যোধপুরের সার্কিট হাউসের সন্ধেরাতে লাল মেরজাই পরা অচেনা লোককে দূরে পালিয়ে যেতে দেখে গম্ভীর মুখে ফেলুদা বলেছিল –“নিশ্চিন্ত আর থাকা গেল না রে তোপসে।”
যখন পারিপার্শ্বিক বাতাবরণ ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো সাধারণ মানুষের ছাপোষা নিত্যযাপনের নিশ্চিন্ততা ক্রমাগত ছিঁড়েখুঁড়ে দিচ্ছে, তখন ব্যক্তিগত শোক আঘাতের অছিলায় বালিতে মুখ গোঁজা স্থবির উটের মতো থাকা হলো না আমারও।
সন্ত্রাস আর তার মোকাবিলায় প্রশাসনের করণীয় বিষয়ে উতোর চাপান এতই চলেছে সমাজমাধ্যমে, যে নতুন কোনও কথা লেখার অবকাশ নেই।
সিন্ধু জলচুক্তি থেকে ভারতের সরে আসা ভাল না খারাপ কাজ? শত্রুদেশকে মুখের মতন জবাব দিতে দেরি করা কি উচিত? নাকি আস্তে সুস্থে ঘুঁটি সাজিয়ে তাদের মাত করার লক্ষ্যে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়ে এগোনো উচিত দেশের?
সেসব না হয় উচ্চতর প্রশাসনের দায়িত্ব কর্তব্য, আমাদের কি করতে হবে এখন? সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু, হিন্দুস্তান- পাকিস্তান, কাশ্মীরী- অকাশ্মীরী পক্ষ তৈরি করে লড়ে যেতে হবে — হবেই। এ তো অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
ওসব অহিংসা টহিংসা সবই বুঝি একপক্ষীয়? সহ্য করার আর এক নাম দুর্বলতা নয়?
কথাদের মতো দ্রুতহারে বংশবৃদ্ধি কোনও ভয়াবহ জীবাণুও করতে পারে না। অতএব জানা কথা, যে কথায় কথা বাড়বে।
মনীষীদের উক্তি, খণ্ডিত দর্শনের উদ্ধৃতি ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর সেই উক্তির পূর্বাপর বক্তব্য বিচার করার ধৈর্য্য, স্থৈর্য্য কোনওটাই না থাকা আধুনিক দেশপ্রেমিকেরা মনীষী-মনস্তত্ত্বের সার্থক স্বাক্ষরের স্ক্রিনশট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন তথাকথিত নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা মানুষজনের উপরে।
এইবারে দেখা যাক, এই তথাকথিত নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা মানুষজন কারা?
ক্ষীণকণ্ঠে যাঁরা যুদ্ধের বিরোধিতা করে সুস্থ আলোচনার পরিসর খোলা রাখার পক্ষে সওয়াল করার চেষ্টা করছেন এবং বিনা বাক্যব্যয়ে অসংখ্য মানুষের দ্বারা judged হচ্ছেন, তাঁরা।
তাঁরাই so called secular, অতএব বিপজ্জনক।
অথচ যাঁরা নীরবে দোকানপাট, বাজারহাট, ইস্কুল কলেজ, রান্নাবান্না, অক্ষয় তৃতীয়া পালন কিংবা ছোট্ট ছুটিতে বেড়িয়ে আসা — এইসব সাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন কোথাও কোনও পক্ষ অবলম্বনকারী মতামত না রেখেই, তাঁরা কিন্তু এই আধুনিক দেশপ্রেমিকদের চোখে বিপজ্জনক নন।
কারণ, তাঁদের ‘যত বেশি জানে, তত কম মানে’-র তকমা দিয়ে বিদ্রোহী ঘোষণা করা সম্ভব নয়। তাঁরা নিরীহ নাগরিক। যত সমস্যা সুরে সুর, তালে তাল না মেলানো তথাকথিত সুস্থ-চিন্তকদের নিয়েই।
আগেও তাই ছিল।
এখনও ‘সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে।’
‘ঘরে বাইরে’তে সন্দীপের জবানিতে লেখা রয়েছে -‘দেশকে চোখে দেখতে না পেলে আমার দেশের লোক জাগবে না। দেশের একটা দেবীপ্রতিমা চাই। কথাটা আমার বন্ধুদের মনে লেগেছিল; তারা বললে, আচ্ছা, একটা মূর্তি বানানো যাক। আমি বললুম, আমরা বানালে চলবে না, যে প্রতিমা চলে আসছে তাকেই আমাদের স্বদেশের প্রতিমা করে তুলতে হবে। পূজার পথ আমাদের দেশে গভীর করে কাটা আছে, সেই রাস্তা দিয়েই আমাদের ভক্তির ধারাকে দেশের দিকে টেনে আনতে হবে।
এই নিয়ে নিখিলের সঙ্গে কিছুকাল পূর্বে আমার খুব তর্ক হয়ে গেছে। নিখিল বললে — যে কাজকে সত্য বলে শ্রদ্ধা করি, তাকে সাধন করবার জন্য মোহকে দলে টানা চলবে না।
আমি বললুম — মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ, মোহ নইলে ইতর লোকের চলেই না, আর পৃথিবীর বারো আনা ভাগ ইতর। সেই মোহকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্যেই সকল দেশে দেবতার সৃষ্টি হয়েছে, মানুষ আপনাকে চেনে।
নিখিল বললে, মোহকে ভাঙবার জন্যেই দেবতা। রাখবার জন্যেই অপদেবতা।’
——-
ভারতবর্ষে এই যে দুর্গা জগদ্ধাত্রীর পূজা বাঙালি উদ্ভাবন করেছে এইটেতে সে নিজের আশ্চর্য্য পরিচয় দিয়েছে। আমি নিশ্চয় বলতে পারি, এ দেবী পোলিটিকাল দেবী। মুসলমানের শাসনকালে বাঙালি যে দেশশক্তির কাছ থেকে শত্রুজয়ের বর কামনা করেছিল, এই দুই দেবী তারই দুই রকমের মূর্তি। সাধনার এমন আশ্চর্য্য বাহ্যরূপ ভারতবর্ষের আর কোন জাত গড়তে পেরেছে?
কল্পনার দিব্যদৃষ্টি নিখিলের একেবারেই অন্ধ হয়ে গেছে বলেই সে আমাকে অনায়াসে বলতে পারলে, মুসলমান শাসনে বর্গি বলো, শিখ বলো, নিজের হাতে অস্ত্র নিয়ে ফল চেয়েছিল। বাঙালি তার দেবীমূর্তির হাতে অস্ত্র দিয়ে মন্ত্র পড়ে ফল কামনা করেছিল; কিন্তু দেশ দেবী নয়, তাই ফলের মধ্যে কেবল ছাগমহিষের মুণ্ডপাত হলো। যেদিন কল্যাণের পথে দেশের কাজ করতে থাকব, সেইদিনই যিনি দেশের চেয়ে বড়ো, যিনি সত্য দেবতা, তিনি সত্য ফল দেবেন।’
নিখিলেশ এবং সন্দীপ, দুই-ই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট চরিত্র। কার উক্তি রবীন্দ্রমানসের দর্পণ, তাই নিয়ে আজকের দিনে যদি জল্পনা করতে হয়, তবে আমাদের রবীন্দ্রচেতনা শূন্যগর্ভ — এমনটাই মনে করি।
কোনও বিষয়েই রবীন্দ্রনাথের কোনও মুরুব্বি বা কৌঁসুলির আজ আর প্রয়োজন নেই, তবু ‘ঘরে বাইরে’র সন্দীপের একটি উক্তি দিয়ে লেখা শেষ করব।
‘আমি বললুম, আমি আজকের দিনের ফলটা চাই, সেই ফলটাই আমার।
নিখিল বললে, আমি কালকের দিনের ফলটা চাই, সেই ফলটাই সকলের।’










