্তানেরা/ ধর্ম, বর্ণ,হরেক জাতি /সবার তরে সবাই বাঁচে / ঐক্যে বাড়ে দেশের খ্যাতি’, ‘যে জাত ধর্ম ঠুনকো এত/ আজ নয় কাল ভাঙ্গবে সে তো /যাক না সে জাত জাহান্নামে/ রইবে মানুষ, নেই পরোয়া’, ‘সব মানুষের এক অধিকার, ধমনীতে রক্ত লাল’, ‘দলাদলি সব ভুলি, হিন্দু মুসলমান/এক পথে এক সাথে চল/ উড়াইয়ে একতা নিশান’, ‘Communalism is a poison which will eat the core of our country’, ‘No more terror, no more bloodshed, Let the future grow’, ‘Respect every culture and religion/ Inculcate communal harmony in the country’, ‘হম লড়েঙ্গে এক কৌম কে লিয়ে/ যো কৌম দিল মে প্যার জাগাতে হ্যায়/ হম তোড়েঙ্গে য়ো শৃঙ্খল কো / যো খুদ কৌম কো তোড় দেতে হ্যায়’। এমন আরো অনেক রঙিন প্ল্যাকার্ডের সঙ্গে দৃপ্ত কণ্ঠে শ্লোগান ওঠে –‘দাঙ্গা নয় চাকরি চাই/ হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই’।
গায়করা ছিলেন মিছিলের পিছনে একটি ট্যাবলোতে- ডঃ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, ডঃ তরুণ কান্তি কর, স্বরজিৎ রায়, সুদীপ দস্তিদার এবং দ্রষ্টা ব্যানার্জী। বাঁধ ভেঙ্গে দাও এর সুরে, মানুষের উদ্দীপ্ত শ্লোগানে মুখরিত হল জোড়াসাঁকো বড়বাজার চাঁদনি চক আর ধর্মতলার আকাশ বাতাস। এলাকার পথচলতি, কাজফেরতা মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন মিছিলের পাশে, কেউ পা মেলালেন মিছিলের সঙ্গে।
স্টেটসম্যান হাউসের কাছে একটি পথসভা করে শেষ হয় এই মিছিল। সভা পরিচালনা করেন ডঃ পুণ্যব্রত গুণ। এই সভায় বক্তব্য রাখেন ডঃ আসফাকুল্লা নাইয়া এবং ডঃ মানস গুমটা । ধর্মীয় মৌলবাদ এবং কেন্দ্র রাজ্য নির্বিশেষে বিভেদকামী সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে জনগণেকে আহবান জানান বক্তারা। এই সভা শেষ হয় সমবেত কণ্ঠে সলিল চৌধুরীর সেই অবিস্মরণীয় গানটি দিয়ে- ‘ও মোদের দেশবাসী রে/ আয় রে পরান ভাই, আয় রে রহিম ভাই, কালো নদী কে হবি পার’।
বৈশাখের নিদাঘ-তপ্ত রাজপথে মিছিল আর পথসভা শেষ করে অভয়া মঞ্চের যোদ্ধারা ধর্মতলা থেকে সল্টলেক করুণাময়ীতে চাকরিহারা শিক্ষকদের অবস্থানে যখন যোগ দেন, তখন চারপাশে নেমে এসেছে সূর্যহারা সন্ধ্যার অন্ধকার। এ যেন এক প্রতীকী আঁধার, যা গ্রাস করছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ, আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। তবু আশাহীনতা কে পরাস্ত করে, বিভেদের বাধা চূর্ণ করে ছুটে চলে দুর্জয় মানুষের স্বপ্নের উচ্চৈঃশ্রবা।













অসাধারণ লিখেছ গোপাদি।