‘অগ্নীশ্বর’ সিনেমা দেখেন নি, এ রকম মানুষ আমাদের প্রজন্মে খুব কম থাকার কথা, অবশ্য বর্তমান প্রজন্মের কথা আলাদা। কাহিনীকার মেডিকেল কলেজের প্রাক্তনী বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, পরিচালক তস্ব ভ্রাতা বাঁকুড়া মেডিকেল কলেজের প্রাক্তনী অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। ‘অগ্নীশ্বর’ এ উত্তম কুমার অর্থাৎ নায়ককে দেখা যায় ডাক্তারী করছেন রীতিমতো দাপটের সাথে, রোগীরা তার ভয়ে তটস্ত, আবার তাদের সঙ্গে ডাক্তারের গভীর সম্পর্ক আন্তরিক শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসায়!
সে সব দিন ছিল বটে!! তখন ডাক্তার প্রচণ্ড বকুনি-ধমক দিতো রোগী নিয়ম না মানলে, মাস্টার ক্লাসে ঢুকতো হাতে ছড়ি/বেত নিয়ে, রাস্তাঘাটে একটু বেচাল দেখলে পাড়ার বয়স্করা কড়া শাসন করতে পারতেন ! আর এসবেতেই পুরো অনুমোদন ছিল বাড়ির গার্জেনদের, গার্জেন বলতে কিন্তু শুধু বাবা-মা বোঝাতো না, দাদু-জ্যাঠা-কাকা এমনকি তাদের ঘনিষ্ঠরা, সবাই ছিল। মাস্টারমশায়ের কাছে শাস্তি পেয়ে বাড়িতে বলার প্রশ্নই ছিল না, তাহলে আবার দ্বিতীয় দফায় প্রহার ছিল অনিবার্য, এবার অবশ্য বাড়িতেই। আমি বাবার বদলীর কারণে সাতটি স্কুলে পড়েছি ঘুরে ঘুরে। ক্লাসে ঊচ্চ পদস্থ অফিসার বা পুলিশের সন্তান অনেককেই পেয়েছি সহপাঠী হিসেবে। কিন্তু কোনোদিন কোনো গার্জেনকে স্কুলে এসে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে দেখিনি তার ছেলেকে কেন শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যদিও এই বিষয়ে শিক্ষকরা ছিলেন অতি উদারপন্থী বা প্রায় সাম্যবাদী, কাউকেই রেয়াত করতেন না।
আসলে, তখন শিক্ষক, ডাক্তার বা পড়াশোনা করা লোকদের সমাজে একটা আলাদা কদর ছিল, এমনকি গুণ্ডা বদমাইশরাও এদের কিছুটা হলেও সম্ভ্রম দিতো।
যাক, সে সব দিনের কথা ভেবে কোনো লাভ নেই। ডাক্তাররা বুদ্ধিমান হয়ে গেছে, রোগীর সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করে না, সময় সত্যিই মূল্যবান। পাড়ার অভিভাবকরা কবে জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন পাড়ার মাস্তান ও কাউন্সিলর এর কাছে (এরা আবার প্রকৃত অর্থেই কাউন্সিলিং করেন অর্থাৎ কীভাবে আপনি নির্বিঘ্নে না হলেও নিরাপদে বাঁচতে পারবেন)। আর ছড়ি হাতে মাস্টারের দেখা শেষ কবে পাওয়া গেছে জানতে গেলে হয়তো আর্কাইভ ঘাঁটতে হবে!!
মুশকিল হলো, যেদিন থেকে মাস্টারের হাতের ছড়ি গিয়ে উঠলো রাজনৈতিক নেতা ও তার সাঙ্গোপাঙ্গো মাস্তানদের হাতে, সমস্যার শুরু সেখান থেকেই। আর এখন তো মাস্তানরাই নেতা, তাদের সাঙ্গোপাঙ্গো হলো পুলিশ ও প্রশাসন!! এই দ্বিতীয় স্তরে অর্থাৎ পুলিশ ও প্রশাসনে একসময় বেশ কিছু ঘাড়বেঁকা মানুষ ছিল যাদের বাগে আনা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এমনকি মন্ত্রীদেরও দুঃসাধ্য ছিল। যে কারণেই হোক বর্তমান কালে এরা ‘অতি দুষ্প্রাপ্য প্রজাতি’তে পরিণত, খুঁজে পাওয়া সত্যিই সুকঠিন!!
নাহলে, ভাবতে পারেন পদস্থ পুলিশ অফিসার অতিশয় নির্লিপ্ততার সঙ্গে শিক্ষকদের উপর লাঠিচার্জকে ব্যক্ত করছেন minimum force applied হিসাবে, যেন শিক্ষক তো কী হয়েছে, so what!! কোথাও কোনো দুঃখ প্রকাশ ছেড়ে দিন, নূন্যতম মানবিক ভাব প্রকাশের লেশমাত্র ছিল না। ব্যাপারটা যেন এর থেকে কম কিছু কখনোই আশা করবেন না!!
মনে রাখতে হবে, কোর্ট যাই অর্ডার দিক, এরা কিন্তু এখনো termination notice পায়নি, সুতরাং তখনো অর্থাৎ লাঠিচার্জ পর্যন্ত সরকারিভাবে শিক্ষক হিসেবেই স্বীকৃত। অবশ্য তাতে কীই বা যায় আসে। বরং, শিক্ষক বলেই বোধহয় এ রকম ব্যবহার করা যায়, যথার্থ গুণ্ডা বদমাইশ হলে, তার কদরই হতো আলাদা !!
কয়েক দিন আগেই সেনাবাহিনীর তিন প্রধানের সাংবাদিক সম্মেলন ছিল, কথাবার্তায় ভীষণ ভাবে সংযত। কোনো ঝকমকে পোশাক বা চকমকে টুপি পড়ে আসেন নি, Press meet এর সময়ে বরং টুপি খুলেই রেখেছিলেন।
সেই প্রেক্ষিতেই সম্ভবতঃ, বড্ডো বেমানান লাগছিল সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের রাজ্যের আধিকারিকের body language বা শরীরী ভাষ্যকে। ঠিক কোন শব্দটা তার সঙ্গে সবচেয়ে সুপ্রযুক্ত হবে বুঝতে পারছি না, দম্ভ, স্পর্ধা না ঔদ্ধত্য ?!
তবে, এসব বলে আর লাভ কী?! সেই পুরোনো কথা, মাস্টারের ছড়ি আজ হস্তচ্যুত। ছড়ি এখন চালাচ্ছে গুণ্ডা মাস্তান আর শাসক একান্ত অনুগতরা। শেষোক্তের মধ্যে প্রশাসনকে ভালোই মানাবে……..









