তেরো বছর আগে এইরকমই এক বর্ষাদিনে শত শত বাঙালির হাত একটি শবদেহ স্পর্শ করে শপথ নিয়েছিল — পশ্চিমবঙ্গকে নৈরাজ্যের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়া থেকে প্রতিহত করতে একজোট হবে। হবেই। অকালমৃত মানুষটি তাই চেয়েছিলেন যে!
কিন্তু ২০১২ সালের ৫ই জুলাই ভর সন্ধেবেলা একটি ব্যস্ত স্টেশন চত্বরে নিরস্ত্র মানুষটিকে দুষ্কৃতীর গুলিতে আহত হয়ে পড়ে গিয়ে কাতরাতে দেখেও ঐ শতশত শপথ নেওয়া হাতের একটিও সময় মতো এগিয়ে আসেনি তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে বলে! যদি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের আতঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে হাতগুলি সেদিন মূমূর্ষুকে বাঁচাতে উদ্যোগী হতো তবে আজ বরুণ বিশ্বাস হয়ত বেঁচে থাকতেন। তিনি বাঁচেননি। তাই সুটিয়া পেরিয়ে এসেছে কা*মদুনি, এসেছে সন্দে*শখালি আর শি*লিগু*ড়ি, এসেছে আর জি*কর, এসেছে কস*বা ল’ ক*লেজ। হয়ত আরও আসবে।
আমরা, সাধারণ নাগরিককুল ‘সেফ’ খেলতে পছন্দ করি। কবি বিদিশা সরকার চলে গিয়েছেন। সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ। এর একশো একটা কারণ থাকতে পারে। আমি জানি না। জানতে চাইও না। কারণ, প্রতিটি মৃত্যু অনন্য। ঠিক যেমন প্রতিটি জীবনও অনন্য।
শুনলাম, কবি বিদিশার জীবদ্দশায় তাঁকে ঘিরে ছিল নির্জনতা। যা তছনছ হয়ে যেতে দেখলাম তাঁর মৃত্যুর পরে।
কিছু মৃত্যুর পরে নীরব শোকজ্ঞাপনের প্রয়োজন থাকে বলে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি, কিন্তু কাউকে তা মানতে বলি না — কারণ, এটাও বিশ্বাস করি, প্রত্যেকটি মানুষের পরিমিতিবোধ তার নিজস্ব। সেখানে সংশোধন চলে না।
কিন্তু কিছু মৃত্যুর পরে কণ্ঠ ছাড়া দরকার। দরকার চিৎকার করে প্রতিবাদ করা। এক বছর, দু’বছর, পাঁচ বছর, দশ বছর, পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মর্মান্তিক স্মৃতিতে পলি জমতে দেওয়া উচিত নয়। মাস্টারমশাই বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যু তেমনই।
কিন্তু, ঐ যে, আমরা সেফ খেলতে পছন্দ করি। আমরা নিজেরাই বিশ্বাস করি না, সংশোধনাগারে ঢোকার মুখে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর হাতে শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত ধরিয়ে দিয়ে তাকে পড়ার অনুরোধ করা যায়! আমরা মগজাস্ত্রে শান দেওয়া আরও দুর্দান্ত, দুর্ধর্ষ থ্রিলার পড়তে চাই, দেখতে চাই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। আমরা আরও নতুন, আরও অদ্ভুত উদ্ভাবনী থিম দেখতে চাই আমাদের ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ উৎসবে, মুঠোফোনের বিপণিতে আরও অবিশ্বাস্য ‘অফার’ চাই, দূরদর্শনে চ্যানেলে চ্যানেলে আরও রক্ত গরম করা খবর চাই, উত্তেজক বিনোদন চাই, দেখনবাহারি রকমারি বেড়াতে যাওয়ার জায়গা চাই, রসনার মুখবদল চাই — আরও অনেক অন্যায্য কিছু চাই মনে মনে — হয়ত সর্বসমক্ষে স্বীকার করতে চক্ষুলজ্জায় বাধে।
কিন্তু এইসব চাহিদার বাইরে একটা বৃহত্তর, আটপৌরে, বিপন্ন দুনিয়া আছে — আমাদেরই প্রতিবেশে — সেদিকে ভুলেও ফিরে তাকাতে চাই না।
যদি চাইতাম, তাহলেও হয়ত উপরোক্ত দুর্ঘটনাগুলি আটকানো যেত না পুরোপুরি — কিন্তু শাসনহীন নৈরাজ্যের লাগামটা হয়ত বা একটু টেনে ধরা যেত। শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস চেষ্টা করেছিলেন। শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতি একা গলা ছেড়ে প্রতিবাদ করেছেন প্রকাশ্যে।
আমরা?
যখন গর্জে ওঠা দরকার, তখন নিজস্ব ছোট পরিসরেও যদি প্রতিবাদ করতে না পারি, না পারলাম — যেখানে নীরবতা শ্রেয়, সেখানে নিঃশব্দ থাকি বরং।
🙏🙏










