একটু অপ্রিয় কথা, যেটা এখুনি না বললেই নয়। কোনও নির্দিষ্ট পেশাজীবি/জনগোষ্ঠীর আন্দোলনই শাসককে বিচলিত করতে পারে না, যতদিন না সে আন্দোলন সমাজের বাকি অংশের সমর্থন পায়, যতদিন না সেই আন্দোলন সবার আন্দোলন হয়ে ওঠে।
এই আন্দোলনও তেমনই।
সমাজের প্রায় সব অংশের বিপুল সমর্থন ছিল বলেই এই আন্দোলন শাসকের উদ্বেগের কারণ হতে পেরেছে। মাননীয়া যে আন্দোলনকারীদের দাবিদাওয়ার একটা বড় অংশ মেনে নিয়েছেন – মেনে নিয়ে প্রতিশ্রুতিপালনের সময় তিনি অত্যন্ত চালাকি করে প্রতিশ্রুতিপালনের এক বিকৃত অর্থ করেছেন, সেটা আলাদা কথা – কিন্তু আন্দোলনটা স্রেফ জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন হয়ে থাকলে, এমনকি সামগ্রিকভাবে ডাক্তারদের আন্দোলন হয়ে থাকলেও, সরকার এমন করে চাপে পড়ত না।
তো সাধারণ মানুষ যাঁরা এই আন্দোলনের পাশে ছিলেন – দলীয় পরিচয় অগ্রাহ্য করে দলমতনির্বিশেষে এই দলীয়-রাজনীতি-মুক্ত আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন – আন্দোলনকারীদেরও দায় থাকে সেই সহযোদ্ধাদের পাশে থাকার। বিশেষত যখন বর্তমান সরকারের প্রতিহিংসাপরায়ণতা নিয়ে সংশয়ের কোনও অবকাশ নেই, তখন সেই পাশে থাকার দায়টি অবশ্যপালনীয় কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
কলতান দাশগুপ্ত।
বর্তমান আন্দোলনের সূত্রপাত যদি ধরি, তাহলে হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের তরফে তড়িঘড়ি লাশ হাসপাতাল থেকে বের করে নেওয়ার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো – গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গাড়ি আটকানো – সেই ঘটনাটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এবং সেই প্রারম্ভিক রুখে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধানতম চরিত্রদের মধ্যে ছিলেন কলতান।
খুব প্রত্যাশিতভাবেই কলতানকে পুলিশ জেলে ভরেছে। না, সেই রুখে দাঁড়ানোর ঘটনায় নয়, প্রত্যাশিতভাবেই অন্য এক কারণে। কলতান নাকি নাশকতার চক্রান্ত করছিলেন। শাসক তথা পুলিশের অপরাধের প্রতিবাদ করতে যান যাঁরা, ঠিক তাঁরাই, এই রাজ্যে প্রায়শই, দেখা যায়, বিভিন্ন ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র ও নাশকতার’ মামলায় জড়িয়ে যান (পরে অবশ্য প্রমাণের অভাবে ছাড়াও পেয়ে যান এবং আদালতে পুলিশ ভর্ৎসিত-ও হয়, নিয়মিতভাবে – শুধু সংশ্লিষ্ট মানুষটির মাঝের ক’টা দিনের হয়রানি নিয়ে বাকি কেউ কথা বলেন না)!
তো, একইভাবে, সত্যবাদী হিসেবে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য মানুষ শ্রী কুণাল ঘোষের অভিযোগের ভিত্তিতে, থুড়ি ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে’ কলকাতা পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত উদ্যোগে, নাশকতার চক্রান্তকারী কলতান দাশগুপ্ত গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতার হয়েছেন, আজ দিনতিনেক হলো। এ নিয়ে সরকার বা কলকাতা পুলিশের উদ্দেশে আমার কিছুই বলার নেই, এমনকি কুণালবাবুকেও কিছুই বলার নেই – কেননা, ছেলেবেলায় পড়েছি, অমুকের কাজ অমুক করেছে, কামড় দিয়াছে পা-য়, তাই বলে কি ইত্যাদি প্রভৃতি।
কিন্তু, কলতান দাশগুপ্ত-কে অন্যায়ভাবে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের তরফে – সংগঠিতভাবে না হলেও, অন্তত ব্যক্তিগতভাবে – তেমন প্রতিবাদ উঠে আসছে না কেন?
এই আন্দোলনে যে বিপুল সংখ্যার মানুষ জড়িয়ে ছিলেন এবং আছেন – তাঁরাও কেন জোর গলায় বলছেন না, কলতানের মুক্তি চাই?
লক্ষ কণ্ঠে আওয়াজ উঠুক – কলতানের মুক্তি চাই।
কলতানের জন্য হোক কলরব।
পুনঃ- কলতানের মা গুরুতর অসুস্থ আর স্ত্রী গর্ভবতী, এই সেন্টিমেন্টের জন্য কলতানের পাশে দাঁড়ান, এসব কথা বলছি না – বলছি, স্রেফ নিজের স্বার্থেই এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন। কেননা, কলতানের মতো পরিচিত নেতার সঙ্গে যদি এই অন্যায় করা যায়, তাহলে আমার-আপনার মতন আমজনতার সঙ্গে পুলিশ/সরকার কী কী করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই না?









