গত বাইশে এপ্রিল থেকে ভয়ঙ্কর কালো মেঘের তাঁবুতে আছি সবাই। দিন রাতের চাকা ঘুরছে তার মতো। মন মেঘলা হলেও কাজ থেমে থাকে না কারো। আমিও রুটিনমাফিক চেম্বারে। সেই আধাগঞ্জের চেম্বার যেখানে বসে ‘পাশের গলির গল্প’ লিখেছিলাম।
এখন সেই ছোটো চেম্বারটা পলিক্লিনিক হয়ে গেছে। অনেক ডাক্তার বসেন। মাঝখানে একটা কমন ওয়েটিং প্লেস। আমার পেশেন্ট দেখছি –হঠাৎ কাশ্মীর নিয়ে কানে কিছু কথা এল, হাতের কলম একটু থামল।
একটু চা খাওয়ার বিরতি নিয়ে আড়ি পেতে শুনছি –দু’জন অপেক্ষারত অসুস্থ মানুষের কথা।
–ইয়ে কাম কই ইনসান কা হোই নেহি স্যাকতা হ্যায় বেটা ইত্যাদি বলছেন কাঁপা গলায় কেউ।
এবার চায়ের কাপ হাতে দরজা একটু ফাঁক করে দাঁড়ালাম।
রোগা কালো কাঁচা পাকা চুল এক ভদ্রলোক, গায়ে লালচে রঙচটা টি শার্ট,ছেঁড়া হাওয়াই চপ্পল, গলায় কন্ঠি।
পাশে ধবধবে দাড়ি, মলিন সাদা পাঞ্জাবি, ফেজ টুপি এক বৃদ্ধ। কাঁপা হাত দেখেই বুঝলাম আগের গলাটা ওনার। আমার উল্টো দিকের ঘরে জেনারেল ফিজিশিয়ানকে দেখাতে এসেছেন বোধহয়।
পলিক্লিনিক থেকে পেশেন্টদের চা দিতে এল, ডাক্তারদের সঙ্গে পেশেন্টদেরও চা খাওয়ায় এরা।
হাওয়াই চপ্পল বলল–নাহ ভাই, চা দিও না। এক পাতা প্যান ফর্টি একশো সত্তর টাকা-অম্বলের ব্যথা উঠলে এখন পেট চেপে বসে থাকি। চায়ের নেশা ছেড়ে দিয়েছি।
সাদা দাড়ি চাচা জিজ্ঞাসা করলেন–তা, কি কাজ কর বেটা?
হাওয়াই চপ্পল বলল–বাসে বাদামের প্যাকেট বেচতাম। ব্যবসা খুব পড়ে গেছে এখন। প্রথম যখন কম বয়সে কাজ শুরু করলাম, সেই আগে যখন জিটি রোডের রুট ছিল–কত লোকাল বাস, কত বাসস্ট্যান্ড। কত লোকজন। ছেলেপিলে, কলেজ ছাত্তর, বউ বাচ্চা সবাই পটাপট বাদাম কিনে খেত। কত রোজগার ছিল। এখন হাইওয়ে–ভলভো বাস, লম্বা রুট। বাসে ফেরিয়ালা ওঠা বারণ। একটা দুটো লোকাল বাস। পথের পাশে পাশে বাসস্ট্যান্ড নেই। ছেলেপিলেরাও কুড়কুড়ে আর লে চিপস খায়।
চাচা বলেন–তা অন্য কোনো ব্যবসা ধর।
–আর বলেন না চাচা। এই বাদাম ভেজেই জীবন কেটে গেল। কিন্তু যা রোজগার শুধু বাদাম বেচে আর চলে না, তাই লোকের বাগানে কাজ করতে গিয়েছিলাম কদিন –এই দেখুন না হাতের অবস্থা, এই দেখাতেই এসেছি।
সাদা দাড়ি চাচা কাঁপা হাতে ওনার হাতটা আলতো করে টেনে ধরে দেখলেন। একটু কষ্টসূচক শব্দ বেরোলো দাড়ির ফাঁকে।
তারপর বললেন –তোমার বড় পাতলা চামড়া, ভারি কাজ করনি তো ছোট থেকে –অন্য কাজ ধর।
–চাচা। সে চেষ্টা কি করিনি? কপাল মন্দ। ওই মোড়ে একটা ভাতের হোটেল ছিল মনে আছে? দিনে বাদাম ফেরি, সন্ধ্যায় ওখানে কাজ করতাম –এই খদ্দের ডাকা টেবিল মোছা, টেবিলে খাবার দেওয়া। ভালোই চলছিল। ওই যে রাস্তা তৈরির সময় হোটেলটা ভেঙে দিল, ব্যস চাকরি খতম। ওই হুস হুস গাড়ি চলা হাইওয়ে আমাদের কতজনের যে ভাত মেরেছে। মেয়েটা উচ্চ মাধ্যমিক দিল –কলেজে পড়তে চায়। যা রোজগার আর টানতে পারব না।
পাকা দাড়ি চাচা উদাস ভাবে কাঁপা গলায় বললেন–আল্লা ঠিক একটা উপায় করে দেবেন।
আমি কমবয়সে কি করতাম জানো? ট্রেনে বাসে সুর্মা বিক্রি করতাম। তখন বাবু বিবিরা অনেকেই চোখে সুর্মা পরতেন। হঠাৎ একদিন দেখি–তাজ্জব কি বাত! আমার মানিব্যগ এত পাতলা কেন? চোখ মেলে দেখি সবার চোখে ল্যাকমের কাজল, আমার বিক্রি নেই। তখন দেশে, পাটনাতে দরজির কাজ শিখলাম নানার কাছে। টেলারিং এ বেশ নাম হল –সাদি লেড়কা লড়কি সব হল। টাকাপয়সাও হল আবার হুস করে সব উড়েও গেল। লেড়কা লড়কিদের পড়ানো, বিয়া সাদি দেওয়া। বিবিও চলে গেছে দু’বছর হল। এখন কাজকাম পারিনা কিছু, হাতে পয়সা ভি নেই। একাই থাকি আল্লার ভরসাতে।
–খাওয়া পরা চালান কিভাবে চাচা? আমি তো পরিবারকে ভাতের পাশে ডাল দিতে পারিনা এখন। চালটা রেশনে ফ্রি পাই বলে বেঁচে আছি।
চাচা বলেন–আমার একটা পেট, চলে যায়। অগলবগল মে যো আদমি হ্যয় বহত হেল্প করে।
হাতে ঘা আমার পেশেন্ট, দেখে দিলাম। এবার অন্য পেশেন্ট দেখায় মন দিয়েছি। কিছুক্ষণ পর বাইরে একটা হৈচৈ ‘কি হল কি হল’ রব কানে এল। বেরিয়ে দেখি চাচা ওনার ডাক্তার দেখিয়ে বেরিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছেন।
পড়ারই কথা। অ্যাডভান্সড পারকিনস রোগের পেশেন্ট দেখেই বোঝা যায়। তার উপর সেদিন যা লু বইছে। কতক্ষণ বসে আছেন।
সামনের বেঞ্চিতে মোটা সিঁদুর পরে খেটে খাওয়া দুজন গ্রামের বউ বসেছিলেন। তারা লাফ মেরে এসে কাপড়ের থলে থেকে বোতল বের করলেন, চোখে মুখে জলের ছিঁটে দিলেন চাচার। আমি এতগুলো বছর ডাক্তারির রিফ্লেক্স অ্যাকশনে ছুটে গিয়ে পালস ধরলাম। বললাম –একটু ওআরএস আনো দেখি, সোডিয়াম কমে গেছে মনে হচ্ছে।
দোকানের ছেলেটা ওআরএস আনল, কলেজ পড়ুয়া একটা মেয়ে ফটাফট জলে গুলে চাচার মুখে দিতে লাগল। চাচা ছোট শিশুর মতো খেলেন আর চোখ মেলে উঠে বসলেন। পারকিনসন রোগীর বসা থেকে দাঁড়ানো বড় কঠিন। সবাই মিলে কোনরকমে দাঁড় করাল। এবার কোশ্চেন হল চাচা একলা বাড়ি যাবেন কি করে? এক সর্দারজী এতক্ষণ বসে খৈনি খাচ্ছিলেন, আমাকেই তো দেখালেন কিছুক্ষণ আগে। তাঁরও সেই গরিবী রোগ, আর হাইওয়ে চিরশত্তুর। জিটি রোড ভ্যানিশ, অটোর খদ্দের কমে গেছে। মাথার পাগড়ি ঠিক করে ফিল্ডে এলেন। বললেন –হামি পৌঁছে দেব চাচাজীকে। চাচা হাঁ হাঁ করে উঠেন –একটু বসি, হেঁটেই যাব। অটোর পয়সা নেই।
সর্দারজী হুঙ্কার ছাড়লেন –পয়সা কৌন মাঙ্গা? চাপুন। লেকিন, কাউকে সঙ্গে যেতে হবে ওনাকে ধরে বসার জন্য। নেহি তো চাচা গির জায়গা। এটা ঠিক। যা কাঁপুনি আর ব্যালেন্সের গন্ডগোল –অটোতে একা চাপানো যাবে না।
সেই বাদামওয়ালা বললেন –চলুন, আমি যাচ্ছি।
সর্দারজীর অটো ফটফট করে স্টার্ট নিল। পেছনের সিটে হাওয়াই চপ্পল গলায় কন্ঠি লোকটি সাদা দাড়ি চাচাকে দুহাতে বেড় দিয়ে ধরে বসেছেন। গ্রামের বউ দুটি কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন –দুগ্গা দুগ্গা।
আবার বাকি দু চারটে পেশেন্ট দেখায় মন দিলাম। ফেরার পথে গাড়ির সীটে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ আগের সিনটা রিওয়াইন্ড করলাম। তিন সত্যি –এটা কিন্তু কোন অলীক গল্প নয়, খুব স্বাভাবিক নিত্যনৈমিত্তিক যা ঘটে থাকে। আজ তাকে বিশেষ তারিফের চোখে দেখে লিখতে হচ্ছে। সবাই জানে আমাদের শিল্পশহর ঘেঁষা এই গঞ্জে হিন্দু, মুসলিম আর শিখ সমান পার্সেন্টেজ। সবাই যেন এক বৃহত্তর পরিবার। যে শব্দটা মনে এল, সম্প্রতি সেই গালাগালি হয়ে যাওয়া শব্দটা বসালে এতগুলো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসাকে বড় খাটো করা হবে। তবু মনে প্রশ্ন পিছু ছাড়ে না –রাতারাতি ‘স্বাভাবিক’ এর প্রতিশব্দ কি ‘সেকুলার’ হয়ে গেল !!
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের “ইজ্জত” গল্পটা খুব মনে পড়ছে আজকাল। অনেক বছর আগে নোয়াখালি প্রেক্ষাপটে লেখা। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা শুধু টেনিদার জনক করেই রেখেছি। তাঁর বড়দের কিছু ছোটগল্প মাস্টারপিস। “ইজ্জত” গল্পটি বেশ বড়, সার সংক্ষেপ হল– দুই সম্প্রদায়ের নেতারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য উস্কানি দিচ্ছেন আর দুই দল গরীব মানুষেরা কেউ রাম দা-তে শান দিচ্ছেন, কেউ লাঠিতে তেল মাখাচ্ছেন। পাশাপাশি ফকির আর কালীর থান। এই নিয়ে ঝগড়া কাজিয়া। দুই সম্প্রদায়ের সবচেয়ে লড়াকু সৈনিক আর সবচেয়ে গরীব মানুষ -ধলা মন্তাই যে কাফেরকে গাল না দিয়ে পানি ছোঁয় না, আর জগন্নাথ ঠাকুর যে অন্য সম্প্রদায়ের ছায়া মাড়ায় না। কিন্তু, এখন মহা আতান্তরে পড়েছে ওরা দুজনেই। ঘরে ভাত তো নেই কচুঘেচু খেয়ে আছে, এবার দুজনের বউ আত্মহত্যা করবেন বলে হুমকি দিয়েছেন কারণ পরনের একটাই কাপড় এমন ছিঁড়ে গেছে যে লজ্জা নিবারণ হয় না। রেশনের কাপড় যা আসছে তলায় তলায় নেতারা সব ঝেড়ে দিচ্ছেন।
দুই দলে বিরাট একটা হাঙ্গামা লড়াই এই বাধে কি সেই বাধে। থমথমে পরিবেশ গ্রামে। এমন সময় খুব বড়মানুষের চতুর্থ বিবি মারা গেল। সবাই দেখল দামি মসলিনের কাপড় পরতে পরতে জড়িয়ে দাফন হল। গ্রামের সবাই কাঁদল খুব।
সেই রাতে গোরস্থানে ঠক ঠক শব্দ–কেউ লাল বিবির কবর খুঁড়ছে। এমন বেয়াদব শয়তান কে আছে গ্রামে? সবাই মার মার করে ছুটে গেল। মেরেই ফেলবে আজ বেয়াদবগুলোকে। টর্চের আলো পড়তেই সবার হাতের অস্ত্র থমকে গেল! শাবল দিয়ে মাটি খুঁড়ছে ধলা মন্তাই আর জগন্নাথ ঠাকুর কনুই পর্যন্ত মাটি মেখে সেই মাটি তুলছে।
গল্পের একদম শেষ লাইন উদ্ধৃত করলাম –“কিন্তু লোকগুলো সব যেন পাথর হয়ে গেছে। মারবার জন্যে কারও হাত উঠল না, এমনকী আঙুলগুলো এতটুকু নড়ল না পর্যন্ত। শুধু সকলের বিস্মিত বিমূঢ় মনে একটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—ফকির আর কালীর ভেতরে এত সহজে মিটমাট হয়ে গেল কেমন করে?”
সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মিটমাট চিরকালই ছিল, আছে, থাকবে–এ তো জল আলো বাতাসের মতো সহজ স্বাভাবিক ব্যাপার। শুধু কারা যে –ওই —











