প্রথমে ছিলেন মাত্র তিনজন। তিনটি গোবেচারী ধরণের মানুষ-প্রাণী। হাত কচলিয়ে। সফেদ কুর্তা পায়জামা সমেত। আর বিরক্তিকর উগ্র আতর গন্ধী। বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছিলেন– হাজী মানুষ ডাক্তারবাবু। হাফেজ মানুষ। আর দ্যাখেন, ইন্তেকাল হলো কোথায়? মসজিদে। আল্লাহ পাকের নজদিকে। এঁকে আর কাটবেন না সাহিব! ছিঁড়বেন না।
অনড় ছিলাম আমি। আর তাই চিত্র হিসাবমাফিক বদলে গেল ঘন্টা দেড়েক পরেই। হাসপাতালের সম্মুখে জমায়েত হলো– কিছু একটা। যে ‘কিছু একটা’র পোশাকি নাম– জনতা। যে জনতার কোনো বিশেষ নাম বা পরিচয় নেই বটে! এবং নামহীন যে ‘জনতা’র পেশীশক্তি প্রশ্নাতীত। নেতা হোক বা বিধাতাপুরুষ, যে জটলাকে সমঝে চলেন দুজনেই। এই নামহীন, মুখহীন দলা-পাকানো প্রাণীগুলিই তো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাঁদের। নতুবা, বিধাতা আর নেতার স্থান তো ছিল স্রেফ ডাস্টবিনে।
এ ঘটনার বছর সাতেক পরের চিত্র।
আবারও মৃত হয়েছেন একজন। আর তিনজন আমার সম্মুখে। আবারও। টুলে আর প্লাস্টিক চেয়ারে বসে।
– গুরু হামদের! নবদ্বীপ থেকে আসছেন। নিজের হাতে রাইন্ধা খান! একে পোছ মটম করবেন না সার গো! গোঁসাই মানষি! হেই গো ডক্টর সাব…
বলাই বাহুল্য সেই সেবারও অনড় ছিলাম আমি। বিজ্ঞানমনস্ক ভাবে। আর তাই সেবারও ঘন্টা দেড়েক পরেই বৈষ্ণব প্রনাম মন্ত্র
বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ
পতিতানাং পাবনেভ্যো বৈষ্ণবেভ্যো নমো নম
এসব ফেলে থুয়ে জমায়েত ছিলেন সত্তর-আশি খানিক মানব। কন্ঠিধারী। আত্মার সাথে পরমাত্মার পূজক যাঁরা। এবং যাঁরা ছিলেন খড়্গহস্ত। শত্রুজাতি, উগ্রচণ্ডা শাক্ত-স্বরূপ।
উপরিউক্ত দুটি ক্ষেত্রেই নিয়ম মেনেই ফোন এসেছিল আমার কাছে।
– ডিসি/ ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দিন/ দাও/ দে।
–দিন, একটু বুঝুন।
–দাও, এসবে জড়িও না।
–দে না রে বক*দ।
দিইনি। অবশ্যই দিইনি।
দেবও না। হ্যাঁ এমনকি দেবো না আমার চিকিৎসায়/আন্ডারে বহুদিন থাকা রোগীকেও। যদি তাঁর মৃত্যু হয় আমার অথবা হাসপাতালের অনুপস্থিতিতে।
কারণ আমি, হ্যাঁ আমি, আমি আমি মনে করি ব্যক্তিগত ভাবে, ইনস্টিটিউশনাল ডেথ যদি না হয় তবে সে সবের সার্টিফিকেট দেওয়ার অধিকার নেই কারো। আমার বহু পরিচিত হেঁপো রোগীও যদি ৯২ বছরে মরে যায় বাড়িতে অথবা আমার অনুপস্থিতিতে তাহলে,… তার শংসাপত্র আমি দিতে পারি না। তার যে খু/ন হয়নি এ আমি বলতে পারি না। বলতে পারেন? আপনি? এক/দুই/পঁচিশ ঝলক দেখে?
বস্তুত আইন করা উচিত। নিয়ম হওয়া উচিত। কড়া। হ্যাঁ। হোক না কাটাছেঁড়া। শরীর নিয়ে। তাতে হয়ত সূক্ষ্ম অনুভূতিতে আঘাত লাগবে– আমার ফুলের মতো বিটিটারে কাইট্যা কাইট্যা সেলাই করতেছে গ আল্লাহ!
হোক। মাতার বুকে হানুক শেল। পিতার বুকে তীর।প্রিয়র ছাতিতে আঘাত। কিন্তু এসব কিছু ছেড়ে ভাবা উচিত আমার সন্তান/ প্রিয়তম/বেরাদর ঠিক কোন রোগটিতে ম’রে গেল! সে রোগে আর কারো বুক যেন খালি না হয় ভগবান!
হ্যাঁ আমার আত্মা যিনি তাঁরও পোস্টমর্টেম হয়েছিল। আর সেই মর্মে আমিই স্বাক্ষর করে হলফ-নামা দিয়েছিলাম কর্তৃপক্ষকে। যদিও তখন আমি পুরোদস্তুর চিকিৎসক। চাইলেই প্রভাব খাটাতে পারতাম দপ্তরের।
করিনি। বরং উৎসুক ছিলাম। মানুষটি বিগত হলেন কেন! কোন সে রোগে!
আমি সরাসরি হস্তক্ষেপ চাই। নীতি নির্ধারকদের। institutional death / স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মৃত্যু ব্যতীত প্রতিটা মৃত্যু খতিয়ে দেখা হোক।









