বাবাসাহেব আম্বেদকরের (১৮৯১ – ১৯৫৬) জীবনের সেরা রাজনৈতিক ও পার্টি কর্মসূচি তৈরি হয় ১৯৩৮ সালে, যার সাথে কমিউনিস্ট নীতির খুব মিল ছিল। তিনি গঠন করেন “ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি”। বম্বের শিল্পাঞ্চলে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা ব্যাপক দলিত শ্রমজীবী মানুষকে তিনি সংগঠিত করেন এবং তাঁদের পরিবারের সঠিক বাসস্থান, তাঁদের পুত্রকন্যাদের শিক্ষা প্রভৃতি নিয়ে বিশেষ মনোযোগী হন। ইতিমধ্যে নারায়ণ মেঘাজী লোখান্ডে (১৮৪৮ – ১৮৯৭), মণিবেন কারা (১৯০৫ – ১৯৭৯), সিপিআই প্রমুখেরা বম্বে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের সচেতন ও সংগঠিত করছিলেন। আম্বেদকরও ইতিমধ্যে দলিতদের তালাও বা জলাশয় ব্যবহারের অধিকার, মন্দিরে প্রবেশের অধিকার, ভূমিহীন দলিত কৃষকদের জমিদারি তালুকদারি জেনমি খোটি মালগুজারি রায়তারি সামন্ত ব্যবস্থায় অন্তহীন শোষণের বিরুদ্ধে বড় বড় আন্দোলন সংগঠিত করেন। কংগ্রেস সোসালিষ্ট পার্টি র সাথে বিশাল শ্রমিক কৃষক অভিযান সংগঠিত করেন।
সে বছরই কমিউনিস্টদের সাথে তাদের যৌথ কার্যকলাপ, শ্রমিক ধর্মঘট ইত্যাদি ঘটে। আম্বেদকর সিপিআই এর শ্রমিক সংগঠন এ আই টি ইউ সি কে নিয়ে এক লক্ষ শ্রমিকের ধর্মঘট করে ব্রিটিশ প্রশাসনকে জোড়ালো বার্তা দিতে পেরেছিলেন।
ধনী শিল্পপতি ও সামন্ত জমিদারদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট উচ্চবর্ণের গান্ধী – প্যাটেল – নেহরু কংগ্রেসী নেতৃত্বের ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সহযোগী কর্মসূচির বিপরীতে আম্বেদকরের নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টি, সিপিআই, সিএসপি, সার্ভেন্টস অফ দ্য পিপল দের জনমুখী এবং কৃষক, শ্রমিক, দলিত, জনজাতি মুখী এই কর্মকাণ্ড গুলির অন্যতম রূপকার ছিলেন অন্যতম সংগঠক ও দার্শনিক শ্যামারাও বিষ্ণু পারুলেকর (১৯০২ -১৯৬৫) যিনি মহারাষ্ট্রের কুখ্যাত “খোটি-প্রথা”র বিরুদ্ধে ৫০ হাজার আন্দোলনকারী কে বম্বে বিধানসভার সামনে জড় করেছিলেন, আর একই সাথে বিধানসভার ভেতরে তাঁর নেতা আম্বেদকর আইনিভাবে ঐ প্রথাটি তুলে দেবার জন্য সংগ্রাম চালাচ্ছিলেন।
১৯৩৯ সালে শ্যামারাও সিপিআই-তে যোগ দেন ও মহারাষ্ট্রে রাজ্য কমিটির সম্পাদক হন। ওয়ার্লিতে আদিবাসীদের নিয়ে সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলে কারাবরণ করেন। সারা ভারত কৃষক সভার সভাপতি হন। একাধিকবার বিধায়ক ও সাংসদও হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে পুনরায় কারাবাস কালে, সিপিএমের গঠনকালে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হন ও ১৯৬৫ সালে কারাগারেই শহীদের মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর সহধর্মিনী ছিলেন কিংবদন্তী-প্রতিম কমিউনিস্ট নেত্রী গোদাবরী পারুলেকর (১৯০৭ – ১৯৯৬)। তাঁর নেতৃত্বে বম্বের গৃহকর্মী নারী শ্রমিকদের বিশাল আন্দোলন এবং ঠানে জেলার ওরলিতে জনজাতি কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল।
এছাড়াও ছিলেন রামচন্দ্র বাবাজী মোরে র (১৯০৩ – ১৯৭২) মত দলিত কমিউনিস্ট নেতা। একাধারে তিনি বাবাসাহেব আম্বেদকরের নেতৃত্বে মাহাদ সত্যাগ্রহ, মনু স্মৃতি দহন দিন অভিযান গুলি সংগঠিত করেছিলেন, আবার নিরলস কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে ভুমিহীন কৃষক, দলিত, জনজাতিদের সংগঠিত করেন। সারা জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যান জাতিভেদ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
সিরাজগঞ্জ, তেভাগা, তেলেঙ্গানা, পুন্নাপ্পা ভায়লার, দণ্ডকারণ্য, ভোজপুর প্রভৃতি ভারতের ইতিহাসে অসংখ্য ইতিবাচক উদাহরণ আছে। সর্বগ্রাসী বৃহৎ পুঁজি ও তাদের দক্ষিণপন্থী দল গুলির আর্থ – সামাজিক – রাজনৈতিক – সাংস্কৃতিক দখলদারির বিরুদ্ধে পারস্পরিক দোষারোপ, কোন একটি জনবিরোধী দক্ষিণপন্থী দলের ধামাধরা বা ক্ষুদ্র সহযোগীর ভূমিকা পালন না করে ঐক্যবদ্ধভাবে, শোষিত বঞ্চিত অত্যাচারিত সমস্ত মানুষের পাশে সবসময় থেকে, বিনম্রভাবে নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে তুলে, ধারাবাহিকভাবে জনমুখী পরিবর্তনের প্রয়াস আকাঙ্খিত।
সংকলন: বাপ্পাদিত্য রায়
কৃতজ্ঞতা: এন কে বিশ্বাস









