পাহাড়তলির ছোট্ট গ্রামের নাম ব্লাতেন। একেবারে ছবির মতো। চারদিকে সফেদ বরফে ঢাকা পর্বতের সারি।আর সেইসব পর্বতের সানু দেশের বিস্তির্ণ উপত্যকায় শান্ত নিরিবিলি দীর্ঘ ৮০০ বছরের পুরনো এই গ্রামীণ বসতি। দেখলেই তার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে।এই ছোট্ট গ্রামটি আজ এক চরম বিপর্যয়ের শিকার। সুইস আল্পস পর্বতের এক ছিন্নমূল হিমবাহের আকস্মিক পতন- অভিঘাতে ছবির মতো সুন্দর ব্লাতেন গ্রামটি আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে– এমন একটা বড়সড় মাপের বিপর্যয়ের খবর আগাম জানানো হয়েছিল? হ্যাঁ, হিমবাহ বিজ্ঞানীরা আগেভাগেই এমন একটা বিপর্যয় যে ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে সে সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন। পর্বতের ঢালে থাকা হিমবাহের গায়ে ফাটল দেখা গিয়েছিল কিছুদিন আগেই। সুতরাং বিপর্যয়ের আশঙ্কা যে একেবারেই ছিলোনা তা নয়। সতর্কবার্তা পেয়েই খুব দ্রুততার সঙ্গে গ্রামের মানুষজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাবার কাজও চলছিল জোরকদমে। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি গোটা হিমবাহের এভাবে ভেঙে পড়াটা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিজ্ঞানীদের কাছেও পরম বিস্ময়ের ব্যাপার।
এখনও পর্যন্ত ১ জন মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর স্বীকার করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। অকুস্থলে এখনও পর্যন্ত খোঁজাখুঁজির কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি কেননা গোটা এলাকার প্রায় ২ কিলোমিটার অংশ আনুমানিক ৩০ – ৪০ মিটার নুড়ি বালি পাথর আর কাদার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে !
কেন এই হিমানি সম্প্রপাত ?


হিমানি সম্প্রপাত ও জলবায়ুর পরিবর্তনের সম্পর্ক
পৃথিবীর হিমবাহরা ভালো নেই। ইতোমধ্যেই আমরা সবাই জেনেছি যে পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলের মহাদেশীয় হিমবাহের বিস্তৃতি ক্রমশই কমছে। পাশাপাশি পৃথিবীর সুউচ্চ পর্বতমালার ওপরে থাকা পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহগুলোও যে খুব নিরাপদ তেমনটাও নয়। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশ হিমবাহ সম্পূর্ণভাবে গলে গিয়ে লোপাট হয়ে যাবে। সুইজারল্যান্ডের অপেক্ষাকৃত নিচু উচ্চতার হিমবাহগুলোও এই পরিবর্তনের ফলে বিপন্নতার শিকার হতে চলেছে। ২০২৪ সালে বিখ্যাত Scientific American জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে সাংবাদিক Alee Luhn জানিয়েছেন, – “ হিমবাহ ও তুষার ক্ষেত্রগুলো এভাবে গলে যাবার কারণে প্রতিফল হিসেবে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বেড়ে যাবে। আসলে চিরহিম বা পারমাফ্রস্ট অঞ্চলগুলো কার্বনের আবদ্ধ ভাণ্ডার। এই হিমায়িত এলাকাগুলো বায়ুমণ্ডলে মুক্ত কার্বনের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম। ফলে এগুলো গলে যাবার অর্থ হলো বায়ুতে বিমুক্ত কার্বনের পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যাওয়া।” তাঁর মতে, এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে সুইজারল্যান্ডের বার্চ হিমবাহের মতো তুলনামূলক ভাবে ছোট হিমবাহগুলো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে এবং হিমানি সম্প্রপাতের ঘটনা বাড়বে। Luhn এর মতে, “গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে বর্তমানে চিরহিম অঞ্চলগুলো যে পরিমাণ কার্বন ধরে রাখছে তার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে কার্বন কণা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে দেবার ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমশই বাড়ছে।” সমস্যা যে অত্যন্ত গম্ভীর তা বোধহয় বুঝতে পারছি সকলেই।
বিপন্ন মানুষের জীবন ও জীবিকা।
বার্চ হিমবাহের ভেঙে পড়ার ঘটনা নানান প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের সকলকে। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর বিজ্ঞানীরা মনে করছেন যে প্রবল শিলাপাতের ঘটনাই আংশিকভাবে হিমবাহ ভেঙে পড়ার কারণ। হিমানি সম্প্রপাতের ঘটনা কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নেই, অন্যান্য বিপর্যয়ের মতো এই ঘটনাও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষদের জীবন যাপন ও জীবিকার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পার্বত্য এলাকার উন্নয়ন পরিকাঠামোর ওপরেও এমন বিপর্যয়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে যে দুনিয়া জুড়ে কমবেশি ১৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের গতিপথের আশেপাশের এলাকায় বসবাস করে। পার্বত্য হিমবাহের গলে যাওয়া জল হ্রদের পরিসীমা ছাপিয়ে যে পথে বয়ে যায় সেই পথেই বিপজ্জনক ভাবে বসবাসে বাধ্য হয় বহুসংখ্যক মানুষ। গ্লফ বা হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বিস্ফোরণ এইসব মানুষের জীবনকে নিয়ত শঙ্কিত রাখে। Global Cryosphere Report সূত্রে জানা গিয়েছে যে এই কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয় প্রভাবিত অঞ্চলের দেশগুলোকে যা উন্নয়নের গতিকে বিলম্বিত করে।
অত: কিম্?
ক্ষীয়মান হিমবাহ আমাদের অস্তিত্বের সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে রেহাই পেতে পারি আমরা? আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে কোন্ কোন্ লক্ষণচিহ্ন দেখে? খুব দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু হিমবাহের ক্ষয়ক্ষতিকে ঠেকাতে প্লাস্টিকের আচ্ছাদন ব্যবহার করা হচ্ছে পৃথিবীর নানান অংশে। এই ব্যবস্থা হিমবাহের গলন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে সাহায্য করে। এছাড়া পৃথিবীর প্রায় সমস্ত হিমবাহ অধ্যুষিত এলাকায় স্নো গান বা তুষার বন্দুক ব্যবহার করা হয় তুষার কণাকে পুনঃ কেলাসিত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে। ভারতের লাদাখে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে হৃতমান হিমস্তূপকে ফিরিয়ে আনতে। এছাড়াও হিমবাহ উপত্যকায় রঙ করা পাথরের খণ্ড রেখে দেওয়া হয় যাতে করে শিলা স্খলনের বিপর্যয়ের আগাম আভাস পাওয়া সম্ভব হয়। হিমবাহের ফাটলপথে বরফগলা জল ঢুকলে হিমবাহ আরও ভেঙে যায় ও প্রবল শব্দের সৃষ্টি করে। এই শব্দের তীব্রতা পরিমাপ করে বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করে চলেছেন যাতে বিপদের পূর্বাভাস দিতে পারেন তাঁরা। একাজে সফল হলে বহু মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে আজকের পৃথিবীর হিমবাহরা গভীর সমস্যার সম্মুখীন। হিমবাহ শূন্য হিমালয় পর্বতের চেহারাটা দেখে আৎকে ওঠার জোগাড় হয়েছে। এই দৃশ্যকে সহ্য করা সত্যিই কঠিন। তাই বিশ্বজুড়ে সচেতনতার জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রচার চলছে। হিম গলনের ফলে পর্বতের ওপরে অবস্থিত হিমহ্রদগুলোর টইটম্বুর টলমল অবস্থা। সিকিমের দক্ষিণ লোনক হ্রদের বিস্ফোরণের মতো ঘটনা যে কোনো মুহূর্তে ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই হিমবাহরা হারিয়ে গেছে চিরকালের মতো। আর যাতে এমনটা না হয় তার জন্য সতর্ক থাকতে হবে আমাদের সকলকে।
তথ্যসূত্র ও ছবি দ্যা গার্ডিয়ান সহ অন্যান্য পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন। গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
জুন ২,২০২৫.














মন খারাপ হয়ে গেলো সকাল বেলায়। কিছুদিন আগে ভোর বেলায় উত্তরবঙ্গের একটি জায়গায় এক জনের সাথে কথা হচ্ছিল এমনই একটা বিষয় নিয়ে। সে এসেছিল কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলতে। আমাদের কাঞ্চনজঙ্ঘার শরীরেও বরফের চাদর কমছে। সাধারণ ফটোগ্রাফিতেও সেটা বোঝা যায়। কাজের সুত্রে নিয়মিত উত্তরবঙ্গের পাহাড় যাওয়ার ফলে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হচ্ছে সেটা মোটেও সুখকর নয়। আল্পসের মতো হিমালয়ও ভালো নেই!
মন খারাপের কিছু নেই। প্রকৃতির রাজ্যে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে এমন ঘটনার তীব্রতা তরান্বিত হচ্ছে মাত্র। পৃথিবী খুব দ্রুত তেমন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। দুঃখটা এখানেই। হিমালয়ের হাল বেশ উদ্বেগের।
এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, মানুষই এর কারণ আর সেই মানুষই এর ভুক্তভোগী…
মজা এখানেই দিদিমণি। এজন্যই বলা হয় – ভাবিয়া করিও কাজ।করিয়া ভাবিও না। অমন সুন্দর গ্রাম ব্লাতেন নিমেষেই উধাও।
অনেক কথা জানা গেল। এই শতাব্দীর শেষে তিন চতুর্থাংশ হিমবাহ গলে যাবে।পরিস্থিতি তো বেশ খারাপ ।
অবস্থা সত্যিই বেশ চিন্তায় ফেলে দেবার মতো। দুই মেরুর অবস্থাও বেশ ঘোলাটে।
BAPRE. KI SANGHATIK.
এতো ট্রেলার হ্যায় রাজীব বাবু! পিকচার অভী বাকি হ্যায়।
একদম নতুন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ব্লাতেনের ভয়াবহ পরিণতি আমাদের সন্ত্রস্ত করে। পরিবেশ নিয়ে আমাদের আরও ভাবতে হবে, ভালোবাসতে হবে।
একদম শেষে যে কথা বলেছেন সেই কথাই মাথা ও মনে গেঁথে রাখুন।ঐটিই সার কথা। ব্লাতেন গেছে এসেছে লাচেন,ছাতেন। খেলা চলবে নিরন্তর। ভালো থাকুন। পরিবেশকে ভালো রাখুন।
Oshadharon! Otyonto tothyo shomriddho! Dhanyobad lekhatir jonyo.
এমন বিপর্যয়ের কথা লিখতে লিখতে কলম ক্লান্ত হয়ে গেছে। তবুও লিখি এই ঘটনা থেকে যাতে আমরা সচেতন হতে পারি।ব্লাতেনের বিপর্যয় সত্যিই ভয়ঙ্কর। নেহাত জনবিরল এলাকা। এদেশে হলে কী হতো?!!!!